কবি’র চোখে একফোঁটা জল

প্রকাশিত : ২৩ জুন, ২০১৮     আপডেট : ২ বছর আগে  
  

তাসলিমা খানম বীথি: ১. সেই দিনটি ছিলো শনিবার। সিলেট মোবাইল পাঠাগারের সাপ্তাহিক সাহিত্য আসর চলছিল। এসময় আসরে এসে প্রবেশ করে তরুণ গল্পকার মিনহাজ ফয়সল। ডায়াসে এসে মিনহাজ বলল- কবি অসুস্থ। সিলেট ওয়েসিস হসপিটালে ভর্তি রয়েছেন। তার জন্য দোয়া করবেন। হঠাৎ করে বশির ভাই অস্থির হয়ে পড়লেন। আমি তখন উপস্থাপনায়- চুপিচুপি বশির ভাই বললেন-‘বীথি জলদি আসর শেষ কর’। আমি বলি-এখনো তো অনেকেই কবিতা পড়া বাকি রয়েছে। এ কথা শুনে প্রচন্ড রেগে গিয়ে বললেন ‘তুই জলদি শেষ না করলে তরে থইয়া আমি যাইমুগিয়া’। এরকম রেগে যাওয়ার কারন বুঝতে পারছিলাম না তখন। কেন তিনি এমন আচরণ করছেন আমার সাথে। এরকম তো কখনো করেন না। সেদিন সাহিত্য আসরে বশির ভাই ছিলেন সভাপতি। তারপর তিনি বললেন-‘আমাদের কবি অসুস্থ’। তাকে দেখতে যাবো। তার কথা শেষ হবার আগেই অনেকেই কবিকে দেখতে তার সাথে যাবার কথা বললেন।
২. রাত তখন সাড়ে ৮টা। প্রবীণ সাংবাদিক মুহম্মদ বশিরুদ্দিন, কলামিস্ট বেলাল আহমদ চৌধুরী, প্রাবন্ধিক মোহাম্মদ আব্দুল হক, তরুণ গল্পকার বাশিরুল আমিন, কবি আব্দুল বাছিতসহ আমরা সিএনজি ভাড়া করে ছুটে যাচ্ছি ওয়েসিস ওসপিটালের দিকে। গাড়ীভাড়া নিয়ে আমাদের কারো কোন মাথা ব্যথা নেই। কারন সাথে রয়েছেন বশির ভাই ও বেলাল চাচা। হসপিটালে সামনে গাড়ী থামতেই বেলাল চাচা আর বশির ভাই মিলে সিএনজি ভাড়া চালকের হাতে দিয়ে দ্রুত সিড়িঁ দিয়ে ওঠে লিফটের সামেন এসে জড়ো হই আমরা। কবির কেবিনে ঢুকতেই আমাদেরকে দেখে তার চোখ দুটি আকাশের তাঁরার মত চিকচিক করে উঠলো। লম্বা হয়ে বেডে শুয়েছিলেন কবি। ওঠে বসলেন। কথা বললেন, হাসলেন। তার হৃদয়ের সব ব্যথা ভুলে গেলেন। তার কথা শুনে তখন কেউ বুঝতেই পারবে না তিনি অসুস্থ কিংবা তার হার্টে রিং লাগানো হয়েছে। প্রতিদিন পাঁচতলা থেকে সিড়িঁ বেয়ে ওঠা নামা করেন। এই বয়সে কি প্রানবন্ত বক্তব্য রাখেন। মাইকের সামনে দাঁড়িয়ে রসট্রামকে খুব জোরে জোরো চাপড়ে যেভাবে কথা বলেন। ঠিক সেইভাবে ওয়েসিস এর শুভ্র বেডে শুয়েও তিনি কথা বলছিলেন আর বেডে হাত দিয়ে চাপড়ে দিচ্ছিলেন। তার সাথে কথা বলার ফাঁকেই কবিকে দেখতে সেখানে হাজির হন বিশিষ্ট সাংবাদিক কলামিস্ট আফতাব চৌধুরী, কবি আলিম উদ্দিন আলম। আমাদের সাথে থাকায় কবি আব্দুল বাছিতকে বশির ভাই বললেন, কবির জন্য দোয়া করতে। তারপর আমরা সবাই তার জন্য হাত তুলি রাব্বুল আলামীনের কাছে। তার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে এক এক করে কেবিন থেকে বের হয়ে যাচ্ছেন যখন সবাই, তখন দূর থেকে তাকিয়ে ছিলাম কবি’র দিকে। লক্ষ করলাম- তার চোখের কোনে এক ফোঁটা, দু’ফোঁটা করে জল জমতে শুরু করেছে। আমাদের বিদায় তার হৃদয়ের ব্যথা যেন আবার জেগে ওঠলো। তার চোখের জল টপ করে পড়ার আগেই কাছে গিয়ে বললাম, আপনি তো সম্পূর্ণ সুস্থ আছেন। খুব তাড়াতাড়ি মাইকের সামনে আপনাকে দেখবো। আমার কথা শুনে তার সেই অবাধ্য চোখের জলটুকু গাল বেয়ে ঝরতে লাগলো। কবি সহধর্মীনির কাছ থেকে বিদায় নিয়ে কেবিন থেকে দ্রুত বের হই। ওয়েসিস সিঁিড়তে দেখা হয় কবি বাছিত ইবনে হাবিবের সাথে। তার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে যে যার নীড়ে ফেরি। কবির অসুস্থতার কথা শুনে একনজর দেখতে প্রতিদিন ছুটে যেতেন সিলেটের লেখকরা। সেদিন বুঝতে পেরেছিলাম কবি কালাম আজাদকে কতটা ভালোবাসেন সবাই।
৩. গত ১৬ আগস্ট ২০১৭ কৈতর সিলেট এর উদ্যোগে কবি কালাম আজাদের ৭০ তম জন্মদিন পালন করা হয়। প্রতি বছরের মত সেদিনও তাঁকে কল করা হয়। হ্যালো বলার আগেই জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাই। কন্ঠস্বর শুনে আমাকে বরাবরের মত চিনতে পারলেন না। মোবাইলের লাইন কাটার আগেই বললাম আজ সন্ধ্যায় দেখা হচ্ছে। তিনি বললেন ‘কে বীথি’। চেনার আগেই ভালো থাকবেন বলে লাইনটা কেটে দেই। সিলেটে এমন কোন সাহিত্য অনুষ্ঠন নেই, যেখানে তিনি উপস্থিত থাকেন না। ভালোবাসার টানে ছুটে আসেন প্রতিটি অনুষ্ঠানে। যখনই তার সাথে দেখা হয় বিনীয় হাসি দিয়ে কুশলাদি জিজ্ঞাসা করেন। তার বক্তব্য শুনে সবসময় মুগ্ধ হই। গত ১০ জানুয়ারি ২০১৮ গল্পকার সেলিম আউয়ালের জন্মদিনের অনুষ্ঠানে উপস্থাপনা শেষ করে লিফট দিয়ে একসাথে নামছিলাম কবি কালাম আজাদ, বশির ভাই, বাছিত আমার ছোট বোন আমিনা। তখন কবি বলছিলেন-তুমি না থাকলে আমাদের কথা এত সুন্দর করে কে বলবে। আমার উপস্থাপনা তাকে মুগ্ধ করে।
সবশেষে বলব- শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব কবি কালাম আজাদ জীবনের শেষ দিনটি পর্যন্ত যেন সুস্থ থাকেন, ভালো থাকেন। সেই প্রত্যাশায় কবি’র প্রতি রইল অনেক শুভ কামনা।
১৭ জানুয়ারি ২০১৮

পরবর্তী খবর পড়ুন : সিলেটেও দাস কেনাবেচা হতো

আরও পড়ুন



তুমি ছাড়া যতকিছু

সৈয়দ সাকিব আহমদ এখনো আকাশ...

তুলনা

মিজানুর রহমান মিজান হয় না...

নাদেলকে তাহিরপুর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান বাবুল এর শুভেচ্ছা

সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি বাংলাদেশ আ,লীগের কেন্দ্রীয়...