কবি হাসনাইন সাজ্জাদী ও তাঁর বিজ্ঞানবাদের কাব্যতত্ত্ব-মো: আব্দুল মালিক

,
প্রকাশিত : ২১ নভেম্বর, ২০২০     আপডেট : ২ সপ্তাহ আগে
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সিলেট এক্সপ্রেস ডেস্ক সাহিত্য কে বলা হয় মানব ও সমাজ জীবনের দর্পন বা প্রতিচ্ছবি। মানব জীবনের বিভিন্ন দিক নিয়ে সাহিত্যের বিকাশ। সাহিত্যে মানব মনের সুখ, দুঃখ, আনন্দ, বেদনা এবং মানব জীবনের শ্বাশ্বত ও চিরন্তন অনুভূতি প্রতিফলিত হয়।

‘সাহিত্য’ শব্দটি বাংলা ‘সহিত’ শব্দ থেকে আগত। ‘সহিত’ শব্দমূলের সঙ্গে ‘য’ প্রত্যয় যুক্ত হয়ে সাহিত্য শব্দটি গঠিত হয়েছে। ‘সহিত’ এর অর্থ-সংযুক্ত, সমন্বিত, সঙ্গে, মিলন, যোগ, সংযোগ, সাথে বা সম্মিলন। ‘সাহিত্য’ শব্দের আভিধানিক অর্থ-সহিতের ভাব, মিলন বা যোগ, অথবা জ্ঞানগর্ভ বা শিক্ষামূলক গ্রন্থ, আবার কাব্য, উপন্যাসাদি, রসাতœক বা রম্যরচনা যাতে এক হৃদয়ের সঙ্গে অপর হৃদয়ের মিলন ঘটে। সাহিত্যের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে বিশ^ কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, “অন্তরের জিনিসকে বাহিরের, ভিতরের জিনিসকে ভাষার, নিজের জিনিসকে বিশ^মানবের ও ক্ষণকালের জিনিসকে চিরকালের করিয়া তোলাই সাহিত্যের কাজ।”

সাহিত্যের আদি শব্দশিল্প হলো ‘কবিতা’। মানব সমাজ ও সভ্যতার বিবর্তনের ধারায় মানুষ ক্রমান্বয়ে তাদের দৈন্দন্দিন জীবন যাপন, জীবন উপভোগ ও মনের সূক্ষতর ভাব, অনুভূতি বা জীবন অভীজ্ঞতাকে শিল্পময় করে মননশীল ভাবে প্রকাশের প্রয়োজনে কবিতার পর বিভিন্ন সাহিত্য অঙ্গিকের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে নাটক, উপন্যাস, ছোট গল্প, প্রবন্ধ, নিবন্ধ, ভ্রমনকাহিনী ও রম্য রচনার মতো নানা রকমের সাহিত্যের শাখা। বলা বাহুল্য সাহিত্য সৃষ্টির এধারা এখনো অব্যাহত রয়েছে।
সাহিত্যের আদিরূপ হচ্ছে কবিতা। অপরিহার্য শব্দের অবশ্যম্ভাবী বাণী বিন্যাসই কবিতা। মানব মনের ভাবনা কল্পনা যখন অনুভূতি রঞ্জিত যথাবিহিত শব্দ সম্ভারে বাস্তব সুষমা মন্ডিত চিত্রাত্মক ও ছন্দোময় রূপ লাভ করে তখনই তাকে কবিতা বলে। কাব্যের উদ্দেশ্য জগৎ ও জীবনের রহস্যকে সুন্দর করে। রসন্সিগ্ধ করে উপস্থাপন করা। কবিতার বাঁক বিভিন্ন সময় বিভিন্ন কবির হাতে বিভিন্ন ভাবে বদলেছে। আদিতে কবিরা ‘¯্রষ্টা’ পরবর্তীতে ‘সৃষ্টি’ কেন্দ্রিক কবিতা রচনা করেছেন। এই ভাবে কবিতার বিষয়বস্তু ও আঙ্গিক বিভিন্ন সময় বিভিন্ন কবির হাতে পরিবর্তিত হয়েছে, হচ্ছে এবং হবে।
মানবজাতি এখন বিজ্ঞানের চরম উৎকর্ষের যুগে বাস করছে। মানুষের জীবন আজ বিজ্ঞান নির্ভর। তাই কবি হাসনাইন সাজ্জাদী কবিতায় এক নতুন ধারার প্রবর্তন করেছেন যার নাম তিনি দিয়েছেন ‘বিজ্ঞান যুগে বিজ্ঞান কবিতা’। এই কবিতার বৈশিষ্ট্য হচ্ছে কবিতার উপমা, উৎপ্রেক্ষা ও চিত্রকল্পে বিজ্ঞান মনষ্কতা, ধর্মনিরপেক্ষতা, আন্ত:ধর্মীয় সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠা ইত্যাদি। তিনি এই আন্দোলনের সুত্রপাত করেছেন আজ থেকে প্রায় ৩০ বছর পূর্বে।

