কালের চিত্তে চির বিকশিত জ্ঞানের পদ্মফুল

প্রকাশিত : ২৩ এপ্রিল, ২০১৮     আপডেট : ২ বছর আগে  
  

অধ্যাপক আব্দুল হান্নান সেলিম: বিংশ শতাব্দির শেষ দশক থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত এদেশে নারী জাগরণের স্বর্ণযুগের সূচনা হয়েছে। রাষ্ট্রীয় প্রধান, বিরোধী দলের নেতৃত্ব, বিচার বিভাগ, শিক্ষা বিভাগ এমনকি সামরিক ও আধাসামরিক বাহিনীতেও নারীর অবাধ সঞ্চারণ। অথচ মাত্র ৭০/৮০ বৎসর পূর্বেও চিত্র ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। বিংশ শতকের গোড়ার দিকে মুসলিম নারী সমাজে উচ্চ শিক্ষা দূরে থাক, ঘরে বসে প্রয়োজনীয় ধর্ম শিক্ষা ভিন্ন অন্য কিছু করা ছিল প্রায় অসম্ভব।
এহেন প্রতিকূল অবস্থার বিপরীতে মহিয়সী মহর্ষী বেগম রোকেয়া, নওয়াব ফয়জুন্নেছার মতো মহর্ষী নারী রুখে দাঁড়ালেন। ডাক দিলেন মুসলিম নারী শিক্ষার।
তারই অভিসাতে দোলা দিল তৎকালীন আমাদের পরিবারের এক স্থানীয় কিছু মুসলিম কিশোরীদের মানষে। ১৯৩০ খৃস্টাব্দে পন্ডিত নিমাই চন্দ্র মিরাবাজারে প্রতিষ্ঠা করলেন কিশোরী মোহন প্রাথমিক বিদ্যালয়।
আমাদের পরিবারের ক’জন কিশোরী সহ স্থানীয় কতিপয় মুসলিম ছাত্রী তথায় ভর্তি হলেন। কিন্তু অচিরেই পর্দা প্রথার বাড়াবাড়ী নিয়ে দেকা দিল বিপত্তি। ক্লাস ফোর ফাইভের মুসলিম ছাত্রী আপাদমস্তক বোরখায় আবৃত না হয়ে রাস্তায় হেটে বিদ্যালয়ে যাওয়া ছিল কল্পনাতীত। কিন্তু তৎকালীন সামাজিক অবস্থার কারণে মুসলিম ছাত্রীদের উপর মানষিক নির্যাতন শুরু হয়। বোরখা ধরে টানাটানি, বোরখা ছিড়ে ফেলা, নানাবিধ টিটকারী ছিল নৈমিত্তিক ঘটনা। কর্তৃপক্ষকে অভিযোগ করেও কোন ফল না পাওয়ায় কতিপয় মুসলিম ছাত্রীদের স্কুলে যাওয়া বন্ধ হয়ে যায়। অথচ শিক্ষা লাভের উদগ্র বাসনা ছিল ছাত্রীদের।
এহেন পরিস্থিতিতে আমার আব্বা আব্দুছ ছাত্তার সাহেব ও ছোট চাচা আব্দুল মুত্তালিব সাহেব উনাদের মাতা বখতিয়ার বিবির নামানুসারে বাড়ীতেই নিজস্ব অর্থায়নে মুসলিম ছাত্রীদের জন্য পাঠশালা স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেন। এ ব্যাপারে প্রধান পরামর্শ দাতা ছিলেন উনাদের প্রায় সমবয়সী বন্ধুতুল্য ভাগিনা আছন হাফিজ সাহেব। (অর্থমন্ত্রী মুহীত সাহেবের পিতা)। স্কুল প্রতিষ্ঠার সম্পত্তিপত্র সহ যাবতীয় প্রাতিষ্ঠানিক কাজকর্ম আব্দুল হাফিজ সাহেব এবং স্থানীয় মুরব্বি ছৈদ মিয়া সাহেব (মিউনিসিপ্যালিটি কর্মকর্তা) যৌথভাবে সম্পাদন করেন। এই ভাবেই ১৯৩১ খৃস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত হয় বখতিয়ার বিবি বালিকা বিদ্যালয় যা কোন মুসলিম দাতা কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত সিলেটর ২য় বিদ্যালয়।
ঝোকের মাথায় বিদ্যালয়তো প্রতিষ্ঠিত হলো, কিন্তু প্রচন্ড সমসা হলো ছাত্রীসংকট। ১০/১২ জন উৎসাহী ছাত্রী নিয়েতো স্কুলফ চলে না। শুরু হলো ছাত্রী সংগ্রহ অভিযান। আব্বা, চাচা হাফিজ ভাই ছৈদ মিয়া চাচা সহ অনেক মুরব্বি মিলে ঘরে ঘরে ছাত্রীদের অভিভাবকদেরকে বুঝিয়ে, মিনতি করে ছাত্রী সংগ্রহ করেন। উপযুক্ত শিক্ষিকা সমস্যাও ছিল প্রচুর। অর্থসংকট বা বাদ যাবে কেন। এভাবেই অনেক প্রতিকূলতার মধ্যে যাত্রা শুরু করে বখতিয়ার বিবি বালিকা বিদ্যালয়।
