করোনা ভাইরাসের সঙ্গে বসবাসের কৌশল শিখে নিতে হবে

প্রকাশিত : ১২ জুন, ২০২০     আপডেট : ৪ মাস আগে
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আব্দুল্লাহ আল আনসারী  বৈজ্ঞানীদের হাজার রকমের চেষ্টা সত্বেও করোনা সংকট সহসা নিরসন হচ্ছে না। ধারণা করা হয়েছে স্বাস্থ্যবিধি নিয়ম মানলে করোনা কাছে ঘেঁষতে পারবে না। সংক্রমণের শৃঙ্খল ভেঙে যাবে। কমবে মহামারির প্রকোপ। আর বিজ্ঞানীদের গবেষণা তো চলছেই। ওষুধ বা টিকা কিছু একটা বেরলে সহসা মিটবে পুরোপুরি তা ও আশা করা যাচ্ছে না।
মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়া করোনাভাইরাস বিশ্বজুড়ে আরও অন্তত দেড় থেকে দুই বছর সক্রিয় থাকতে পারে বলে ধারণা দিয়েছেন গবেষকরা। বিশ্বের মোট জনসংখ্যার দুই-তৃতীয়াংশের মধ্যে সংক্রমিত হয়ে ‘হার্ড ইমিউনিটি’ অর্জনের পরেই প্রাণঘাতী ভাইরাসটি অকার্যকর হতে শুরু করবে বলে উল্লেখ করেছেন তারা। আগের মহামারী-গুলো নিয়ে গবেষণার ওপর ভিত্তি করে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টার ফর ইনফেকশাস ডিজিজ অ্যান্ড রিসার্চ পলিসি (সিআইডিআরআইপি) নতুন করোনাভাইরাসের স্থায়িত্বকাল নিয়ে এ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনে যে তিনটি সম্ভাব্য পরিস্থিতির কথা বলা হয়েছে, তার কোনোটিতেই করোনাভাইরাস স্বল্প সময়ের মধ্যে ‘মুছে যেতে পারে’ এমন আশাবাদ মেলেনি।
জীবিকার তাগিতে অন্তসময় লকডাউন ও সম্ভব নহে। ফলে সংক্রমণের গ্রাফ ঊর্ধমুখী হওয়া সত্বেও লকডাইন করে ঘরে বসা সম্ভব নহে। এ পরিস্থিতিতে ডেঙ্গু,এইডসের মতো ধীরে ধীরে অদৃশ্য করোনা ভাইরাসের সঙ্গে বসবাসের কৌশল শিখে নিতে হবে।
জনস্বাস্থ্য বিশেজ্ঞদের মতে রোগ ঠেকানোর ৮০ শতাংশ চাবিকাঠি আছে হাত ধোওয়ার মধ্যে বিদ্যমান কিন্তু তার মানে এই নয় যে ঘণ্টায় ঘণ্টায় হাত ধুতে হবে। আপনি যদি এমন জায়গায় হাত দেন যেখানে জীবাণু থাকার আশঙ্কা আছে,যেমন গণপরিবহণে উঠলে, লিফটের বোতাম-দরজার হাতল বা সিঁড়ির রেলিং ধরলে,পাঁচ জন ব্যবহার করে এমন কিছুতে হাত দিলে,টাকা দেওয়া-নেওয়া করলে ইত্যাদি, সেই হাত নাকে-মুখে-চোখে বা অন্য কোথাও লাগার আগেই ভাল করে ধুয়ে নিতে হবে।হাত ধুতে হয় খাওয়ার আগে, টয়লেট থেকে এসে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে বাইরে বেরনোর সময় সঙ্গে ছোট একটা সাবান ও ৭০ শতাংশ অ্যালকোহল আছে এমন স্যানিটাইজার নিতে পারেন। কিছু টিস্যু পেপার বা পরিষ্কার রুমাল রাখতে পারেন। হাত ধোওয়ার সুযোগ থাকলে সর্বদা সাবান পানিতে হাত ধোওয়া উত্তম। না হলে স্যানিটাইজার ব্যবহার করতে পারেন। সাধারণ সাবান হলেই ভালো। অ্যান্টিব্যাক্টিরিয়াল সাবানের কোনও দরকার নেই। তার আলাদা কোনও ভূমিকা নেই। তা ছাড়া আপনার লড়াই তো ব্যাক্টিরিয়ার বিরুদ্ধে নয়, ভাইরাসের বিরুদ্ধে।
সাধারণ মানুষের গ্লাভস পরার দরকার নেই। নিয়ম মেনে না পরলে উল্টে বিপদের আশঙ্কা বেশি। তার চেয়ে হাত ধুয়ে নেওয়া অনেক নিরাপদ।
