ক্যামেরা কাহানী -৪ — পাভেল রহমান

Alternative Text
,
প্রকাশিত : ২২ জুন, ২০২১     আপডেট : ৫ মাস আগে
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

পাভেল রহমান  ছবি তোলার নেশায় নিজের ক্যামেরা ‘ রিকো ‘ দিয়ে সাপ্তাহিক সচিত্র সন্ধানীতে ১টি বছর বেতন বিহীন কাটিয়ে দিলাম। ৩০০ টাকা বেতন আগ্রিম নেয়া যাতায়াতের বিল বাবদ পুরোটাই হিসেব মিলিয়ে দেন সম্পাদক এবং শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী । শ্রদ্ধেয় কবি বেলাল চৌধুরী যিনি আমার ডাক নাম পাভেল এর সাথে রহমান যোগ করেছিলেন তাঁর অগাদ স্নেহ আর মিসেস গাজী সাহাবুদ্দিনের আদর আমার সন্ধানী থেকে বেড়িয়ে আসা বাঁধা হয়ে উঠেছিল। সেই সাথে সচিত্র সন্ধানী ‘ টিম ‘ আমাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল ছবি তোলার নেশায়।
ওখানে থাকতেই ‘ কিশোর বাংলা ‘ শিশুদের সাপ্তাহিক পত্রিকা আমার ভালো লাগায় কিছু দিন সেখানে কাজ করছিলাম। এখানেও কাজ করছি বিনা পয়সায়। কিশোর বাংলায় আমার বন্ধুরা ছিল সবাই ষ্টাফ। ছড়াকার বর্তমানে চ্যানেল আইতে আব্দুর রহমান, বন্ধু আলিমুজ্জামান, সাইফুল যুগান্তর , শিল্পী আফজাল হোসেন।


