কাশ্মীরে ভারতীয় আগ্রাসন

,
প্রকাশিত : ১৯ আগস্ট, ২০১৯     আপডেট : ২ বছর আগে
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

বায়েজীদ মাহমুদ ফয়সল

ভারতীয় আগ্রাসনে কাশ্মীর এখন খুব উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে।‘ভূ-স্বর্গ’ হিসেবে পরিচিত ৮৫৮০৬ বর্গমাইলের অঞ্চল- জম্মু,কাশ্মির উপত্যকা এবং লাদাখ এ তিনটি অঞ্চল নিয়ে জম্মু-কাশ্মির রাজ্যটি গঠিত হয়েছে। কাশ্মীর উপত্যকা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য বিখ্যাত। জম্মু অঞ্চলে অনেক মন্দির থাকায় এটি হিন্দুদের নিকট পবিত্র তীর্থক্ষেত্র। লাদাখ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও বৌদ্ধ সংস্কৃতির জন্য বিখ্যাত। ২৬ অক্টোবর ১৯৪৭ সালে এটি ভারতের করদ রাজ্যে পরিণত হয়। বর্তমানে ৩ বিভাগে ২২ টি জেলা নিয়ে এটি গঠিত। কাশ্মীরের সরকারী ভাষা ‘উর্দু’। রাজ্যটির বর্তমান জনসংখ্যা প্রায় ১,২৫,৪৮,৯২৬ জন। এই রাজ্যটির উত্তর-পশ্চিমে ‘লাইন অব একচুয়াল কন্ট্রোল’,উত্তর-পূর্বে গণচীন, দক্ষিণে ভারতের হিমাচল ও পাঞ্জাব প্রদেশটি অবস্থিত। রাজ্যটির জনগণের শিক্ষার হার ৬৬.৭%।সমগ্র কাশ্মীর অঞ্চলটি ভারত, পাকিস্তান ও চীন এই তিন দেশের অধীনেই রয়েছে। ২০১০ সালের হিসেব অনুযায়ী- ভারতের অংশটুকু “জম্মু-কাশ্মির” নামে পরিচিত যা মোট কাশ্মীরি ভূমির ৪৩%, পাকিস্তানের অংশটুকু “আজাদ কাশ্মীর” নামে পরিচিত যা মোট কাশ্মীরি ভূমির ৩৭% এবং চায়নার অংশটুকু “আকসাই চীন”(ভারত “আকসাই চীন” তাদের নিজেদের বলে দাবি করে আসছে) নামে পরিচিত যা মোট কাশ্মীরি ভূমির ২০%। সাম্প্রতিক কালের সমস্যা গুলো মূলত আজাদ কাশ্মীর বা আকসাই চীন নিয়ে নয় বরং এটা ভারতের দখলে থাকা ‘জম্মু-কাশ্মির’ নিয়ে সমস্যা।
৬ষ্ঠ শতাব্দীতে ভারতে আসা চীনা পরিব্রাজক ‘ফা-হিয়েন’ বলেন-“কাশ্মিরের অস্তিত্ব প্রথম শতাব্দী থেকেই”। পূর্বে হিন্দু রাজা এবং পরে মুসলিম সুলতানদের অধীনে থাকা ‘জম্মু-কাশ্মির’ অঞ্চলটি মুঘল সম্রাট আকবরের অধীনে আসে। ১৭৫৬ সাল থেকে আফগান শাসনের পর ১৮১৯ সালে এই রাজ্যটি পাঞ্জাবের শিখ রাজত্বের অধীনে আসে। পরে ১৮৪৬ সালে ‘রঞ্জিত সিং’ জম্মু অঞ্চলটিকে মহারাজা ‘গুলাব সিং’ এর নিকট হস্তান্তর করেন। সেই সাথে একটি বছর ‘অমৃতসর চুক্তির’ দ্বারা কাশ্মীরও মহারাজা গুলাব সিং এর অধীনে চলে আসে। ১৯২৫ সালে ‘হরি সিং’ কাশ্মীরের রাজা হন এবং তিনি ১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীনতা লাভ পর্যন্ত কাশ্মীরের শাসক ছিলেন। ১৯৩৯ সালে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ তাঁর ‘দ্বিজাতি তত্ত্ব’ প্রদান করেন। এরই ভিত্তিতে উপমহাদেশের সর্বশেষ ব্রিটিশ লর্ড মাউন্ট ব্যাটেন এর মধ্যস্থতায় ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পাকিস্তান এবং ১৫ আগস্ট ভারত নামে দুটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্ম হয়। লর্ড মাউন্ট ব্যাটেন ছিলেন জওহর লাল নেহেরুর বন্ধু এবং তিনি আলী জিন্নাহর প্রতি কিছুটা বিরক্ত ছিলেন। ফলে মাউন্ট ব্যাটেন ভারতের প্রতি সহানুভূতিশীল মনোভাব প্রদর্শন করেন।
