একেএম বদরুদ্দোজার করোনাকালের ইতিকথা

প্রকাশিত : ০৪ আগস্ট, ২০২০     আপডেট : ১ মাস আগে
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সাঈদ চৌধুরী :
একেএম বদরুদ্দোজা একজন প্রাজ্ঞ লেখক, শিশু সংগঠক ও জনপ্রিয় আইনজীবী। তার লেখা আমাদের জীবন ও সমাজের দর্পণ, সুন্দরের প্রতীক ও কল্যাণের উৎস। তার হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়া বর্ণনা মনমুগ্ধকর।
নব্বই দশক থেকে একেএম বদরুদ্দোজা নতুন প্রজন্মকে ফুলের মত গড়ে তোলার লক্ষ্যে অক্লান্ত সাধনা করছেন। শিশূ-কিশোরদের সত্য ও ন্যায়ের সাধকে পরিণত করতে জেলায় জেলায় ঘুরে ঘুরে উদ্বুদ্ধ করেছেন। ফুলকুঁড়ি সুবাসিত ফুলের ন্যায় সুগন্ধি ছড়াবে এবং প্রজ্জ্বলিত প্রদীপের মত আজীবন আলো ছড়িয়ে দেবে সমাজের মধ্যে। স্বদেশ ও স্বজাতির প্রতি দায়বদ্ধতার চেতনা তরুণ হৃদয়ে জাগ্রত করতে তিনি প্রাণপাত করে চলেছেন বছরের পর বছর।
একেএম বদরুদ্দোজা অনেক দূরদৃষ্টি সম্পন্ন উপন্যাস ও প্রতিবাদী প্রবন্ধ-নিবন্ধ লিখে চলেছেন অব্যাহত ভাবে। বক্তব্যের স্পষ্টতা আর তীব্রতার জন্য তিনি খুই পাঠকপ্রিয়। দেশের সর্ব্বোচ্চ আদালত বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের খ্যাতিমান আইনজীবী ও কোম্পানী আইনের বিশেষজ্ঞ একেএম বদরুদ্দোজা সমৃদ্ধ জাতি গঠনের জন্য কাজ করছেন অকুতোভয় সৈনিকের মতো। তার বহুমুখি প্রয়াস সুধী মহলে ব্যাপকভাবে আলোচিত ও সমাদৃত। তিনি শোষিত মানুষের পক্ষে এক বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর।
একেএম বদরুদ্দোজার সাম্প্রতিক প্রকাশনা করোনাকালের ইতিকথা একটি সময়োপযোগী গ্রন্থ। করোনাভাইরাসে পাল্টে যাওয়া জীবন বাস্তবতায় বইটি সময়ের চাহিদা পুরণ করেছে। বইয়ের সূচিপত্র থেকেই লেখক কী বিষয় লিখেছেন তার ব্যাপকতা উপলব্ধি করা যায়।
বইটির গুরুত্বপুর্ণ বিষয়ের মধ্যে রয়েছে, করোনা : ভাবনার অতীত, বাংলাদেশে করোনা রোগী সনাক্ত, লকডাউন : জীবনযাত্রায় নতুন মেরুকরণ, করোনাশহিদ: ডাক্তার মঈন, স্বাপ্নিক বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ ইমামুল কবির শান্ত’র অনন্তলোকে যাত্রা, করোনাকলে খুলনায় ডাঃ আব্দুর রাকিব খানের হত্যাকাণ্ড, লকডাউন : শিথিল সবকিছু, ভিডিও কনফারেন্সে নতুন মাত্রা, হতাশাব্যঞ্জক ভূমিকা বিশ্ব নেতৃবৃন্দের, আমরা কোন অবস্থানে, মধ্যবিত্তরা বেকায়দায়, লেখালেখিতে মজেছি তখন, করোনাকাল: চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় করুণচিত্র উন্মোচন, করোনা ও সোশ্যাল মিডিয়া, প্লাজমা থেরাপি, সংক্রমণের ঝুঁকি : স্বাস্থ্যবিধি মানা না মানা বৃদ্ধি ও সুস্থ হওয়া, করোনাকালীন পারিবিারিক পর্যবেক্ষণ, মানবিক পাঠশালা, ঘূর্ণিঝড় আমফান, করোনায় বদলে যাওয়া জীবনের ছক, করোনা : সৌভাগ্যের প্রসূতি, মহামারি প্রাদুর্ভাব ও ইসলামি বিধিবিধান /শরীয়ত, ঘূর্ণিঝড় আমফান, করোনাসময়ের, ‘সংযুক্ত’ তুলনাহীন শব্দটি, থিয়েটারপাড়া, সরকার খুব ছোট হয়ে এসেছে, রমজান এবং আলকুদস, আমফান ও সুন্দরবনের ভূমিকা, বাঙালির কোয়ারেন্টিন, করোনাকালের অর্থনীতি, অন্যরকম এক ঈদ, এক ফ্রেমে গোটা পরিবার, সবকিছু খুলে দেওয়ার পর, আমেরিকান বসন্ত, বাংলাদেশের করোনা পরিস্থিতি, করোনার ঘাত-প্রতিঘাতে বিপর্যস্ত অর্থনীতি, কার্যকর ওষুধের খোঁজে মরিয়া, করোনা চিকিৎসা, প্রতারক চক্র, করোনায় করণীয় প্রভৃতি। গ্রন্থ থেকে অংশ বিশেষ এখানে তুলে ধরা হল।
করোনা : ভাবনার অতীত
২০২০ সালের জানুয়ারিতেও কেউ ভাবতে পারেনি এমন দিন আসবে। ঘরে বসে থাকতে হবে দিনের পর দিন। চাল, ডাল, পেঁয়াজ, মরিচের আগে ভাবতে হবে সাবান, হ্যান্ড স্যানিটাইজার, জীবাণুনাশক স্প্রে, মাস্ক, হ্যান্ডগ্লাভসের কথা। ডাক্তার-নার্স-টেকনিশিয়ানদের কর্মস্থলে যাওয়ার আগে পড়তে হবে পার্সোনাল প্রটেকশন ইকুইপমেন্ট বা পিপিই। জারি হবে নতুন স্বাস্থ্যবিধি। অর্থাৎ বারবার হাত ধোয়া, পানি সেবন বিশেষত গরম পানি এবং সবার উপরে সামাজিক দূরত্ব। করোনা আক্রান্তদের জন্য আইসোলেশন। সন্দেহভাজনদের জন্য কোয়ারেন্টিন এবং সাধারণভাবে জাতীয় বা এলাকাভিত্তিক বা আক্রান্ত জনপদ ও মহল্লাভিত্তিক লকডাউন। ব্যাংকে, ডিপার্টমেন্ট স্টোরে সেবা বা পণ্যের জন্য দাঁড়াতে হবে সারি বেঁধে। সন্দেহভাজনদের জন্য মুখ্য কাজ হবে পরীক্ষা। পজিটিভ হলে আইসোলেশন। আর যারা ঐ ব্যক্তির সংস্পর্শে এসেছিলেন তাদের জন্য সেলফ কোয়ারেন্টিন। উভয় ক্ষেত্রে মেয়াদ ১৪ দিন। পরবর্তী পরীক্ষার পর মুক্তি।চীনের উহানে ২০০৯ খ্রিষ্টাব্দের নভেম্বরে যখন অদৃশ্য এই ভাইরাসের আক্রমণ শুরু হয় তখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একে ‘চীনা করোনা’ বলে উপহাস করেছিলেন। চীনের হাতে বিস্তর সম্পদ। তার উপর রেজিমেন্টেড শাসন। তারা করোনা মোকাবেলায় উঠেপড়ে লাগে। ব্যয় করে প্রচুর অর্থ। পরীক্ষা, আইসোলেশন ও কোয়ারেন্টিন- এগুলোকে কার্যকরভাবে প্রয়োগ করে। উহানে এক রাতে তৈরি হয় ৫০০ বেডের করোনা হাসপাতাল। করোনার চাপে বিব্রত চীনা কর্তৃপক্ষ দেশের বিভিন্ন স্থানে মসজিদ খুলে দেয়। সোশ্যাল মিডিয়ার কেউ কেউ চীনের বিরুদ্ধে বিরূপ প্রচারণায় ব্রতী হন। তারা করোনা দুর্যোগকে উইঘুরে মুসলিম নির্যাতনের জন্য আল্লাহর গজব বলে আখ্যায়িত করেন।
