ক্যামেরা কাহানী – ৩ পাভেল রহমান

Alternative Text
,
প্রকাশিত : ২০ জুন, ২০২১     আপডেট : ৭ মাস আগে
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

পাভেল রহমান :- আব্বার প্রিয় ইয়াশিকা ক্যামেরাটা ছাত্র ইউনিয়ন কেন্দ্রীয় দফতর ১০ পুরানা পল্টন থেকে চুরি যাওয়ায় মনটা বেদনায় ভোরে থাকতো আমার। ছিনতাইয়ের ভয়ে ক্যামেরাটা রেখেছিলাম অফিসের ভিতরে একটা স্টিলের আলমারিতে।
হারিয়ে যাওয়া ক্যামেরার স্মৃতি আমাকে তাড়িয়ে বেড়াতে লাগলো। মাত্র কিছুদিন আগেই সপরিবারে হারিয়েছি বঙ্গবন্ধুকে। আব্বার ঐ ক্যামেরায় বঙ্গবন্ধুর ধানমণ্ডি ৩২শের কত ছবি তুলেছিলাম। সব স্মৃতি মনে পড়ছে।
ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় নেতাদের তাগদা দিলাম ক্যামেরার জন্য। সেলিম ভাই , মাহবুব ভাই লেলিন ভাই আকরাম ভাই অজয় দা। শুনলাম দারোয়ান নিজেই ক্যামেরাটা চুরি করে বেচে দিয়েছে অল্প টাকায়।
বেশ কিছু দিন তাগিদ, ধর্না দিতে দিতে একটা ‘ কিয়েভ ‘ ক্যামেরা এলো আমার জন্য। তাও কয়েক মাস কেটে গেল এরই মাঝে। কিয়েভ ক্যামেরাটা ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের তৈরি। জাপানী ক্যামেরা ব্যবহার করে যে সখ্যতা গড়ে উঠেছিল তা কোন ভাবেই ‘ কিয়েভ ’ ক্যামেরাটিতে পাওয়া যাচ্ছিল না। ‘ কিয়েভ ‘ ক্যামেরায় ছবি তুলতে ইচ্ছাই করছিল না আমার।
এর মধ্যে আম্মা কেন জানি আমার ছবি তোলা বিষয়ে মহা বিরক্ত হয়ে উঠেছেন। পড়াশুনার কারনেই বুঝি আম্মা শঙ্কিত হয়ে উঠেছিলেন। আম্মা প্রায়ই আভিযোগের সুরে আব্বাকে বলতে লাগলেন , ‘ ছেলেটা উচ্ছন্নে চলে যাচ্ছে ‘ ! তুমি কিছুই বলো না পাভেলকে। সকাল বেলা ক্যামেরা নিয়ে বেড়িয়ে যায় আর রাতের বেলা ফিরে ‘ ।
মায়ের কথা সত্য ! সত্যি ক্যামেরা আমার সঙ্গের সাথী হয়ে কাঁধে উঠেছে। ক্যামেরা ছাড়া যে নিঃসঙ্গ লাগে নিজেকে। ক্যামেরার হারিয়ে ছবি তোলা বন্ধ হওয়ায় ছবি প্রিন্টের জন্য নিউ মার্কেটের বিখ্যাত স্টুডিও ‘ আকস ’ যাওয়া হচ্ছে না। পুরানা পল্টনে ছাত্র ইউনিয়ন অফিসের পিছনের গলিতে একটা স্টুডিও ছিল। ওখানে প্রিন্ট করানোর বাড়তি সুবিধা পেয়ে ছিলাম। ফিল্ম ডেভলাপের করে সাথে সাথেই প্রিন্ট করা যেতো। স্টুডিও শাহাজাহান দায়িত্বে থাকা সিরাজুল করিম চুন্নুর সাথে আমার সুন্দর সম্পর্ক গড়ে উঠে। পরে জেনেছি চুন্নু বিখ্যাত প্রেস ফটোগ্রাফার রশিদ তালুকদারের ছোটভাই।
স্টুডিও শাহাজাহানে ডার্ক রুমে ছবি প্রিন্ট আর ফিল্ম ডেভলাপমেন্টের কাজ শেখার সুযোগ এলো। ব্রোমাইড প্রিন্টার মোহাম্মদ সেলিম আমাকে সাহায্য করতেন। স্টুডিওর কয়েকটা ক্যামেরার মাঝে একটা ক্যামেরা কয়েকবার ‘ ধার ‘ নিয়ে আবার ছবি তোলার কাজ শুরু করেছি। ধার নেবার কারনে মাঝে মাঝে স্টুডিওর বাণিজ্যিক কাজে আমাকে যেতে হতো। যার মধ্যে বার্থ ডে, মতিঝিলের অফিস পাড়ায় অনুষ্ঠানে কয়েক বার যেতে হয়েছে আমাকে। অনুষ্ঠানে গেলে পরিচয় দিতে হতো স্টুডিও ফটোগ্রাফার হিসেবে। যেটা আমার কখনোই ভালো লাগতো না। একবার পুরান ঢাকায় একটি বার্থডে অনুষ্ঠানে যেতে হলো । আমাকে একজন প্রশ্ন করলেন , ‘ ‘ কই থোন আইছেন ‘ ? স্টুডিও থোন ? আমি অসহায় হয়ে বলেছি, জি ! আর সাথে সাথে আমাকে বললেন , ‘ অহোন বারান্দায় বইয়া থাহেন, জহোন কেক কাটবার টাইম হইবো তহোন ডাইক্যা ভি ত্বড়ে নিমু আপনারে, তহোন ভি ত্ব রে আইবেন , কেক কাটোনের ছবি তুইল্লা বাইরে আইসা বোয়া থাইয়েন , জহোন ডাহুম তহোন আবার আইবেন ‘।
শুধু ক্যামেরার জন্য এসব মানতে হচ্ছিল আমাকে। স্টুডিও শাহাজানের মালিক মতিন ভাই খুব চালাক মানুষ ছিলেন। আমাকে দোকানের পুরাতন ক্যামেরাটি গচ্ছাতে চাইলেন। প্রতিদিনই বলতেন , ‘ কিনে নেও ক্যামেরাটা ‘। বেস কিছু দিন ছবি তুলতে তুলতে কেমন মায়া জন্মালো ‘ রিকো ’ক্যামেরাটার প্রতি।
আমার বড় চাচা ডাক্তার আব্দুল হামিদ আর চাচী আমাকে খুব আদর করতেন। সেসময় তাঁরা আমার ছবির ভক্ত হয়ে উঠেছেন। বড় চাচা ঢাকার ‘ মধ্য বাসাবো ‘ এলাকায় নিজস্ব একতালা বাড়ির চমৎকার বারান্দা জুড়ে দেয়ালে কাঁচের ফ্রেমে আমার তোলা ছবির একটা ডিসপ্লে তৈরি করলাম চাচা চাচীর আগ্রহে। সেই সুবাদে চাচা চাচী আমাকে ‘ রিকো ‘ ক্যামেরাটি কিনে দেন ২ হাজার টাকায়।
কৃতজ্ঞতায় আর শ্রদ্ধায় চাচাচাচীর কাছে আমি ঋণী হয়ে যাই।
সে সময়ের আধুনিক ঐ ক্যামেরাটি আমাকে দ্রুত নিউজ বা প্রেস ফটোগ্রাফির দিকে আগ্রহী করে তুলতে থাকে।।
পাভেল রহমান
বেবিলন, নিউ ইয়র্ক ।
১৭ মে ২০২১ ।