কবি হাসনাইন সাজ্জাদী বাংলাদেশের একমাত্র জলপ্রপাত ‘মাধবকুন্ড’ পর্যটন কেন্দ্র খ্যাত মৌলভীবাজার জেলার তৎকালীন বড়লেখা বর্তমান জুড়ি উপজেলার জায়ফর নগর ইউনিয়নের গোবিন্দপুর গ্রামে ১৯৬২ সালের ১লা মার্চ এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম সাহিত্য-সাংস্কৃতিক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম মোহাম্মদ সাজ্জাদ এবং দাদার নাম আমির সাধু। তাঁর শিক্ষার হাতে খড়ি পরিবারে, পরে গ্রামের মানিক সিংহ প্রাথমিক বিদ্যালয়, জুড়ি উচ্চ বিদ্যালয়, কুলাউড়া ডিগ্রী কলেজ, মোহাম্মদপুর কলেজ ঢাকায় লেখাপড়া করেছেন। তিনি পিআইবি থেকে সাংবাদিকতায় ডিপ্লোমা এবং ‘আমেরিকা-বাংলাদেশ বিশ^বিদ্যালয়’ থেকে বাংলা সাহিত্যে অনার্স মাস্টার্স ডিগ্রী অর্জন করেন।

সাহিত্য ও সাংবাদিকতা জীবন ঃ কবি হাসনাইন সাজ্জাদীর প্রথম ছড়া ছাপা হয় সাপ্তাহিক সিলেট সমাচার পত্রিকায় ১৯৭৭ সালের ৭ আগস্ট। ১৯৭৯ সালে সাপ্তাহিক সিলেট সমাচারের জুড়ি প্রতিনিধি হিসেবে তাঁর সাংবাদিকতা জীবনের শুরু। ১৯৮১ সালে দৈনিক জালালাবাদীর স্টাফ রিপোর্টার হিসেবে মৌলভী বাজার অফিসে যোগদান করেন। ১৯৮৪ সালে সাপ্তাহিক মুক্তকণ্ঠের কার্যকরী সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৬ সাল থেকে ঢাকার মোহাম্মদপুরে সাহিত্যপত্র ‘বিস্ফোরণ’ সম্পদনা করেন। ১৯৮৮ সাল থেকে দৈনিক নব অভিযান পত্রিকার সাহিত্য পাতার সহকারী, ১৯৮৯ সাল থেকে দৈনিক নব অভিযান পত্রিকার অনুপ্রাস পাতা ও সাহিত্য পাতার সহকারী সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি সাপ্তাহিক ‘রক্তকেতু’ তে স্টাফ রিপোর্টার, ১৯৯৯ সালে সাপ্তাহিক মনোরমায় স্টাফ রিপোর্টার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ১৯৯১ সালে মাসিক ‘খোঁজখবর’ ও ১৯৯২ সালে মাসিক ‘পূর্বাপর’ পত্রিকার ডিক্লারেশন গ্রহণ করে প্রকাশনা জগতে পা রাখেন। ১৯৯৩ সালে মাসিক ‘খোঁজখবর’কে সাপ্তাহিক হিসেবে আবারও ডিক্লেরেশন নেন। ১৯৯৪ সালে সাপ্তাহিক ‘বৃহস্পতিবার’ এর নির্বাহী সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৬ সালে দৈনিক সংবাদে ‘জলসা বিনোদন’ এর স্টাফ রিপোর্টার, ২০০২ সালে পাক্ষিক ‘সিনোভিশন’ এ স্টাফ রিপোর্টার, ২০০৪ সালে দৈনিক ‘খবরপত্রে’ স্টাফ রিপোর্টার হিসেবে ২০০৭ পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৫ সাল থেকে রূপসী বাংলা টেলিভিশন অর্গেনাইজিং এ অংশগ্রহণ করেন এবং টেলিভিশন রিপার্টাস অব বাংলাদেশ (ট্রাব) এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হিসেবে ২০১২ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৬ সালে জাতীয় কবি সংগঠন অনুপ্রাস এর সহকারী মহাসচিব হিসেবে