আমরা এখন বাস করছি গ্লোবাল ভিলেজে। করোনাভাইরাসের অবলম্বন মানবদেহ। সেই সূত্র ধরে করোনার বিশ্বজয়ের সূত্রপাত। ২০২০ খ্রিষ্টাব্দের জানুয়ারি থেকে ইরানে করোনার প্রকোপ শুরু হয়। আমি ২৯ ডিসেম্বর’২০১৯ স্বপরিবারে উমরাহ পালনের জন্য সৌদি আরব যাই। মক্কা-মদিনা মিলিয়ে দুই সপ্তাহের বেশি সময় সেখানে অবস্থান করি। মক্কায় অবস্থানকালে একাধিকবার উমরা করি এবং সময় সুযোগ পেলেই আল্লাহর ঘর তাওয়াফ করি। মক্কার অদূরে তায়েফ এবং জেদ্দায় লোহিত সাগরের তীর পরিদর্শন করি। তাছাড়া আল্লাহর রাসুল (সা.)এর ওহী নাজিলের স্মৃতিবহ হেরাগুহা এবং হিজরতের স্মৃতিবহ সত্তরগুহা, জাবালে রহমত ও আরাফা ময়দান, নামিরা মসজিদ, মিনা, মুজদালিফা, জামারা ইত্যাদি হজের পবিত্র স্থানসমূহ পরিদর্শন করি। মদিনায় সংক্ষিপ্ত অবস্থানকালে মসজিদে নববীতে উনিশ ওয়াক্ত নামাজ জামাতে পড়েছি। প্রতিদিনই রিয়াজুল জান্নাতে নফল নামাজ আদায় এবং প্রিয়নবী (সা.) এবং তাঁর দুই বিশ্বস্ত সহচরের রওজা মোবারক জিয়ারত করেছি।ঘুরে দেখেছি মদিনার খেজুর বাগান, ওহুদ যুদ্ধের স্মৃতি বিজরিত স্থান, মসজিদুল কেবলাতাইন, মসজিদে কোবা, রাসুল (সা.)-এর স্মৃতিবিজড়িত একটি কূপ।
তখনো মক্কা-মদিনায় করোনার প্রাদুর্ভাব ঘটেনি। প্রতিদিনই শতশত হাজি সৌদি আরব যাচ্ছিলেন। আমরা সুস্থ স্বাভাবিক অবস্থায় অবাধে উমরাহ ও জেয়ারতে রওজাতুন নবী সম্পন্ন করি। তখন মক্কায় স্বাভাবিক ঠান্ডা। মদিনায় ঠান্ডার মাত্রা বেশি। অনুকূল আবহাওয়ার জন্য বিপুল সংখ্যক মুসলিম নর-নারী সৌদি আরবে গমনাগমন করেন। তারা সবাই সুন্দরভাবে উমরাহ ও জিয়ারতে মদিনা সম্পন্ন করেন। এই সময় ইরানে করোনা ব্যাপ্তি লাভ করতে থাকে। এরই মধ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে ইরাকে ইরানের ইসলামিক রিপাবলিকান গার্ডসের কুদস বাহিনীর প্রধান জেনারেল কাশেম সুলাইমানিকে হত্যা করা হয়। ইরানও কিছু পাল্টা পদক্ষেপ নেয়। উপসাগরীয় দেশগুলোর উড়োজাহাজ আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। কিন্তু তখনো সৌদি আরব বা উপসাগরীয় দেশগুলোতে করোনার নিয়ে কোনো উদ্বেগ তৈরি হয়নি। দেশে ফেরার পর ইরানে করোনার প্রসার লক্ষ্য করি। ইরানিরা করোনা আক্রান্তদের চিকিৎসার জন্য ওষুধ আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে দেওয়ার আহ্বান জানালেও যুক্তরাষ্ট্র তা করেনি।
এরপর করোনা আগ্রাসন চালায় ইউরোপে। শুরু ইতালি থেকে, তারপরে স্পেন, ফ্রান্স, জার্মানি হয়ে গোটা ইউরোপ, যুক্তরাজ্য এবং যুক্তরাষ্ট্র। ইতালির ক্ষমতাসীন দলের সংসদীয় নেতা বলেছিলেন, ‘করোনার জন্য আমরা বদলাব না। আমরা আমাদের সিস্টেমে চলে করোনাকে মোকাবেলা করব।’এ সবই ছিল বাগাড়ম্বর। ইতালিই সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতির শিকার হয়। সেখানে ষাটোর্ধ্ব লোকদের হাসপাতালের বেডে শুইয়ে রাখা হয়েছিল। চিকিৎসা দেয়া হয়নি। কারণ, ইতালির স্বাস্থ্যব্যবস্থার সে সামর্থ ছিল না। পূর্বোক্ত নেতাও করোনায় আক্রান্ত। কিছুই বদলাতে হয়নি ইতালিকে, করোনাই সব বদলে দেয়।
৫ মার্চ ২০২০ সৌদি কর্তৃপক্ষ মসজিদুল হারাম ও মসজিদে নববীতে জমজমের পানিসহ খাবার ও পানীয় গ্রহণ বন্ধ করে দেয়। ২০ মার্চ দুই মসজিদে নামাজ, উমরা, সায়ী বন্ধ করে দেওয়া হয়। তবে মসজিদের ইমাম ও অন্যান্য কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নামাজ ও তাওয়াফের সিলসিলা অব্যাহত রাখেন। এর আগে ১৫-২০ মার্চ কাবাঘরের চারদিকে বেষ্টনি দিয়ে তাওয়াফ করতে দেওয়া হয়। কিন্তু ২০ মার্চের পর বাইরের কোনো মুসল্লিকে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। সৌদি আরবের মুফতিরা দুই পবিত্র মসজিদসহ দেশের সকল মসজিদে নামাজের জামাতে অংশগ্রহণ বারিত করে ফতোয়া দেন। নামাজের আজানে যেখানে বলা হয়, ‘এসো কল্যাণের দিকে’; তার পরিবর্তে ঘরে নামাজ আদায় ও সুস্থ থাকার কথা যুক্ত করা হয়।
