ক্বারী আব্দুল আলী কোরআনের একজন খাদেম ছিলেন

প্রকাশিত : ১১ এপ্রিল, ২০১৮     আপডেট : ২ বছর আগে

মো: দিলশাদ মিয়া:
মহান আল্লা তা’য়ালা পবিত্র কোরআনে ৩ বার ৩টি সূরাতে উল্লেখ করেছেন- “কুল্লু নাফসী যায়িকাতুল মাউত’’ প্রত্যেক প্রানীকেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহন করতে হবে। যেখানেই আমরা থাকি না কেন মৃত্যু আমাদের কে পাকরাও করবে। মৃত্যু থেকে পালানোর কোন উপায় নেই। সীমাবদ্ধ জীবনের অবসান ঘটিয়ে মানুষকে এ পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে হয়। পেছনে পড়ে থাকে তার কর্মময় জীবন। এ পৃথিবীতে যত সুন্দর নামই থাকুক না কেন, পৃথিবীতে সুন্দর নামের কোন মূল্য নেই-মূল্য হয় তার সুন্দন কর্মের। কৃতকর্মের জন্যেই কারো করো নাম পায়, মহিমা, মহিয়ান উত্তর-পুরুষের কাছে হয় স্বরনীয়। মহৎকর্মের জন্যেই তাঁরা এই পৃথিবীতে অমর হয়ে থাকেন। এমন ব্যক্তিই মানবসমাজে ধন্য বলে বিবেচিত মহৎ কর্মের মাধ্যমে মানুষ যখন অপর মানুষের হৃদয়ে অমর হয়ে থাকে তখন জীবন হয় সার্থক। অপর মানুষের কীর্কিতে মানুষের পরিচয়। যার কোন কীর্তি নেই তার কথা কেউ স্বরণ করে না। মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে পৃথিবীর ইতিহাস থেকে তার নাম বিলীন হয়ে যায়। পৃথিবীর জ্ঞানী ও গুনী ব্যক্তিগণ তাঁদের গেীরবজনক কীর্তির জন্য তাঁদের গৌরবজনক কীর্তির জন্য চিরস্বরনীয় হয়ে রয়েছেন। পৃথিবীতে কর্মের জন্যই বিখ্যাত হয়েছে। মহৎ কর্মের মাধ্যমে মানুষ যখন অপর মানুষের হৃদয়ে অমর হয়ে থাকে তখন তার জীবন হয় সার্থক। মানুষ সৃষ্ঠির সেরা। জ্ঞানে, কর্মে, পূন্যে ও প্রীতিতে মানুষ সার্থক করে তোলে। বাঁচার জন্য মানুষ নীরবে সংগ্রাম করে। মানুষের বাঁচা তখনই সার্থক হয়, যখন সে প্রীতির পরশে আপন আলয়ে স্বর্গ রচনা করতে পারে। ভোগ. ঐশ্বর্য,ক্ষমতি মানুষের কাম্য হতে পারে কিন্তু এসবে প্রকৃত সুখ নেই।
১৯৩৭ সালের ১১ই ফেব্রুয়ারি তিনি জন্মগ্রহন করেন। ক্বারী আব্দুল আলী একজন গুণী মানুষ ছিলেন। তিনি ছিলেন সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার তাহিরপুর সদর ইউনিয়নের ধুতমা গ্রামের ঐতিহ্যাবাহী মুসলিম পরিবারের সন্তান। তাঁর পিতার নাম মরহুম আকিল মাহমুদ ও মাতার নাম মরহুম আশুরমা। ক্বারী আব্দুল আলী কোরআনের একজন খাদেম ছিলেন। কোরআনের খেদমতে কাজ করা ছিল তাঁর জীবনের লক্ষ্য। তিনি তাহির পুর উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের অনেক মসজিদ মক্তব স্থাপনের উদ্যোক্তা ছিলেন। তাঁর অনেক ছাত্র-ছাত্রী রয়েছে যারা তার কাছ থেকে কোরআন শিক্ষা