করোনার দিনরাত্রি : পাঠকের ফোন ও ঘরে বসে সংবাদপত্র বের করার আনন্দ

প্রকাশিত : ১৯ এপ্রিল, ২০২০     আপডেট : ২ মাস আগে

তাইসির মাহমুদ : শনিবার দুপুর । অফিসের ল্যান্ড ফোন থেকে ডাইভার্ট হয়ে মোবাইলে একটি কল এলো। হ্যালো বলতেই ওপাশ থেকে সালাম দিয়ে একজন জানতে চাইলেন, “সম্পাদক সাবোর লগে মাতরামনি”। সালামের জবাব দিয়ে বললাম “জ্বি আফনে সম্পাদোকর লগে মাতরা”। কণ্ঠ শুনে অনুমান হলো যিনি ফোন দিয়েছেন তাঁর বয়স ষাটের কাছাকাছি হবে। বললেন, “দীর্ঘদিন পর আজ আপনাদের পত্রিকা (সাপ্তাহিক দেশ) পেলাম। আমি তো সবসময় মসজিদ থেকে পত্রিকা নিই। কিন্তু গত দুই সপ্তাহ ধরে মসজিদ বন্ধ। তাই পত্রিকাও পাইনা। আজ আমার ছেলে বাংলা টাউন থেকে আনলো। তাই আপনাদেরকে ধন্যবাদ জানাতে ফোন দিলাম।”

বললাম, ফোন করার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। তিনি কথা বলতে থাকলেন। “করোনার কারণে ঘরে বন্দী আছি। কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই। আগে পাঁচ ওয়াক্ত মসজিদে যেতাম। শুক্রবারে আপনাদের পত্রিকা আনতাম। আর সারা সপ্তাহ ঘরে বসে পড়তাম। দেশ, বিদেশ, কমিউনিটির খবর পেতাম। কিন্তু পত্রিকা না থাকায় দুই সপ্তাহ কোনোকিছু ভালো লাগেনি। ঘরে বাংলা চ্যানেল নাই। দিন-দুনিয়ার কোনো খবর পাইনা।

বললাম, চাচা লকডাউনের কারণে অফিস বন্ধ ছিলো। তাই পত্রিকা বের করা সম্ভব হয়নি। এখন নিয়মিত বের হচ্ছে। বললেন, আপনাদের পত্রিকা না পড়লে ভালো লাগে না। নিয়মিত বের করবেন, আমার অনুরোধ।

ফোন রেখে তৃপ্তির নিঃশ্বাস ফেললাম। একজন পাঠক হলেও তো পত্রিকা থেকে নাম্বার খুঁজে বের করে ধন্যবাদ জানাতে ফোন দিয়েছেন। এটি একটি সংবাদপত্রের সবচেয়ে বেশি ভালো লাগার জায়গা। করোনাকালে পত্রিকার প্রকাশনা অব্যাহত রাখা স্বার্থক মনে হলো।

যুক্তরাজ্য লকডাউনের পর আমাদের অফিস-ভবনটি পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়া হয়। তাই কীভাবে কী করবো ভেবে পাচ্ছিলাম না। ভাবলাম, অফিসে যে কাজ করি ঘর থেকেও তো তা করা যায়। কম্পিউটার আছে। সারাদিনই ফেসবুকে লেখালেখি করি। করোনার দিনরাত্রি লিখতে পারি। তাহলে পত্রিকা বন্ধ থাকবে কেন। ফোন দিলাম আমাদের হেড অব প্রোডাকশন রিয়াজুল ইসলামকে। বললাম, পত্রিকা কীভাবে বের করা যায়? তিনি বললেন, এটা কি কোনো বিষয় হলো? আমার ঘরে কম্পিউটার আছে, আপনার ঘরেও আছে। আমার হার্ড ড্রাইভে ব্যাকআপ কপি আছে। আপনি ম্যাটারিয়েল পাঠিয়ে দেবেন। আমি ডিজাইন করে প্রেসে পাঠিয়ে দেবো। তারা ছেপে দেবে। ব্যাস হয়ে গেলো। বললাম, তাহলে প্রস্তুতি নিন। আমি কাজ শুরু করছি। এই সপ্তাহ থেকেই বের হবে।

ফোন দিলাম ছাপাখানা ম্যানেজারকে। বললেন, আমরা খোলা আছি। তবে সময়সূচিতে কিছু পরিবর্তন আছে। তিনি প্রিন্টিং স্লট, ডেডলাইন টাইমসহ সবকিছু বুঝিয়ে দিলেন। এবার টিমের সকলের সাথে কথা বললাম। প্রত্যেকে নিজ নিজ ঘর থেকে কাজ শুরু করলেন। সোমবার, মঙ্গলবার, বুধবার তিনদিনের কাজ শেষে বৃহস্পতিবার পত্রিকা হাতে চলে এলো ।