রমজানে দুই পবিত্র মসজিদ সীমিত আকারে খুলে দেওয়া হয়েছিল। উমরা ভিসা বন্ধ থাকায় লোক সমাগম কম। প্রবেশপথে যন্ত্র বসিয়ে মুসল্লিদের পরীক্ষা করা হচ্ছে। মানব ইতিহাসে হজ-উমরার উপর বিধিনিষেধ আরোপ, তাওয়াফে নিয়ন্ত্রণ সবই এই প্রথম। কাবাঘরের চারপাশে স্বাস্থ্য নিরাপত্তা বেষ্টনী কাবাকে তাওয়াফকারীদের থেকে দূরে সরিয়ে নিয়ে গেছে। তাছাড়া তাওয়াফের জনস্রোতও আর নেই। টেলিভিশনে জনবিরল বেষ্টিত কাবাঘর দেখলে মনটা খারাপ হয়ে যায়। সৌদি কর্তৃপক্ষ রমজানে মসজিদ খোলা নির্দেশ দেন। তবে দুই পবিত্র মসজিদে তারাবি ১০ রাকাতে সীমিত করা হয়েছে এবং এতেকাফের অনুমতি দেওয়া হয়নি। করোনাভাইরাসে ১৩ মে পর্যন্ত সারাবিশ্বে মোট আক্রান্ত ৪২,৯২,৫০৬ জন। মৃত্যু ২,৮৮,৯৭৫ জন। আক্রান্তের প্রায় এক তৃতীয়াংশ যুক্তরাষ্ট্রের। মৃতেরও প্রায় ৩০ শতাংশ যুক্তরাষ্ট্রের। যুক্তরাষ্ট্রের পেছনে আছে স্পেন, রাশিয়া, ব্রিটেন, ইতালি, ফ্রান্স, জার্মানি, ব্রাজিল, তুরস্ক, ইরান।
বাংলাদেশে করোনা রোগী শনাক্ত
বাংলাদেশে ৮ মার্চ প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হয়। উহানে করোনার প্রাদুর্ভাবের পর ২৬ মার্চ লকডাউন জারি পর্যন্ত বিমান, স্থলপথ ও জাহাজে কয়েক লাখ লোক বাংলাদেশে প্রবেশ করে। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার সর্তকতা সত্ত্বেও আমরা এই যাত্রীদের যথাযথ স্বাস্থ্য পরীক্ষা ছাড়াই দেশে ঢুকে অবাধে চলাফেরা করার সুযোগ দিই। তারাই করোনাকে সকলের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেন। শোনা যায়, উৎকোচের বিনিময়ে যাত্রীরা গণহারে জনপ্রতি ৫০০টাকা দিয়ে স্বাস্থ্য ছাড়পত্র নিয়ে বেরিয়ে গেছেন। নারায়ণগঞ্জের করোনার ব্যাপক সংক্রমণের মূলে ছিলেন এক ইতালি প্রবাসী দম্পতি। তারা বিমানবন্দরের বৈতরণী অবলীলায় পার হয়ে এসে দেশের নানা সামাজিক অনুষ্ঠানে যোগ দেন এবং আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে বেড়াতে যান। প্রেস রিপোর্ট থেকে দেখা যায়, এরা অল্পসময়ের মধ্যে ব্যাপক সংখ্যক লোকের সংস্পর্শে গেছেন। এই সংস্পর্শকদের বেশির ভাগ করোনা আক্রান্ত হয়েছেন। নারায়ণগঞ্জ শহরের দুটি সরকারি হাসপাতালের ডাক্তার, নার্স, মেডিকেল এসিস্ট্যান্ট করোনা আক্রান্ত হওয়ায় এগুলি শাটডাউন করা হয়।
শুরুতে আমাদের স্বাস্থ্য অধিদপ্তর মাঠে নামেনি। আইইডিসিআর প্রতিদিন পরীক্ষা ও ফলাফলের তথ্য দিত। তখন একমাত্র আইইডিসিআর’ই করোনা টেস্ট করত। কাজেই আনুষঙ্গিক তথ্যসহ পরীক্ষার ফলাফল সম্পর্কে আইইডিসিআর-এর ব্রিফিং প্রাসঙ্গিক ছিল। দক্ষতার সাথে কাজটি করে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক ডা. মীরজাদী সাবরিনা ফ্লোরা ব্যাপকভাবে আলোচিত হন। তবে কিছুদিনের মধ্যেই ব্রিফিংয়ে সম্পৃক্ত হোন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহেদ মালিক এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ও অন্যান্য কর্মকর্তারা। সংক্রামক ব্যাধি আইন ২০১৮-এর বিধান মোতাবেক কোনো মহামারির প্রাদুর্ভাব ঘটলে তা নিয়ন্ত্রণের আইনানুগ কর্তৃপক্ষ স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। করোনাকে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা এপিডেমিক বা মহামারীর চেয়েও অনেক ঊর্ধ্বে পেনডামিক হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। তাই করোনা মোকাবেলায় সিদ্ধান্ত গ্রহণের কর্তৃপক্ষ স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। তাদের আদেশ-নিষেধ সরকারের সকল প্রতিষ্ঠান ও বিভাগের উপর কার্যকর ও বাধ্যকর।
৮ মার্চের পর ধীরে ধীরে পরীক্ষা ও শনাক্তকরণ বাড়তে থাকে। নতুন করে বিদেশ থেকে আগতদের ১৪ দিনের বাধ্যতামূলক কোয়ারেন্টিনে পাঠানো হয়। অন্যদিকে পজিটিভ হওয়াদের অবস্থাভেদে নিজ বাড়িতে আইসোলেশনে রাখা হয় বা অবস্থার অবনতি হলে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। শুরুতেই করোনা চিকিৎসার জন্য আলাদা হাসপাতাল বা চিকিৎসাকেন্দ্র ছিল না। করোনা রোগীরা যেসব হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গেছেন সেখানে ডাক্তার, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মীরা দলে দলে আক্রান্ত হন।