রাস্তায় বেরলে মাস্ক বাধ্যতামূলক। অফিসেও পরে থাকবেন। কাপড়ের ট্রিপল লেয়ার মাস্ক সবচেয়ে ভাল। তবে গরমে অসুবিধে হলে ডাবল লেয়ারই পরুন। বেশ বড় মাপের। নাকের উপর থেকে চিবুকের নীচ ও কান পর্যন্ত গালের পুরোটাই ঢাকা থাকতে হবে। আপনার ৬ ফুটের মধ্যে কেউ যেন মাস্ক ছাড়া আসতে না পারে,সে দিকে খেয়াল রাখবেন। বাড়ি ফিরে সাবান পানিতে মাস্ক ধুয়ে শুকিয়ে নিতে হবে। ৫টা মাস্ক রাখা দরকার । আলাদা করে রাখার জায়গা করতে হবে ,পর পর ৫ দিন আলাদা আলাদা মাস্ক পরে আবার ষষ্ঠ দিন আবার এক নম্বর মাস্ক দিয়ে শুরু করতে পারেন। বিশেষ্হদের মতে রোগ ঠেকানোর ২০ শতাংশ দায়িত্ব আছে মাস্কের উপর।মাস্ক পরছেন বলে মানুষের সঙ্গে দূরত্ব বজায় রাখবেন না, এমন যেন না হয়। ৬ ফুটের বেশি দূরত্ব রাখতে পারলে সবচেয়ে ভাল। নয়তো কম করে ৩ ফুট।
চোখে চশমা থাকলে আর কোনও সাবধানতা লাগবে না। না থাকলে রোদচশমা পরেন। কারণ চোখ দিয়েও কিন্তু জীবাণু ঢুকতে পারে।
বড় চুল হলে চুল ভাল করে বেঁধে স্কার্ফ বা ওড়নায় মাথা ঢেকে নেবেন।মাথায় ঢুপিও দিতে পারেন। কারণ গাড়ীতে খোলা চুল অন্যের নাকে-মুখে উড়ে লাগতে পারে। তাঁদের রোগ আছে কি না তা তো জানেন না। সেই চুল আপনার নাকে-মুখে লাগলে বিপদ হতে পারে। তা ছাড়া বড় চুলে রোজ শ্যাম্পুও করা যায় না। বিপদ বাড়ে তা থেকে।
নিয়মিত ধোওয়া যায় এমন স্যান্ডেল বা জুতো পরে বেরবেন।
মোবাইল রাখার জন্য মিনি পকেট লাখতে পারেন। গয়নাগাটি পরে বেরবেন না। কারণ ধাতুর উপর প্রায় পাঁচ দিন থেকে যেতে পারে জীবাণু। ঘড়ি পরারও দরকার নেই।অফিসে নিজস্ব কাপ রেখে দেবেন। সাবান-পানিতে ধুয়ে সেই কাপে চা বা কফি খাবেন।বাড়ি থেকে টিফিন নিয়ে যাবেন। নয়তো খোসা ছাড়িয়ে খেতে হয় এমন ফল খাবেন। প্যাকেটের বিস্কুট বা বাদাম খেতে পারেন মাঝে মধ্যে। প্যাকেট খুলে পরিষ্কার করে ধোওয়া পাত্রে ঢেলে তারপর হাত ধুয়ে খাবেন।
রাস্তার কিছু খাওয়া এ সময় ঠিক নয়। বড় রেস্তরাঁয় যদি সব নিয়ম মেনে খাবার বানানো হয়, এক-আধ বার খেতে পারেন। তবে সে সবও যত এড়িয়ে যেতে পারবেন তত ভাল। খাবার বাড়িতে এনে গরম করে খেলে অবশ্য অসুবিধে নেই।
জুতো বাইরে খুলে ঘরে ঢুকবেন। পাঁচ জোড়া জুতো থাকলে এক এক দিন এক একটা পরতে পারেন। ষষ্ঠ দিনে আবার প্রথম জোড়াটা পরবেন। কারণ ৫ দিন পর্যন্ত ভাইরাস লেগে থাকতে পারে জুতোয়। না থাকলে সাবান-পানিতে জুতো ধুয়ে তবে ঘরে ঢোকাতে পারবেন। এর পর বাথরুমে গিয়ে জামাকাপড়, চশমা সাবান-পানিতে ধুয়ে, তুলোয় স্যানিটাইজার ভিজিয়ে মোবাইল পরিষ্কার করে ভাল করে সাবান মেখে, শ্যাম্পু করে গোসল করবেন।
বাড়িতে কাজের লোক বা অন্য কেউ এলে ঘরে ঢোকার আগে হাত এবং পা ভাল করে সাবান পানিতে ধুয়ে নিতে হবে। ধোওয়া মাস্ক পরতে হবে। স্নান করে জামাকাপড় বদলে নিতে পারলে আরও ভাল।