কবিতা আন্দোলনে যুক্ত হন। ১৯৮৮ সালে সহ সভাপতি (গবেষণা ও মূল্যায়ন) পদ লাভ করেন। এ সময় কবিতার বাকঁ বদলে গবেষণা করে বিজ্ঞানভিত্তিক কবিতার চর্চা ও লেখালেখি শুরু করেন। ১৯৮৯ সালে মিয়া মুসা হোসেন সম্পাদিত দৈনিক পত্রিকায় নতুন প্রজন্মের কবিতা শীর্ষক ধারাবাহিক প্রবন্ধ লিখে কবিতা আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৯৬ সাল থেকে বাচসাস এর নির্বাহী সদস্য পদ নিয়ে অদ্যাবধি নেতৃত্ব প্রদান করে যাচ্ছেন। তিনি জাতীয় কবিতা পরিষদেরও নির্বাহী সদস্য। কবি হাসনাইন সাজ্জাদী এক সময় বিনোদন সাংবাদিকতায় নেতৃত্ব দিয়েছেন। তিনি অপেরা জার্নালিস্ট ফোরামের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, যাত্রা শিল্প উন্নয়ন পরিষদের সদস্য, আমির সাধু অপেরার সত্ত্বাধিকারী ও যাত্রা নির্দেশক সহ সাহিত্য সাংবাদিকতা ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে বলিষ্ট নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছেন বহুমুখী এই প্রতিভা। বর্তমানে তিনি বিজ্ঞান কবিতার থিয়োরি, বঙ্গবন্ধু ও অন্যান্য বিভিন্ন বিষয়ে গবেষণারত।
কবিতা, মুক্তিযুদ্ধ, লোকসাহিত্য ও সাংবাদিকতা বিষয়ে তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থ হচ্ছে-
১। এখানে একদিন – ১৯৮৮ (বিজ্ঞান কাব্য) ।
২। সাংবাদিকতার অ আ ক খ – ১৯৯৩ (সংবাদ বিষয়ক)।
৩। সময় বদলে গেছে – ২০০৮ (বিজ্ঞান কাব্য)।
৪। ৮ ডিসেম্বর মৌলভীবাজার মুক্ত দিবস – ২০০৮ (মুক্তিযুদ্ধ)।
৫। সিলেটের লোক সাহিত্য ব্যক্তিমানস ও সমাজ- ২০০৮ (লোকসাহিত্য)।
৬। ভালোবাসার বড় কিছু – ২০১১ (বিজ্ঞান কাব্য)।
৭। সহজ সাংবাদিকতা কেমন করে – ২০১২ (সংবাদ বিষয়ক)
৮। এক কোটি তেজস্ক্রিয়তা – ২০১৬ (বিজ্ঞান কাব্য)
৯। জালালপুর সাব সেক্টরে মুক্তিযুদ্ধ – ২০১৪ (মুক্তিযুদ্ধ)
১০। বিজ্ঞান কবিতার রূপরেখা – ২০১৪ ও ২০১৫ (গবেষণা)।
১১। বিজ্ঞানযুগের সাংবাদিকতা – ২০১৫ (সংবাদ বিষয়ক)।
১২। প্রেম ভালোবাসার হার্ডডিস্ক – ২০১৬ (বিজ্ঞানকাব্য)।
১৩। জাপানে বঙ্গবিদ্যা ও বাংলাদেশে বিজ্ঞান কবিতা – ২০১৬ (গবেষণা)।
১৪। হে স্বপ্ন হে বিজ্ঞান কবিতা – ২০১৭ (বিজ্ঞান কাব্য)।
১৫। আকাশ জুড়ে বঙ্গবন্ধু – ২০১৮ (ছড়া কাব্য)।
১৬। ছোটদের বিজ্ঞানবাদ – ২০১৮ (রাষ্ট্র দর্শন)।
১৭। ভালোবাসার হার্ডডিস্ক – ২০১৮ (বিজ্ঞান কাব্য)।
১৮। মহাবিশে^র মহা বিস্ময় – ২০১৯ (বিজ্ঞান সিরিজ)।
১৯। আমাদের পৃথিবী – ২০১৯ (বিজ্ঞান সিরিজ)।
২০। রহস্যেভরা সমুদ্রতল – ২০১৯ (বিজ্ঞান সিরিজ)।
২১। চলো চাঁদে যাই – ২০১৯ (বিজ্ঞান সিরিজ)।
২২। রোবটের গল্প – ২০২০ (বিজ্ঞান সিরিজ)।
২৩। মুজিব বর্ষের ছড়া – ২০২০ (ছড়াকাব্য)।
২৪। মুজিব শতবর্ষ – ২০২০ (ফুটনোট)।