এরই মাঝে ১৯৭৬ সালে দৈনিক সংবাদের সিনিয়ার ফটোগ্রাফার মোহাম্মদ আলম আমাকে সংবাদে নিয়ে আসেন। এখানেও বেতন বিরাম্বনায় পড়তে হয়। সন্ধানীর মতই টানা ১ বছর বিনা বেতনে কাজ করতে হয়। প্রতিদিনই আমার ‘ এপয়ন্মেন্ট লেটার ‘ দেয়া হবে বললেও একবছর বিনাবেতনে আমাকে খাঁটিয়ে নেয়া হয়েছিল। যদিও আমি বেতনের চেয়ে কাজকে প্রাধান্য দেয়ায় আমার সাথে বুঝি এমন ব্যাবহার করতো।
কিশোর বাংলার বার্তা সম্পাদক মরহুম বোরহান আহমেদ আমাকে দৈনিক জনপদে নিয়ে আসেন।
১৯৭৭ সালে ফিরে আসি জুনিয়ার ফটোগ্রাফার ৭৫০/- টাকা বেসিক হিসাবে দৈনিক সংবাদে। ঐ সময়ে আমি নিজের ক্যামেরায় কাজ করতে থাকি।
সেই বছরেই ‘ হিজবুল বাহার’ নামের এক প্রমোদতরী চট্টগ্রাম থেকে মালোয়েশিয়া পেনাং বন্দর হয়ে যায় সিঙ্গাপুর। বাবার কাছে জিদ করেই আমি টিকিট আদায় করি আর সেই তরীতেই সিঙ্গাপুর। সিংপুর থেকে জাপানী আশাহী প্যান্টাক্স কে – ১০০০ (Asahi Pentax K1000) মডেলের ক্যামেরা কিনে ফেলি। আমি সৌভাগ্যবান সিংগাপুর অর্চারড মার্কেটে আমার সাথে ঢাকার বিখ্যাত আলোকচিত্রীদ্বয় মরহুম গোলাম মওলা , যিনি তখন দৈনিক বাংলার চীফ ফটোগ্রাফার এবং
মরহুম মোকাদ্দাস আলী, অবজারভারের স্পোর্টস ফটোগ্রাফার , শ্রদ্ধেয় দুজনকে ক্যামেরা কেনার সময় আমার পাশে পেয়ে ছিলা।
ঐ তরীতে ছিল সাংবাদিকদের বড় একটি দল হিজবুল বাহারে যারা হিজবুল বাহারে ‘ দাওয়াতি ‘ মর্যদায় ভ্রমন করার সুযোগ পেয়েছিলেন।
নূতন আশাহী প্যান্টাক্স ক্যামেরাটির সাথে সিগমা ৩৫ মিলিমিটার থেকে – ১০৫ জুম লেন্স কিনেছিলাম। ক্যামেরার ঐ একটা জুম থাকায় সেই জুম সর্ব সময়ে লাগানো থাকতো। সিনিয়ররা সে কারনে আমার পিছনে কথা বলতেন।জুমটি দেখতে ছিল দারুন। লেন্স হুডটা ছিল বেশি ওয়াইড। ক্যামেরাটা হাতে নিলেই একটা ভাব আসতো। কারন সেই রকম ক্যামেরা ঢাকায় তখন কারো কাছে নেই।
মোহাম্মদ আলম ভাই সংবাদ সম্পাদকের একটি পার্সোনাল ক্যামেরা আশাহী প্যান্টাক্স এম ই ব্যাবহার করতেন।
নুতন ক্যামেরাটি দিয়ে গুলিস্তানে বাস শ্রমিক আর ছাত্রদের সংঘর্ষের ছবি তুলতে গিয়ে শ্রমিকদের হাতে নিগৃহীত হতে হয় আর সেই ফাঁকে তারা নূতন ক্যামেরাটাই ছিনিয়ে নেয়। কিন্তু আমার সৌভাগ্য, এক সুহৃদ শ্রমিক আমার প্রিয় ক্যামেরাটা ফেরত নিয়ে আসে।
এরপর
একদিন ঢাকায় আওয়ামী লীগের ডাকা হরতালে আশাহি ক্যামেরাটি অবিশ্বাস্য একটা ছবি দিয়ে যায় আমাকে।
ঢাকায় তখন জেনারেল জিয়াউর রহমানের শাসন চলছে। ঢাকার মেয়র আবুল হাসনাত। তাঁর ছত্রছায়ায় ছিল ঢাকার সব টপ টেরর। টপ টেরর দিলা মোখলেসের নেতৃত্বে গুলিস্তানে আওয়ামী লীগের বিক্ষোভ মিছিলের গতিরোধ করলো। আমরা তিনজন ফটোগ্রাফার মিছিলের সম্মুখ ভাগে কাজ করছিলাম। মিছিল নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন আওয়ামী লীগের নগর সভাপতি মোহাম্মাদ হানিফ , পরে মেযর , আমীর হোসেন আমু পরে মন্ত্রী, সহ অন্যান্য নেতারা। প্রায় হাজার খানেক বিক্ষোভকারী অংশ নিচ্ছিলেন বিক্ষোভে। দিলা সহ জনা ৫/৬ টেরর সাদা একটা জীপ থেকে নেমে বিদ্যুৎ গতিতে ধেয়ে আসলো মিছিলের দিকে। আমরা তিন ফটোগ্রাফার বিখ্যাত রশিদ তালুকদার , বিএনপি দলীয় পত্রিকা ‘ দৈনিক দেশ ‘ এর ফটোগ্রাফার আর আমি মুহূর্তেই পজিশন চেঞ্জ করে ফুটপাতে সোরে আসি। আমি তখন সংবাদে আর রশিদ ভাই ইত্তেফাকে।
