কোভিড-১৯ প্রাদুর্ভাবের কর্মহীন মানুষ

প্রকাশিত : ০৬ জুলাই, ২০২০     আপডেট : ১ মাস আগে

বেলাল আহমদ চৌধুরী : আমরা হেথায় ভালো আছি ভাই, হাসপাতালের ঘরে/ এ পাশে ও পাশে রোগী অরোগীতে মহাকলরব করে/ এক, দুই, তিন নানা নম্বরে হই মোরা পরিচিত/ জাতি ও ধর্ম ভাষা ঘষা যত নামগুলি তিরোহিত।’
পল্লী কবি জসীম উদ্দিন তার কবিতায় হাসপাতালের চিত্র মনোরমভাবে তুলে ধরেছেন। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর ভয়াবহ কোভিড-১৯ রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি আজ হাসপাতালে ঠাঁই পায় না। উচ্চ নীচ, ধনী-দরিদ্র সবল দুর্বল সকল মানুষই অসহনীয় কোভিড-১৯ আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর নির্মম শিকারে পরিণত হচ্ছেন।
গত ০৫ মে থেকে ২৯ মে ২০২০ এক জরীপ রিপোর্টে জানা যায় ১৩ শতাংশ মানুষ বৈশ্বিক কোভিড-১৯ প্রাদুর্ভাবের ফলে কর্মহীন হয়ে পড়ছেন। সর্বনাশা কোভিড-১৯ প্রভাবে দেশের অর্থনীতির প্রধান প্রধান সূচক নি¤œমুখী। জীবন ও জীবিকার সংকট গ্রাম ও শহরে সর্বত্র বিরাজ করছে। কোভিড-১৯ প্রশমিত করার লক্ষে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো দ্রæত বিচ্ছিন্ন করে লকডাউন (অবরুদ্ধ) ঘোষণা করা হচ্ছে। কিন্তু কোথাও লকডাউনের সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। বাস্তবতা হচ্ছে জীবন রক্ষার্থে চিকিৎসা এবং জীবিকা উভয়ই কঠিনতর দুঃসহ যন্ত্রণায় হাবুডুবু খাচ্ছে। এই সঙ্কট থেকে উত্তরণে বিকল্প ভাবনা বাস্তবায়ন করতে হবে। চিকিৎসা তথা স্বাস্থ্যসেবা এবং জীবিকার নিরাপত্তার জন্য লকডাউন সফল করার লক্ষে নি¤েœাক্ত সুপারিশ উপস্থাপন করছি-
(১) কোভিড-১৯ মহামারি থেকে পরিত্রাণ পেতে স্বাস্থ্যসেবার জন্য দেশব্যাপী যে সকল বিশেষায়িত হাসপাতাল, থানা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ক্লিনিক, কমিউনিটি ক্লিনিক রয়েছে তার পাশাপাশি নগর/ মহানগর/ উপজেলা সদরে যে সকল কমিউনিটি সেন্টার অডিটোরিয়াম রয়েছে সেগুলোতে আপদকালীন ‘করোনা আইসোলেশন সেবা ক্যাম্প’ ঘোষণা করা যেতে পারে। করোনা আক্রান্ত রোগী স্বাস্থ্য বেষ্টনীর মধ্যে অবস্থান করে ডাক্তারের চিকিৎসা সেবা নিতে পারেন। করোনা প্রাদুর্ভাবে সংক্রমিত রোগ বালাই রোধে স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলিতে নার্স, ব্রাদার, আয়া ওয়ার্ডবয়, ল্যাবটেকনিশিয়ান নিয়োগ দেয়ার জন্য স্বল্পমেয়াদী কোর্সের প্রশিক্ষণ কর্মশালা চালু করা যেতে পারে। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত স্বাস্থ্যকর্মীদের নতুন নতুন স্বাস্থ্য ক্যাম্পে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়া যেতে পারে। এতে করে কর্মসংস্থানের সাথে মানুষের জীবিকার পথ সুগম হবে।
(২) জীবন ও জীবিকার জন্য যোগ্যতার ভিত্তিতে বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনী, বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী এবং সিভিল ডিফেন্সে-এ সাধারণ সদস্য পদে মাস্টার রোল-এ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত লোক নিয়োগ দেয়া যেতে পারে। এতে করে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।
দেশে জীবিকার সংকট তীব্রতর হচ্ছে। একদা যে, মানুষগুলো এক বুক আশা নিয়ে পেটের তাগিদে গ্রাম ছেড়ে শহরে ঠাঁই নিয়েছিল, বর্তমানে তারা রিক্ত হাতে গ্রামে ফিরে যাচ্ছে। এ অবস্থার প্রেক্ষিতে গ্রাম ও শহরে সব পেশার মানুষ আয় রোজগারহীন হয়ে পড়ছেন। এ অবস্থার ক্রমঅবনতী অব্যাহত থাকলে দেশে সহসাই আইন শৃঙ্খলা অবনতি হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। আগামী দিনের যে কোন সংকট মোকাবেলার জন্য মাঠ পর্যায়ে আইন শৃঙ্খলা বাহিনী সদস্য সংখ্যা জোরদার করতে হবে।
