করোনার দিনরাত্রি: প্রাণহীন টাওয়ার হ্যামলেটসে রুদ্ধশ্বাস তিনঘণ্টা

প্রকাশিত : ১৮ এপ্রিল, ২০২০     আপডেট : ২ মাস আগে  
  

তাইসির মাহমুদ দুপুরে কম্পিউটার ডেস্কে বসে কিছু একটা লিখছিলাম। হঠাৎ স্ত্রী পাশে এসে ক্ষিণস্বরে বললেন, “কিছু মাছ মাংস কাঁচা-বাজার দরকার, আশে পাশে কোথাও..”। আমি তাঁকে কথা শেষ করতে না দিয়ে বললাম আশে পাশে ভালো পাওয়া যাবে না। টাওয়ার হ্যামলেটসেই ভালো হবে । বললেন, যেতে পারো । তবে টাওয়ার হ্যামলেটসে গেলে তো তাড়াতাড়ি ফেরা হয় না । তাড়াতাড়ি চলে এসো।

আসলে আশেপাশে অনেক গ্রোসারী শপ আছে। মাছ মাংস সবই আছে। ভালো কাঁচাবাজারের দোহাই দেয়ার মুল মতলব একবার টাওয়ার হ্যামলেটস ঘুরে আসার সুযোগ নেয়া । গৃহকর্ত্রীর কাছ থেকে ছুটি পেয়ে মনটি বেশ প্রফুল্ল হয়ে ওঠলো।

দীর্ঘদিন ধরে টাওয়ার হ্যামলেটস যাওয়া হয়নি। যে টাওয়ার হ্যামলেটসে প্রতিদিন একবার তো বটেই; উপরন্ত দুইবারও যাওয়া হয় । সেখানে আজ প্রায় চার সপ্তাহ। মন কাঁদছে প্রিয় টাওয়ার হ্যামলেটসের জন্য।

সোয়া ৫টার দিকে ঘর থেকে বেরুলাম। অবশ্য এর আগে যথারীতি অজু সেরে দোয়া-কালাম পড়ে বাচ্চাদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে নিলাম । এ থার্টিন, ইস্ট ইন্ডিয়া ডক রোড, বার্ডেট রোড হয়ে মাইল এন্ড। উদ্দেশ্য রহিম বাদ্রার্স থেকে মাছ মাংস কিনে নেয়া। গাড়ি থেকে নেমে রহিম বাদার্সে পৌঁছতেই দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা একজন বললেন “উই আর ক্লোজড”। বললাম আপনারা তো রাত ৯ টার আগে বন্ধ করেন না । বললেন- নো ভাইয়া, টাইম হ্যাজ চেইঞ্জড। আমরা এখন ৬টায় বন্ধ করে দিই।

তাঁর সাথে কথা না বাড়িয়ে ক্যাম্ব্রিজ হিথ রোড ধরে বেথনাল গ্রীন পৌঁছলাম। সেখানে দুটো গ্রোসারী শপ আছে । একটি ‘হাটবাজার’, অন্যটি ‘লাইম হাউস স্টোর’ । ড্রাইভ করে খানিক এগিয়ে দেখলাম ‘হাটবাজার’ বন্ধ । দোকানের সামনে মানুষ দুরে থাক, কাক-পক্ষিও নেই।

একটু সামনে এগিয়ে লাইম হাউস গ্রোসারী শপ। সেখানে পৌঁছে দেখি দোকান মালিক সাটার টানছেন । আমকে দেখে বললেন, বাংলা টাউন বোধহয় খোলা আছে। ওখানে পাবেন । দেরি না করে বাংলা টাউন অভিমুখে ড্রাইভ করলাম। ভ্যালেন্স রোড হয়ে বঙ্গবীর ওসমানী সেন্টারের পাশ দিয়ে পৌছলাম বাংলা টাউনে । ভেতরে ঢুকতেই কাউন্টার থেকে একজন বললেন, ভাইয়া কিছু কিনবেন? তাড়াতাড়ি করেন। আমরা বন্ধ করে দেবো।