মার্চের শুরু থেকেই স্কুল-কলেজে ছাত্র-ছাত্রীর উপস্থিতি কমে যায়। অজ্ঞাত কারণে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ছুটির ঘোষণা বিলম্বিত করে। ছুটি ঘোষণার পর দেখা গেল ভিন্ন চিত্র। লক্ষাধিক অভিভাবক আনন্দ-বিনোদনের জন্য কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে সপরিবারে জড়ো হয়েছে। কোথায় সাবান দিয়ে ঘন ঘন হাত ধোয়া? কোথায় নাকে মাস্ক আর কোথায় সামাজিক দূরত্ব? সৈকতে অজস্র মানুষ গাদাগাদি করে হাঁটছেন, সাগরের নামছেন আর পানিতে জলকেলী করছেন। বিমানবন্দর দিয়ে প্রবাসীদের মাধ্যমে যে ভাইরাস প্রবেশ করেছিল কক্সবাজারে তা ব্যাপক বিস্তারের সুযোগ পায়। এরপর ঘটে গার্মেন্টস খোলার পায়তারা। প্রথম দফার লকডাউনের মেয়াদ ৪ এপ্রিল শেষ হবার পর গার্মেন্ট খুলে দেওয়ার একটা চেষ্টা হয়। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ও ইতিবাচক আভাস দেয়। বিজেএমইএ দুই পা এগিয়ে এক পা পিছিয়ে যায়। ইতোমধ্যে গার্মেন্টস খোলার বার্তা চলে যায় তৃণমূলে। গার্মেন্টস কর্মীরা দলে দলে ঢাকার পথে রওয়ানা দেয়।
সমালোচনার ঝড় উঠে। টনক নড়ে সরকারের। পিছু হটে বিজিএমইএ। কিন্তু খুব বেশি দিন আটকে রাখা যায়নি তাদের। ২০ এপ্রিল গার্মেন্টস খুলে দেয়া হয়। কথা ছিল শুরুতে ফ্যাক্টরির আশেপাশের শ্রমিক দিয়ে সীমিত আকারে উৎপাদন চালু করা হবে। কিন্তু এসব ছিল ধাপ্পা। দেশের সব এলাকা থেকে গার্মেন্টস শ্রমিকরা কাজে যোগদানের জন্য দলে দলে টঙ্গী, গাজীপুর, সাভার, আশুলিয়া ও নারায়ণগঞ্জের দিকে আসতে থাকে। দুই দফায় গার্মেন্টস শ্রমিকদের নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরে আশেপাশের এলাকা গমনাগমন করোনার বিস্তারে বিশেষ ভূমিকা পালন করে। চব্বিশে মার্চ যখন চলমান লকডাউন ঘোষিত হয় তখন গণপরিবহন বন্ধের কোনো নির্দেশ ছিল না। ২৪-২৫ মার্চ দুই দিনে অসংখ্য মানুষ করোনা সম্ভাবনা নিয়ে দেশের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েন।
সাম্প্রতিক করোনা কালে আর কোনো দেশে এমন অসতর্ক ছুটি ও লকডাউনের প্রাক্কালে দেশের ভেতরে এত ব্যাপক লোক স্থানান্তর কোথাও ঘটেনি। অথচ করোনা রোধের মূল কৌশল আক্রান্ত এলাকার লোক জনকে সেখানে ধরে রাখা এবং অন্য এলাকার লোকদের সেখানে যেতে না দেওয়া। আমাদের ক্ষেত্রে উল্টোটি হলো। সর্বাধিক আক্রান্ত ঢাকা মহানগর, নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, গাজীপুর, সাভার থেকে ব্যাপক সংখ্যক লোক বাইরে গেছে আবার ফিরে এসেছে। করোনাকালে প্রথম ও প্রধান কাজ আক্রান্ত বাড়ি, ভবন বা এলাকা চিহ্নিত করা ও লকডাউন। সেখানে গমন ও সেখান থেকে নির্গমন নিয়ন্ত্রণ। শুরু থেকেই কাজটি ঠিকমতো হয়নি বরং বিরাট কমিউনিটি মুভমেন্ট ভাইরাসবাহীদের প্রত্যন্ত এলাকায় পৌঁছে দিয়েছে। ফলে এখনো অন্যান্য দেশের তুলনায় আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা কম হলেও কী ঘটতে যাচ্ছে তা বোধগম্য নয়। স্কুল ছুটির পর কক্সবাজার ফেস্টিং, গার্মেন্টসে দু’দফায় শ্রমিক মুভমেন্ট এবং ছুটি পেয়ে যার যার এলাকায় যাওয়ার লোকের সংখ্যা এক কোটির কম হবে না।
এই লোকগুলো সারা বাংলাদেশে আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে গেছে। ওদিকে নভেম্বর ২০১৯ থেকে এবছরের ২৫ মার্চ পর্যন্ত দেশে ফেরা ৭-৮ লাখ প্রবাসী বিনা বাধায় মিশে গেছে কমিউনিটিতে। ঝালমুড়ি বানানোর মতো অবস্থা। প্রবাসী, সন্দেহভাজন, আক্রান্তÑ সবাইকে এক পাত্রে ঢুকিয়ে আচ্ছা সে ঘোটা। ফলাফল যা হওয়ার তাই হয়েছে। এই নীরব ঘাতক এখন লাখো মানুষের ভেতরে স্থান নিয়েছে। ১৩ মে দেশে আক্রান্ত ১৬ হাজার ছাড়াল বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক ডা. নাসিমা সুলতানা। এট হলো সরকারি হিসাব। অনেকেই টেস্ট করাচ্ছেন না আবার উপসর্গ না থাকায় অনেকেই টেস্টমুখী হচ্ছেন না। এ যাবত ৩৮টি ল্যাবে টেস্ট চালু হলেও আইইসিডিআরের ল্যাব বাদে অন্যান্য ল্যাবে টেস্টের সুযোগ সীমিত।
আইইডিসিআর নমুনা সংগ্রহ বন্ধ করে দিয়েছে। ফলে স্বপ্রণোদিত হয়ে যারা বুথে গিয়ে নমুনা দিচ্ছেন তাদেরই পরীক্ষা হচ্ছে। এতদিন বাড়িতে বাড়িতে নমুনা সংগ্রহের কাজ করত আইইডিসিআর (রোগতত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট)। নমুনা সংগ্রহের দায়িত্ব থেকে এক পর্যায়ে আইইডিসিআর’কে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। দায়িত্বটি গ্রহণ করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। আইইডিসিআর করোনা সংশ্লিষ্ট কাজকর্মে প্রথম পাদপ্রদীপে আসে। করোনা নিয়ে তারাই নিয়মিতভাবে গবেষণা এবং সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করছিল। এতে আইইডিসিআরের পরিচালক ডা. শাহজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা সকল মহলে সমাদৃত হন। যে কারণে স্বাস্থ্য-অধিদপ্তর তাকে সরিয়ে দিয়ে সরকারি প্রেস বুলেটিন প্রচার করছে। করোনা প্রতিরোধে আইন নেতৃত্ব দানের ক্ষমতা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে দিয়েছে। এই সময়ে স্বাস্থ্যবিধি