কালো ছায়া

প্রকাশিত : ০১ মার্চ, ২০১৯     আপডেট : ১ বছর আগে  
  

জিন্নিয়া সুলতানাঃ

নাফিজা বেগমকে নিয়ে বিচার সভা বসেছে গ্রামের মাতব্বর বাড়িতে। মাতব্বরের বয়স বেশি না। কিন্তু ভালো মানুষ হিসেবে তার একটা নাম ডাক আছে কয়েক্ গ্রামে।
নাফিজার মা আমিনা বেগম ভাবলো এই বিচার একমাত্র কুদরত মাতব্বরই করতে পারবে। তাহলে যদি নাফিজা একটু সুবিচার পায়।

ভোরের আলো ফোটার আগেই নাফিজা ঘুম থেকে উঠে পড়ে, সকাল সকাল মায়ের কাজে হাত লাগালে মায়ের কষ্ট একটু কমে। মা এমনিতেই সারা দিন অন্যের বাড়িতে রান্নার কাজ করে। নিজের ঘরের কাজে যদি একটু সাহায্য পায় তাহলে এই ফাঁকে একটু বিশ্রাম নিতে পারবে।
নাফিজার বয়স সবে মাত্র দশ বছরে পড়েছে। অথচ বাস্তবতার অনেক কিছুই সে বুঝে। কিসে কষ্ট, কিসে অসম্মান এসব সব কিছুই সে বুঝতে পারে।
তাই পড়াশুনা শেষ করে মাকে একটু শান্তি দেবে এই চিন্তা তার মাথায় ঘুরপাক খায়।
স্কুলের বড় মাস্টার তাকে বেশ স্নেহ করেন। তাই স্কুলেও সে সবার প্রিয়।
প্রতিবার ক্লাসে সে প্রথম হয়। তার পড়াশোনার মনোযোগ দেখে বড় মাস্টার বলেন, নাফিজা বড় হলে আমিনা বেগমের কষ্ট যদি একটু কমে! মেয়েটা এই বয়সেই কত কিছু বুঝতে পারে।

নাফিজার বাবা অসুস্থ্য হওয়ার পর থেকে বিছানায় শুয়ে থাকেন সারা দিন।
সারা দিন কাজ করে এসে আমিনা বেগমের কষ্ট হয়ে যায় আধমরা স্বামীর যত্ন করতে।
মাঝে মাঝে মেজাজ গরম করে দুয়েক কথা শুনিয়ে দিলে নাফিজার বাবা সবার আড়ালে চোখ মুছেন।
এই বিব্রতকর অবস্থায় নাফিজা বাবার সামনে এসে পড়ে।
অসহায় চোখে বাবার দিকে তাকিয়ে থাকে, কিন্তু মাকেও কিছু বলতে পারে না। নাফিজা বুঝতে পারে,সারা দিনের খাটাখাটনি করে মায়ের মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায়।
এই বয়সের অন্য বাচ্চারা মুখে তুলে না দিলে ভাত খায় না, কিন্তু নাফিজা যেন এই বয়সেই বাবা মায়ের একটা শক্তি।
সে স্কুল থেকে ফিরে এসে বাবাকে নিজ হাতে গুসল করায়, সরিষা তেল ডলে ডলে মাখিয়ে দেয় বাবার পায়ে।
যদি একটু ভালো হয়ে যায় বাবা।
তাহলে আর মাকে বাড়ি বাড়ি গিয়ে ঝিয়ের কাজ করতে হয় না।

আসেপাশে সবার বাড়িতেই বিদ্যুৎ চলে এসেছে। কিন্তু নাফিজার ঘরে এখনো বিদ্যুৎ পৌঁছেনি।
আমিনা বেগম মাস শেষে যা পায় তাতে সংসার খরচ শেষে অসুস্থ্য স্বামীর ঔষধের খরচই চলে না।
বিদ্যুৎ বিল দেওয়ার সাধ্য তার নেই। তাই এখনো নাফিজাকে কেরোসিনের বাতি জ্বালিয়ে রাতের বেলা পড়তে হয়। তাও বেশিক্ষণ আলো জ্বালিয়ে রাখা যায় না। তেল বেশি খরচ করা যাবেনা।
মায়ের তাতে খরচ আরো বেড়ে যাবে।

