করোনার দিনরাত্রি: কোয়ারিন্টিনকালে পুত্রের চুল কাটার দুঃসাহসিক মিশন!

প্রকাশিত : ০৬ মে, ২০২০     আপডেট : ৩ সপ্তাহ আগে  
  

তাইসির মাহমুদ, যুক্তরাজ্য থেকেঃ

শরিরী ও অশরিরী ‘চার ফেরেশতা’র বেস্টনীতে চলছে কোয়ারিনটিন জীবন। অশরিরী দুই ফেরেশতা হলেন ‘কেরামান কাতেবিন’। আর শরিরী দু’জন (অবঃ) জিবরিল ও মিকাইল। মানে আমার দুই ছেলে।
আগেই বলছিলাম দীর্ঘ কোয়ারিনটিন জীবনে ওদের চুল এতো লম্বা হয়েছে যে, দুর থেকে দেখলে বাচ্চা পীর, বাচ্চা পীর মনে হয়। শ্বশুরালয় থেকে সেই কবে ট্রিমার এনে রেখেছিলুম চুল কাটবো বলে। কিন্তু দু’জনকে বুঝানোর আর তাক্কত নেই। আমি তাদের চুল কাটতে পারবো- এটা তারা একদম বিশ্বাসই করতে চায় না । যখনই বলি, জিবরিল আসো চুল কেটে দিই । তার সোজা প্রশ্ন, “আপনি কি এর আগে কখনো চুল কেটেছেন? কোনো অভিজ্ঞতা আছে?

কী জবাব দেবো তাকে? আসলেও তো কোনো অভিজ্ঞতা নেই । সাংবাদিকতা পেশায় সববিষয়ে টুকটাক কিছু জ্ঞান রাখতে হয়। কিন্তু একদিন যে কোয়ারিনটিন আসবে আর নিজেকে নরসুন্দরের ভুমিকায় অবতীর্ণ হতে হবে তা কে জানে? নতুবা আগে-ভাগেই নিদেনপক্ষে ঘরের কোনো পোষ্য জন্ত জানোয়ারের লোম-চুল কেটে কিছু অভিজ্ঞতা অর্জন করে নিতাম!

জিবরিলকে কিভাবে আশ্বস্ত করবো যে, আমি চুল কাটতে পারবো। হঠাৎ মনে পড়লো, নাহ! একেবারেই যে অনভিজ্ঞ তা কিন্ত নয়, ছোটকালে একদিন বাবার মাথার চুল কেটেছিলাম । বললাম, হ্যা, অভিজ্ঞতা থাকবে না কেন, অবশ্যই আছে। তোমার দাদার মাথার চুল কেটেছি। জিবরিলের জবাব তো রেডি- “দাদা বুড়ো মানুষ। উনার তো আর কোনো স্টাইল লাগতো না। তাই বলে আমার চুল..?”

বুঝানো বড়ই মুশকিল । একদিন দুইদিন করে পুরো একসপ্তাহ ব্রেশ ওয়াশের চেষ্টা অকেটা ব্যর্থ । শেষতক একটা কথা কাজে লাগলো। বললাম, আমরা এখন কোয়ারিনটিনে আছি। থাকতে হবে আরো অনেকদিন। তাই একটু আধটু-খারাপ হলেইবা কী। কে দেখবে? কথাটি তার বুজে পড়লো। চুল কাটতে সম্মতি জানালো।

ট্রিমার, চিরুনী, টাওয়াল সবকিছুর বন্দোবস্ত করে তাকে একটি টুলের উপর বসালাম। চুল কাটতে শুরু করার আগ মহূর্তে জিবরিলের শেষ আর্জি, বাবা যাতে একেবারে খারাপ না হয়। বললাম চিন্তার কোনো কারণ নেই। খুব খারাপ হবে না।

শুরু করবো। কিন্তু কীভাবে? বাবার চুল কেটেছিলাম সম্ভবত তিন যুগ আগে ভোতা কাঁচি দিয়ে। এখন পুত্রের চুল কাটতে হবে ইলেক্ট্রিক মেশিন দিয়ে । এটা কীভাবে কী করতে হয়? চারটি ব্লেড আছে । কোনটি কত নম্বর, তাও চিনি না । আইডিয়ার ওপর একটা ব্লেড লাগিয়ে পেছন দিক থেকে কাটতে শুরু করলাম । চুলতো কাটছি । মনে হলো প্রথমেই আমি এক নাম্বার ব্লেড লাগিয়ে দিয়েছি। তাই পেছনের চুল বেশি খাঁটো হয়ে গেছে । ভাবছি, জিবরিল যখন হাত দিয়ে টের পারবে তখন ঠেলা সামলানো মুশকলি হয়ে পড়বে । মোটামুটি কিছু কাটার পর সে পেছনে হাত দিয়ে অনুমান করতে চাইলো কী অবস্থা। হাত দিয়েই বললো বাবা “ইটস টু শর্ট” । বললাম, আরে বাবা এটাই এখন স্টাইল। সাইট ছোট থাকবে আর উপর লম্বা । বললো, ও ইয়েস। ঠিক আছে।