ঔপনিবেশিক শাসনের পর উপমাহাদেশ যখন সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে ভারত ও পাকিস্তান এ দুটো আলাদা রাষ্ট্র হিসেবে আত্ম প্রকাশ করে তখন দেশীয় রাজ্য গুলোর ব্যাপারে সুস্পষ্ট কোন দিক নির্দেশনা ছিল না। ১৯৪৭ সালে ভারতের স্বাধীনতা আইন (The Act of Independence of India;1947)এর ৭ নম্বর সেকশন অনুযায়ী দেশীয় রাজ্য (Princely State) জম্মু-কাশ্মির পাকিস্তানের হওয়ার কথা কারন সেখানকার অধিবাসীদের শতকরা ৭৫ ভাগের ও অধিক মুসুলমান ছিল। অন্যদিকে রাজা হরি সিং অত্যাচারী ছিলেন বিধায় তাঁর বিরুদ্ধে এ প্রবল সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ রুষ্ট ছিল। এ ছাড়াও চতুর্দিকে স্থলবেষ্টিত (Land Lock) ভৌগোলিক অবস্থানের কারনেও কাশ্মীর আলাদা স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে টিকে থাকতে সক্ষম কিনা সে ব্যাপারে সন্দেহ দেখা দিলে পাকিস্তানের সাথে যোগদানই ছিল কাশ্মীর এর জন্য অধিক যুক্তিযুক্ত। কিন্তু হরি সিং জনগনের ইচ্ছাকে প্রাধান্য না দিয়ে টালবাহানা শুরু করে। ফলে কাশ্মীরি জনগন হরি সিং এর আচরণ নিয়ে সন্দেহ পোষণ করতে থাকে। এমতাবস্থায় হরি সিং ছলনার আশ্রয় নিয়ে পাকিস্তানের সাথে “অবিচল থাকা সংক্রান্ত”(Standstill Agreement) এক চুক্তি সাক্ষর করলেও গোপনে ভারতের সাথে যোগদানের ব্যাপারে প্রস্তুতি চালাতে থাকেন। কাশ্মিরের মুসলমানেরা এটা আঁচ করতে পেরে তাঁর বিরুদ্ধে স্বতঃস্ফূর্ত বিদ্রোহ শুরু করে দেন। কাশ্মীরি মুসলিমদের সাহায্য করার জন্য এগিয়ে আসেন পাকিস্তানের উপজাতিয় সম্প্রদায়ের জনগণ। এটাকে হরি সিং পাকিস্তান সরকারের কারসাজি বলে চালিয়ে ১৯৪৭ সনের ২৪ শে অক্টোবর ভারত সরকারের সাথে “সংযুক্তি সংক্রান্ত চুক্তি”(Instrument of Accession) সাক্ষর করেন।চুক্তি সাক্ষর হওয়ার পর ভারতীয় সেনারা কাশ্মিরে প্রবেশ করে এবং পাকিস্তানের অনুপ্রবেশ কারীদের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হয়। ফলে বেধে যায় ভারত-পাকিস্তান ভয়ানক যুদ্ধ।
উপমাহাদেশের শান্তি বিঘ্নকারী এ বিষয়টি যখন জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে আলোচিত হয় তখন “পাঁচ সদস্য বিশিষ্ট” একটি কমিটি গঠন করা হয় যার উপর শান্তি ফিরিয়ে আনা ও ভারত-পাকিস্তান উভয় সরকারের সহযোগিতায় কাশ্মিরের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের জন্য গণভোট (Plebiscite) অনুষ্ঠানের দায়িত্ব অর্পিত হয়। উক্ত কমিটি “লাইন অব কন্ট্রোল” নির্ধারণের মাধ্যমে ১৯৪৯ সালের ১ লা জানুয়ারি যুদ্ধবিরতি কার্যকর করে। কিন্ত ভারত এ গণভোটের বিপক্ষে অবস্থান নেয় এবং যুদ্ধের মাধ্যমে দখলকৃত কাশ্মীর নিজ রাষ্ট্রের অংশ হিসেবে আত্মিকরন সম্পূর্ণ করে। ফলে গণভোট আর সম্পূর্ণ করা সম্ভব হয়নি।