নাফিজার ঘরের সামনেই আনিসদের দুতলা ঘর। আনিস নাফিজার সাথেই একই ক্লাসে পড়ে।
একদিন রাতের বেলা যখন আনিস তার ঘরের জানালা খুলে দিল, তখন বিদ্যুতের ঝলমলে আলো এসে পড়লো নাফিজার বারান্দায়।
হঠাৎ নাফিজার মাথায় এলো, এই বারান্দার আলোর মধ্যেই তো সে রাতের বেলা পড়তে পারবে।

আনিস নাফিজার ভালো বন্ধু।তাই পরদিন সে আনিসকে বলে কয়ে রাজি করিয়ে নিল, যাতে সে সন্ধ্যার পর তার ঘরের জানালা খুলে রাখে।
এর পর থেকে সে প্রায়ই বারান্দায় পড়তে বসতো। মাঝে মাঝে সেই জানালায় আনিসের চাচা খুকন এসে উকি দিয়ে দেখত নাফিজাকে।
কিন্তু জানালা বন্ধ করত না। নাফিজা তখন একটি হাসি দিয়ে আবার পড়তে শুরু করতো।

শীতের সন্ধ্যা।
নাফিজা আজকে তার বাবাকে গুসল করায়নি। সকাল থেকেই তার বাবার গায়ে জ্বর চলে এসেছে। তাই সন্ধ্যা বেলায় বাবাকে কাঁথা মুড়ি দিয়ে শুইয়ে রেখে এসে সে পড়তে বসেছে।
কিন্তু বাবার জন্যে তার মনটা কেমন যেন করছে। কিছুক্ষণ পর পর ডেকে ডেকে জিজ্ঞেস করছে, বাবা তোমার কিছু লাগবে?
বাবা তখন জড়ানো কণ্ঠে আওয়াজ দিচ্ছেন ঘর থেকে।
হঠাৎ আনিসদের জানালায় আনিসের চাচা খুকন মিয়াকে দেখা গেল।
প্রতিদিনের মত সে উকি দিয়ে নাফিজাকে দেখছে।
জানালায় দাঁড়িয়ে সে নাফিজা কে জিজ্ঞেস করলো, কি রে? তোর বাবার শরীর কি বেশি খারাপ?
নাফিজা তাকিয়ে দেখলো খুকন চাচা।
– হ্যাঁ চাচা, বাবার গায়ে জ্বর এসেছে। মা ও আজকে ফেরেনি এখনো। ভ্য় লাগছে জ্বর বেড়ে যদি কোনো সমস্যা হয়।
– তাই নাকি রে? আমাদের ঘরে জ্বরের ঔষধ আছে। নিয়ে গিয়ে তোর বাপকে একটু খাইয়ে দে।
– তাহলে তো ভালো হয় চাচা। আমি আসছি দাঁড়াও।
নাফিজা ঔষধ নিয়ে আসে। সাথে খুকন ও তার দুই বন্ধু আসে। বাচ্চা মেয়ে, না বুঝে কি না কি করবে।

রাত নয়টা বাজে।
বিয়ে বাড়ির রান্না শেষ করে মা আমিনা বেগমের বাড়ি ফিরতে দেরি হয়ে গেল।
কিন্তু একি !
ঘরের দরজা খোলা, ঘরে কোনো আলোও নেই।
নাফিজা কই গেলি রে? নাফিজা?
ঘরে কোনো সাড়া শব্দ না পেয়ে নিজেই আলো জ্বালিয়ে আনলো আমিনা বেগমে।
হঠাৎ তার চোখ পড়লো ঘরের এক কোণে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে আছে নাফিজা।
কিন্তু চৌকির উপর তার বাবা নাক ডেকে ঘুমাচ্ছেন।
আমিনা বেগম চিত্কার দিয়ে উঠলো, ইয়া আল্লাহ, আমার এ কি সর্বনাশ হয়ে গেছে রে, কে এমন সর্বনাশ করলো আমার।
ও নাফিজা, নাফিজা, চোখ খুলে তাকা মা।

