গ্রন্থ আলোচনা : বুলেট কিংবা কবিতার আঘাত-প্রেমের ভুবনে প্রেমের চাষ

,
প্রকাশিত : ০৩ নভেম্বর, ২০১৮     আপডেট : ৩ বছর আগে
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এম এ আসাদ চৌধুরী: কবি মোয়াজ্জিম আল হাসান। তরুণ্যের এক উজ্জল চেহারা। বিভাগীয় শহর সিলেটের চামেলীবাগ আবাসিক এলাকায় জন্ম। ১৯৯৭ সালের ১১ সেপ্টেম্বরে। বর্তমান অবস্থান খাদিমপাড়ায়। মোয়াজ্জিম কবিতা লিখেন। তার সাথে পরিচিতি তার কবিতার মাধ্যমে। প্রকাশনিতে কাজ করতে গিয়েই তার আগে তার কবিতার সাথে কথা হয়। কথাগুলো বেশ শক্তিশালি। বুলেটের মত। অবশেষে দেখা হলো তার সাথে। কথাও হলো। মাত্র ক’দিনে বেশ সখ্যতাও গড়ে ওঠলো। কথার সেই বুলেট গুলোকে মলাটবন্দি করেছেন “বুলেট কিংবা কবিতার আঘাত” নাম্নী বসনের দ্বারা। এটি তার দ্বিতীয় একক গ্রন্থ। শোনেছি এর আগেও “সন্ধ্যে নামার কাব্য” নামে আরেকটি কবিতা গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে।

কথার শক্তিবলে তার এই বই সংক্ষেপে “বুলেট” বলে খেতাব পেয়ে যায় প্রকাশের পূর্বেই। তো এই “বুলেট” এর শব্দবিন্যাস, ইলেট্রাশনের কাজ করেছি আমি। এতেকরে সবকটি কবিতা পড়া হয়েযায়। ইডিটিং’র সুবাদে বেশ কয়েকবার নজর হাটানো হয় তাতে। তবুও মলাটবদ্ধ একটি “বুলেটে”র আবদার থাকে লেখকের কাছে। সিলেটের কেমুসাস বইমেলা ২০১৮ উপলক্ষ্যে মার্চে পাপড়ি প্রকাশ থেক প্রকাশিত হলেও দীর্ঘদিন পর সেপ্টেম্বরে অটোগ্রাফ সহ বইটি আমি পাই।

তার বইয়ের প্রথম কবিতা “শিরোনামহীন” শিরোনামে। এই কবিতায় কবি ফুটিয়ে তুলেছেন ভালোবাসার শহর, ভালোলাগার প্রহর, ভালোথাকার বহর।

বলে রাখি, “বুলেটের” অস্থির এক চরিত্র “অন্ত্রিলা” বইটির ভেতর হাঁটতে গেলে বেশ ক’বার চোখে পড়বে চরিত্রটি। বুলেটের আঘাত কিন্তু তাকেই উদ্দেশ্য করে ছুড়েছেন কবি। প্রশ্ন জাগতে পারে কে সেই অন্ত্রিলা? পাঠক হৃদয়, হৃদয় দিয়ে হাঁটলে এখানে অন্ত্রিলাকে পাবে। অশান্ত সমাজ রূপে, উশৃঙ্খল যুবা রূপে, অশ্লীল তরুণী রূপে। কিন্তু কেনো এই চরিত্র? হ্যাঁ পাঠক তা বুঝবে বুলেটের সুরে প্রেমের যাদু দেখে। কবি তাকে ডাকছেন শান্তির সমিরণে উড়তে। শৃঙ্খল জীবনের স্রোতে ভাসতে। শ্লীলতার চাদরে ঢাকতে। কবিতা তা বুঝিয়েছেন তার বুলেট কিংবা কবিতার আঘাত শিরোনামের দীর্ঘ কাব্যে,

” বুলেট কিংবা বিদ্রোহ নয় প্রেমিকা,
আঘাত করবো কবিতায়!”
হৃদয়ের সমস্ত শক্তিদিয়ে-
ধ্বংস করে দেবো ভিত্তিহীন অহংকারের বিধ্বংসী দেয়াল।”

“বুলেট কিংবা যুদ্ধ নয় প্রেমিকা,
আঘাত করবো কবিতায়!