প্রণয়ন ও নিয়ন্ত্রণ তাদেরই দায়িত্ব। এই বিষয়ে প্রেসব্রিফিংয়ের দায়িত্ব তাদের ওপরই বর্তায়। জনগণকে দিকনির্দেশনা প্রদানের দায়িত্বও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের। কিন্তু রোগতত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণার জন্য গঠিত ইনস্টিটিউটকে এই নাজুক সময় মুখে তালা দিয়ে বসিয়ে রাখার বা তাদের কার্যক্রম সীমিত করার কোনো কারণ থাকতে পারে না। নিজস্ব পরিসরে তারা তাদের বিশেষায়িত কার্যক্রম চালিয়ে যাবে এবং নিশ্চয়ই সেজন্য প্রেসব্রিফিংও করতে পারে। লকডাউনের সময় অধিকাংশ মানুষ ঘরে থাকে। তারা করোনা সংক্রান্ত তথ্যের জন্য ইলেকট্রনিক মিডিয়ার উপর নির্ভরশীল। এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত বুলেটিন অবশ্যই প্রচার হবে।
আইইডিসিআর’ও তাদের প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত ও গবেষণার উপর প্রেস ব্রিফিং করতে পারে। এতে ভুক্তভোগী জনগণ উপকৃত হবে।করোনা প্রতিরোধের জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে পরামর্শ ছিল প্রথমত ঘরে থাকা। বিশেষ কাজে বাইরে বেরুলে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা, যা কমপক্ষে ৩ ফুট বলে জানানো হয়। দ্বিতীয়ত বার বার সাবান দিয়ে ২০ সেকেন্ড হাত ধোয়া।তৃতীয়ত বেশি বেশি পানি বিশেষ করে গরম পানি খাওয়া। চতুর্থত বাইরে বেরুলে মাস্ক পরিধান ও হাতে গ্লাভস পরা।পঞ্চমত বাইরে থেকে ঘরে ফেরার পর মাক্স, গ্লাভস খুলে নিরাপদ জায়গায় রাখা, হাত ধোয়া, জামাকাপড় ধুয়ে ফেলা এবং গোসল করা। ষষ্ঠত মোবাইল, ঘড়ি, ঘরে ঢোকার সময় ব্যবহৃত দরজায় হ্যান্ডেল ইত্যাদি সেনিটাইজার বা জীবাণুনাশক দিয়ে পরিষ্কার করা। সপ্তমত বাজার থেকে আনা ব্যাগে জীবাণুনাশক স্প্রে করে তা রেখে দেওয়া। পরে বাজার থেকে আনা মাছ-গোশত তরকারি ফল ইত্যাদি গরম পানি দিয়ে ধুয়ে পরিষ্কার করার পর রান্না ও আহার। অষ্টমত ঘরে কার্পেট ব্যবহার না করা। ফ্লোর দিনে অন্তত একবার ফিনাইল বা জীবাণুনাশক মেশানো পানিতে মুছে পরিষ্কার করা।নবমত করোনার উপসর্গ যথা; জ্বর, সদির্, কাশি, গলাব্যথা, শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে টেস্ট করা। টেস্টে পজিটিভ হলে আইসোলেশনে যাওয়া। অবস্থার অবনতি হলে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া। যিনি পজিটিভ হয়েছেন তার সঙ্গে আসা লোকজনকে ১৪ দিনের সেলফ কোয়ারেন্টিনে থাকতে হবে। এরপর টেস্টে নেগেটিভ হলে মুক্ত জীবনে যাবেন।
লকডাউন : জীবনযাত্রায় নতুন মেরুকরণ
২৪ মার্চ লকডাউন ঘোষণার পর ২৫ মার্চ চেম্বারে গিয়ে জরুরি কাজগুলো সম্পন্ন করি। সহকর্মীদের অনেকেই সেদিন চেম্বারে আসতে পারেনি। দ্রুত ব্যাংক থেকে টাকা তুলে সহকর্মীদের মার্চ মাসের আগাম বেতন পরিশোধ করি। অনেকদিন ধরেই কোম্পানি আইনের উপর একটা বই লেখার ইচ্ছা। তাই কোম্পানি আইনের উপর কিংবদন্তি আইনজ্ঞ ড. এম জহিরের বইসহ ইংলিশ ও ভারতীয় জুরিডিকশনের একাধিক বই বের করে গাড়িতে উঠাতে বলি। ২৬ মার্চ লকডাউনের প্রথম দিন আল্লাহর নাম নিয়ে কোম্পানি আইনের উপর বই লেখায় হাত দিলাম। আমি নোট ও টিকা-টিপ্পনীসহ প্রচলিত কোম্পানি আইন, লেখার জন্য বসব না। আমি আমার সীমাবদ্ধতা জানি। কিন্তু তবুও নিজের জন্য একটা উচ্চাভিলাসী লক্ষ্য স্থির করলাম। এমন একটি বই লিখব যা নবীন প্র্যাকটিশনারদের পথ দেখাবে, প্রবীণদের ভিন্ন দৃষ্টিতে অবলোকনের সুযোগ দেবে আর সংশ্লিষ্ট বিচারক পাবেন আইনের প্রয়োগ ও ব্যাখ্যার কিছু উপাদান। কোম্পানি প্র্যাকটিসে আমি নেতৃস্থানীয় কেউ নই। কিন্তু যুগপৎ জয়েন্ট স্টক কোম্পানিজ এন্ড ফার্মসের কার্যালয়ের বিধিবদ্ধ রিটার্ন দাখিল, কোম্পানি নিবন্ধন ও অন্যান্য কার্যক্রমে ব্যাপক অভিজ্ঞতার পাশাপাশি হাইকোর্ট ডিভিশনে কোম্পানি প্র্যাকটিসের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা আমাকে একটি বিরল অবস্থান দিয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে আমি আইনের বিধান ও প্র্যাকটিসের অভিজ্ঞতার আলোকে ব্যবহারোপযোগী একটি বই লেখার কাজ শুরু করি। ২০ মার্চ থেকে ২৫ এপ্রিল দীর্ঘ একমাস আমি অধিকাংশ সময় কাটিয়েছি লেখার টেবিলে। লিখতে গিয়ে যখনই কোনো শব্দ বা তার দ্যোতনা নিয়ে সন্দেহ হয়েছে অভিধান রেফারেন্স বই দেখে, প্রয়োজনে গুগলে সার্চ করে সন্দেহ অপনোদন করেছি। কোনো শব্দের সংজ্ঞা আইনে না থাকলে সঠিক উৎস থেকে তা সংগ্রহ করে আমার বইয়ে সন্নিবেশিত করেছি। কোম্পানি প্র্যাকটিস আমাকে কম দেয়নি। তাই নামধাম বা প্রচারের জন্য নয় দায়বদ্ধতার অনুভূতি নিয়ে বইটি লিখেছি। আমার প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ১৯। অধিকাংশ উপন্যাস। আইনের উপর আমার এটি প্রথম বই। আইনের উপর আগে বই লিখতে পারিনি। কারণ, করোনাজনিত লকডাউন ছিল না। বই লেখার এমন সুন্দর ও উপযোগী পরিবেশের কথা ভাবাই যায় না। আমি একদিকে লিখছি অন্যদিকে আমার ছেলে ইঞ্জিনিয়ার ফারদিন হাসিন তা কম্পিউটার কম্পোজ করে চলেছে। তাকে নিয়ে কাজ করার বাড়তি সুবিধা হলো ইংরেজিতে তার স্বাচ্ছন্দ্য ও দখল। অনেক জায়গায় তার সাথে কথা বলে টেক্সট ইম্প্রুভাইজ করেছি।