জিবরিল যতই ইয়েস বলুক। আমি তো বুঝতে পারছি কোথায় কোন ভুল-শুব্ধ হচ্ছে। পেছনের দিকটা কীভাবে এবড়ো থেবড়ো হয়েছে । গ্লাসে দেখতে দিলে চুল কাটতে না দিয়ে এতক্ষণে দৌঁড় দিতো।

এবার খুব সাবধানে মাথার সামনের দিকটা আর উপরের চুল কাটলাম । কারণ সে মুখের সামনে আয়না ধরে আছে । শেষ হলে বললাম, দেখোতো কী ফার্স্ট ক্লাস চুল কাটা হয়েছে। পরিবারের সদস্যদের আগেই বলা ছিলো, চুল কাটা যাই হোক সবাই বলবে ‘মারহাবা-মারহাবা’ । সকলেই আমার নির্দেশনা অক্ষরে অক্ষরে পালন করলেন । হঠাৎ টের পেলাম দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ। খুলে দেখি মেজো শ্যালক এসে হাজির । ঘরে ঢোকার আগেই কানে কানে সতর্ক করে দিয়ে বললাম, তোমার ভাগিনার চুল কাটছি। ঘরে ঢুকেই বলো চমৎকার হয়েছে। সকলের মুখে মুখে চমৎকার চমৎকার শুনতে শুনতে জিবরিলও মোটামুটি চমৎকৃত হয়ে ওঠলো।

বিকেলে তাঁর নানু মোবাইলে ভিডিও কল দিলেন । তিনি এতোদিন নাতিদের চুল কেটে দিতেন । তাই ভিডিও-কলে দেখতে চান চুল কাটা কেমন হয়েছে। বলছেন, জিবরিল দেখি তো তোমার চুলকাটা কেমন হলো । আমি খানিক দূর থেকে নানু-নাতির কথোপকথন শুনছিলাম । একদিকে জিবরলি মাথা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে তার নানুকে চুল কাটা দেখাচ্ছে আর অন্যদিকে আমার হার্টব্রিট বাড়ছে । লাইভ কথাবার্তায় তো আর শ্বাশুড়িকে সতর্ক করে দেয়া যায় না। কিন্তু মনে হলো তিনিও যেন দামান্দের আশংকার বিষয়টি অলৌকিকভাবে বুঝতে পারছিলেন । বললেন, ভেরি নাইস হয়েছে। এবার জিবরিল আপাতত খুশি । আর আমিও আপাতত স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম, কারণ ওপর থেকে বড় ধরনের একটি ফাড়া (বিপদ) কেটে গেলো। তবে বলে রাখছি, জিবরিলের চুলকাটায় এতো দক্ষতা প্রদর্শনের পরও মিকাইল এখনও আমার কোনো যুক্তিতেই ভরসা করতে পারছে না। তাই তার চুল কাটা হয়নি। সে এখন ‘বাচ্চা পীর’ এর পাঠ চুকিয়ে ‘ইয়াং পীর’ হওয়ার পথে।

ছেলের চুল কাটার মিশন শেষ করতে পারলাম বটে; কিন্তু আমার চুল কাটার মিশন কে সারবে? বেগম সাহেবাকে বললাম, দেখো ট্রাই করে, যেভাবেই করতে পারো আমার কোনো আপত্তি নেই । তিনি বললেন, তুমি না হয় তোমার বাবার চুল একদিন হলেও কেটেছো, আমি তো কোনোদিন কাঁচিতে হাতও লাগাই নি। এটা কীভাবে সম্ভব হবে?

তাহলে আপাতত নিরুপায় । মাথার চুল বেসামাল গতিতে বাড়ছে । ছেলেদের সাথে আমারও ‘বড় পীর’ হওয়ার অবস্থা । কীভাবে কী করবো? কোথায় চুল কাটাবো ভাবছি। এক বন্ধু জানালেন, তিনি একটি সেলুনের সন্ধান পেয়েছেন। জানতে চাইলাম কোথায়, কীভাবে। বললেন, টাওয়ার হ্যামলেটসের একজন বাংলাদেশী তার নিজের ঘরের একটি রুমে ‘জরুরী সেলুন সেবা’ শুরু করেছেন। মাথপিছু ২০ পাউ‌ণ্ড । আপনি আগে ফোনে এপোয়েন্টমেন্ট করে যেতে হবে।

ভাবছি ফোন দিবো, কিন্তু হঠাৎ এডিটিভির একটি খবর দেখে আশাহত হলাম। ভারতে মধ্য প্রদেশের একটি গ্রামে একটি সেলুনে ছয় ব্যক্তি চুল কাটতে গিয়েছিলেন। পরে পরীক্ষায় ছয়জনেরই করোনাভাইরাস পজিটিভ ধরা পড়েছে।

তাই আপাতত চুল কাটার চিন্তা ভুলে গিয়ে সরকারী কোনো নির্দেশনার অপেক্ষায় আছি। সরকার যদি দুই মিটার লম্বা কাঁচি আর চিরুনী ও প্রয়োজনীয় পিপিই সেলুনগুলোতে সরবরাহ করে চুল কাটার অনুমতি দেয়, তাহলে বোধহয় এই যাত্রায় ঘরবন্দী লাখ লাখ ছেলে বুড়ো যুবক ভগ্নদশা থেকে মুক্তি পেতে পারে।

আরও পড়ুন