যে সকল বেসরকারি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানে লোকজন নিয়োজিত আছেন তাদেরকে কোন অবস্থাতেই কর্মচ্যুত করা যাবে না। যা অমানবিক ও অনৈতিক। এতদবিষয়ে সরকারকে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে।
কোভিড-১৯ থেকে পরিত্রাণ পেতে হলে সরকারের পাশাপাশি রাজনৈতিক দল, স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান ও এনজিওগুলো সম্মিলিতভাবে করোনা আইসোলেশন ক্যাম্প তৈরি করতে পারেন। সম্মিলিতভাবে রোগীর জীবন রক্ষার জন্য জরুরীভাবে অক্সিজেন সিলিন্ডার, পিপিই, হ্যান্ডসেনিটাইজার, হ্যান্ডগøাভস, সার্জিক্যাল মাক্স, করোনা টেস্ট ডিউবসহ এ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস রোগীর সেবায় সরবরাহ করতে পারেন। এই দুঃসময়ে সম্মিলিত প্রচেষ্টাই কোভিড-১৯ সঙ্কটে মানুষকে সাহস যোগাবে।
দেশের অর্থনীতির চলমান সঙ্কটকালে কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং স্বাস্থ্যসুরক্ষায় রোগ নিরাময় দু’টি বিষয়কে নিয়ন্ত্রণ করতে হলে বিশাল আকারের রাজস্বের দরকার। এহেন অবস্থার প্রেক্ষিতে সরকার চলতি বার্ষিক বাজেট (২০২০-২০২১) গতানুগতিক বাৎসরিক বাজেট হিসাবে না রেখে ষান্মাসিক বাজেট হিসাবে উন্নয়ন খাত এবং অনুন্নয়ন খাতে ভাগ করে নিতে পারেন।
আপদকালীন অনুউন্নয়ন খাতের ব্যয় রিভিউ করতে পারেন। দ্বিতীয়ত সরকারের ৪১টি মন্ত্রণালয়ের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্কযুক্ত বা সম্পৃক্ত মন্ত্রণালয়গুলোকে সংকোচন/পুনর্বিবেচনা করা হলে সার্বিকভাবে সরকারের ব্যয়ভার হ্রাস পাবে।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস) থেকে প্রাপ্ত কোভিড-১৯ প্রভাবে চলতি অর্থ বছর (২০২০-২০২১) দারিদ্র্যের হার ২৫ দশমিক ০১ শতাংশে উন্নীত হতে পারে। তাদের প্রজ্ঞাপন চলতি ২০২০ সালে দ্বিতীয় ত্রিমাসিক রিপোর্টে দেশে ১ কোটি ৬৪ লক্ষ মানুষ দারিদ্র্যসীমায় যুক্ত হয়েছেন। এ প্রেক্ষিতে ২০৩১ সালে বাংলাদেশ সহ¯্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষমাত্রা এসডিজি শূণ্য দারিদ্র্য লক্ষমাত্রা অর্জনে ব্যর্থ হবে বলে আশঙ্কা রয়েছে।
পরিশেষে বলতে চাই- সরকার এই দুর্যোগে অনেকগুলো সময়োপযোগী প্রণোদনা প্যাকেজ দিচ্ছেন। কিন্তু সেগুলো চলমান রাখা উৎসাহ ব্যঞ্জক হতে পারে না। বৈশ্বিক কোভিড-১৯ বাংলাদেশের মত দেশের জনগণের বিপুল বৃহদাংশের জন্য একই সাথে বিপদের কারণসহ সুযোগ সম্ভাবনার ইঙ্গিতবাহী। বৈশ্বিক মহামারি থেকে রক্ষা পেতে বাংলাদেশের শক্তির উৎস দেশের জনগণ। জনগণের দুটি হাত মানব পুঁজিতে রূপান্তরের চ্যালেঞ্জ-ই হবে ১. আভ্যন্তরীণ উৎপাদন বৃদ্ধি ২. স্বাস্থ্যসুরক্ষায় চিকিৎসা এবং ৩. সর্বোপরি আইন শৃঙ্খলা রক্ষার চ্যালেঞ্জই হবে কোভিড-১৯ থেকে পরিত্রাণের একমাত্র চ্যালেঞ্জ।

আরও পড়ুন

একনেকে আখাউড়া-সিলেট ডুয়েল গেজে রূপান্তর প্রকল্পের অনুমোদন

জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (একনেক) নির্বাহী...

৪২ বছর ধরে বাবার কবর খুঁজছেন ডা. জাহাঙ্গীর

মৌলভীবাজার থেকে নোয়াখালীর কোম্পানিগঞ্জ। ১৯৭৬...

চুনারুঘাটে রাস্তার সীমানা নিয়ে বিরোধের জের এক ব্যক্তি খুন

চুনারুঘাট (হবিগঞ্জ) প্রতিনিধিঃ হবিগঞ্জের চুনারুঘাটে...

সাধারণ শিক্ষার্থীদের প্রিয় নেতা জাকের আহমদ (অপু)

মৌলভীবাজার সদর উপজেলার ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠ...