কুরবানির হাটে সতর্কতা প্রসঙ্গ

,
প্রকাশিত : ১৫ জুলাই, ২০২১     আপডেট : ১০ মাস আগে

আনোয়ার হোসেন মিছবাহ :
হাতের আঙ্গুলে লেপ্টে আছে দিন। বুড়ো আঙ্গুল কনিষ্ঠা আঙ্গুল ধরে হাঁটালেই বলে দেওয়া যায়, ঈদের জন্য দিন বাকি নেই। অর্থাৎ ঈদ আসছে। আগন্তুক ঈদের নামÑ ঈদুল আযহা বা কুরবানির ঈদ।

এদিন পশু জবাই করা হয়। মনের পশুকে কোরবান করা হয়। যে পশু তিন পায়ে চলে, রোগা, দুর্বল, দাঁত নেই, শিং ফাঁটা, শিং ভাঙ্গা, অর্ধেকের বেশি কান কাটা, লেজ কাটা, নির্দেশিত চাহিদার তুলনায় অল্প বয়েসি সে পশু কুরবানি দানে মানা, কাজেই উপলব্দিকে উপলক্ষ করে মানুষ পশু কিনতে বাজারে যায়। নিজের পছন্দে নিজেই কিনে আনে বলে কুরবানির হাট কিংবা বাজার, অন্য অনেক থেকে আলাদা। কাজেই, এ বাজারে পুরাতন বিক্রেতার সাথে নতুন ক্রেতার দেখা হয়, পুরাতন দালালের সাথে নতুন ক্রেতার ভণিতার সখ্য হয়। গরু পৌঁছে দেওয়ার সহকারীর কাছে একশত টাকা থেকে হাজার টাকার দফারফায় লক্ষ টাকার গরু বা পশু তুলে দিতে হয়। তাই কানকে খরগোশের মতো খাড়া করে, চোখকে মাছির মতো সচল রেখে, বাজারে বা হাঁটে ঢুকতে হয়। অস্থায়ী মানুষের অস্থায়ী হাট ক্ষণস্থায়ী বলে পদে পদে বিপদ সাথে সাথে ঘুরে। এজন্যই এ বাজারে অধিক সতর্কতার সাথে পশু কিনতে হয়। চোখকে টর্চলাইট, কানকে এন্টেনা, মনকে রাডার মানিয়ে চলতে হয়।

যদিও কুরবানি ভালো ও সুস্থ পশু ছাড়া হয় না। তাই নতুন ক্রেতা পুরাতন বিক্রেতার কাছে যায়। ফাঁদ পাতা জালে আটকা পড়ে বেশি। সিলেটে আবার ব্যবসায়ী ক্যাটাগরিতে দুই ধরণের কাস্টমার বেশি গুরুত্ব পেয়ে থাকে। এর একজন বিদেশ থেকে ডলার, পাউন্ড নিয়ে আগত। আবার অন্যজন ভাই, বোন বা আত্মীয় পরিজনের টাকার পশু কিনতে আগত কাস্টমার। বিক্রেতারা এ দুই ধরণের কাস্টমার কে গুরুত্ব বেশি দিয়ে আবার দুই ধরণের দাম হাঁকায়। বিদেশীকে পশুর দাম থেকে ৩ থেকে ৫ গুণ বাড়িয়ে বলে অনড় থাকা। আবার বিদেশী টাকায় দেশি কাস্টমারকে ৩ থেকে ৪ গুণ দাম বাড়িয়ে বলা। দেখা গেছে, যিনি ডলার বা পাউন্ড নিয়ে এসেছেন তিনি পাউন্ড বা ডলারকে চোখ বুজে টাকায় রূপান্তর করে বেশ সস্তায় কিনতে পারছেন মনে করে বেশি দামে কেনেন। আবার পরের ধনে পৌদ্দারী করা কাস্টমার, বেশি দামদর না করেই পশু কিনে নেন। তারা পশুর দাম যাচ্ছে তাই হাঁকাতে শুরু করে। আটকে দেয় তাদের- যারা ঘুষের টাকা গরিব মারার টাকায় কিনতে আসেন না।

বাজারের নিয়মিত পদ্ধতি হচ্ছে, আপনি যা কিনতে বা ক্রয় করতে যাচ্ছেন তার সম্পর্কে সম্যক ধারণা নিয়ে যাওয়া। এতে যদি কোন রাস্তা না থাকে, তাহলে একজনের কাছে দাঁড়িয়ে হঠাৎ দাম করে না কিনে বাজারে দর দাম যাচাই করে কেনা। ফলমূল, তরিতরকারি, আসবাব কিংবা জমি কেনার মতো কিনতে কিনতে ক্রেতা হওয়ার মতো বাজারে অভিজ্ঞ ক্রেতা সেজে ঢুকুন। ঠকবেন না। ইদানিং একটি কথা চাউর আছে বাজারে- সেটি মোটাতাজা পশু। সম্পূর্ণ না জেনে। না প্রশিক্ষণে অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে পশু মোটাতাজা করে বাজারে বিক্রি। দেখা গেছে, মোটাতাজা করা কৃত্রিম পশুর মাংস খেয়ে কুরবানির দিনেই অনেক মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়েন। ফলে মোটাতাজা গরু কিনবেন, কিনুন, পরীক্ষা করে।
পশুর হাট বা বাজারের হালচাল ভালো থাকে না। দেখা গেছে বিক্রেতা পশু বিক্রি করে ফেলেছেন- ক্রেতা জাল নোট ধরিয়ে দিলো। দিতেই পারে। তাই বিক্রেতার কাছে পশু হস্তান্তরের পূর্বে হাটে কিংবা পশুর বাজারে অবস্থিত ব্যাংকের অস্থায়ী বুথে জাল নোট শনাক্ত করে টাকাগুলো গুনে, বুঝে, তারপর পশু হস্তান্তর করুন। মনে রাখবেন, যারা জাল নোট বহন করে তারা মারাত্মক অপরাধী। এদেরকে পুলিশের হাত ছাড়া কারো হাতে দেবেন না।
অননুমোদিতভাবে রাস্তাঘাট, ফুটপাত, খেলার মাঠ কিংবা রাস্তায় চলমান বিক্রেতার কাছ থেকে পশু কিনবেন না। এতে বোর্ডার পাস করা, কারো জমি থেকে হারিয়ে যাওয়া, গোয়াল ঘর থেকে খোয়া যাওয়া পশুও কিনে ফেলতে পারেন। কাজেই অনুমোদন প্রান্ত পশুর হাঁট বা বাজার থেকে পশু কিনুন।
অনেক সময় ক্রেতার সরলতার সুযোগ নিয়ে বিক্রেতারা পশুর শরীরে কৃত্রিম রঙ মাখিয়ে, বয়স লুকিয়ে, পশুর দাঁত প্রদর্শন না করে, নেশা খাইয়ে পশুর পায়ে প্যারেক গেঁথে, লেজে আলপিন মেরে, অসুস্থ পশুর শরীরে চিরুনি দিয়ে নিঁজন দিয়ে বিক্রি করতে পারে। তাই ভ্রটিগুলো মেপে অসুস্থ কি-না মলত্যাগের রাস্তা পরখ করে কিনতে হবে।
বাজারের হালচালে আরেকটা অবৈধ উৎপাতের নাম দালাল বা ফড়িয়ার উৎপাত। এদের লড়াইয়ে চলা ই বাজারের ধরণ। লক্ষ্য করলে দেখবেন, যে লোক একবার আপনার পক্ষে আরেকবার বিক্রেতার পক্ষে কথা বলছে, বুঝ নেবেন এর পার্স নেই। লোকটি এখানকার দালাল। আবার ক্রেতা সাজিয়ে আরো দু’চারজনকে এতে আপনার করা দামের চাইতে বেশি দামে পশু কিনতে হচ্ছে, তখন বুঝে নেবেন লোকটি ফড়িয়া।
অনেকে কেনা পশু বাসা বাড়িতে পৌঁছে দেবার সাহায্যকারী নেন। কিন্তু সাহায্যকারীর কোন পরিচয় রাখেন না। বুঝে নেবেন হয়তো ফাঁকফোকরে আপনার পশু খোয়া যেতে পারে। তাই সাহায্যকারী নেবার পূর্বে সাহায্যকারীর আসল পরিচয় জানতে তার রেজিস্ট্রেশনকৃত মোবাইল নম্বর। জাতীয় পরিচয়পত্র বা জন্ম সনদের কপি রাখুন। একান্ত অপারগ হলে হাতে থাকা ক্যামেরাযুক্ত মোবাইলে ছবি তুলে রাখুন। হাঁটুন তার সাথে সাথে।
পশু কিনতে বা ক্রয় করতে গেলে সাথে টাকা থাকে, তা অন্ধ চোর বা কানা ছিনতাইকারী জানে। কাজেই সতর্ক থাকুন। পাশাপাশি না হেঁটে পাশের জনকে নিয়ে ভিড়ে ভিড়ে আগে পিছে করে হাঁটুন। কাউকে সন্দেহ হলে, সন্দেহ নিশ্চিত হলে, পুলিশ কিংবা ভালো পথিককে জানিয়ে রাখুন। পাশের জন যাকে আপনি সাথে এনেছেন, তাকে আপনার পেছনে গিয়ে আপনাকে চোখে চোখে রাখতে বলুন। সাবধানে টাকা রাখুন। সাধুবেশে চোর। ভদ্র বেশি ছিনতাইকারী। মিষ্টভাষী কপট মানুষ এখন পায়ে পায়ে হাঁটে। পশু কিনে বা ক্রয় করে রশিদ নেন। মনে রাখবেন, রশিদ হচ্ছে নিরাপত্তার পাস। মনে রাখবেন যে রশিদটি নিচ্ছেন তার মধ্যে ক্রেতার ও বিক্রেতার নাম, ঠিকানা, মোবাইল নম্বর, প্রযোজ্যক্ষেত্রে জাতীয় পরিচয়পত্র বা জন্ম সনদ নম্বর থাকে। আরো থাকে ক্রয়কৃত পশুর বিবরণ ও হাট বা বাজারের নাম। কাজেই চোরাইপশু কেনার হাত থেকে বেঁচে যাওয়ার এটিও এক মোক্ষম সুযোগ। একে হাতছাড়া করতে নেই।
কেনার পর পশুর গলায় বাঁধা দড়ি পরীক্ষা করবেন। দড়িটি শক্ত কি না। মাথা থেকে দড়ি বের হয়ে যাচ্ছে কি না। পাটের দড়ি হলে ভালো। নাইলনের দড়ি হলে টানতে টানতে পশুটি ফাঁস লাগালো কি না নজর নেবেন। তবেই হয়তো দড়িটি নিরাপত্তার কাজে বেশি সহযোগিতা করতে পারে। নতুবা দড়ি ছিঁড়ে লাপাত্তা হয়ে যাওয়ার মতো পশুর কথাও অনেকে বলে থাকেন। এবার আসুন, অন্য আরেক কথা বলি-
রাস্তার ধারে, অনুপযুক্ত স্থানে, ময়লা ড্রেনের পাশে পশু জবাই করবেন না। যেখানে সেখানে জবাইকৃত পশুর রক্ত, নাড়িভূড়ি ফেলবেন না। রক্ত পরিস্কার করুন। আবর্জনা মাটির নিচে পুতে দিন। করোনাকালীন পশু ক্রয়ে ভিড় এড়িয়ে চলুন। মুখে মাস্ক, হাতে গ্লাবস পরুন এবং সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখুন। করোনাকালীন বিদেশি পশুর চেয়ে দেশি পশু অনেকটা নিরাপদ। কাজেই বিদেশী পশু নয়, দেশি পশু কেনায় এগিয়ে আসুন। মনে রাখবেন পশু কুরবানি নিজের জন্য, কিন্তু মাংস গরিব মানুষ, আত্মীয় স্বজনের চাওয়া। এ থেকে এদের বঞ্চিত করা অনুচিত। গরিব আত্মীয়, দরিদ্র প্রতিবেশির জন্য পশুর চামড়া অগ্রাধিকার ভিত্তিতে হক এবং চরম চাওয়া। কাজেই পশুর চামড়া এদেরকে দিন। মনে রাখবেন পশুর চামড়া কোন প্রতিষ্ঠানের হক নয়, গরিবের হক। প্রতিবেশির হক, যে কোন ধরণের সাহায্য কিংবা পশুর চামড়া এদের প্রাপ্য। আপনার আশপাশ, প্রতিপাশ পরিস্কার রাখার দায়িত্ব আপনার। দিনের পরিবেশ, সময়ের পরিবেশ। আগামীর পরিবেশ সুন্দরভাবে রাখার দায়িত্ব হোক আপনার আমার অঙ্গিকার। সকলের চাওয়া।
লেখক : কলামিস্ট।


আরও পড়ুন

একদিন মদিনার পথে

 কবির মাহমুদ হয়েছি অধম বান্দা...

সিলেটের প্রিয় ব্যক্তিত্ব কর্নেল এর আর নেই

 সিলেট জেলার বালাগঞ্জ উপজেলার কৃতি...

ফায়ারম্যান পদে যোগ দেওয়া হলো না পবিত্রের

 দুই বন্ধুকে নিয়ে মোটরসাইকেলে করে...