কাশ্মীর ইস্যুটি নিয়ে পুনরায় ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে ১৯৬৫ সালে ১৭ দিনের ‘পাক-ভারত’ যুদ্ধ হয় (যা তাসখন্দ চুক্তির মাধ্যমে সমাপ্ত হয়), ১৯৯৯ সালে কার্গিল যুদ্ধ হয়( কার্গিল কাশ্মীরের একটি জেলা)। এ ছাড়াও ১৯৮৫ সালের পর থেকে ‘সিয়াচেন হিমবাহ’ এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে কয়েকটি খণ্ড যুদ্ধ হয়েছে।
কাশ্মীর অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ভারত সরকার,কাশ্মিরি বিদ্রোহী গোষ্ঠী এবং পাকিস্তান সরকারের মধ্যে প্রধান আঞ্চলিক বিরোধ। কাশ্মীরি বিদ্রোহী গোষ্ঠী এবং ভারত সরকারের মধ্যে বিরোধের মূল বিষয়টি হল ‘স্বায়ত্তশাসন’। কাশ্মীরের গনতান্রিক উন্নয়ন সীমিত ছিল ১৯৭০ সালের সেশভাগ পর্যন্ত।১৯৮৮ সালে ভারত সরকার কর্তৃক প্রদত্ত বহু গণতান্রিক সংস্কার বাতিল হওয়ায় অহিংস পথে অসন্তোষ জ্ঞাপনের সুযোগ না থাকায় বিদ্রোহীরা হিংসাত্মক আন্দোলনের দিকে ধাবিত হতে থাকে। নিম্নোক্ত কারণে পাকিস্তান এবং ভারত দুই দেশই কাশ্মীরকে গুরুত্ব দিয়ে থাকেঃ-
১।সিন্ধু নদ তিব্বতের মানস সরোবর থেকে উত্তরে “সিন-কা-বাব” জলধারা থেকে উৎপন্ন হয়ে কাশ্মিরে প্রবেশ করেছে। পরে নদটি কাশ্মীর হয়ে পাকিস্তানে প্রবেশ করেছে। পাকিস্তানের অর্থনীতিতে সিন্ধু নদের ভূমিকা অনন্য সাধারণ। অন্যদিকে সিন্ধু নদের উপনদী- শতলজ,বিয়াম,রাভি,চন্দ্রভাগা,ঝিলাম প্রভৃতি নদী গুলো ভারতে প্রবেশ করেছে। শতলজ নদীর উপর নির্মিত “ভাকরা-নাঙ্গাল” সেচ ও বিদ্যুৎ প্রকল্প ভারতের পাঞ্জাব ও হিমাচল প্রদেশে শস্য উৎপাদনে বিরাট পরিবর্তন এনেছে। যেহেতু জম্মু-কাশ্মির রাজ্যটি ভারতের তাই ভারত সবসময় সিন্ধু নদের গতিরোধ করার হুমকি দিয়ে থাকে পাকিস্তান কে। তাই পাকিস্তান কাশ্মীর দখলে মরিয়া হয়ে উঠেছে তাঁর জাতীয় স্বার্থের কথা চিন্তা করে।
২।যুদ্ধক্ষেত্র অনুযায়ী উঁচু স্থান দখল করলে জয়ের সম্ভাবনা বেশি। কারণ পর্বতের বা উঁচুতেঁ আরোহণকারী সৈন্য নিচুতে অবস্থানকারী সৈন্য থেকে বেশি সুবিধা পাবে। তাই কাশ্মীরের সিয়াচেন হিমবাহ যুদ্ধক্ষেত্রে যেখানে ভারত ও পাকিস্তান ১৯৮৪ সনের ১৩ এপ্রিল থেকে পরস্পরের বিরুদ্ধে লড়াই করে আসছে।দুই দেশই বর্তমানে সিয়াচেন হিমবাতে ৬০০০ মিটার উচ্চতায় স্থায়ী সামরিক উপস্থিতি বজায় রেখেছে। কারণ সিয়াচেন হিমবাহ থেকে ভারত বা পাকিস্তান উভয় দেশকেই খুব সহজেই আক্রমণ করা যাবে এবং জয়ের সম্ভাবনা বেশি। তাই শত্রুতামূলক মনোভাব এবং সিয়াচেন হিমবাহ এর কৌশলগত অবস্থানের কারনে উভয় দেশই কাশ্মীর দখল রাখতে চায়।
