কাব্যিক ঘ্রাণে সুশোভিত ‘মেঘরাখালের বাঁশি’

প্রকাশিত : ২০ জানুয়ারি, ২০১৯     আপডেট : ২ বছর আগে
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

নাসিম আহমদ লস্কর: কবিদের বোধের জগৎ আলাদা। তাঁদের চিন্তাভাবনা সমাজের সাধারণ লোকদের নিয়ে হলেও চিন্তাজগত সমাজের সাধারণ লোকদের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। চিন্তাভাবনা আর নতুন সৃষ্টির নেশা এ দুইয়ের মিথস্ক্রিয়ার ফলেই সৃষ্টি হয় এই অনন্য চিন্তাাজগতের, সৃষ্টি হয় নতুন নতুন কবিতার।
কবি মামুন সুলতান বাংলা সাহিত্যের একজন ধারক এবং সেই সাথে বাহকও বটে। তাঁর চিন্তার জগৎ জুড়ে রয়েছে সৃজনশীল ভাবনার নুড়ি আর নুড়ি। সদা হাসিখুশিময় এই কবি তাঁর ধারালো চিন্তাজগতটিকে বাঁচিয়ে রাখতে দীর্ঘদিন ধরে রচনা করে আসছেন কবিতা। এ পর্যন্ত তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ৪ টি। বইগুলো সিলেট অঞ্চলসহ সারা দেশের পাঠকসমাজে বেশ সাড়া জাগিয়েছ। এ বইটিতে কবি প্রথাগত ছন্দের চেয়ে গদ্যছন্দেই বেশ জোর দিয়েছেন। কবিতা হচ্ছে মনের ভাব প্রকাশের প্রধান হাতিয়ার। গদ্য ছন্দের পাশাপাশি তিনি অন্যান্য ছন্দেরও প্রয়োগ করেছেন তাঁর কবিতায়। আধুনিক বাংলা সাহিত্য হচ্ছে গদ্য ছন্দের স্বর্ণযুগ। এ বিষয়টিতে তিনি বেশ স্বাক্ষরতার ছাপ রেখেছেন। তাঁর প্রতিটি কবিতাই উল্লেখযোগ্য। তিনি ‘গ্রামের নাম দুর্দশা’ কবিতাটিই এতই বাস্তবতার নিরিখে লিখেছেন যে, এটি আলোচনা করতে গেলে পুরো একটি নিবন্ধ লিখতে হবে। পরবর্তী কোন এক নিবন্ধে কবিতাটি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করবো। লেখালেখির পাশাপাশি তিনি সাহিত্যের কাগজ ‘প্রাকৃত’-র সম্পাদক।
একুশে বইমেলা ২০১৮ তে সিলেটের প্রাকৃত প্রকাশ থেকে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর কাব্যগ্রন্থ ‘মেঘরাখালের বাঁশি’। ৬৪ পৃষ্ঠার এ বইটিতে স্থান পেয়েছে প্রেম, দ্রোহ, ভালোবাসা, দেশপ্রেম, সমাজ বাস্তবতা ইত্যাদি বিষয়ক নানা কবিতা।
উক্ত বইয়ের প্রথম কবিতা অসুরপুত্রে ফুটে উঠেছে এক চরম অপ্রিয় বাস্তবতা। মানুষ যদি কেবল আয়েশ করে দিনাতিপাত করতে থাকে তবে তা কখনো মঙ্গল বয়ে আনেনা। প্রতিটি মানুষই ব্যাক্তিগত জীবনে সুখের আকাঙ্খা করে থাকে। তাই বলে সুখের দিনে মানুষকে হেঁয়ালিপনায় কাটালে চলবে না। ভবিষ্যত অপ্রত্যাশিত নিকষ কালো বিপদের কথাও তাঁকে ভাবতে হবে। সবসময় সচেতন থাকতে হবে তাঁকে। ফলে, কোন বিপদ আসলে সে সহজেই তা সমাধান করতে পারবে। কবিতাটিতে কবি একইসাথে ব্যক্তিগত ও জাতীয় বিষয় ফুটিয়ে তুলেছেন। কবিতাটির শেষের দিকে কবি পাঠককে এই বার্তা দিতে চেয়েছেন যে, অসচেতনতার কারণে যেমন ব্যাক্তি ক্ষতিগ্রস্থ হতে পারে তেমনি রাষ্ট্রব্যবস্থাও ক্ষতিগ্রস্থ হতে পারে এবং উপদেশ দিয়েছেন সবসময় অপ্রত্যশিত বিষয় নিয়ে সচেতন থাকতে।
‘নিশিগন্ধা ঘ্রাণে মোহিত হয়ে
নিরাপদ নিদ্রায় যাপন করছো ঘুমকাতুরে রাত
তোমার সঞ্চিত সুখ এই রাতে বেহাত হতে পারে
তোমার জীবন এই ঘুম কেড়ে নিতে পারে
তোমার অসুরপুত্র।