কবি হাসনাইন সাজ্জাদী ২০১৫ সালের ১৩ ডিসেম্বর জাপানের টোকিও বিশ^বিদ্যালয়ে চতুর্থ আর্ন্তজাতিক বঙ্গবিদ্যা সম্মেলনে ‘বিজ্ঞান যুগে বিজ্ঞান কবিতার তত্ত্ব’ উপস্থাপন করে ভূয়সী প্রশংসা অর্জন করেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রকাশিত নিউজ উইক, ম্যাগাজিন ২ এপ্রিল ২০১৮ অনলাইন সংখ্যাকে বিজ্ঞান কবিতা সংখ্যা হিসেবে প্রকাশ করেছে। তিনি কয়েকবার ভারতে সাহিত্য সম্মেলনে যোগদান করেছেন। বাংলাদেশের বেসরকারী টেলিভিশন মাছরাঙা প্রতিদিন সকাল ৭-৯ টা পর্যন্ত দেশ বিদেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত ২ জন ব্যক্তিকে নিয়ে সাক্ষাৎকার ভিত্তিক দুই ঘন্টার লাইভ প্রোগ্রাম করে থাকে। সেই টেলিভিশন চ্যানেল ১লা অক্টোবর ২০১৮ সালে কবি হাসানইন সাজ্জাদীকে আমন্ত্রণ করে। বিজ্ঞান কবিতা আন্দোলন ও সাংবাদিকতায় তিনি ২৫ টির ও বেশি পুরষ্কার লাভ করেছেন। বিজ্ঞান ভিত্তিক সমাজ ও বিজ্ঞান মনষ্ক জাতি গঠন তাঁর জীবনের লক্ষ।


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আরও পড়ুন

হাজী মো. আমান উল্লাহ‘র স্মরণে শোকসভা

         করিম উল্লাহ মার্কেট ও আমান...

ছাত্রলীগ নেতা ফয়জের জন্মদিনে আসাদ উদ্দিন আহমদ

         সিলেট এক্সপ্রেস ডেস্ক: সিলেট মহানগর...

সাবরিনারা মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে

1        1Shareসিলেট এক্সপ্রেস ডেস্ক —   ...

সর্বক্ষেত্রে নারীর মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করতে হবে

         মো. আব্দুল বাছিত সিলেট মেডিকেল...