প্রথম তারাবি পড়লাম কোম্পানি আইনের উপর বইয়ের পাণ্ডুলিপি সমাপ্ত করে। টানা একমাস নির্বিঘ্নে লিখেছি। প্রতিদিন নিদেনপক্ষে ১০ঘন্টা তো হবেই। ছেলেকে কম্পোজের ভার দিয়ে নতুন কাজে হাত দিলাম। আমার প্রকাশক উষার দুয়ার প্রকাশনীর কর্ণধার কাব্য সুলতানা হজের উপর স্মৃতিচারণমূলক একটা বইয়ের জন্য তাগাদা দিয়ে আসছিল বহুদিন ধরে। পহেলা রমজান অর্থাৎ ২৫ এপ্রিল শুরু করলাম নতুন বইয়ের কাজ। কোম্পানি আইনের উপর বইটি লিখেছি ইংরেজিতে। হজের উপর সঙ্গত কারণে বাংলায় লিখতে শুরু করলাম। ২০১৫ সালে হজ আর ২০১৯ সনের ২৯ ডিসেম্বর থেকে ২০২০ সালের ১৩ জানুয়ারি উমরা পালনের জন্য মক্কা ও মদিনায় যাই। যাওয়া-আসার পথে ট্রানজিট ছিল দুবাইতে। ৩০ ডিসেম্বর ফজরের নামাজের পর দুবাই বিমানবন্দরে ইহরাম বেঁধে সপরিবারে জেদ্দায় পৌঁছি সকাল দশটার দিকে। শুধু হজের উপর স্মৃতিচারণের পরিবর্তে বিষয়বস্তু হিসেবে বেছে নেই পবিত্র হজ ও উমরার স্মৃতিচারণ। ৮ মার্চ ২০২০ রমজানের মধ্যে পাণ্ডুলিপি তৈরি হয়ে যায়।
হাতে সময় ঢের। শিশু-কিশোর-তরুণ সম্প্রদায়কে নিয়ে কাজ করছি ৪৫ বছর ধরে। শতাধিক ক্যাম্পে কখনো পরিচালক কখনো উপস্থাপক কখনো মেন্টার হিসেবে কাজ করেছি। একত্রে থেকেছি টানা তিন বা চার দিন। বিদায়বেলা তাদের অশ্রুসজল চোখ দেখে বেদনাহত হয়েছি। পেশাগত ব্যস্ততায় এখন সেইরকম সময় দিতে পারি না। তবু এরাও আমার বর্ধিত পরিবার। পরবর্তী প্রজন্মের সাথে সংলাপ ও ভাব বিনিময়ের নেশা আমায় ছাড়েনি এখনো। ডাক পেলে ছুটে যাই তাদের ক্যাম্পে। যতক্ষণ থাকা সম্ভব ততক্ষণ থাকি তাদের পাশে। অমিত সম্ভাবনা দেখি ওদের চোখেমুখে। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী হই। ৯ মার্চ থেকে শুরু করি নতুন কাজ। এবারের বিষয় ক্যাম্পিং। নানা চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে শিশু-কিশোর ও তরুণদের ক্ষুদে নাগরিকে রূপান্তরের এক কারখানা এই ক্যাম্প। ব্যক্তিগত চ্যালেঞ্জের অনেকগুলো বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছি। এমনকি বইয়ের মধ্যে ক্যাম্পে উপস্থাপনযোগ্য এগারটি কবিতা ও গান সন্নিবেশিত করেছি।
আমার চয়ন করা ১১টি কবিতার বাইরে বাংলাসাহিত্যে আরো অনেক ভালো কবিতা আছে। কিন্তু আমার বিবেচনায় এই এগারটি কবিতা প্রতিনিধিত্বশীল। পাশাপাশি রাখলে পুরো বাংলাদেশের মুখ। কবিতাগুলি হলো বীরপুরুষ- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সংকল্প- কাজী নজরুল ইসলাম, বঙ্গভাষা- মাইকেল মধুসূদন দত্ত, ভেবে ভেবে ব্যথা পাব- জীবনানন্দ দাশ, প্রতিদান- জসিম উদ্দিন, পাঞ্জেরি- ফররুখ আহমদ, আমার পূর্ব বাংলা- সৈয়দ আলী আহসান, স্বাধীনতা তুমি- শামসুর রাহমান, নোলক- আল মাহমুদ, ছাড়পত্র- সুকান্ত ভট্টাচার্য, আমি কিংবদন্তির কথা বলছি- আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ।
যেকোনো মানুষের অন্তত এই ধরনের দশটি কবিতা বা তার অংশবিশেষ মুখস্ত থাকা উচিত। ছোটদেরও কবিতা মুখস্থ এবং আবৃত্তি শিক্ষা দিতে হবে। এ ধরনের লকডাউনে ঘরে বসে আবৃত্তি করা উপভোগ্য। এমনকি খালি গলায় গান গাইতে পারে। সারাক্ষণ টিভি দেখা বা মোবাইল টেপার চেয়ে এটা অনেক ভালো। এই ধরনের চর্চা থেকে হয়তো ঘরে ঘরে আবৃত্তিকার ও শিল্পী তৈরি হবে না কিন্তু ছুটির বা লকডাউনের দিনে বা দেশ-বিদেশে ভ্রমণের সময়, এমনকি কোনো ঘরোয়া বা সামাজিক অনুষ্ঠানে একটা কবিতা আবৃত্তি করে বা একটা গান শুনিয়ে সামাজিক আবদার পূরণ করা যাবে। আপনার স্টকে কিছুই না থাকলে আপনি বিব্রত হতে পারেন। আমার কবিতার স্টক বেশ ভালো। অবলীলায় আবৃত্তি করতে পারি নিঃসঙ্গ সময়ে বা কোনো অনুষ্ঠানে। বক্তৃতায় জুড়ে দিতে পারি উপযোগী উদ্ধৃতি। ছোটদের অনুষ্ঠানে দুই-তিনটা গানও গাই। আমি কখনো গান শিখিনি। সুর-তাল-লয় খুব ভালো বুঝি না। তবুও ছোটদের আনন্দ দেওয়ার জন্য গাই। তার মধ্যে আমার নিজের গ্রন্থিত ও সুরারোপিত একটি জারি গান ছোটদের ভারি পছন্দ। ওদের কোনো অনুষ্ঠানে গেলে শোনাতেই হয়।
গানটি শুরু এভাবে
পাখির যুদ্ধ আরম্ভ হইল ময়দানে
পাখির যুদ্ধ আরম্ভ হইল….