লেখক:- একুশে পদকপ্রাপ্ত আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন আলোকচিত্রী

ক্যাপশন –
সেই সময় আমি। পুরানা পল্টনের স্টুডিও শাহাজাহান এর ব্রোমাইড প্রিন্টার মোহাম্মাদ সেলিম ভাইয়ের তোলা এই ছবিতে
আমার হাতে রিকো ক্যামেরা। বড় চাচা আমাকে এই ক্যামেরাটা কিনে দিয়েছিলেন ২০০০ টাকায়।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আরও পড়ুন

আওয়ামীলীগ উন্নয়নে বিশ্বাস… ইমরান আহমদ এম.পি

        গোয়াইনঘাট প্রতিনিধিঃ সিলেট-৪ আসনের সংসদ...

মৃত্যুতে মাছুম আহমদ দুধরচকীর শোক প্রকাশ

        সিলেট এক্সপ্রেস ডেস্ক: খেলাঘর আসর...

সিলেট জেলা সিএনজি চালিত অটোরিক্সা শ্রমিক ইউনিয়নের আলোচনা সভা

        সিলেট এক্সপ্রেস ডেস্ক সিলেট জেলা...

ছাত্র বন্ধু নুরুল হক নূর

        তানজিয়া শিশির পুষ্পাঃ “স্বপ্ন দেখি...