করোনার দিনরাত্রি

প্রকাশিত : ০২ এপ্রিল, ২০২০     আপডেট : ৬ মাস আগে
  • 18
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    18
    Shares

তাইসির মাহমুদ লন্ডন, যুক্তরাজ্য – বুধবার পয়লা এপ্রিল। লন্ডনে গৃহবন্দী জীবনের বারোতম দিবস অতিবাহিত করলাম। আর কতদিন এভাবে থাকতে হবে জানি না। এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ধাবমান হচ্ছি। কবে এই অবস্থার উত্তোরণ ঘটবে। কবে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসবো কিছুই জানি না। চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা বলছেন, সেপ্টেম্বর নাগাদ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে পারে। তার মানে আগামী ছয় মাস পর্যন্ত আমাদেরকে নিজ নিজ গৃহে বন্দী থাকতে হতে পারে।

জীবনে এই প্রথম একসাথে বারোদিন গৃহবন্দী থাকলাম। এ এক নতুন অভিজ্ঞতা। এখন রাত কখন শেষ হয়, দিন কখন আসে তা মনে থাকেনা। দিন, তারিখ, মাসও অনেক সময় ভুলে যাই। মনে হয় শুধু একটি সময় পার করছি। স্বাভাবিক জীবনে সপ্তাহের সোমবার থেকে শুক্রবার পাঁচটি দিন আমাদের একটি রুটিনের মধ্যে চলে। শনি ও রবিবার সাপ্তাহিক ছুটির দুদিনেও আমাদের একটি রুটিন থাকে। কোন দিন কী কাজ করবো তার একটি ছক থাকে। তাই দিন তারিখ জানার জন্য ক্যালেণ্ডার দেখতে হয় না। কিন্তু এখন সব দিনই যেন সমান। উইক ডে আর উইক এন্ড বলতে যেন কোনো কিছুই নেই। একটি সময় পার করছি। যার কোনো হিসাব নেই।

একসময় ভাবতাম ব্রিটেন একটি সুরক্ষিত দেশ। এখানে বহির্বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বন্যা, ঘুর্ণিঝড়, দুর্ভিক্ষ, মহামারী তেমন কোনো প্রভাব বিস্তার করতে পারবে না। কিন্তু এখন দেখলাম এরকম ধারণা একেবারেই অমুলক। একটি অদৃশ্য ভাইরাসের কাছে পুরো দেশ নাকাল। বিশ্বের মোড়ল দেশ ও দেশের সরকার প্রধানরা একেবারেই কাবু। কেউ কোনো হিসেব মেলাতে পারছেন না।

এখন সকালে ঘুম থেকে জেগে মোবাইল হাতে নিয়ে একটি সুসংবাদ দেখতে চাই। দেখতে চাই কেউ একজন ভিডিও বার্তায় বলছে, আর চিন্তার কোনো কারণ নেই। করোনার ভ্যাকসিন আবিস্কার হয়ে গেছে। বৃটেনের অবস্থা নিয়ন্ত্রনে চলে আসছে। আর ক’দিনের মধ্যেই আমরা স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসবো। কিন্তু এ ধরনের কোনো সংবাদ দেখতে পাইনা।

দেখতে পাই শুধু মৃত্যু সংবাদ। সারি সারি লাশ। নর্থ লন্ডনে করোনায় আক্রান্ত হয়ে এক বাংলাদেশী মারা গেছেন। পশ্চিম লন্ডনে মারা গেছেন আরো একজন। টাওয়ার হ্যামলেটসে মারা গেছেন দুইজন। অমুক অসুস্থ, অমুক হাসপাতালে, অমুকের অবস্থার অবনতি। আর সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসার সাথে সাথে চলে আসে আরো ভয়াবহ সংবাদ। করোনায় সারাদেশে একদিনে মারা গেছেন ৫৬৩ জন। আগের দিনের চেয়ে ১৮২জন বেশি। আক্রান্ত হয়েছেন ২৯ হাজারেরও বেশি । আগের দিনের চেয়ে সাড়ে ৪ হাজার বেশি। শুধুই হতাশা। চারদিকে হাহাকার।

তাই এখন আর বেশি সময় স্যোশাল মিডিয়ায় থাকতে মন চায় না। যা হওয়ার তো হবেই। দুঃসংবাগুলো আর দেখতে চাই না। তাই অধিকাংশ সময়ই মোবাইল অফ করে রাখি। অনেকেই ফোন করে খবর নেন। ভালো-মন্দ জানতে চান। আমিও স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, পরিচিতজনকে ফোন করি। চেষ্টা করি সকলের সাথে একবার হলেও কথা বলি। কিন্তু মন ভালো না থাকলে ফোনে কথা বলতেও ভালো লাগে না।