খাওয়া দাওয়ার দিকে নজর দিতে হবে। বাহুল্য বর্জিত হালকা খাবারই ভাল এই সময়। ঘরে বানানো সাধারণ বাঙালি খাবার। ভাজা-মিষ্টি একটু কম খাওয়া ভাল। ফল খাবেন সুবিধেমতো। মাছ-মাংস-ডিম, যাঁর যেমন সুবিধে। প্রচুর পানি খাওয়ার কোনও দরকার নেই। শরীর যতটুকু চায় ততটুকু খেলেই হবে।
ভেষজ উপাদান খেতে ইচ্ছে হলে খাবেন। না খেলেও ক্ষতি নেই। কারণ আদা, ভিনিগার ইত্যাদিরা ভাইরাস মারতে পারে না। পুষ্টিকর সহজপাচ্য খাবার খেলে,অল্প ব্যায়াম করলে ও ভাল করে ঘুমোলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এমনিই ঠিক থাকবে।
গায়ে হালকা রোদ লাগানো খুবই দরকার। সকালের দিকে একটু মর্নিং ওয়াকে গেলে ব্যায়ামও হবে,রোদও লাগবে গায়ে। ভাইরাস বাতাসে ভেসে বেরায় না। কাজেই ভয় নেই। সময় থাকলে একটু বেলার দিকেও বেরতে পারেন। চড়া রোদ ঠেকাতে ছাতা নিয়ে নেবেন। এতে মানুষের সঙ্গে দূরত্ব বজায় রাখাও সহজ হবে।
যতটা সম্ভব স্বাভাবিক জীবনযাপন করুন। নিয়ম মানুন। অতিরিক্ত কিছু করার দরকার নেই। করে লাভও নেই। কারণ কিসে ভাইরাস মরবে,তা কেউ জানে না। কাজেই তার থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করাই বুদ্ধিমানের কাজ।
অবৈজ্ঞানিক কিছু কিছু ব্যাপার পরিহার করা উচিত। এই যে গরমের মধ্যে ঘণ্টায় ঘণ্টায় গরম জল খাওয়া,চা খাওয়া। এসবের কোন বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। ভাইরাসকে মারতে গেলে যে তাপমাত্রা হতে হবে,তাতে তো মানুষই মরে যাবে!
কেউ আবার রোদে দাঁড়িয়ে থাকছেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা। কারণ তাতে ভিটামিন ডি তৈরি হবে,করোনা পালাবে! ভিটামিন ডি দরকার। সব সময়েই দরকার। কিন্তু বাড়াবাড়ি করলে তো বিপদ। আসলে মানুষকে ভাল করে বোঝানো হচ্ছে না। স্রেফ বলে দেওয়া হচ্ছে এটা করো,ওটা করো। কেন করতে হবে,না করলে কী হবে তা না বুঝলে যা হয়। কেউ গুরুত্ব দিচ্ছেন না। কেউ বাড়াবাড়ি করছেন।
করোনার মতো মহামারির মোকাবিলা করতে হলে সমাজের সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে সমন্বয় গড়ে তুলতে হবে।স্বাস্থ্য শিক্ষা দিয়ে সর্বস্তরের মানুষকে প্রশিক্ষিত করে তুলতে হবে। সবাই যখন বুঝবেন এই পথে চললে ভাল হবে, তারা নিজেরাই ঠিকঠাক নিয়ম মানবেন, চাপিয়ে দিতে হবে না।

লেখক,আহবায়ক,বাংলাদেশ মেডিক্যাল টেকনোলজিষ্ট(ইপিআই) এসোসিয়েশন।
প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, বাংলাদেশ হেলথ এসিসষ্ট্যান্ট এসোসিয়েশন।
মোবাইল ০১৭১৩৮০০৫২২
ঠিকানাঃ মেডিক্যাল টেকনোলজিষ্ট(ইপিআই),খাদিমপাড়া ৩১ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতাল,সিলেট।


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আরও পড়ুন

অবতরণের সময় ‘চাকা ফাটল’ নভোএয়ার উড়োজাহাজের

         বাংলাদেশের বেসরকারি বিমান পরিবহন সংস্থা...

সিলেট মহানগর জাতীয় পার্টির সাংগঠনিক সভা অনুষ্ঠিত

         ২ নভেম্বর শনিবার ৪টায় সিলেট...