এ আঘাত রক্তক্ষয়ী নয়,
এ আঘাত প্রেমের, এ আঘাত শাশ্বত সরলতার!
এ আঘাত অন্য কিছুর”

এই অন্য কিছুতেই কবি উহ্য রেখেছেন হাজারো ভালোবাসা, ভালোলাগা।

তরুণ এই কবি স্বপ্ন দেখেন কবিতার উচ্চ শিখড়ে পৌঁছার। কাব্য যুদ্ধের মহামঞ্চে বিজয়ের উল্লাসে বিভূর কবির কবির স্বচ্ছস্বপ্ন। তার এই বিজয় স্বপ্ন শুধু কবিতার বিজয় ভেবে পাঠক হৃদয় স্বপ্ন কার্পণ্যের পরিচয় দেবে না নিশ্চইয়। তার এ স্বপ্ন বিস্তর, তার এ স্বপ্ন সর্বাঙ্গীণ। তার এ স্বপ্ন মানবতা বিজয়ের। কবি তার “কবিতা” শিরোনামের কাব্যে তা প্রকাশ করেছেন।

“একদিন আমার কবিতাটিও পাঠ হবে- গণসূর্যের মঞ্চে!
শহীদ মিনারের রৌদ্রতপ্ত দীঘল উঠুনে দাঁড়িয়ে আমার কবিতাটিও –

চিৎকার করে করে বাতাসে ছড়াবে
কেউ একজন…
যে কবিতাটি লিখা হবে না কোনোদিন!

যে কবিতাটি ভুমিষ্ঠ হওয়ার পূর্বেই হয়েগেছো ইতিহাস! ”

কবি তার কবিতায় সামাজিক বিবর্ণতা তুলে ধরেছেন ব্যথিত হৃদয়ে। সমাজ, পরিবেশ, পরিস্থিতির এহেন নষ্টামি কবিকে উদ্ভুদ্ধ করে এক অনাকাঙ্ক্ষিত বিপ্লবের পথে। তার সুরে বাজিয়ে তুলে “বিপ্লব আসতে আর দেরী নেই”
কবি তার এ কাব্যে বলেছেন সমাজের হাড়কাঁপানো কিছু সত্যকথা।

” রাজনীতি শিখে গেছে গণ্ডমূর্খ রাখাল বালকেরা
রোদপোড়া বস্তির বিপন্ন ছেলেটাও; সিগারেট ফুঁকতে ফুঁকতে গলির মোড়ে আড্ডায় মেতে ওঠা শিখে গেছে
স্কুল মাস্টারের নির্বোধ সন্তান
‘আড়চোখা বায়েজিদ’

বুজুর্গ সাহেবের কনিষ্ঠ কন্যাটাও
ফেসবুকে এসে নাম দিয়েছে ‘এঞ্জেল আনিকা’
মধ্যরাতে ম্যাসেঞ্জারের দুনিয়ায়-
বিক্রিহয় বিবস্ত্র মন!”

সমাজের এতোশতো পরিবর্তন পরিবর্জন সত্যেও কবি ভালোবাসেন মা, মাটি ও মানুষ কে। এই দেশের প্রতি, এই শহরের প্রতি, এখানকার মানুষ, পরিবেশ, প্রকৃতির প্রতি তার জন্ম-জন্মান্তরের প্রেম ভালোবাসা। তাই তো কবি “বুলেট কিংবা কবিতার শহর” কাব্যে বলেছেন,

“কোথাও যাচ্ছি না এই জনতার মিছিল-বিক্ষুব্ধ স্লোগান
এই অধিকার আদায়ের বারুদগন্ধা রাজপথ ছেড়ে,
এই নির্মল উদ্যানের পাশে গড়ে ওঠা দালানের বন, রৌদ্রতপ্ত কীন্ ব্রীজের বুকে ছুটে চলা মানুষের অবাধ্য কিছু স্বপ্ন…

এই লাল নীল গল্প ছেড়ে, এই গল্পের নগরী ছেড়ে-
কোথাও যাচ্ছি না আমি আর! ”

“এই শহর ছেড়ে কোথাও যাবো না আমি,
থেকে যাবো কবি ও কবিতার মত বারবার ফিরে এসে,
পার্কের বেঞ্চে নেচে ওঠা বৃষ্টির মত থমকে- চমকে হেসে
থেকে যাবো পাতাকুড়ানি মেয়ে অঞ্জনাকে ভালোবেসে…
বারবার;

এই পথচারী হিমুদের নগরী ছেড়ে,
এই বুলেট কিংবা কবিতার শহর ছেড়ে
কোথাও যাচ্ছি না আমি আর…।

কবি মোয়াজ্জিম আল হাসান। তার প্রেম, ভালোবাসা, স্বপ্ন, বিশ্বাস নিয়ে জন্ম-জন্মান্তর এই দেশ, মাটি, মানুষ, পরিবেশ আর প্রকৃতির মাঝে বেঁচে থাকুন এই কামনা।


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আরও পড়ুন