আমি দৌড়ের ওপর কিছু মাছ মাংস অর্ডার করে সেগুলো কেটে রেডি করতে বললাম । ভেজিটেবল সেকশনে গিয়ে কিছু শাক-শবজি, কাঁচা মরিছ, ধনিয়া ব্যাগে ভরলাম । কাউন্টারে এসে খুব দ্রুত দাম পরিশোধ করে বেরিয়ে এলাম।

আশা ছিলো, বাংলা টাউনের ডাইরেক্টর রফিক হায়দার ভাইকে অন্তত কাউন্টারে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখবো । তাঁর সাথে কিছুক্ষণ কমিউনিটির এটা-সেটা নিয়ে ‘খাজুরী’ (খোশগল্প) কথা হবে । কিন্তু তাঁকে না পেয়ে ভালো লাগলো না ।

গাড়িতে ফিরে ভাবলাম এবার কোথায় যাওয়া যায়? বাজার তো কেনা হলো । গিন্নী আপাতত ম্যানেজড । তাহলে চিরচেনা ব্রিকলেন, হোয়ইটচ্যাপেল একনজর গাড়ি থেকে ঘুরে দেখা যাক।

সেখান থেকে হ্যানবারী স্ট্রিট, স্পেলম্যান স্ট্রিট হয়ে ব্রিকলেন উঠলাম । আস্তে আস্তে ড্রাইভ করছি আর দুপাশের দোকানপাট দেখছি। শুধু জামান ব্রাদার্স গ্রোসারী শপ খোলা । আর সবই বন্ধ। দু’একজন বিচ্ছিন্নভাবে হাঁটছেন। মনে হচ্ছে যেন বাংলাদেশের হরতালের দৃশ্য দেখছি ।

ব্রিকলেন জামে মসজিদের দরজায় তালা ঝুলছে । ধারে কাছে কোনো মানুষের ছিটেফুটো নেই । তাজ স্টোরের সাটার লাগোনো। প্রেম-প্রীতি রেস্টুরেন্টের সামনে আজমাল ভাইয়ের সেই চিরায়ত উপস্থিতি দারুনভাবে মিস করলাম । ফাঁকা রাস্তায় আস্তে আস্তে ড্রাইভ করে হ্যানবারী স্ট্রিট, গ্রেটোরেক্স স্ট্রিট, অল্ড মন্টুগে স্ট্রিট হয়ে হোয়াইটচ্যাপেল পৌঁছলাম।

সামনে সাক্ষাৎ দাঁড়িয়ে আছে ইস্ট লন্ডন মসজিদ। মসজিদের সামনে গাড়ি দাঁড় করালাম । বায়ে বারাকা রেস্টুরেন্ট ও ক্যাফে কাসাব্লাংকা । সব দোকানের সাটার লাগানো । গাড়ি থেকে নেমে ইস্ট লন্ডন মসজিদের পেছন দিকে ফিল্ডগেট স্ট্রিটে গেলাম। বিশাল মসজিদের চারদিক নীরব নিস্তব্ধ। কঠিন শুন্যতা বিরাজ করছে চারদিকে ।

এ যেন অন্যরকম এক হোয়াইটচ্যাপেল । বৃটেনে ব্রিটনে বড়দিনের ছুটিতে সবকিছু বন্ধ থাকলেও রেস্টুরেন্ট খোলা থাকে। মানুষের আনা গোনা থাকে। বারাকা রেস্টুরেন্ট কিংবা ক্যাফে কাসাব্লাংকায় দু’চারজন পরিচিত বন্ধু-বান্ধব, সাংবাদিকের দর্শন মেলে।। কেউ বসে চা খান, কেউ গল্পগুজবে ডুবে থকেন । কেউবা রেস্টুরেন্টের সামনে দাঁড়িয়ে সিগারেটে ধোয়া উড়ান। কিন্তু আজ সেখানে কেউ নেই। মনে হচ্ছে অনির্দিষ্টকালের জন্য লাগাতার হরতাল চলছে।