গ্রহন করেছেন। তাহির পুর উপজেলা ছাড়া ও তিনি জামালগঞ্জ, বিশ্বম্ভরপুর, সুনামগঞ্জ সদর, দক্ষিণ সুনামগঞ্জ, জগন্নাথপুর, ধর্মপাশা ও সিলেট সহ অনেক এলাকায় কোরআনের খেদমতে জীবনের বিশেষ অংশ ব্যয় করেছেন। তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি উত্তম যে নিজে কোরআন শিক্ষা করে এবং অন্যকে কোরআন শিক্ষা দেয়” মহান শিক্ষক হযরত মুহাম্মদ (সা:) এর বানীকে তিনি তাঁর জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত পালন করেছেন। যে তিনি মারা যান সে দিন ও তিনি বীরনগর জামে মসজিদে জামায়াতে নামাজ পড়িয়েছেন। তার জীবনের অবসানের দিনে ও কোরআন ও মসজিদের সার্থে সম্পর্ক ছিল খুবই ঘনিষ্ঠ। তিনি ছিলেন সহজ সরল জীবনের অধিকারী। ১৪ই এপ্রিল রোজ শুক্রবার ২০১৭ সাল। দিনটি ছিল ১লা বৈশাখ। ঐ দিন তিনি পরলোকগমন করেন। ২০১৭ সালের ১৪ এপ্রিল, সুনামগঞ্জ জেলার প্রায় প্রতিটি উপজেলার হাওড়ের ধান অকালে বন্যায় তলিয়ে যায়। হাওড়ের বাঁধ রক্ষা করার জন্য এলাকার সকল পুরুষ মানুষ প্রতিদিন ছুটে যেতেন। প্রতিদিন মাইকিং করা হতো। মাইকিং শুনার পর মহহুম ক্বারী আব্দুল আলী ফজরের নামাজের পর মসজিদ থেকে সরাসরি নৌকায় উঠে হাতের লাঠিসহ তাহিরপুরের শনির হাওড়ের “আহাম্মক আলির বাধ” এ ছুটে চলেন। সেখানে উপস্থিত ছিলেন তাহির পুর উপজেলার চেয়ারম্যান জনাব কামরুজ্জামান। যাকে হাওড়বন্ধু বলা হয়। জনাব কামরুজ্জামান কামরুল সহ এলাকার সর্বসাধারন উপস্থিত ছিলেন। তিনি বাঁধের মধ্যে জোহর, আছর ও মাগরিবের নামাজের ইমামতি করেন। সকল মানুষকে নিয়ে নামাজ পড়েন আর বলেন আল্লাহর উপর ভরসা করার কথা। সমাজের সাথে তিনি ছিলেন সক্রিয় মৃত্যুর দিনও তিনি সামাজিক দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি প্রতিদিন ফজরের নামাজের পর পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত করতেন। সূরা ইয়াসিন তিনি মুখস্ত তেলাওয়াত করতেন তা-আমরা দেখেছি ও শুনেছি। তিনি অর্থনৈতিক সামজিক, শিক্ষা, ইসলামের প্রচার ও প্রসারের দাওয়াত ও ইসলামী সাংস্কৃতিক অঙ্গনে অনেক কাজ করেছেন। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের হানাদার বাহিনী তাকে ধরে নিয়ে বীর, জয়, লক্ষী ধুতমা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠে সারিবদ্ধ করে গুলি ছুড়ে মেরে ফেলার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিল। ঐ সারীতে তিনিও একজন ছিলেন। দেশের প্রতি ভালোবাসা ছিল অকৃত্রিম। তখন তিনি কালেমা পড়ে শুনান পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত করে শুনালে তারা