আগে প্রতি শুক্রবার মসজিগুলোতে পত্রিকা বিপনন হতো। পাশাপাশি বড় কয়েকটি গ্রোসারী শপেও যেতো । যেহেতু সকল মসজিদই বন্ধ তাই বিকল্প হিসেবে আরো কিছু গ্রোসারী শপের সাথে কথা বলে বিপননের ব্যবস্থা করে নিলাম। ডেলিভারীম্যানকে দোকানগুলোর একটি লিস্ট পাঠিয়ে দিয়ে বললাম, ছাপাখানা থেকে এনে ওই গুলোতে দিয়ে দেবেন।

ঘরে বসে দুই সপ্তাহ ধরে পত্রিকা বের করছি। টিমের কারো সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ নেই। শুধু টেলিফোনে যোগাযোগ। মনে হচ্ছে অফিস আর ঘর-তেমন কোনো ফারাক নেই। উপরতলায় বাসা, নিচের তলায় অফিস। সকালে আধঘণ্টা ড্রাইভ করে অফিসে যেতে হয় না। বিকেলে আরো এক ঘণ্টা ড্রাইভ করে ফিরতে হয় না। আরো তিন সপ্তাহের লকডাউন আছে। অসুবিধা নেই। পত্রিকা নিয়মিতই বের হবে।

করোনাকালে পত্রিকা বের করার কিছু সুবিধা আছে। এখন করোনা ছাড়া আর কোনো নিউজ নেই। বত্রিশ পৃষ্ঠার ট্যাবলয়েড পত্রিকার নিরান্নব্বুই শতাংশ সংবাদই করোনা সংক্রান্ত। স্বাভাবিক সময়ে সবচেয়ে বেশি ধকল দিতে হয় কমিউনিটি সংবাদে। সাত-আট পেইজ কমিউনিটি সংবাদ ছাপার পরও অনেকের অনুরোধ রক্ষা করা সম্ভব হয়না। কিন্তু এখন কমিউনিটি সংবাদ নেই বললেই চলে। দু’চারটি সংবাদ আছে। তাও করোনা বিষয়ক। গত সপ্তাহে একটি প্রেস রিলিজ পেয়ে কিছুসময় হাসলাম। সংবাদটির শিরোনাম “করোনা থেকে মুক্তি পেতে অনলাইনে দোয়া মাহফিল”। আমার সাংবাদিকতা জীবনে এই সংবাদটি সম্পুর্ণ নতুন।

প্রকাশনার সাত বছর পার করছে সাপ্তাহিক দেশ। ফ্রি বিপনন ও সর্বাধিক প্রচারিত সংবাদপত্র হওয়ায় বাংলাদেশী কমিউনিটিতে আমরা বড় একটি পাঠকগোষ্ঠী তৈরি করতে পেরেছি। প্রতি শুক্রবার জুমার নামাজের পর পত্রিকার জন্য কাড়াকাড়ির দৃশ্য দেখতে ভালোই লাগে। কোনো কারণে কোনো মসজিদে সময় মতো পত্রিকা না পৌঁছলে পাঠককে কৈফিয়ত পর্যন্ত দিতে হয়। তাই দুঃসময় হলেও সাত বছর ধরে তিলে তিলে গড়েওঠা পাঠকসমাজকে বঞ্চিত করতে চাইনা। বয়োবৃদ্ধ বাংলাদেশী চাচারা, যারা এখনও ইন্টারনেট ঘেটে খবর পড়তে পারেন না, তারাই আমাদের সংবাদপত্রের প্রাণ। তারা পড়েন বলেই আমরা পত্রিকাগুলো বাঁচিয়ে রাখতে পারছি।

অনেকে বলেন, বাংলা সংবাদপত্রের ভবিষ্যৎ অন্ধকার। সবকিছুই এখন অনলাইনে চলে যাচ্ছে। বড়জোর আরো দশ বছর টিকতে পারে। এরপর প্রিন্ট মিডিয়া যাদুঘরে চলে যাবে। বিষয়টি নিয়ে আমার আশংকাও এড়ায়না। ভাবি, আজ যে বয়োবৃদ্ধ পাঠক ফোন দিলেন, তিনি যখন থাকবেন না, তখন সংবাদপত্র কে পড়বে? প্রায় পঁচিশ বছর ধরে প্রিন্ট মিডিয়ায় আছি। মিডিয়ার সাথেই ঘর-সংসার। সংবাদপত্র থাকবে না, এটা ভাবতে কষ্ট হয়।

ছবি: গ্রোসারী শপে পেপার বক্স থেকে পত্রিকা সংগ্রহ করছেন পাঠক।

তাইসির মাহমুদ
সম্পাদক, সাপ্তাহিক দেশ
লন্ডন, যুক্তরাজ্য
১৯ এপ্রিল ২০২০

আরও পড়ুন

সিলেট অঞ্চলে পাহাড়ি ঢল ও বন্যার পূর্বাভাস

ঘূর্ণিঝড় ফণীর প্রভাবে সিলেটসহ উত্তর-পূর্বাঞ্চলে...

সিলেটে বিশ্ব রেডক্রিসেন্ট দিবস পালিত

আব্দুস সোবহান ইমন : বর্ণাঢ্য...