কাব্যে মহানবী ও নিবেদিত কবিতা

প্রকাশিত : ২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯     আপডেট : ১ বছর আগে

সরওয়ার ফারুকী : যে গ্রন্থ মানবজাতির প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়েছিল এই বলেÑ‘যদি সক্ষম হও, তাহলে অনুরূপ একটি সুরা নিয়ে আসো’! সে গ্রন্থেই মহাবিশ্বের মালিক তাঁকে এঁকেছেন এভাবে “নিশ্চয়ই আপনি সুন্দরতম চরিত্রের উপর অধিষ্ঠিত!”
মহানবীর চরিত্র জানতে যারা গিয়েছিলেন আয়েশা (রা.)’র ঘরে, তাদের প্রতি মা আয়েশা প্রশ্ন ছুঁড়েছিলেন এই বলেÑ‘আপনারা কি কুরআন পড়েন নি? তিনিই তো জীবন্ত কুরআন।’
এক চাঁদনি রাতে মহানবীর পেছনে হাঁটছিলেন জাবির ইবনে সামুরা (রা.)। তিনি বলেন, ‘লাল বস্ত্রাচ্ছাদিত রাসুলের পেছন থেকে আমি একবার চাঁদের দিকে, আর একবার রাসুলের দিকে তাকাচ্ছিলাম। অবশেষে আমি সিদ্ধান্ত নিলাম, তিনি চাঁদের চেয়েও সুন্দর।’
সুন্দরতম ছুরত এবং সিরাতের চরমতম নিদর্শন মহানবী (স.)। তার প্রতি নিবেদিত আল্লাহর সাক্ষ্য, তার প্রেমে কোরবান অগণিত আদমের প্রাণ, তার গুণগানে মুখরিত জানা অজানা অসংখ্য কবি, সাহিত্যিক, দার্শনিকের কলম। আমরা তার খ-াংশের খবর পাই মাত্র, বৃহদাংশ রয়ে যায় অগোচরে।
শামসীর হারুনুর রশীদের ‘কাব্যে মহানবী ও নিবেদিত কবিতা’ সংকলন তারই সার্থক প্রয়াস, যেখানে নবী-প্রেমের অথৈ দরিয়া থেকে তিনি ধরে এনেছেন ক’বিন্দু প্রেমজারক!
৩৭৫ পৃষ্ঠায় বিস্তৃত ৩৬০ গ্রাম ওজনের বইয়ে অধ্যায় সংখ্যা সাত। আরবি কাব্যের প্রাকপর্ব থেকে সাহাবী-যুগ, মধ্যযুগ, আধুনিক যুগ ছুঁয়ে এ বই সুরমার বিধৌত পললে এসে ডেরা বেঁধেছে! আরবি সাহিত্যের ইতিহাস, ওকাজ মেলাকে কেন্দ্র করে আরবি কাব্যের যে কেন্দ্রায়ন, তারই স্থিরচিত্র প্রথম অধ্যায়। মহানবীর রক্তধারায় কাব্যচর্চার যে সুদীর্ঘ ইতিহাস তা নিমজ্জিত ছিল কেবলই প-িত-মননে, সাধারণ পাঠে কখনো তা গুরুত্ব পায়নি অথবা চারিত্রিক কাঠামোয় আসে নি। অধ্যায়ে ইসমাঈল-পুত্র আদনান থেকে নিযার, মুযার, ইল্য়াস হয়ে মহানবীর দাদা আবদুল মুত্তালিব পর্যন্ত ক্রমধারাÑযারা কবিতার ঘ্রাণ নিয়েছেন, দিয়েছেন। আবদুল মুত্তালিবের কাব্যপ্রেমের নিদর্শন পাওয়া যায় তার ওছিয়তনামায়, যেখানে সন্তানের উদ্দেশ্যে শোকগাঁথা পাঠের অসিয়ত করেন এবং মৃত্যুর পূর্বেই যেনো নিবেদিত শোকের আর্তনাদ শুনতে পারেন!