দু’চারজন অপরিচিত বাংলাদেশীর দেখা পেলাম। তবে কোনো আড্ডা বা খোশগল্পে নয় । দুই মিটারের স্থলে চার মিটার দুরত্ব রেখে সমান্তরাল গতিতে তারা হাঁটছেন। হাঁটছেন দ্রুপ পায়ে । দেখে মনে হচ্ছে কেউ যেন পেছন থেকে ধাওয়া করছে। সকলের মুখে মাস্ক। হাতে গ্লাবস। তাই পরিচিত না অপরিচিত তাও টাওর করা মুশকিল।

এমন নিস্তব্ধ নীরবতা দেখে মনের মধ্যে কিছুটা ভীতি চলে এলো । গাড়িতে ওঠে ইঞ্জিন স্টার্ট দিয়ে রওয়ানা দিলাম । হঠাৎ মনে হলো বেগম সাহেবা আসার সময় আরো দুটো কাজ হাতে ধরিয়ে দিয়েছেন। একটা ক্যাবল স্ট্রিটে তাঁর বড় বোনের ঘরে একগুচ্ছ ফুলের চারা ও এক ব্যাগ গার্ডেনিং মাটি দিয়ে আসতে হবে । আর বার্ডেট রোডে (শুশুড় বাড়ি) থেকে চুল কাটার মেশিন আনতে হবে। কারণ জিবরিল ও মিকাইলের চুলের অবস্থা এমন হয়েছে যে, দেখতে ছাওয়াল পীর ছাওয়াল পীর মনে হয়।

হোয়াইটচ্যাপেল থেকে রওয়ানা দিয়ে নিউরোড ও ক্যানন স্ট্রিট হয়ে ক্যাবল স্ট্রিটের সিয়ার্স্মিথ হাউসের নিচে পৌঁছে ফোন দিলাম আপাকে (স্ত্রীর বোন) । বললেন, আপনার ভাই নিচে আসছেন । মিনিট পাঁচেকের মধ্যে ভায়রা মোঃ হেলাল উদ্দিন নিচে নেমে এলেন। গাড়ি থেকে ফুলের চারা আর মাটির ব্যাগ নামিয়ে দিয়ে দুর থেকে খানিক কুশল বিনিময় হলো। বিদায় নেবো এমন সময় বললেন, “ঘরে তো বোধ হয় আসবেন না। রসিকতা করে বলালাম, ঘরে আসবোনা মানে? আপনি তো আসতে বললেনই না।

এবার ফিরতি পথে গন্তব্য বার্টেড রোডে শুশুরালয় । চুলকাটার মেশিন আনবো আর শশুর শাশুড়িকে একনজর দেখে আসবো। দরজায় কড়া নাড়লে শাশুড়ি বেরিয়ে এলেন । শুশুরও এসে দরজার দাঁড়ালেন । যতই করোনা আতংক হোক দামান্দ বলে কথা, তাই শাশুড়ি ভেতরে যেতে বললেন । বললাম ভেতরে আসছি না। টাওয়ার হ্যামলেটস এসেছিলাম। ভাবলাম আপনাদের দেখে যাই। সামাজিক দুরত্ব বজায় রেখে মিনিট দুয়েক দরজার সামনে দাঁড়িয়ে কুশল বিনিময় শেষে চুল কাটার মেশিনটি নিয়ে ডেগেনহ্যাম অভিমুখে রওয়ানা দিলাম।