সবাই বলে ভয় পেয়ো না
আমি বলি ভয়ে ভয়ে কাতর হও
……………………………………………
আমরা পরাধীন থাকতে থাকতে স্বাধীন হয়েছি
তাই স্বাধীনতার মানে আমরা বুঝি
স্বাধীনতা মানে আ্মার বুকের মানিক
আমার লালিত স্বপ্ন।’
ভেসে যাচ্ছে কবিতায় ফুটে উঠেছে এক জটিল বীভৎস ক্রান্তিকালের কথা। সেই সাথে ব্যক্ত হয়েছে প্রত্যাশার সুর। কবিতার প্রথমদিকে ফুটে উঠেছে নির্মমতার আর্তনাদ। নিজ জন্মভূমিতে জন্মভূমির সন্তান যখন খুন হয় তখন কবি জগতের চারদিকে করুণ অবস্থার প্রতিচ্ছবি দেখতে পান। নিজেকে প্রশ্ন করেন এই বিপথগামীরা কেন এমন জঘন্য কাজ করে? কোথায় লুকিয়ে আছে তাঁর সেই অপশক্তি। কবিতার শেষাংশে কবি তার পরম আকাঙ্খার কথা ফুটিয়ে তুলেছেন। তিনি আবার এই বাংলায় চিরচেনা ভাওয়ালি গান শুনতে চান। তিনি ফিরে পেতে চান তার সেই চির পরিচিত লাবণ্যময় বাংলা। কবি এখানে গণমানুষের প্রতিনিধিত্ব করেছেন।
‘গতির গলিপথে গলিত লাশের মিছিল
…….নিজভূমে নিহত হয় নিরীহ মানুষ।
তবু জনতার ঝুলন্ত জিহ্বায় করাত করাত ধ্বনি-
কিছু নহে বলে সাহসের কথা শুনি।
………………………………………………………
গলিত লাশের গন্ধ গোলাপবাগে আর গোলাপ ফোটে না।
……….জোয়ারে ভাসেনা স্বপ্নের সাম্পান।
ভোরের হাওয়ায় কবে শুনবো ভাওয়লি সুর।
নতুন ভোর কবে আসবে নদীমাতৃক বাঙলায়?
………………………………………………
যেতে যেতে আর কি ফিরে আসবে প্রিয় বাংলার লাবণ্যময় শান্ত সু›্দর।
মানবজীবনে কখনো তৃপ্তি আসেনা। মানবমন চির অতৃপ্ত। জানার শেষ নেই; দেখার শেষ নেই। এ সত্যের ধারক ও বাহক মানবমন। অতৃপ্তি কবিতায় ফুটে উঠেছে সেই অতৃপ্তময়তা।
‘পৃথিবীর ছবিগুলো চোখের এ্যালবামে ঠাসা
প্রতিদিন দেখা হয় প্রতিদিন দেখি
হবে না কখনো শেষ দেখবো চিরকাল
………সৃষ্টির সকল চোখ এক হয়ে গেলে
তারপরও থেকে যাবে দৃশ্যের অনেক।’
প্রতিটি মানুষ তার প্রিয় মানুষটিকে অনন্য, অদ্বিতীয় নামে ডাকতে চায়্, কাছে পেতে চায় তার মনের মানুষটিকে একান্ত নির্জনে। প্রিয় নাম দিয়ে প্রিয় মানুষটির কাছে প্রিয় বার্তা দিতে চায়্। ভালোবাসার এ অনুরাগের কথা কবি ফুটিয়ে তুলেছেন ‘চলো সেই নামে ডাকি’ কবিতায়।
‘যে নাম চন্দ্রিমা রাতে ঝলমল করবে তারা ভরা আকাশে
স্ফুলিঙ্গ ছড়িয়ে পড়বে নক্ষত্র নীহারিকায়
ধুমকেতু উপড়ে পড়বে নতুন উদ্যমে
চলো সেই নামে ডাকি।