বেদুইন জীবনের রন্দ্রে রন্দ্রে কাব্যচর্চার যে অমিয় চরিত্রÑতা তাদের কাব্যপাঠের উন্মাদ চিত্রে পাওয়া যায়। আল ফারাবি বলেন, ‘কবিতার ভেতর সঙ্গীতের সুর মেশানো ছিল আরবদের প্রকৃতিগত গুণ’। ওমন যৌবনা কবিতা আর পাঠোন্মাদনা অপর কোনো জাতীর কাব্য-পাঠে পাওয়া দুষ্কর। ‘আবৃত্তির সময় তাদের শরীর নেচে ওঠে এক প্রকার শরীরজ সংগীত তৈরি করত, শ্রোতাকে মোহগ্রস্ত করে ফেলত।’ কিছু কবি আবৃত্তি-মঞ্চে অদ্ভুত সাজে ঢলোঢলো নাচতেন, যেনো বিয়ে বাড়ির আনন্দোৎসবে বাঁধহীন গাহন। কবিতার সাথে যৌবনের এমন স্ফুরণ আর কোন্ দেশে, কোন্ ভাষায় বিদ্যমানÑজানা নেই।
যে পাঁচটি যুগে বিভক্ত আরবি কবিতার শরীর, তার বিশদ পাঠ ছাড়াও দেড় হাজার বছর ধরে আরবি সাহিত্যের সমগ্র সত্তাকে নাড়িয়ে দেয়া আল-কোরআনের বিস্ময়কর বিচ্ছুরণ আলোচিত হয়েছে এ অধ্যায়ে। সাহিত্য চর্চায় মহানবীর উৎসাহ, ‘আনা নাবিউন লা কাজিব/আনা ইবনে আবদুল মুত্তালিব’Ñবলে কবিতাকে সত্যের সাক্ষ্য বানিয়ে মহানবী বলেনঃ ‘ভালো কথা যেমন সুন্দর, ভালো কবিতাও তেমনি সুন্দর, আর মন্দ কবিতা মন্দ কথার মতোই’Ñএ কথা বলে কবিতার মানদ- নির্ধারণ করে দেন তিনি।
প্রাক-ইসলাম যুগের সাতজন কবির কবিতা নিয়ে সাজানো দ্বিতীয় অধ্যায়। এসকল কবিতার আবেদন সময়ের সমান্তরাল। মহানবীর জ্যোতি দিকবিদিক ছুটোছুটি করবে, পূর্ববর্তী নবীদের সাক্ষ্য হয়ে তার বাণীসমূহ প্রতিষ্ঠিত হবে, অপরাধ-ভারে জর্জরিত জগতে তার আগমন যে অবশ্যম্ভাবী; কবিতায় সে বক্তব্য সুপ্রতিষ্ঠিত। ‘সে নবীর যুগ যদি পেতাম/সার্বিক সেবাকে গনিমত ভাবতাম’Ñইয়ারব বিন কাহতানের খেদোক্তি আমাদের সত্যিই ভাবিয়ে তোলে। ওয়ারাকা বিন নওফেলের কবিতাটি তাৎপর্যবাহী। কারণ, ওয়ারাকা জীবদ্দশায় নবুওয়াতের খবর পেয়েছিলেন এবং নবুওতি জিন্দেগীতে মহানবী যে মহা-প্রতিরোধের মুখোমুখি হচ্ছেন, তারও বার্তা দিয়েছিলেন। ওয়ারাকা তার কবিতায় নবী-আগমনের শুভেচ্ছা পাঠিয়েছেন, ফেতনা ফাসাদে নিমজ্জিত মানবতার মুক্তির আশা জানিয়েছেন, তার প্রতি ঈমানের অগ্রিম খবর দিয়েছেন। প্রাক-ইসলামী যুগের কবিতা-সংকলন এ অধ্যায়ের আকর্ষণ বৃদ্ধি করেছে।
নিবেদিত কবিতার ‘সাহাবী-যুগ’ শুরু হয়েছে আব্বাস বিন আবদুল মুত্তালিবের কবিতার মাধ্যমে। ফরিদ উদ্দীন মাসউদ-এর কাব্যানুবাদেÑ
‘একদা তাঁর অবস্থান ছিল ছায়া-সুনিবিড়/ ঘন সুরক্ষিত আবাসে/ সেখানে পাতা ঝরার মর্মরধ্বনি। / পরে/ আরও পরে নেমে এলেন জনপদে…’
আবু বকর সিদ্দিক-এর কবিতায় আছে মশহুর ঘটনার সুস্পষ্ট ইঙ্গিত। হিজরতের সময় বিখ্যাত ‘সূর’ গুহায় তার নবী-সঙ্গ, অকুতোভয় সেদিনের অবস্থান তার, এসবের খবর দিয়েছেন ‘আশ্বাস’ শিরোনামের কবিতায়। এ অধ্যায়ের ১৩টি কবিতার কাব্যানুবাদ করেছেন যথাক্রমে ফরিদ উদ্দীন মাসউদ, আবদুস সাত্তার, আসাদ বিন হাফিজ ও আখতার ফারুক। কাব বিন যুহায়ের-এর সুদীর্ঘ কবিতা ‘বানাত সুয়াদ’। ছন্দে, অন্ত্যমিলে চমৎকার অনুবাদ আখতার ফারুকের। অনুবাদের দিক থেকে যেমন উত্তীর্ণ, তেমনি মৌলিক রস-নিষিক্ত নির্যাস। মহানবীর দরাজ বক্ষের বর্ণনা দিচ্ছেন কবি:
চিত্তে আশা ভিক্ষে পাব সেই সাগরের বিন্দু বারি/ হাজার পাপে অশেষ ভুলে পায় যে ক্ষমা নিত্য তারি।
আসহাবে রাসুলের জীবন-পাঠে আমরা বিস্ময়কর প্রেম, ভক্তি, অনুসরণ, অনুকরণের সন্ধান পাই। কাব বিন যুহায়েরের কবিতা তারই সাক্ষী।
মহানবীর শা’নে যেসকল কবিতা ভাষা এবং কালের দেয়াল ভেঙে মানুষের হৃদয় আন্দোলিত করেছে যুগ-যুগান্তরব্যাপী, চতুর্থ অধ্যায়ে সংকলিত হয়েছে এমন উনপঞ্চাশটি কবিতা। আধ্যাত্ম জগতের বিস্ময় বড়পির আবদুল কাদের জিলানি’র ‘ক্বাসিদায়ে গাওসিয়া’ অমর কাব্য, পর্বের শুরুতেই তার নাত। ৮১টি না’ত দ্বারা সজ্জিত বড়পিরের এ কাব্য ফারসি ভাষায় রচিত।
কাব্যানুবাদে বড়পিরকে পাচ্ছি এভাবেÑ
“আপনারই পরশে পৃথিবীর তুচ্ছ মানব/ মৌমাছিদের মত মধু আহরণে/ ধন্য করে তাদের মানব জীবন।”
জালাল উদ্দিন রুমি খ্যাতি অর্জন করেন ‘মসনবি’এর জন্যে। মসনবিÑমা’নুবী বা দুই পঙক্তি বিশিষ্ট এ কাব্য আধ্যাত্মিক বিজ্ঞানের আকর। ‘মসনবী’এর প্রশংসা এবং প্রয়োজনীয়তা বুঝাতে বলা হয়Ñ‘এটা যেনো ফারসি ভাষার কোরআন’! মসনবী থেকে সংকলক আব্দুস সাত্তারের অনুবাদে তুলে এনেছেনÑ
‘আহমদ নাম সে তো শীলাদৃঢ় দুর্গের মতন/ তার সে কঠিন সত্তা রক্ষাকারী, বিপদ যখন।’
বালাগাল উলা বি-কামালিহি/কাশাফাদ্দুজা বি-জামালিহি/হাসুনাৎ জামিয়ু খিসালিহি/সাল্লু আলায়হে ওআলিহি। চতুর্দশী এ পংক্তিমালা আমাদের দেশে শুনেন নি, এমন কেউ বিরল। বলা হয়, মানব-রচিত সবচেয়ে বেশি পঠিত পংক্তি হচ্ছে শেখ সা’দী রচিত এ চতুষ্পদী। আমাদের দেশে দরূদ হিসেবে প্রচলিত। ছন্দোবদ্ধ আরবী চতুস্পদীটি অসম্ভব জনপ্রিয় সর্বমহলে। জ্ঞানী-গুণী পীর-মাশায়েখের কাছে যেমন, তেমনি নারী-পুরুষ, শিক্ষিত-অশিক্ষিত সর্বসাধারণ কাছেও সমাদৃত। মাহফিলে ওয়ায়েজ যখন সুর দিয়ে পড়েন, তখন উপস্থিত ছোট-বড় সবাই তাঁর সঙ্গীত মাধুরিতে বিমোহিত হন। তাঁরাও সমস্বরে পাঠ করেন, অবলোকন করেন রাসূল প্রেমের আরশি, অমৃত সুধার আধার এই চতুস্পদীতে লুকিয়ে আছে আধ্যাত্মিকতার চরম কর্ষণ।
কী আছে এই চার লাইনে? এমন জনপ্রিয়তার রহস্য কোথায়? আলোচ্য দরাদ সম্পর্কে চমকপ্রদ তথ্য হলÑ শেখ সাদী এ চতুষ্পদীর প্রথম তিন লাইন লেখার পর চতুর্থ লাইন মেলাতে পারছিলেন না। দিন যায়, মাস পেরিয়ে বছর অতিক্রান্ত হয়, কিন্তু না। শেখ সাদী সন্তোষজনক একটি লাইনও পেতে ব্যর্থ হন। এক রাতে তিনি স্বপ্নে দেখেন আল্লাহর রাসুল বলছেন, ‘লিখো, সাল্লু আলায়হি ওয়া আলিহি’। স্বপ্নযোগে আদেশ পেয়ে সা’দী শেষ লাইনের অন্ত্যমিলে রাসুলের সাথে যৌথ হন! উম্মতের একজন কবির এর চেয়ে বড় সৌভাগ্য আর কী হতে পারে? এভাবেই রচিত হয় অসাধারণ এই না’ত। সাতশত বছর ধরে যা মানব হৃদয়ে মহাজাগতিক ঝংকার তুলছে, এশকের তুফান আনছে। আব্দুস সাত্তারের অনুবাদে সা’দীর চার অনুচ্ছেদের দীর্ঘ কবিতায় খোরাক আছে আধ্যাত্মবাদীদের জন্যে। ফরিদ উদ্দীন আত্তার, মুহাম্মদ শরফুদ্দিন, আকবর এলাহবাদী, হাফিজ, জামী, খৈয়ামসহ এ অধ্যায়ের প্রত্যেকেই বিশ্ব-সাহিত্যের অমর নাম।