বাড়ি অভিমুখে গাড়ি ড্রাইভ করছি। মনটি খুবই ভীষন্ন। আশা ছিলো অনেকের সাথেই দেখা হবে। কিন্তু কী দেখলাম চিরচেনা টাওয়ার হ্যামলেটসে। যেখানে লক্ষাধিক বাঙালির বসবাস। গাড়ি পার্ক করে রাস্তায় বেরুলেই ওমুক তমুক। কেমন আছেন ভাই? চলতে ফিরতে কত মানুষের সাথে দেখা সাক্ষাৎ। সেখানে একজনও পরিচিত মানুষের দেখা পেলাম না। আত্মীয় স্বজন, বন্ধু-বান্ধব সাংবাদিক সহকর্মী, অধিকাংশই টাওয়ার হ্যামলেসের বাসিন্দা। রাস্তায় বেরুলেই কাউকে না কাউকে দেখা যায়। কিন্তু সেখানে আজ কেউ নেই।

বিশেষ করে ইস্ট লন্ডন মসজিদ, বারাকা রেস্টুরেন্ট, হাল হাম্বরা রেস্টুরেন্ট, হোযাইটচ্যাপেল, আলতাব আলী পার্ক, ক্যাফে কাসাব্লাকাং বাংলাদেশীদের পদচারনায় মুখর থাকে। সেখানে আজ কঠিন শুন্যতা বিরাজ করছে। মনে হচ্ছে প্রাণের টাওয়ার হ্যামলেটস যেন প্রাণহীন। প্রাণের মানুষগুলো আজ কোথাও হারিয়ে গেছে।

আসরে নামাজের ওয়াক্ত চলে যাচ্ছে। টাওয়া হ্যামলেটসে ৫৫টি মসজিদ। প্রতিটি পাড়া মহলায় একটি করে মসজিদ আছে । মসজিদের পাশ দিয়েই ড্রাইভ করে যাচ্ছি, কিন্তু নামাজ পড়ার সুযোগ নেই। সব মসজিদ তালাবদ্ধ । মসজিদের আশপাশে সবসময় যে গমগম উপস্থিতি লক্ষ্য করা সেখানে আজ শুধুই নীরবতা । ভাবছিলাম, যতই করোনা আতংক হোক, দু’চারজন প্রিয়জনকে দেখবো। কিন্তু ফিরে এলাম একরাশ ভীষন্নতা নিয়ে।

করোনা আমাদের প্রিয় টাওয়ার হ্যামলেটসকে বদলে দিয়েছে। বদলে দিয়েছে গোটা দেশ, এমনকি বিশ্বকে। গৃরবন্দী বন্ধু বান্ধবদের সাথে এখন দেখা হয় শুধু সোশ্যাল মিডিয়ায়। প্রেস কনফারেন্স নেই, প্রেস ক্লাবের আড্ডা নেই, সংবাদপত্র অফিসগুলোর জমজমাট দিনগুলো নেই । সবখানে শুন্যতা । শুধুই শুন্যতা। যে শুন্যতা আমার সতেরো বছরের বিলেত জীবনে এই প্রথম অনুভব করলাম।

তাইসির মাহমুদ
সম্পাদক, সাপ্তাহিক দেশ
লন্ডন, যুক্তরাজ্য
সতেরো এপ্রিল ২০২০

আরও পড়ুন



বৃষ্টিতে জনজীবন বিপর্যস্ত

দিনভর অবিরাম বর্ষণে গতকাল মঙ্গলবার...

জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের প্রস্তুতি সভা

সিলেট এক্সপ্রেস ডেস্ক: নব নিযুক্ত...

সিলেটে ভার্সেন্টাইল ফাউন্ডেশন-এর সাধারণ সভা অনুষ্ঠিত

  ভার্সেন্টাইল ফাউন্ডেশন সিলেট-এর এক...

ছাতক সড়ক দুর্ঘটনায় ছাত্রলীগ নেতা নিহত

সিলেট এক্সপ্রেস প্রতিবেদন সিলেট-সুনামগঞ্জ সড়কে...