৩।জম্মু-কাশ্মির রাজ্যটির মাধ্যমে ভারত মধ্য এশিয়া এবং মধ্য প্রাচ্যের সাথে খুব সহজেই যোগাযোগ রাখতে পারে। তাই অভিন্ন শত্রু হিসেবে ভারতকে পাকিস্তান এবং চীন চাপে রাখতে চায় কাশ্মীর এর দখল নিয়ে। (১৯৬২ সালের ইন্ডিয়া-চায়না যুদ্ধে চায়না কাশ্মীর থেকে ‘আকসাই চীন’ দখল করে নেয় সেই সাথে এই যুদ্ধের মাধ্যমে চীন ভারতের সেভেন সিস্টার্স এর অন্তর্গত ‘অরুণাচল প্রদেশটিকেও’ দখল করে নেয়, পরে চীন আন্তর্জাতিক চাপে বাধ্য হয়ে অরুনাচলকে ভারতের নিকট ফেরত দেয়।)
৪।ভারত যদি কাশ্মীর রাজ্যটিকে ধর্মের ভিত্তিতে স্বাধীনতা দিয়ে দেয় তাহলে ধর্ম নিরপেক্ষ ভারত রাষ্ট্রটি হুমকির মুখে পড়বে।কারণ অন্যান্য রাজ্য গুলোও স্বাধীনতা চাইবে। যেমনঃ জুনাগড়, হায়দারাবার মুসলিম অধ্যুষিত। তারাও স্বাধীনতা চাইতে পারে।তাই ভারত কাশ্মীরকে ছাড়তে চাইবে না।
৫। জম্মু-কাশ্মিরের উল্লেখযোগ্য নদী চন্দ্রভাগা,ঝিলাম,শূরা,নুবরা,শায়ক ইত্যাদি নদী গুলো ভারতকে একধাপ এগিয়ে দিয়েছে। ফলে ভারতও চাইবেনা কাশ্মিরকে হাতছাড়া করতে।
৬।ঐতিহাসিক শত্রুতামূলক আচরনের কারনেও দুই দেশ জয়ী হওয়ার বাসনায় যুদ্ধে লিপ্ত হয় এবং নিজেদের আধিপত্য জাহির করতে চায়।
৭।পাকিস্তান এবং চায়না উভয়েই বন্ধু রাষ্ট্র হিসেবে সহজ যোগাযোগ চায়। তাই কাশ্মীর যদি পাকিস্তানের অধীনে চলে আসে তাহলে সে খুব সহজেই চায়নার সাথে যোগাযোগ রক্ষা করতে পারবে, যা উভয় দেশের পরিবহন খরচ অনেকটা কমিয়ে দিবে।(যদিও আজাদ কাশ্মীরের মাধ্যমে পাকিস্তান চায়নার সাথে যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছে।)
২০০১ সাল পর্যন্ত সন্ত্রাসবাদ দমনের নামে ভারতীয় সরকার তাঁর সেনাবাহিনী কে কাশ্মীরের পাঠালে সেখানে ৬০০০০ মানুষ নিহত হয় যার বেশিরভাগ-ই বেসামরিক নিরীহ জনগণ যারা ভারতীয় সৈন্যদের রোষাগ্নির শিকার। এই সকল হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে কাশ্মীরি জনগণ সোচ্চার হয়ে উঠে। অন্যদিকে ভারতও স্বায়ত্তশাসনের পরিবর্তে দমন নীতি প্রয়োগ করে থাকে। যদিও ভারত তাদের সংবিধানের ৩৭০ নং ধারা(ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ ধারা অনুযায়ী জম্মু-কাশ্মির একটি বিশেষ অঞ্চল।কারণ প্রতিরক্ষা,পররাষ্ট্রবা যোগাযোগের মতো কয়েকটি বিষয় ছাড়া বাকি সব ক্ষেত্রে সেখানে ভারতের কোন আইন প্রয়োগ করতে গেলে রাজ্য সরকারের সম্মতিও জরুরি।নাগরিকত্ব,সম্পত্তির মালিকানা বা মৌলিক অধিকারের ক্ষেত্রে তারা একটু বাড়তি সুযোগ সুবিধা পেয়ে থাকে।) সে অনুযায়ী বিশেষ মর্যাদা দিয়েছে। কিন্ত বাস্তবে এই ধারার প্রতিফলন ঘটেনি। ফলে উর্দু ভাষাভাষী কাশ্মীরি জনগণ পাকিস্তানের দিকে এগিয়ে চলছে।