তারপর সুরমার জল অনেক গেিয়ছে। দীর্ঘ দিন স্কুলফ পরিচালনায় দায়িত্ব ছিলেন এডভোকেট আব্দুল হাফিজ সাহেব। প্রথম দিকের ছোট বোন সাহেরা খাতুন খুকি বিতি এম.সি কলেজ থেকে প্রথম মুসলিম গ্রাজুয়েট (অর্থ মন্ত্রীর ফুফু এবং পরবর্তিত শাশুড়ী।)
খুকি আপার মতো হাজার হাজার প্রতিভার জন্ম দিয়েছে এই বিদ্যালয়তন। সাক্ষী থেকেছে অনেক ঐতিহ্যময় কর্মকান্ডের।
১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের সময় শ্রীহট্ট পাকিস্তানের সাথে থাকবে না ভারতের সাথে থাকবে এই ইস্যু নিয়ে গণভোট রেফারেন্ডাম) অনুষ্ঠিত হয়। আজকের মতো সিলেটে কোথাও বড় হল বা অফিস করার মতো স্থান ছিল না। একমাত্র যে সারদা হল তাও ছিলফ রেফারেন্ডামের বিরোধী গ্রুপের হাতে। তাই রেফারেন্ডামের মূল অফিস তৎকালীন নেতা সৈয়দ আব্দুল মজিদ কাপ্তান মিয়া সাহেবের বাসায় থাকলেও বকতিয়ার বিবি বিদ্যালয়টি ছিলফ রেফারেন্ডামের দ্বিতীয় দপ্তর। স্থানীয় এবং জাতীয় নেতাদের পদচারণায় স্কুলফ প্রাঙ্গণ ছিল মুখর। এমনকি তৎকালনি আওয়ামী মুসলিম লীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি আব্দুর রশীদ তর্কবাগীশ তুখোর যুবনেতা শেখ মুজিব সহ স্কুলে থেকে রেফারেন্ডামের কাজকর্ম করেছেন।
১৯৭২ সালে পাকিস্থানী কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে বঙ্গবন্ধুর প্রথম সিলেট সফরের সময় হযরত শাহপরাণ (র.) মাজারে যাওয়ার পথে বখতিয়ার বিবি বালিকা বিদ্যালয়ের সামনে অনির্ধারিত যাত্রাবিরতি করে রেফারেন্ডমের সময়কার স্মৃতি রোমন্থন করে কিছুক্ষণ অতিবাহিত করেন এবং স্কুল ফান্ডে কিছু অনুদান দেন। বখতিয়ার বিবি বালিকা বিদ্যালয়টি এহেন ঐতিহ্য মন্ডিত। আমি নিজেও এই স্কুলের ৬০/৬২ বৎসর পূর্বের ছাত্র হিসাবে গর্ব অনুভব করি। তবে আমি প্রতিষ্ঠাতার সন্তান হিসাবে দ্বিতীয় শ্রেণী পর্যন্ত ক্লাস করার সুযোগ পেলেও শুধুমাত্র বালিকা বিদ্যালয় হওয়ার স্কুল খাতায় নাম ছিল না, শুধু ক্লাশ করা এবং পর্কীষা দেওয়ার মধ্যেই আমার ছাত্রত্ব সীমিত ছিল।
দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় প্রায় শতবর্ষী বিদ্যালয়টি এগিয়ে চলছে। মাঝখানে বিদ্যালয়টির ঐজ্বল্য কিছুটা ম্লান থাকলেও বর্তমানে যোগ্য প্রধান শিক্ষিকা এবং শিক্ষাব্রতী শিক্ষিকাদের নীবিড় তত্ত্বাবধানে স্কুলটির যথেষ্ট উন্নতি হয়েছে। পরীক্ষার রিজাল্ট অত্যন্ত ভালো যদিও স্কুলের প্রায় ৯০% ছাত্র ছাত্রী নি¤œবিত্ত (অভাব যাদের নিত্যসঙ্গী) একমাত্র শিক্ষক মন্ডলীর সুচারু তত্ত্বাবধানের কারণেই ভালো ফলাফল সম্ভব হয়েছে। গত বছর স্কুলফ মেনেজমেন্ট কমিটি জেলার শ্রেষ্ঠ কমিটি এবং বৃহত্তর সিলেটের ২য় শ্রেষ্ঠ কমিটি হিসাবে শিক্ষাবোর্ড কর্তৃক বিবেচিত হয়েছে।
আজ বাংলার নারী জাগরণের চূড়ান্ত উৎকর্ষের মাহেন্দ্রক্ষণে স্কুল প্রতিষ্ঠাতা ভ্রাতৃদ্বয়ের নারী শিক্ষার অবদানের কথা স্মরণ করা অত্যাবশ্যক। মহান আল্লাহ আমার আব্বা ও ছোট চাচার শিক্ষা ক্ষেত্রে অবদান কবুল করুন।
(কবি দেলওয়ারের কালজয়ী স্কুল সঙ্গীতের চরণ থেকে ক্যাপশনটা নেয়া)

আরও পড়ুন