ছেড়ে দেয়। ছাড়া পেয়ে বাড়ীতে গিয়ে কোরআন তেলাওয়াত করা অবস্থায় পাঞ্জাবী বাহিনী পেলে তাকে আর কিছু করেনি। এভাবে তিনি তখন রেহাই পান তিনি বলতেন-‘দেশ প্রেম ঈমানের অঙ্গ’ এ কথা রাসুল (স:) এর বানী। তিনি নামাজ ও ইসলামী আইন কানুন পালনে ছিলেন সক্রিয়। ব্যাক্তিগত জীবনে ২ছেলে ও ৩ মেয়ে ও স্ত্রী আনোয়ার বেগম কে রেখে গেছেন। তন্মধ্যে বড় ছেলে বি.এস.এস (অনার্স) এম.এস.এস ও ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় কুষ্টিয়া হতে এল.এল. এম উত্তীর্ন হয়েছেন। বর্তমানে একটি কলেজে প্রভাষক পদে চাকুরীতে আছেন। তিনি বাংলাদেশ কলেজ শিক্ষক সমাজবিজ্ঞান সমিতি সিলেট বিভাগের যুগ্ম সদস্য সচিব, ভাইস চেয়ারম্যান, বিডিএইচ এসোসিয়েশন বাংলাদেশে , এম.ডি, আর্কেডিয়া একাডেমি, আনোয়ারপুর, উদ্যোক্তা ও কলেজ বাস্তবায়ন কমিটির সেক্রেটারী টাঙ্গুয়া আইডিয়েল কলেজ, বালিজুরী উপদেষ্ঠা, আইডিয়াল ভিশন একাডেমি, বাদাঘাট, সাবেক প্রভাষক সুফিয়ামতিন মহিলা বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ, বানিয়াচং ও প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট। ছোট ছেলে এমবি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ থেকে বাংলা সাহিত্য (অনার্স) সহ এম পাশ করে বর্তমানে একটি বেসরকারি কোম্পানীতে চাকুরীরত। তাঁর দুই ছেলেই পরিবার পরিজন সহ বর্তমানে সিলেটে বসবাস করছেন। ক্বারী আব্দুল আলী ঁেবচে আছেন তাঁর মনননের আলোয়। তাঁর কোরআন শিক্ষাদান আলোক বর্তিকা হয়ে পথ দেখাবে। তিনি তাঁর জীবন কে বিলিয়ে দিয়েছেন কোরআনের খেদমতে ও এ অঞ্চলের মানুষের কল্যাণে। এ অঞ্চলের মানুষের জন্য তিনি নি:স্বার্থভাবে কাজ করেছেন। তার প্রমান তার জানাজার নামাজে সর্বস্তরের জনতার অংশগ্রহন। জানাজার পূর্ববতী সভায় উপস্থিত ছিলেন তাহিরপুর উপজেলা চেয়ারম্যান মোঃ কামরুজ্জামান কামরুল, মোঃ আব্দুল বারিক, মোঃ আউল কালাম আজাদ, মাওঃ আবুল খয়ের, মাওঃ আলী হোসেন, মোঃ ইয়াহিয়া, নুরুল ইসলাম, আছদ্দর আলী সহ উপজেলা সর্বস্তরের জনসাধারণ। ক্বারী আব্দুল আলী এর ১ম মৃত্যু বার্ষিকীতে তাহিরপুর তথা সুনামগঞ্জ বাসীর নিকট দোয়া কামনা করছি। আল্øাহ তা’য়ালা যেন তাঁর খেদমত ও সমাজ সেবা কে কবুল করে বিনিময়ে জান্নাত দান করেন।
লেখকঃ চেয়ারম্যান, মহরহুম ক্বারী আব্দুল আলী মেমোরিয়াল ফাউন্ডেশন, তাহিরপুর, সুনামগঞ্জ।

আরও পড়ুন

চুনারুঘাটে কিশোরীকে ধর্ষণের পর হত্যা, লাশ উদ্ধার

হবিগঞ্জর চুনারুঘাট উপজেলার সীমান্ত এলাকা...

আজ থেকে কঠোর হবে সেনাবাহিনী

আজ বৃহস্পতিবার থেকে সেনাবাহিনী স্থানীয়...