জার্মান কবি গ্যাটে’র সুদীর্ঘ কবিতা বাংলা কাব্য- কৃষকের চোখ নতুনভাবে উন্মোচন করবে। সময়ের স্তুপে প্রায় চাপাপড়া এ কবিতার অনুবাদক হলেন আমাদের ভাষা ও সাহিত্যের অমর স্থপতি ডক্টর মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ।
৪৬ পৃষ্ঠাব্যাপী উনষাট জন নন্দিত কবির ছোঁয়ায় প্রস্ফুটিত গ্রন্থের পঞ্চম অধ্যায়। সময়কাল ‘মধ্যযুগ’। সকলেই বাংলা ভাষার কবি। সুর, ছন্দ এবং গঠনশৈলীতে এ অধ্যায়ের সমূহ কবিতা আলাদা এবং আবেগাশ্রিত। মধ্যযুগের সাহিত্যে উল্লেখযোগ্য সৃষ্টি পাওয়া না গেলেও মুসলিম কবি-মানস মহানবীর প্রশংসায় নির্মোহ ছিল না। অন্তরালের অনেক কবি এবং কবিতা খুঁজে বের করে আনা, মলাটবদ্ধ করতে পারা সংকলকের বড় সাফল্য, এ অধ্যায়ে শামসীর হারুনুর রশীদ সক্ষমতার সাথে তা করতে পেরেছেন।
শামসীর তার সংকলনে বিস্মৃত অনেক নামোদ্ধার, পাঠোদ্ধারের মাধ্যমে প্রাচীন সিলেটের নবী প্রেমের কাব্যচিত্র তুলে ধরেছেন।
সিলেটের কবি ও কবিতায় নবীপ্রেমের স্ফুরণ আবহমান, হাল আমলেও এর ব্যত্যয় হয় নি। আফজাল চৌধুরীর ‘হিজরত’, দিলওয়ারের ‘পাঠ করো হে মানুষ’, কালাম আজাদের ‘ঈদে মিলাদুন্নবী’, মুকুল চৌধুরীর ‘নবীজী সালাম তোমাকে’ সহ বহুসংখ্যক সার্থক কবিতা ওঠে এসেছে এক মলাটে।
নবীর প্রতি তরুণ সিলেটি কবিদের সালাম ও দুরাদের যে প্রাবল্য, তা যেন ঐতিহ্যের স্মারক। মুহিত চৌধুরীর ‘নবীর গান’, সৈয়দ মবনুর ‘দরাদে রাসুল স.’, সরওয়ার ফারুকীর ‘জ্যোতির প্রীতি’ ছাড়াও সংকলনের সবগুলো কবিতাই রূহের খোরাক।
শামসীর হারুনুর রশীদের ‘কাব্যে মহানবী ও নিবেদিত কবিতা’Ñসংকলনে প্রচেষ্টা নিখাদ, শৈলী বৈশিষ্টম-িত। বইয়ের কাল-চিত্র আপনাকে ঘুরিয়ে আনবে মোহগ্রস্ত মুসাফিরের মতো। ‘সাহিত্য রস প্রকাশনি’ বইটি প্রকাশ করে ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছে এবং বাণিজ্যের পাশাপাশি ক্বওমের প্রতি তাদের দায়িত্ববোধ প্রমাণ করেছে।
ছাপাখানার টুকটাক যা ভুল, তা লুৎফুর রহমান তোফায়েলের চমৎকার প্রচ্ছদ ঢেকে দিয়েছে। পরবর্তী সংস্করণে বাদবাকি শুধরে যাবে ইনশাআল্লাহ।

আরও পড়ুন

গোয়াইনঘাটে র‌্যালী ও আলোচনা সভা অনুষ্টিত

সিলেট এক্সপ্রেস ডেস্ক :- সারা...

ট্রাফিক সপ্তাহ বাড়ল ৩ দিন

সিলেট এক্সপ্রেস ডেস্ক :  চলমান ট্রাফিক...