কবি-সাহিত্যিক কে দায় নিতে হয়

প্রকাশিত : ২৪ মার্চ, ২০১৯     আপডেট : ১ বছর আগে  
  

মোহাম্মদ আব্দুল হক: কবিতা কেউ কেউ সহজ শব্দে গড়ে তোলেন। কেউ আবার কঠিন শব্দ প্রয়োগে কবিতা রচনা করেন। কেউ কেউ দুর্বল শব্দে আবার কেউ কেউ সবল শব্দে লিখে থাকেন কবিতা। আবার অনেকে আছেন অতি সহজবোধ্য ভাষায় কবিতা লিখেন সবসময়। তবে এরাও মাঝে মাঝে রহস্যাবৃত কবিতা নিয়ে হাজির হন পাঠক ও শ্রোতাদের কাছে। এতে অসুবিধা হয়না বরং কিছুটা দুর্বোধ্য শব্দের কবিতায় চিন্তা জগতে বিচরণ বেড়ে যায়। তবে সবচেয়ে দুশ্চিন্তার বিষয় হয় কবিতায় কবির প্রকাশ ও ব্যক্তিগত জীবনের বিকাশে মিল খুঁজে না পেলে। কিভাবে?

দেখুন, কবি – সাহিত্যিকদের প্রকৃতি ও সমাজের প্রতি অনেক দায় আছে। কারণ তাঁরা সমাজ ও প্রকৃতি থেকে পেয়ে থাকেন তাঁদের লেখার উপাদান। সৃষ্টিকর্তা তাঁদের মননকে জাগ্রত করে দেন যাতে তাঁরা প্রকৃতি ও মানুষ সৃষ্ট সমাজের গভীরের দুঃখবোধ ও আনন্দ দেখতে পান। কবি মননশীল তাই তাঁর চেতনায় যেভাবে ধরা দেয় নৈসর্গিক বেদনাবোধ বা মানব সমাজের প্রকৃত চাওয়া পাওয়া ; তা কিন্তু সকল মানুষের কাছে সেভাবে ধরা দেয় না। এজন্যেই মননশীল মানুষ মাত্রেই সৃষ্টিশীল। তবে এই সৃষ্টিশীল মানুষদের মধ্যে থেকে কেউ যখন লুকোচুরি বা ভণ্ডামির আশ্রয় নেয় তখনই সর্বনাশ হয়। কিভাবে?

দেখুন, আমরা জানি, রাতে প্রহরী জেগে থাকে পাহারায়। আবার রাতে চোর চুরির উদ্দেশ্যে জেগে রয়। এখানে দুজনেই জেগে থাকে। তবে এদের দুজনের জেগে থাকার গুরুত্ব সমান নয়। এখানে বুঝতে হবে সকলের রাত জাগা মানব সমাজের জন্যে মঙ্গলজনক নয়। তেমনি করে সকল প্রকাশিত কবির সৃষ্টি মঙ্গলকাব্য হয়না। এমন কবি – সাহিত্যিকদের খুঁজলে পাওয়া যায়। এরা দুষ্ট প্রকৃতির। বুঝার সুবিধার জন্যে একটি উদাহরণ দেয়া যেতে পারে এভাবে, ধরুন একজন কবি কিংবা লেখক কবিতায় বা লেখায় অথবা কোনো আসরে কথা বললেন ঘুষ – দুর্নীতির বিরুদ্ধে। অথচ বাস্তবে ওই ব্যক্তি নিজে ঘুষ – দুর্নীতিতে সম্পৃক্ত কিংবা অনৈতিক পথে অর্থ ও ক্ষমতার অংশীদার। এই ধরনের ব্যক্তি কিন্তু ওই রাতজাগা চোরের চেয়েও একধাপ পিছিয়ে। বলা যায় সে সমাজে ভন্ড বা প্রতারক। এই ধরনের মানুষ প্রকৃত কবি নয় ; বরং কবি সেজে নিজে সুবিধা ভোগী ঘুষ লেনদেনে থাকে, আর মুখে বা লেখায় বলে দুর্নীতি ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে। এই ধরনের কবি – সাহিত্যিক লোকেরা সাহিত্যের মাঠের সর্বনাশ করছে। এরাই অকবি বা দুষ্ট সাহিত্যিক। সত্য নির্ভর চরিত্র নৈতিক চরিত্র ঠিক রেখে নিজের বহুল পরিচিত শব্দে লিখলে ক্ষতি নেই। চর্চা করতে করতে সময়ে সমৃদ্ধ কাব্য সমৃদ্ধ লেখা হয়ে উঠবে। কিন্তু নিজের কথা আর চলন অভ্যাসে বৈষম্য রোধ করতে না পারলে তা হবে সাহিত্য, লেখক ও সাহিত্য সমাজের সাথে প্রতারণা। এ যদি ছোঁয়াচে প্রভাবে ভালো পথের সারথিকে সম্মোহিত করে তবে তা হবে ভয়ংকর ক্ষতির কারণ।

