করোনা মোকাবিলায় প্রস্তুতি নেই সিলেটে

প্রকাশিত : ২৬ জুন, ২০২০     আপডেট : ২ মাস আগে

ওয়েছ খছরু মহামারি করোনা নিয়ে নানা ভয় সিলেটে। এ ভাইরাস মোকাবিলায় প্রস্তুতি নেয়া হয়নি। সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে রয়েছে সমন্বয়হীনতার অভাব। কোনো পরামর্শ কিংবা সহযোগিতাও গ্রহণ করা হয়নি। রোগীদের চিকিৎসা ব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখতে সমন্বিত উদ্যোগ ছিল না। আক্রান্ত রোগীদের আইসোলেশনের ব্যাপারে বাস্তব পদক্ষেপও অদৃশ্যমান। এ কারণেই করোনা নিয়ে ভয়ে আছেন সিলেটের মানুষ। এজন্য করোনা মোকাবিলায় আগামীদিনের পথপরিক্রমায় অন্ধকার দেখছেন তারা।

ফলে ক্ষোভও বাড়ছে বিভিন্ন মহলে। প্রবাসী অধ্যুষিত এলাকা হওয়ার কারণে সিলেটের মানুষ শুরু থেকেই করোনা মহামারি নিয়ে সতর্ক ছিলেন। নিজেদের আইসোলেডেট রাখতে প্রবাসী স্বজনদের সঙ্গে রূঢ় আচরণ করেন মানুষ। অনেক প্রবাসী করোনা মহামারির শুরুতে নিজ এলাকা সিলেটে চলে এলেও আইসোলেটেড অবস্থায় আবার ফিরে গেছেন প্রবাসের কর্মস্থলে। আবার অনেকেই সংক্রমণ এড়াতে দেশেও আসেননি। করোনা টেনশনের শুরুতেই সিলেটে মারা যান পরিচিত ডা. মঈন উদ্দিন। তার মৃত্যু সিলেটকে নাড়া দিয়ে যায়। এরপর থেকে আরো সতর্কতা বাড়ে। করোনার প্রস্তুতি শুরু হয় সিলেটে। সিলেটের জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক, পেশাজীবীসহ নানা পথ ও মতের মানুষ নিজ থেকে আন্তরিকতা থাকলেও সিলেটের প্রশাসন ও স্বাস্থ্য বিভাগের উদ্যোগ ছিল অদৃশ্যমান। সিলেটে কোভিড চিকিৎসার জন্য পুরাতন হাসপাতাল শহীদ শামসুদ্দিনকে নির্বাচন করা হয়। এরপর রোগী ভর্তি করে হাসপাতালকে চিকিৎসার উপযোগী করা হয়। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. একে আব্দুল মোমেনের নির্দেশে ওই হাসপাতালে ১১টি আইসিইউ বেড স্থাপন করা হয়। অক্সিজেন সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়। এরপর থেকে চিকিৎসকরা রোগী নিয়ে এই হাসপাতালে করোনার সঙ্গে লড়াই করছেন। এতে করে চিকিৎসকরা অনেক সফলতা পেয়েছে। হাসপাতালের ভেতরে রোগী মৃত্যুর হার কম রাখা সম্ভব হয়েছে। ১১ই এপ্রিল সিলেটের জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জেলাকে লকডাউন ঘোষণা হলেও বাস্তবিক অর্থে সিলেটে গত ঈদ পর্যন্ত কোনো লকডাউন পালন হয়নি। যানবাহন ও মানুষজন চলাচল নিয়ন্ত্রিত ছিল না। এর মধ্যে ঈদে মার্কেটিংও হয়েছে। এই নিয়ে সিলেটের বিভিন্ন কর্ণার থেকে নেতৃস্থানীয়রা চিৎকার করলেও প্রশাসন কিংবা স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তাদের টনক নড়েনি। বরং সব হাল ছেড়ে দেয়া হয়েছিল। যার ফলস্বরূপ ঈদের পর থেকে সিলেটে করোনা রোগীর সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে যায়। এখন সংক্রমের হার ৩০ ভাগের উপরে। সিলেটের পুলিশ, র‌্যাব, ডাক্তার, নার্সসহ বিভিন্ন পেশার ফ্রন্টলাইনাররা সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েছেন। এই অবস্থায় সিলেটে প্রস্তাব ছিল ফের পুরোপুরি লকডাউনে যাওয়ার। কিন্তু সেই প্রস্তাব সিলেটের করোনা প্রতিরোধ সমন্বয় কমিটির পক্ষ থেকে গ্রহণ করা হয়নি। যুক্তি ছিল সরকারের ছুটি নেই। এ কারণে লকডাউন সম্ভব নয়। এরপর থেকে সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে যায়। সিলেটের যে শপিং কমপ্লেক্স ও মার্কেটগুলোতে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে ব্যবসা করা যাবে সেসব মার্কেট সবকিছু খুলে যাওয়ার পরও পুরোদমে চালু হয়নি। এখনো সেই অবস্থা বিরাজমান। করোনার সংক্রমণের আশঙ্কায় অনেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এখনো বন্ধ। কিন্তু যেসব মার্কেট কিংবা ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা সম্ভব নয় সেসব মার্কেট খোলে পুরোদমে। এতে করে ওইসব মার্কেটে ক্রেতাদের ছিল উপচেপড়া ভিড়। করোনা মোকাবিলায় সরকারি ভাবে সিলেটে ৫০০ শয্যার একটি বেসরকারি হাসপাতাল ভাড়া করার প্রস্তাব এসেছিল। নর্থইষ্ট মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে এ নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। নর্থইষ্ট ভাড়ার টাকা বেশি চাওয়ার কারণে শেষ পর্যন্ত সরকার সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে। এরপর গত ১৫ দিন ধরে সরকারের তরফ থেকে সিলেটের দক্ষিণ সুরমা ও খাদিমপাড়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে কোভিড চিকিৎসার জন্য প্রস্তুতি শুরু করে। কিন্তু এখন পর্যন্ত এ দুটি হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা শুরু হয়নি। আগামী শনিবার থেকে খাদিমপাড়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাসেবা শুরু হতে পারে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা। এ দুটি হাসপাতালে সেন্ট্রাল অক্সিজেন ব্যবস্থা চালু করতে প্রবাসীরা সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছেন। জেলা প্রশাসক কাজী ইমদাদুল ইসলাম সিলেটের করোনা পরিস্থিতির ভয়াবহতা অনুভব করে নগরীর আবুল মাল আবদুল মুহিত ক্রীড়া কমপ্লেক্সে ৫০০ শয্যার আইসোলেশন ব্যবস্থা চালু করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। প্রশাসনিক চ্যানেলে সেই প্রস্তাব তিনি ঢাকায়ও পাঠিয়েছেন। সিলেটের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী চেয়েছিলেন সিলেটের পুরাতন কারাগারকে আইসোলেশনের জন্য প্রস্তুত রাখতে। এ নিয়ে তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে পত্র দিয়েছিলেন। কোনো উত্তর মেলেনি। স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারাই বলছেন- সিলেটে এখন করোনার ‘পিক টাইম’ চলছে। গেলো এক সপ্তাহ ধরে প্রতিদিন গড়ে ১০০ জনের উপরে রোগী মিলছে। নমুনা