টেররদের মধ্যে ছুটন্ত দিলা গুলি ছুড়তে ছুড়তে আমাদের সম্মুখে পিস্তল হাতে চিৎকার করে উঠলো ‘ ছবি তুল্লেই গুলি ছুড়বো ‘। আমার ডানে রশিদ ভাই ক্যামেরা গলায় ঝুলিয়ে। দৈনিক দেশের ফটোগ্রাফার গুলির শব্দে ততক্ষণে ফুটপাতে শুয়ে। আমি গলায় ঝুলে থাকা ক্যামেরার চোখে না দিয়েই মুহূর্তে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলি এভাবেই ছবিটি তোলার। ক্যামেরার জুম রিং ঘুড়িয়ে ফুল ওয়াইডে ৩৫ মিলিমিটারে নিয়েই সার্টার টিপে ধরি। যাতে ফ্রেমটা ওয়াইড হয়ে যায় আর ওয়াইড হলে দ্রুত সময়েই টেরর দিলার পজিশন আর তার একশন দুটাই পেয়ে যাই ক্যামেরা চোখ না লাগিয়েই। কারন চোখে ক্যামেরা তুললেই সে বুঝে ফেলবে আমি ছবি তুলছি। প্রথম শটের পর পরের ছবির জন্য ফিল্ম টানতে বুড়ি আঙ্গুলে এদ্ভান্স লিভার টেনেও সেকেন্ডের অভাবে দ্বিতীয় শট নিতে পারিনি। ততক্ষণে মিছিল ছত্রভঙ্গ হয়ে পরে এবং পিস্তলের গুলি আর রান্দা , দেশী অস্ত্র , হকি স্টিকের আঘাতে অনেক নেতা কর্মী আহত হন। রক্তাক্ত অবস্থায় তাঁরা গুলিস্তান ঐতিহাসিক ‘ কামান ‘ সামনের রাজপথে লুটিয়ে পড়ে।
দ্বিতীয় কোন ছবি তুলতে না পারলেও প্রথম ছবিটাই ছক্কা মেড়ে দেয়। তবে দেপ্ত অফ ফিল্ড কম থাকায় ফোকাসের গভীরতা শার্প একটু কম হয়ে পড়ে। সেকারণে ব্যাক গ্রাউইন্ডে ‘ নীরব দর্শক ‘ গুলিস্তান পুলিশ বক্সের পুলিশ সদস্যরা শার্প ফোকাসে আসে নাই।
পরদিন ঢাকায় জাতীয় দৈনিকের মাঝে সংবাদেই শুধু আমার ছবিটি প্রথম পাতায় ছাপা হলো। ছবিটি আর কোথাও ইত্তেফাক কিংবা দৈনিক দেশে দেখা যায়নি বা বাকি ২ জনার কেউ তুলতেই পারেননি!
ঐ ছবি তোলার খেসারত হিসাবে দুই দিন বাড়ি ছেড়ে পালাতে হয়েছিল দিলা মোকলেসদের আতংকে। দিলা মোখলেস সংবাদের ফোনে ছবি তোলার কারনে অকথ্য গালি গালাজ সেই সাথে জানে মেরে ফেলার হুমকি দিয়েছিলো।
১৯৮২ পযন্ত সংবাদে Asahi Pentax K-1000
আমার নিজস্ব ক্যামেরায় আমি কাজ করেছি।
সংবাদ আমাকে কোন ক্যামেরা দেয়নি।
১৯৮২ তে ইংরেজি দৈনিক নিউ নেসানে চীফ ফটোগ্রাফার হিসাবে যোগ দিলে জীবনে প্রথম নাইকন ক্যামেরার ছোঁয়া পাই।
সে কথা আগামীতে
ক্যামেরা কাহানী – ৫এ।
আমার বই ‘ সাংবাদিকতা আমার ক্যামেরায় ‘ থেকে।
পাভেল রহমান
নিউ ইয়র্ক।
২৭সে মে ২০২১

লেখক:- একুশে পদকপ্রাপ্ত আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন আলোকচিত্রী

ক্যাপশন –
১ । দৈনিক সংবাদের প্রথম পাতায় প্রকাশিত আমার তোলা এক্সক্লুসিভ ছবি।
২। সিঙ্গাপুর থেকে বাবার টাকায় কেনা নিজের প্রথম ব্র্যান্ড নিউ ক্যামেরা। ছবি-নেট থেকে নেয়া।


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আরও পড়ুন

তার কাছে যেতে কাউকে ভায়া ধরতে হতো না

        আবদুল বাতিন ফয়সল কামরান ভাইকে...

লিডিং ইউনিভার্সিটিতে ঐতিহাসিক ৭ই মার্চ দিবস উদযাপন

2       ঐতিহাসিক ৭ই মার্চ দিবস উপলক্ষে...

শেখ ফজলুল হক মনি যুব লীগের সাহস ও অনুপ্রেরণার নাম

        বাংলাদেশের ছাত্র রাজনীতি ও স্বাধিকার...

কেমুসাস’র ৮৩তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী সোমবার

        সিলেট এক্সপ্রেস ডেস্ক: দেশের প্রাচীনতম...