যে নাম কেবল তোমার জন্য
তুমিই কেবল ছড়িয়ে পড়বে ওই নামে
চলো সেই নামে ডাকি।’
প্রতিটি মানুষ চায় উন্নত সমৃদ্ধ জীবন গঠন করতে। সাহস আর দৃঢ় মনোবল থাকলে মানুষ তাঁর আপন লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারে। কেউ যদি অপ্রত্যাশিত দুঃখ থেকে আপন মনোবল নিয়ে ঘুরে দাঁড়াতে পারে তবে সুখ একসময় তার অতি কাছে চলে আসে। ‘এগিয়ে চলো’ কবিতায় কবি পাঠককে ঘুরে দাঁড়ানোর পন্থা শিখিয়ে দিয়েছেন।
‘চিতার আগুনে আর দগ্ধ করো না নিজেকে
তুষের গুপ্ত আগুন জ্বেলো না মনে
…………..বরং সব স্বপ্নকে রুমালে বেঁধে মরুপথে হেঁটে চলো।
হয়তো উটের উলান থেকে ঝরে পড়বে
হাজারো জমজম ধারা………….’
সমাজের প্রতিটি সদস্য নির্দিষ্ট বৃত্তের মধ্যে আবদ্ধ। চাইলেই সে বৃত্ত ভাঙ্গা যায়না। প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থা অনেক সময় ঐতিহ্যের পুজো করতে গিয়ে সত্য ও সুন্দরের পথকে বাঁধাগ্রস্থ করে। যার কারণে গণমানব অনেক সময় অব্যক্ত কষ্ট নিযে সমাজে বাস করে। এ বিষয়টি কবি অত্যন্ত সুনিপুণভাবে ‘নীলমানুষ’ কবিতায় চিত্রিত করেছেন।
‘জীবন লগ্নি রেখে অর্থহীন স্বাধীন ভেবে
পরাধীন হয়ে আছি। বৃত্তের বাইরে গেলে
তর্জনী উঁচু করে খামুশ বলে ধমক দেয়।
……………………………………..
শেকলে বাঁধা আছি
অথচ সেই শেকল কেউ স্বীকার করে না।’
সমসাময়িক বিশ্বে মানুষের পরম আরাধ্য ধন হচ্ছে শান্তি। বর্তমান বিশ্বের আনাচে কানাচে জায়গায় বিরাজ করছে দাঙ্গা, হাঙ্গামা, যুদ্ধ। এসব দানবীয় বীভৎস বিষয়গুলো কবিকে চরমভাবে আহত করেছে। তিনি চান শান্তি আর শান্তি যা ফুটে উঠেছে তাঁর রচিত ‘শান্তিপত্র চাই’ কবিতায়।
‘বনে বনে গুপ্তশিয়ালের মরণ ফাঁদে
হরিণির চকিত দৌড় দেখি
মানুষের মনে তাড়া করে গোপন ভয়্।
সুপ্রিয় শান্তির প্রতীক্ষায় আর্য-অনার্য কবির মতো
আমিও প্রহর গুনছি
মানবিক দৈন্যদশা আমাকে খাচ্ছে কুড়েকুড়ে।’
দেশমাতৃকার প্রতি প্রতিটি মানুষের থাকে নাড়ির টান। নিজের দেশের পতাকা হাতে নিলে মানুষ খুঁজে পায় আপন বল। ফুলে ফুলে যখন শহীদ মিনার ভরে উঠে তখন মানুষের বুক গর্বে ফুলে উঠে। দেশের জন্য মানুষ নিজের জীবন উৎসর্গ করতে পায় অণুপ্রেরণা। দেশপ্রেমিক কবি সেই সত্যটা তুলে ধরেছেন ‘গর্বে আমার বুক ভরে যায়’ কবিতায়।
‘বিজয় আমার বিজয় তোমার জানিয়ে দিলাম বিশ্বময়
গর্বে আমার বুক ভরে যায় পেয়ে এমন অবাক জয়
একশ নদীর সমান জলে রক্ত দিলেন আমার ভাই
সেই সে রক্তে উড়ছে দ্যাখো লাল সবুজের সেই বড়াই।’
মানুষ যখন তাঁর আপনজনকে হারিয়ে ফেলে তখন সে জীবনের গতি হারিয়ে ফেলে। মানুষ হারিয়ে ফেলে তাঁর অণুপ্রেরণার উৎস। ঠিক একইভাবে মানুষ তাঁর অধিকার আদায়ে ব্যর্থ হলে হারিয়ে ফেলে জীবনের দিশা। মানবজীবনের এই হতাশাব্যঞ্জক দিকটি ফুটে উঠেছে তাঁর ‘অর্কেস্ট্রা’ কবিতায়।
‘নেমেছি পথের খোঁজে
মেঘের সওয়ারি হয়ে ঘুরি পাহাড়ে পাহাড়ে
ঝর্ণার কলকলে রাখি সুরের অর্কেস্ট্রা
…………………………………………
তোমাকে আকাশ ভেবে ভুল করেছি প্রিয়া
তুমিও আকাশ নও কেবল নীলাম্বরী দুঃখ
পাই নি প্রেমের পরশ তাই পথের পরশে নেমেছি আজ।’
‘মেঘরাখালের বাঁশি’ কবিতাটি হচ্ছে কাব্যগ্রন্থটির নাম কবিতা। কবিতাটিতে মূলত ফুটে উঠেছে মানবজীবনের রঙিন স্বপ্নের কথা। স্বপ্নই মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে; নতুন স্বপ্ন দেখায়। কবিও স্বপ্ন দেখেন। স্বপ্নচারী কবি প্রতিনিয়ত স্বপ্ন দেখেই প্রেম শিখেন আর সেই প্রেমকে বাঁচিয়ে রাখেন কবিতার দেহাবয়বে।
‘আমার আছে মধুমতি মেঘরাখালের বাঁশি
ঐ যে দূরের নিবিড় পাহাড় ডাকছে তাদের মাসি।