সংগ্রহের অপ্রতুলতা রয়েছে। এরপরও সিলেটে নমুনা জট কাটছে না। প্রায় দুই হাজার সন্দেহভাজন মানুষের নমুনা ১০ দিন ধরে ফলাফলের অপেক্ষায় রয়েছে। নমুনা জট কমাতে সিলেটে খুব দ্রুত দুটি পিসিআর ল্যাব স্থাপনের অনুরোধ জানিয়ে বুধবার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে পত্র পাঠিয়েছেন সিলেটের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী। তিনি জানিয়েছেন- সিলেট থেকে অনেক প্রস্তাবনা ঢাকায় পাঠাচ্ছি। কিন্তু কোনো সাড়া পাচ্ছি না। সিলেটের প্রশাসনের কর্মকর্তাদের কাছ থেকে মিলছে না কোনো সদুত্তর। ফলে করোনা মোকাবিলা সিলেটে কীভাবে হবে কেউ জানে না। এ নিয়ে জনমনে কিছুটা শঙ্কাও বিরাজ করছে। এদিকে- সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. হিমাংশু লাল রায় জানিয়েছেন- অনেক আগেই তাদের তরফ থেকে ৫০০ শয্যার আইসোলেশন ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রস্তাবনা দেয়া হয়েছিল। এজন্য আবুল মাল আবদুল মুহিত ক্রীড়া কমপ্লেক্স নিয়ে দাবি ছিল সবার। কিন্তু এই প্রস্তাবে সাড়া মেলেনি। তিনি জানান, আমাদের প্রথম কাজ হচ্ছে করোনা আক্রান্ত রোগীকে আইসোলেটেড করা। যাতে তাদের দ্বারা আর কেউ সংক্রমিত না হয়। রোগীদের সমাজে কিংবা পরিবারের রেখে কোনোভাবে করোনা সংক্রমণ ঠেকানো সম্ভব হবে না। এ কারণে যা হওয়ার তাই হচ্ছে। সুধীজনেরাও সিলেটের প্রশাসন ও স্বাস্থ্য বিভাগের উপর ভরসা রাখতে পারছেন না। কোনো উদ্যোগই কাজে আসছে না। এতে শঙ্কিত তারা। বুধবার সিলেটের করোনা পরিস্থিতি জানিয়ে তারা প্রধানমন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপি দিয়েছেন। এদিকে- সিলেটের কোভিড চিকিৎসায় আইসিইউ ও অক্সিজেন সংকট চলছে। বেসরকারি হাসপাতালে আইসিইউ সাপোর্ট নিলে গুনতে হয় লাখ লাখ টাকা। এমনকি বেসরকারি হাসপাতালে ডাক্তারের পিপিই খরচও বহন করতে হয় রোগীদের। এতে দেখা গেছে, বেসরকারি হাসপাতালে কোভিড রোগীর চিকিৎসায় খরচ পড়ে লাখ টাকার উপরে। এজন্য সরকারি হাসপাতালই ভরসা। সিলেটের কোভিড চিকিৎসা কেন্দ্র শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. চয়ন রায় জানিয়েছেন- হাসপাতালে ১১টি আইসিইউ বেড রয়েছে। গতকাল সবকটি আইসিইউ বেড ছিল রোগী ভর্তি। এ অবস্থা গত কয়েক দিন ধরে চলছে বলে জানান তিনি। সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. জাহিদুল ইসলাম জানিয়েছেন- ‘আমরা রেড জোন তালিকা করে পাঠিয়েছি। এখন লকডাউন দিতে হলে পুরোটাই দিতে হবে। ভেঙে ভেঙে লকডাউন দিলে কোনো উদ্যোগই কাজে আসবে না। এছাড়া, জনপ্রতিনিধি, পেশাজীবী, ব্যবসায়ী, সমাজ সচেতন মানুষকে সম্পৃক্ত না করলে কোনো কাজে আসবে না সেই লকডাউন।’সুত্র মানবজমিন

আরও পড়ুন

বাদ পড়লেন নাহিদ

সিলেট এক্সপ্রেস ডেস্ক : শেখ হাসিনা...

মানুষের জীবন : এক মহা মূল্যবান আমানত

বায়েজীদ মাহমুদ ফয়সল: মানুষ তার...