দুই দিন পর, গ্রামের স্বাস্থ্য সেবা কেন্দ্রে নাফিজা চোখ খুলে চিত্কার দিয়ে উঠলো।
টানা তিন চার ঘণ্টার অমানুষিক নির্যাতনের পর দুই দিন ধরে সে কোনো কথাই বলে নী।
নাফিজাকে সাথে নিয়ে এসে খুকন আর তার বন্ধুরা মিলে নাফিজার বাবাকে ঘুমের ঔষধ খাইয়ে দেয়।
ঔষধ খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে তিনজন মিলে ঝাঁপিয়ে পড়ে নাফিজার উপর।
পালাক্রমে চলতে থাকে তাদের পৈশাচিক আনন্দ ভাগাভাগির উৎসব।

কুদরত মাতব্বরের সামনে বসে আছে নাফিজা।
এক পাশে দাঁড়িয়ে আছে খুকন আর তার বন্ধুরা। অন্যপাশে আমিনা বেগম পাশে বসিয়ে রাখা তার স্বামী।
কুদরত মাতব্বর নাফিজা কে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি মিথ্যা বলছো না তো?
ছেলেটা কি খুকনই ছিল?নাকি অন্য কেউ?
নাফিজা কোনো উত্তর দিচ্ছে না।
পাশ থেকে তার বাবা বলে উঠলেন, মাতব্বর সাহেব, খুকনই আমাকে ঘুমের ঔষধ খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে রেখে দিয়ে এই কাজটা করেছে।
কুদরত মাতব্বর তাকে ধমক দিয়ে বললেন, তুমি থামো মিয়া, চলার মরদ নাই আবার কথা বলে। তুমি কি দেখতে কি দেখেছো। আবার সাক্ষী দিচ্ছ এসে।
নাফিজার বাবা বললেন, মাতব্বর সাহেব, আমার হাত পা অচল, কিন্তু আমার চোখ কানা না। আমি নিজের চোখে দেখেছি এই তিনটে ছেলেই আমাকে ঔষধ খাইয়েছে।
কুদরত মাতব্বর এখন বিরক্ত হয়ে বললেন, তোমাকে থামতে বললাম না? এই ছেলেরাই তোমাকে ঔষধ খাইয়েছে,কিন্তু এরাই তোমার মেয়ের ইজ্জত নিয়েছে সেটা কি তুমি দেখেছো?
নাফিজার বাবা এবার চুপ হয়ে গেলেন।

কুদরত মাতব্বর আবার নাফিজা কে জিজ্ঞেস করলেন, কি কথা কও না কেন?
ছেলেগুলো তোমাকে কিভাবে কি করেছিল বলো তো?
বাচ্চা মেয়ে। কি বুঝতে কি বুঝেছে!
সব বলো আমাকে।ওরা তোমার কোন কোন জায়গায় হাত দিয়েছে। কি করেছে বলো। না বললে বুঝবো কিভাবে আসলেই কি ওরা তোমার ইজ্জত নিতে চেয়েছে নাকি অন্য কিছু।

নাফিজা মাতব্বরের প্রশ্নের উত্তর দেবে।
উঠান ভর্তি মানুষ।সবাই নাফিজার দিকে তাকিয়ে আছে।
যেন খুব মজার কোনো গল্প বলবে নাফিজা। বসে বসে সেই গল্প গোগ্রাসে গিলবে জড়ো হওয়া সবাই।