তাছাড়া আরেকটি ছড়াগান শোনাই তাদের কখনো কখনো।
ও আমার হাঁসের ছাউ রে
ঠিল্লা ভইরা রাখছি কুড়া
ছোকছুকাইয়া খাইতরে
ও আমার হাঁসের ছাউ রে…
করোনাকালে আবৃত্তি করুন। গান গেয়ে সময় কাটান। ছোটদের গান শোনান। দেখবেন বাচ্চাকে ঘুম পাড়ানোর কাজটা সহজ হয়ে উঠেছে।
লকডাউন শুরুর পর নিজস্ব একটা রুটিন করে নিই। ফজরের নামাজের পর ২-৩ ঘন্টা ঘুম। ঘুম থেকে উঠে বাসার সামনে ধানমন্ডি লেকের পাশে প্রায় নির্জনে সর্বোচ্চ একঘন্টা মর্নিং ওয়াক। অবশ্যই মুখে মাস্ক হাতে গ্লাভস পরে। বাসায় ফিরে গ্লাভস, মাস্ক নিরাপদ জায়গায় রেখে গোসল। তারপর নাস্তা এবং পত্রিকা পড়া। দশটার দিকে বসে যেতাম কাগজ-কলম নিয়ে। সময়মত নামাজ, দুপুরে ঘণ্টা দুয়েক টিভি দেখা বাদ দিয়ে রাত একটা পর্যন্ত লিখেছি। কখনো কখনো হাত ভার হয়ে উঠত। পিঠে ব্যথা অনুভব করতাম। লেখার গতি কমিয়ে নিজস্ব ভঙ্গিতে ব্যায়াম করে সামলে নিতাম। টেবিল ছেড়ে যাইনি। ফল পেয়েছি হাতেনাতে। একমাসের মাথায় কোম্পানি আইনের উপর পাণ্ডুলিপি তৈরি হয়ে গেল। পরের ১০ দিনে পবিত্র হজ ও উমরার স্মৃতিচারণের বইটির পাণ্ডুলিপিও তৈরি হয়ে গেল। তৃতীয় কাজটি ছিল শিশু-কিশোর ও তরুণদের লিডারশিপ ক্যাম্পিং। এই পাণ্ডুলিপিও চূড়ান্ত হলো ১৩ মে।
আমি থামলাম না। পেশাগত কাজ প্র্যাকটিস অনেক হয়েছে। চতুর্থ বইয়ের কাজে হাত দিলাম। শিরোনাম ঠিক করলাম ‘করোনাকালের ইতিকথা’। গ্লোবাল ভিলেজ কথাটা চালু হয়েছে কয়েক দশক আগে। কিন্তু এই ভিলেজের কোনো অভিন্ন সামাজিক অনুষঙ্গ দেখা যাচ্ছিল না। করোনা সে অভাব মিটিয়ে দিলো। এখন করোনার বদৌলতে ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা থেকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সবাই একই সমতলে। উন্নত ও উন্নয়নশীল পশ্চাৎপদ সব দেশের জন্য একই দাওয়াই। সামাজিক দূরত্ব, হাত ধোয়া, মাস্ক ও গ্লাভস ব্যবহার এবং পিপিই পরিধান। সেইসাথে সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিতের জন্য লকডাউন। আক্রান্তের জন্য আইসোলেশন আর তাদের সংস্পর্শে আসা এবং বিদেশফেরতদের জন্য হোম কোয়ারেন্টিন ও প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টিন। এই রোগের নাম দেওয়া হয়েছে করোনাভাইরাস ডিজিজ বা কোভিড-২০১৯। এর কোনো প্রতিষেধক টিকা বা ইনজেকশন বা নিরাময়ের জন্য কোনো ঔষধ এ পর্যন্ত আবিষ্কৃত হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রে ইবোলা ভাইরাসের ওষুধ রেমডেসিভি গুরুতর আক্রান্ত করোনা রোগীদের উপর ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছে সেখানকার এফডিও বা ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অরগানাইজেশন। বাংলাদেশের ম্যালেরিয়ার ওষুধ প্রতিষেধক হিসেবে খাচ্ছেন অনেকেই। কিছু কিছু কোম্পানি ম্যালেরিয়ার ওষুধের সাথে শ্বাসকষ্টের ওষুধ এজিথ্রোমাইসিনের কম্বিনেশন তৈরি করছে। এটিও ব্যবহৃত হচ্ছে প্রতিরোধক হিসেবে। ইতিমধ্যে ইবোলা ভাইরাসের ওষুধ রেমডেসিভি উৎপাদনের অনুমতি পেয়েছে ৬টি ওষুধ কোম্পানি। দ্রুতই বাজারে আসবে তা।
করোনাশহিদ: ডাক্তার মঈন
লকডাউনের প্রথম সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী বন্ধু ইন্টার সহপাঠী ডা. ইউসুফ গজনবী এবং আমার বড়ভাই এ.কে.