কবি কাশেমীর সৃষ্টিশীলতা চিরদিন লিখা থাকবে

প্রকাশিত : ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৮     আপডেট : ১ বছর আগে  
  

বেলাল আহমদ চৌধুরী : মৃত্যু জীবনে সূর্যের আলোর চেয়েও বড় সত্য। মৃত্যু মানে অনন্তকালের জন্য অনন্ত শূন্যতায় মিলিয়ে যাওয়া। সদ্য প্রয়াত কে আর কাসেমী ৭০ দশকের উল্লেখযোগ্য শক্তিমান কবি সাহিত্যিক সাংবাদিক এবং সাহিত্য ম্যাগাজিন ‘সমীকরণ’ ও ‘দৈনিক জনধারা’ সম্পাদক ছিলেন। তিনি বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন সহ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন। প্রয়াত কে আর কাসেমী মাত্র ৬৭ বছর বয়সে চলে গেছেন পরপারের ঠিকানায়। কে আর কাশেমীর সাহচর্যে ঋদ্ধ হয়েছেন আত্মীয়, অনাত্মীয় সহ সমাজের সকল স্তরের মানুষ।
সকল মানুষই সদগুণাবলীর অধিকারী হয়। কিন্তু প্রত্যেকই এর পূর্ণ বিকাশ ঘটাতে পারে না। প্রয়াত কে আর কাসেমী বাংলা সাহিত্যে চিলে কোঠার এক ঝলক রোদ্দুর হয়ে আবির্ভূত হয়েছিলেন কিন্তু অচিরেই শুকতারার মতো চলে গেলেন। বাংলা সাহিত্য জগতে তার উপস্থিতি খুবই প্রয়োজন ছিল। সাহিত্য জগতে তিনি অনেক কিছু দিতে পারতেন। তাঁর মাঝে প্রচন্ড সৃজনশীলতা ছিল। কিন্তু, কেন জানি এক অভিমান বোধ থেকে তিনি সাহিত্য জগৎ থেকে নিজেকে আড়ালে রাখতেন। তার লিখা কবিতায় আকাশ ছোঁয়া হৃদয় স্পর্শিতা ছিল।
স্মৃতির পাতায় মনে পড়ে ৭০ দশকের কথা। জিন্দাবাজারস্থ ‘ছাপাখানা’ প্রেস। স্বত্বাধিকারী আকসার বক্স। তিনি ছিলেন একজন সাহিত্য অনুরাগী। সিলেটের নবীন সাহিত্য অনুরাগীদের সাহিত্য আড্ডায় প্রাণ প্রাচুর্যে সদা হাস্যময় সকলের মধ্যমনি ছিলেন কে আর কাসেমী। ১৯৭৪ সালে তিনি প্রকাশ করেন ‘সমীকরণ’ নামে গল্প সংকলন। যা পরে সমীকরণ সাহিত্য পত্রিকা হিসাবে প্রশংসা লাভ করে।
সত্তর দশকের শুরুতে তিনি অনেক সাহিত্যামোদী সহযোদ্ধা গড়ে তুলেছিলেন। সাহিত্য সংগঠন, সাহিত্য পত্রিকা নিয়ে দিনানিপাত করতেন কিন্তু প্রাঞ্জল বন্ধু কাশেমী হঠাৎ করে পুরোদস্তুর চলে গেলেন সাহিত্যের আড়ালে আবডালে। তিনি বাস্তবের রূঢ় সংঘাত মোকাবেলা করার জন্য চলে গেলেন ব্যবসায়। জীবনকে তিনি দেখেছেন বাস্তবের নিরিখে। মুক্ত স্বদেশে ’৭৪ সাল পর্যন্ত তিনি নিজেকে যুক্ত রেখেছিলেন সাহিত্য জগতে আপন শক্তিমত্তায়। তার আত্মসম্মান বোধ অতি প্রবল ছিল। তিনি কাজ করে খেতে ভালবাসতেন। তিনি ছিলেন একজন শ্রমসৈনিক। সেক্ষেত্রে ছাপাখানার কাজ বেছে নিয়েছিলেন। ছাপাখানার অক্ষরের মত তাঁর জীবন চরিত্রে কোথাও ভুল ছিল না। তিনি স্বচ্ছ চিন্তা শক্তির জোরেই অনেকের থেকে ভিন্ন জগতের বাসিন্দা ছিলেন। তাঁর যাপিত জীবন সহজ সরল উন্নত নৈতিকতায় উদ্ভাসিত ছিল। বন্ধুবর কে আর কাশেমী আমার স্মৃতিতে ভাস্বর ভালো মানুষগুলোর একজন।
কবি ও সাহিত্যিকদের মনের পাতায় কে আর কাশেমীর সৃষ্টিশীলতা চিরদিন লিখা থাকবে। তিনি সিলেট জেলার বিশ্বনাথ থানার অন্তর্গত কাশিপুর গ্রামে পিতা মরহুম মৌলভী আব্দুল গনির ঔরসে এবং মাতা মরহুমা আউলিয়া বেগমের গর্ভে ১৯৫১ সালে জন্ম গ্রহণ করেন এবং ০৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮ তিনি না ফেরার দেশে চলে গেছেন। মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী, দুই পুত্র, এক কন্যা ও অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন।
তিনিই জীবন দেন এবং মৃত্যু ঘটান এবং তাঁরই কাছে তোমরা প্রত্যাবর্তিত হবে (সূরা ইউনুছ, আয়াত-৫৬)। এই অনিত্য সংসার থেকে সবাইকে একদিন চলে যেতে হবে। মৃতদেহ কবরে শায়িত করার সময় এক মুষ্ঠি মাটি নিয়ে বলি-বিস্মিল্লাহ ওয়া আলা মিল্লাতি রাসুলিল্লাহি। অর্থাৎ-আল্লাহতায়ালার নামে ও তাঁর রাসুলের মিল্লাতের উপর সোপর্দ করলাম।
কবরের পাশে দাঁড়িয়ে আমার মনে পড়লো প্রিয়তমার হাতের বাঁধন খুলে, ছেলে-মেয়ের আদর ভুলে, চলে যেতে হবে এই ক্ষণস্থায়ী রঙিন দুনিয়া ছেড়ে। হাদীসে আছে ‘আদ দুনিয়াউ মাজরাতুল আখেরা’-অর্থাৎ-দুনিয়া আখেরাতের শস্যক্ষেত্র। আমরা কি আখেরাতের জিন্দেগীর চিন্তা ফিকির করি? মনে পড়লো পারস্য কবি ওমর খৈয়াম এর :
দিন কতকের মেয়াদ শুধু/ ধার করা এই জীবন মোর।/ হাসি মুখে ফেরত দিবো/ সময়টুকু হলেই ভোর।
লেখক : কলামিস্ট।

আরও পড়ুন