ভারত-শাসিত কাশ্মীরে ১৯৮৯ সালে ভারতীয় শাসনের বিরুদ্ধে সশস্ত্র গণআন্দোলন শুরুর পর থেকে সরকারি হিসাব অনুযায়ী সহিংসতায় নিহত হয়েছে ৫০ হাজারের বেশি। শত শত গণকবর আবিস্কৃত হয়েছে, ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের হিসাব অনুযায়ী, এই অঞ্চল ৩০ হাজার এতিম ও অন্তত এক হাজার ‘অর্ধ-বিধবার’ বাসস্থান। কাশ্মীরে অর্ধ-বিধবা একটি বিশেষ পরিভাষা। তাদের স্বামীরা নিখোঁজ হয়ে গেছে। কিন্তু তারা মারা গেছে, তার কোনো প্রমাণ নেই।গত কয়েক বছর ধরে বেসামরিক বা বিদ্রোহীদের হত্যার প্রতিবাদে প্রতিদিনই তরুণরা বন্দুকধারী ভারতীয় সৈন্যদের দিকে পাথর নিক্ষেপ করে। কাশ্মীরের ওপর ভারতীয় শাসনকে স্থানীয়রা দখলদারিত্ব বিবেচনা করে।

এই প্রেক্ষাপটেই ভারত ৫ আগস্ট ভারতীয় সংবিধানে থাকা কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদাসূচক অনুচ্ছেদ ৩৭০ ও অনুচ্ছেদ ৩৫ক বিলুপ্ত করে। একইসাথে ভারতের একমাত্র মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজ্যটি থেকে লাদাখ অঞ্চলকে আলাদা করা হয়। উভয় অংশকেই ইউনিয়নভুক্ত ভূখণ্ড হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এই পদক্ষেপের কথা ঘোষণা করার আগে কঠোর কারফিউ জারি করা হয়, ইন্টারনেট, ল্যান্ডফোন, মোবাইল ফোন পরিষেবা বন্ধ করে দেয়া হয়।