আড়ালে বসে আছেন কুদরত মাতব্বরের মা রেহানা বেগম। এতক্ষণ ধরে তিনি সব কিছু শুনছিলেন।
তিনি যেন ফিরে গেলেন সংগ্রামের বছর। কি বিভৎস দৃশ্য,কি অমানবিক নির্যাতন!
পাকিস্তানি বাহিনী যুবতী রেহানাকে ঘর থেকে ধরে নিয়ে গেল ক্যাম্পে।
তিনি ক্যাম্পে গিয়ে দেখলেন মজিদ মাস্টার ক্যাম্পে বসে পান খাচ্ছে।
এজন্যেই সে মাঝে মাঝে মুক্তিবাহিনীর খবর নিতে যেত তাদের বাড়িতে।
তাহলে এই লোকটাই আর্মিকে সব সংবাদ দিত!
রেহানা বেগমের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল, চোখে মুখে প্রচণ্ড ঘৃণা উপচে পড়তে শুরু করলো।
কথা ছিল মেট্রিক পাস করলেই মজিদ মাস্টারের সাথে রেহানা বেগমের বিয়ে হবে। কিন্তু মেট্রিক পাস করার আগেই দেশে মুক্তি যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল।
কিন্তু এখন মজিদ মাস্টারের মুখে এক দলা থুথু ছিটিয়ে দিতে ইচ্ছে করছে রেহানার।
কি অদ্ভুত রকম ভালো মানুষের মুখোশ পরে থাকে মানুষ সমাজে।
কিন্তু একটা সময় তার প্রকৃত চেহারা সমাজের সামনে বেরিয়ে আসে। মজিদ মাস্টারও নিজের পরিচয়ে ধরা দিল এই কঠিন সময়ে এসে।
যুবক বৃদ্ধ সবাই যখন মুক্তি বাহিনীতে যোগ দিতে শুরু করেছে,তখন মজিদ মাস্টার অস্ত্র দেখলে ভয় লাগে বলে মুক্তি বাহিনীতে যোগ দিতে রাজি হলো না।
কিন্তু রেহানা বেগম নিজে রান্না করে খাইয়ে মুক্তি বাহিনীকে সহায়তা করতেন।

বয়সে তরুণ আর্মির অফিসার।
সাথে আরো কয়েকজনকে নিয়ে রেহানা বেগমকে খুঁটে খুঁটে দেখতে লাগলো।
অদ্ভুত ব্যাপার হলো, মজিদ মাস্টার সেই কাজে অফিসারকে উৎসাহ দিচ্ছে।
যেন একটা পোড়া মুরগিকে আরো সুস্বাদু করে তোলার জন্যে সে টেস্টিং সল্ট ঢালছে।

মজিদ মাস্টারের সামনে দিয়েই আর্মি অফিসার রেহানাকে নিয়ে একটি ঘরে ঢুকে গেল।
কি ভয়ানক যন্ত্রণায় কেটেছে এক একটি রাত!
মদ খেয়ে মাতাল হয়ে অফিসাররা কি না করেছে তার সাথে।
একের পর এক এসেছে পালাক্রমে নির্যাতন করতে।

রেহানা বেগম আর কিছু ভাবতে পারছেন না।
তার কাছে ছেলে কুদরতকে এখন মজিদ মাস্টারের মতন লাগছে।
একই মানুষ শুধু দুই যুগে দুই চেহারা দুই পরিচয় নিয়ে জন্মেছে।
তাহলে কি মজিদ মাষ্টাররা কখনো মরে না?
শুধু ঘাপটি মেরে থাকে ভিন্ন ভিন্ন পরিচয়ে?
তিনি উদভ্রান্তের মত বেরিয়ে এলেন ঘর থেকে।
উঠোন ভর্তি মানুষ।
চেয়ারে বসে আছে কুদরত মাতব্বর।
রেহানা বেগম সোজা এসে ছেলে কুদরত মাতব্বরের গালে কষে একটা থাপ্পড় দিয়ে বসলেন।
তার চোখে মুখে প্রচণ্ড ঘৃণা।
অনেক বছর পর সবাই রেহানা বেগমের মুখে একটি কথাই শুনলো, মজিদ মাস্টার!

আরও পড়ুন