মনে রাখতে হবে, যে চোর সেতো চুরি করতে মাঠে নেমেছে জেনেশুনে। আর যে পাহারাদার সে দৃঢ় শপথে চোখকান খোলা রেখেই থাকে সতর্ক পাহারায়। যেজন সাহিত্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল এবং সুসাহিত্যিক সেজন নিজে সুন্দর ও সত্যে থেকেই সুসাহিত্যিক। যে নিজে ব্যক্তি জীবনে সৎ নয়; বরং অসুন্দর, তার মাধ্যমে কবিতায় সুন্দর বাণী প্রকাশ প্রতারণার শামিল। তাই সাহিত্য নৈতিক চরিত্র সম্পন, সুন্দর মানসিকতা ও সত্য পথের মানুষের দ্বারা ভালো থাকবে। আমি মানি সৃষ্ট সাহিত্য সহজ কিংবা দুর্বল ভাষায় অর্থাৎ সাধারণের বোধগম্য হয় এমন ভাষায় হলে ক্ষতি নাই যদি তাতে ওই স্রষ্টার কোনো ছলনা বা প্রতারনা লুকিয়ে না থাকে। কাব্য সাহিত্যের ক্ষতি হবে হৃদয়ে প্রতারক বোধ লালন করে কঠিন বা সরল শব্দে সাধারণ পাঠককে কিংবা শ্রোতাকে বিভ্রান্ত করলে। কারণ পাঠক বা শ্রোতা লেখা শুনে বা পড়ে ওই কবি বা লেখকের ব্যক্তি জীবনের সাথে মুটামুটি মিল খুঁজে পেতে চেষ্টা করে ওই সৃষ্টির সময়কালে।

সুন্দর মানসিকতা ও বোধশক্তি সম্পন্ন কবি সাহিত্যিকদের অনেক দায় আছে সমাজের জন্যে। তাঁকে সেই দায় নিতে হয়। তাই সাহিত্য মাঠে অসুন্দর বা অশুভ অর্থাৎ মানবিকতার জন্যে অহিতকর কেউ যেনো বাহবা পেয়ে সারা মাঠে চষে বেড়াতে না পারে আর তার মেকি অহংকার যেনো আমাদেরকে প্রভাবিত না করতে পারে, সেদিকে খেয়াল রেখে সাহিত্যের মূল ঘাটের মানুষকে কাব্যচর্চা বা সাহিত্যচর্চা চালিয়ে যেতে হবে। সাহিত্যের মাঠের আসল চাষিদের দায়িত্ব নিয়ে বাংলা সাহিত্যকে ধীরে ধীরে সমৃদ্ধির শিখরে নিয়ে পৌঁছানোর ভূমিকা অব্যাহত রাখার চেষ্টা করতে হবে।।
লেখক  মোহাম্মদ আব্দুল হক
কলামিস্ট কবি ও প্রাবন্ধিক।

আরও পড়ুন