নয়া দিল্লি কয়েক বছর ধরেই জম্মু ও কাশ্মীরের বিশেষ অনেক সুবিধা হ্রাস করে আসছিল। তবে তারপরও অনুচ্ছেদ দুটি কাশ্মীরীদের মনে আশাবাদ জাগিয়ে রেখেছিল যে তারা ভারতের কাছ থেকে একসময় ভালো আচরণ পাবে। তাছাড়া অনুচ্ছেদ ৩৫ক বাইরের লোকদের কাশ্মীরীদের জমি কেনায় প্রতিবন্ধকতা হিসেবে কাজ করছিল। স্থানীয়রা আশঙ্কা করছে, বাইরের লোকজন জমি কেনা শুরু করলে এখানকার জনসংখ্যাগত ভারসাম্য বদলে যাবে।

এখন দুটি অনুচ্ছেদ বাতিল করায় কাশ্মীরী ও অবশিষ্ট ভারতীয়দের মধ্যে ব্যবধান আরো বাড়বে। ভারতীয় কর্তৃপক্ষ এখন শান্তি বজায় রাখতে পারলেও উচ্চ মাত্রার সহিংসতা যেকোনো মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

মনে হচ্ছে অনুচ্ছেদ ৩৫ক বিলুপ্ত করার ফলে কাশ্মীরের প্রকৃতি বদলে যাবে। ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এই অঞ্চলের ১২.৫ মিলিয়ন লোকের ৬৮ ভাগ মুসলিম ছিল। নতুন পরিস্থিতির ফলে স্থানীয় সরকার আর বাইরের লোকদের ভূমি ক্রয়ে বাধা দিতে পারবে না। এতে করে নয়া দিল্লি হিন্দু অভিবাসীদের জমি কিনতে উৎসাহিত করবে। তিব্বতে হ্যান চীনা জনসংখ্যা বাড়াতে চীনও ঠিক একই নীতি অনুসরণ করেছিল।

ইকোনমিস্ট অনুযায়ী ২০০০ সালে হ্যান চীনারা তিব্বতের রাজধানী লাসায় ছিল সেখানকার মোট জনসংখ্যার ১৭ ভাগ। বর্তমানে তা হয়েছে ২২ ভাগ। বিশাল অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি মিশ্র জনসংখ্যা পরিবর্তন ঘটেছে। এর মাধ্যমে স্থানীয় লোকজনের ওপর আরো বেশি নজরদারি চালানোর সুযোগ পাচ্ছে চীন। কিন্তু এর ফলে তিব্বতিরা কিন্তু চীনাদের সাথে মিশে যাচ্ছে না। তারা বরং আরো দূরে সরে যাচ্ছে, তাদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। চীনা শাসনের প্রতিবাদে ২০১১ সাল থেকে ১৫০ জনের বেশি তিব্বতি আগুন দিয়ে আত্মহত্যা করেছে।

একইভাবে উন্নয়নের নামে কাশ্মীরে জাতিগত অবস্থানে পরিবর্তন আনা হবে। ক্ষমতাসীন বিজেপির মূল সংগঠন আরএসএস দীর্ঘ দিন ধরেই এমন দাবি জানিয়ে আসছিল। তারা রাজ্যটিকে হিন্দুদের অনুকূলে আনার জন্য অনুচ্ছেদ দুটি বাতিল করার কথা বলছিল।

তাদের দাবি অনুযায়ী অনুচ্ছেদ দুটি বিলুপ্ত করা হয়েছে। এখন ভারতের অন্যান্য অংশ থেকে হিন্দুদের কাশ্মীরে ভূমি ক্রয়ের সুযোগ দেয়া হবে।

জম্মু ও কাশ্মীরে মোতায়েন প্রায় ৫ লাখ ভারতীয় সৈন্যের অনেকে সম্ভবত ইতোমধ্যেই সেখানে ভূমি কিনেছে। তবে অল্প সময়ের মধ্যে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটানো হতে পারে। ভারত সরকার ইতোমধ্যেই ঘোষণা দিয়েছে, অক্টোবরে সেখানে একটি আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ সম্মেলনের আয়োজন করা হবে।