আমার আকাশ আমার পাহাড় যায় না চোখে দেখা
মনের ভেতর একটা সাগর তার কাছে প্রেম শেখা।’

বইটি পাঠ করে আমার মনে হয়েছে বইটি বাংলা সাহিত্যের অনন্য সম্পদ। কবির শৈল্পিক চিন্তাভাবনা বইটিকে কাব্যরসে পূর্ণ করে তুলেছে। আমার বিশ্বাস কবি বাংলা সাহিত্য নিয়ে বহুদূর যেতে পারবেন। তিনি আরো বেশি বেশি কবিতা পাঠক সমাজকে উপহার দিবেন এবং বাংলা সাহিত্যে কালজয়ী হয়ে থাকবেন। আমি বইটির পাঠক প্রিয়তা কামনা করছি।
লেখক: নাসিম আহমদ লস্কর
শিক্ষার্থী; বিবিএ প্রোগ্রাম
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট।


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আরও পড়ুন

সিলেট অনলাইন প্রেসক্লাবের ইফতার মাহফিল সম্পন্ন

         সিলেট এক্সপ্রেস ডেস্ক: পবিত্র মাহে...

নিউইয়র্কে গণলুটপাটে মেয়রের ভুমিকায় ক্ষুব্দ গভর্নর কার্ফ্যু চলবে ৮জন পর্যন্ত

         এমদাদ চৌধুরী দীপু(নিউইয়র্ক) বিশ্বের রাজধানীখ্যাত...

নিসচা গণমানুষের জন্য কাজ করে যাচ্ছে –পীর মিসবাহ

         নিরাপদ সড়ক চাই নিসচা কেন্দ্রীয়...