অনেকের সাথে কথা হয়েছে। আজ ফোন দিলাম বর্ষিয়ান সাংবাদিক-কলামিস্ট আব্দুল গাফফার চৌধুরীকে। ভাবলাম, বয়োবৃদ্ধ মানুষ একটা ফোন দেয়া উচিত। ফোন পেয়ে তিনি খুশিই হলেন। শরীর কেমন যাচ্ছে- জিজ্ঞেস করতেই বললেন, “করোনা হয়নি। ভালো আছি। জানতে চাইলাম, করোনা সম্পর্কে আপনার উপলব্ধি কী? বললেন, এটা কীভাবে উহান ছড়িয়েছে তা আমার গতকালের কলামে বিস্তারিত লিখেছি। বললাম অনেকেই তো বলেন, এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে এক ধরনের গজব। গাফফার ভাই বললেন, তাও হতে পারে। যেভাবে আমরা পাপ করছি। পাপে গোটা বিশ্ব সয়লাব হয়ে গেছে। আমাদের পাপের প্রায়শ্চিত্যও হতে পারে। বলেলেন, আমার ৮৪ বছর জীবনে এ ধরনের মহামারী কখনো দেখিনি। মানব সভ্যতার ইতিহাসে এটি সবচেয়ে বড় একটি অভিশাপ। করোনা থেকে বাঁচতে আমাদের কী করা উচিৎ-জানতে চাইলে বললেন, আমাদের ঘরে থাকতে হবে। সতর্ক থাকতে হবে। আর যে যে ধর্মে বিশ্বাস করেন সেই ধর্ম মতো সৃষ্টিকর্তার কাছে সাহায্য চাইতে হবে। বললাম, দোয়া রাখবেন। তিনিও বললেন, আমার জন্য দোয়া করবেন।

বিকেলে কথা হলো লন্ডন বাংলা প্রেস ক্লাবের প্রাক্তণ সভাপতি মোহাম্মদ নবাব উদ্দিন এর সাথে। তিনি ঘর থেকে অফিসের কাজ করছিলেন। আমার সাথে কথা বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়লেন। বললেন, ২৮ মার্চ ক্যামডেনে তাঁর এক চাচাতো বোন ইন্তেকাল করেছেন। তাঁর স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু জানাজায় যাওয়া তাঁর ভাগ্যে জুটেনি। ফরেস্টগেইট গোরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়েছে। গোরস্থান থেকে অগেই জানিয়ে দেয়া হয়, ১০ জনের বেশি সেখানে যাওয়া যাবে না। তাই বিপুল সংখ্যক আত্মীয় জনের মধ্য থেকে তাঁকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ১০ জনের তালিকা তৈরি করতে হয়। এই তালিকা করতে গিয়ে তাঁর চোখের জল গড়িয়ে পড়েছে। অন্যকে সুযোগ দিতে গিয়ে তিনি নিজেকে বঞ্চিত করেছেন। জীবনে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হবেন কোনোদিন কল্পানাও করতে পারেন নি।

একটি কথা বলে আজকের ‘করোনার দিনরাত্রি’ শেষ করতে চাই। আগামীকাল এই ডায়েরী লিখতে পারবোনা কি-না জানি না। এখন একটি দিন, একটি ঘণ্টা বেঁচে থাকা আমার আমাদের জন্য সৃষ্টিকর্তার অনেক বড় কৃপা। এজন্য আল্লাহ তায়ালার কৃতজ্ঞতা প্রকাশের ভাষা নেই। তিনি একদিন কিংবা এক ঘণ্টার জন্য হলেও আমাদেরকে জীবিত রেখেছেন। আর জীবিত আছি বলেই বলতে পারি আল-হামদুলিল্লাহ। সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ তায়ালার জন্য। আমাদের পরিচিত অনেকেই ইতোমধ্যে মহান প্রতিপালকের ডাকে সাড়া দিয়ে চলে গেছেন। তারা কিন্তু আর সেই সুযোগটি কখনো পাবেন না।


  • 18
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    18
    Shares

আরও পড়ুন

মেট্রোপলিটন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা তৈরী করলো ইলেকট্রিক হুইল-চেয়ার

         সিলেট এক্সপ্রেস ডেস্ক:  মেট্রোপলিটন বিশ্ববিদ্যালয়ের...

লিডিং ইউনিভার্সিটির সিন্ডিকেট সভা অনুষ্ঠিত

         সিলেট এক্সপ্রেস ডেস্ক : লিডিং ইউনিভার্সিটির...

রোটারি’র সহায়তায় অটিজম সেন্টার প্রতিষ্ঠা উপলক্ষে মতবিনিময় সভা

         রোটারি আন্তর্জাতিক জেলা ৩২৮২-এর ডিষ্ট্রিক্ট...

পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নানকে হাওর উন্নয়ন পরিষদের সংবর্ধনা

         সিলেট এক্সপ্রেস ডেস্ক: সুনামগঞ্জ-৩ আসনের...