তাছাড়া আইন পরিষদের আসনেও পরিবর্তন আনা হবে। জম্মু ও কাশ্মীরের আইন পরিষদে জম্মুর রয়েছে ৩৭টি আসন, কাশ্মীরের ৪৬টি, লাদাখের ৪টি। এখন লাদাখ সরিয়ে নেয়া হয়েছে। জম্মুর আসন বাড়ানো হলে মুসলিমদের আসন কমে যাবে। ফলে মুসলিমদের তাৎপর্য হ্রাস পাবে। মুসলিমদের অবস্থান যত হ্রাস পাবে, হিন্দুদের তত বাড়বে।

বিজেপি ১৯৯০-এর দশক থেকে তাদের হিন্দু ভোট ভিত্তি বাড়ানোর জন্য কাশ্মীরী পণ্ডিতদের ব্যবহার করছে। ১৯৯০-এর দশক থেকে প্রায় এক লাখ উচ্চ বর্ণের হিন্দু কাশ্মীর থেকে পালিয়ে যায় বলে ধারণা কা হচ্ছে। মোদির বিজেপি তাদেরকে পুনর্বাসিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বারবার।

নতুন ব্যবস্থায় সরকার সম্ভবত তাদের জন্য আলাদা টাউনশিপ গড়ে তুলবে। সেখানে তাদের নিজস্ব শিল্পপ্রতিষ্ঠান, স্কুল, হাসপাতাল থাকবে। এসবের মাধ্যমে কাশ্মীরকে আরো নানাভাবে বিভক্ত করে ফেলা হবে।

বর্তমানে ভারতজুড়ে লোকজন শক্তিশালী ভারতের গল্প বলছিল। শুরুতে জম্মু ও লাদাখের অমুসলিমরাও নয়া দিল্লির পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছিল। কিন্তু এখন তাদেরও অনেকে তাদের সংস্কৃতি ও চাকরি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করতে শুরু করেছে। এদিকে ৫ আগস্টের পর কাশ্মীরে কী ঘটছে তা বোঝা যাচ্ছে না। তথ্য নিষিদ্ধ, কারফিউ চলছে। লোকজন তাদের ঘরে আটকে রয়েছে, শত শত মানুষ রয়েছে কারাগারে। এ ধরনের বদ্ধ অবস্থা চিরদিন থাকতে পারে না। এটা প্রত্যাহার হওয়ার পরই বিশ্ব চরমভাবে বদলে যাওয়া ভিন্ন এক কাশ্মীর দেখতে পাবে।
ইতিহাস সাক্ষী দেয় ভালবাসার মাধ্যমে বিশ্ব জয় করা যায়। অন্যদিকে দমন নীতি শুধু বিভাজন বাড়ায়। দমন নীতি আর শোষণ যদি সমাধান হতো তাহলে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটি তৈরি হতো না, হতো না ভারত বা পাকিস্তান। যদি ভারত তাঁর অখণ্ডতা বজায় রাখতে চায় তাহলে তাকে ৩৭০ নং ধারাটির বাস্তবায়ন করতেই হবে।তাহলেই কাশ্মীর সংকট সমাধান সম্ভব।আমরা শান্তি প্রিয় পৃথিবী চাই। যেখানে হিমালয়ের চূড়ার ন্যায় কিছু শান্তি প্রিয় বড় মনের মানুষ থাকবেন যারা মানবতার কথা চিন্তা করে এই রাজনৈতিক সংকটকে রাজনৈতিক ভাবেই সমাধান করবেন। কেননা মন্দিরের প্রার্থনা যেইখানে যায়, মসজিদের প্রার্থনাও সেইখানেই যায়, হয়তো ভিন্ন ভিন্ন মাধ্যমে। তাই মানবতার সেবাই হোক আমাদের প্রাণের স্পন্দন।


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আরও পড়ুন