এম. ফারুকের সম্বন্ধি ডা. কয়ছর রশিদের করোনায় আক্রান্ত হওয়ার কথা শুনলাম। দুজনকে হাসপাতাল ভর্তি করা হলো। বড় ধাক্কাটি খেলাম এপ্রিলের ৪ তারিখে। সিলেটে অনুজ প্রতিম ডা. মঈনউদ্দিন আক্রান্ত হয়েছেন বলে খবর পেলাম। ডা. মঈন আমার স্ত্রী লুৎফার মামাতো বোন ডা. রিফাতের স্বামী। তাঁদের দুই পুত্র রিয়াদ ও জায়য়ান। বয়স যথাক্রমে ১২ ও ৭। ডা. মঈনের শ্বশুর ডা. নুর আহমেদ এবং শাশুড়ি ডা. মনসুরা বেগম। রিফাতের বড়ভাই জামিল আহমেদ রিজভী বুয়েট থেকে পাস করা সিভিল ইঞ্জিনিয়ার। ছোটবোন ডা. নুসরাত ও তার স্বামী ডা. তানভীর সরকারি চাকরিতে কর্মরত। ডা. মঈনের বাবা ছিলেন সুনামগঞ্জ জেলার ছাতক থানার অন্তর্গত নিদামপুর গ্রামের অধিবাসী। পেশায় পল্লিচিকিৎসক। দুই ছেলে তিন কন্যার জনক। ছোট ছেলেটিকে ডা. বানানোর স্বপ্ন দেখতেনÑ যে ছেলে এলাকার দরিদ্র মানুষদের সেবা করবে। ডা. মঈন ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাশ করে। পরে সে কার্ডিওলজিতে এমডি এবং মেডিসিনে এফসিপিএস করে। ২০০৪ সনে সে ডা. রিফাতের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়। রিফাত আমাদের স্নেহভাজন খুবই প্রাণবন্ত মেয়ে। মঈনের সাথে যুগলবন্দী সেই হাসিকে অম্লান রাখে। মঈনের মৃত্যুর পর আর দেখিনি তাকে। সে কি হাসতে পারে? হয়তো পারতেই হয়। দুই সন্তানের দিকে তাকিয়ে তাকে মানিয়ে নিতেই হবে। বুকের ক্ষত চেপে রাখতে হবে।
ডা. মঈনকে প্রথম দেখি বর বেশে। সেটা ২০০৪ সালের কথা। অনুষ্ঠানস্থল হাফিজ কমপ্লেক্স কমিউনিটি সেন্টার। সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের পারিবারিক এস্টেট। বররা সাধারণত বিয়ের অনুষ্ঠানে মুখে রুমাল চেপে বসে থাকে। এই বরের ব্যাপার আলাদা। নিজেদের দিকের আয়োজন নিজেই দেখছে। আবার বরসুলভ লোকাচারও পালন করছে। নমিত স্বরে কথোপকথন আর স্মিত হাসি ছিল তার বৈশিষ্ট্য। বিয়েতে এসেছেন ছাতকের তদানীন্তন এমপি মুহিবুর রহমান মানিকসহ শহরের গণ্যমান্য নাগরিক সুধীজন, বিশিষ্ট চিকিৎসকবৃন্দ। তাদের মধ্যে ছিলেন প্রফেসর ডা. এম এ খালিক। মেডিসিনের দিকপাল। যার চিকিৎসায় মিরাকল ঘটেছে বারবার। ডা. খালিকের সাথে আমার বিশেষ অন্তরঙ্গতা ছিল। বিয়ের আয়োজন চারিদিকে হৈচৈ ব্যস্ততা। বরের বসার মঞ্চের একপাশে বসে শুরু হলো আমাদের আলাপচারিতা। ডা. মঈন সম্পর্কে, তার পরিবার সম্পর্কে তিনি ওয়াকিবহাল। আমাকে বললেন, নুর আহমদ ভালো ডিসিশন নিয়েছে। ছেলেটার মধ্যে পটেনশিয়াল আছে। এখানে বলে রাখি, সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে একসময় প্রফেসর খালিকের ইউনিটে সিও ছিলেন আমার মামাশ্বশুর ডা. নুর আহমদ।
মঈনরা বিয়ের পর ঢাকায় ছিল কয়েক বছর। কার্ডিওলজিতে এমডি, মেডিসিনে এফসিএস করে ফিরে যায় সিলেটে। ততদিনে মঈন-রিফাত জুটি দুই ছেলে রিয়াদ ও জায়য়ানের জনক-জননী। রিয়াদের কিছু শারীরিক সমস্যা ছিল। বিষয়টাকে স্বাভাবিকভাবে নিয়ে বাচ্চাটিকে দেশে-বিদেশে নানা রকম চিকিৎসা করিয়েছে। এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজে এসিস্ট্যান্ট প্রফেসর মেডিসিন পদে কর্মরত ছিল মঈন। বিকালে ইবনেসিনার সুবহানিঘাটে অবস্থিত হাসপাতালে কনসালটেশন সেন্টারে রোগী দেখত। আমরা আশৈশব সিলেট শহরে লালিত। ইন্টারমিডিয়েট পাশ করার পর ঢাকায় স্থানান্তরিত হই। কিন্তু আমাদের আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব, সহপাঠীদের বেশিরভাগই সেখানে আছেন। মা-বাবা, শ্বশুর-শাশুড়িসহ প্রিয়জনের শেষ ঠিকানা এই পবিত্র শহর। এখনো আত্মীয়তা ও পরিচিতির ব্যাপক পরিসর শহরজুড়ে। তাই আমাদের বারবার টানে সিলেটের মাটি। ২০১৯ খ্রিষ্টাব্দে প্রায় প্রতিমাসেই সিলেট গেছি। পেশাগত কাজে মাত্র একবার। অন্যান্য সফর সপরিবারে ঈদে বা অন্য উপলক্ষে। সিলেট গেলে সাক্ষাতের জন্য ডা. নুর আহমদের বাসায় যেতাম। হাউজিং এস্টেটের এই বাড়িতেই আলাদাভাবে থাকত মঈন-রিফাত দম্পতি। দেখা হতো। স্বভাবে খুবই বিনয়ী। কথাবার্তা সংযত আর সদা হাসিমাখা একটি মুখ ছিল তার। বড়দের সম্মান প্রদর্শনে যেমন যত্নবান ছোটদের প্রতি স্নেহও তার অবারিত।
তবে তার সুখাদ্যে আসক্তি ছিল শুনেছি। মঈন সকালে মর্নিং ওয়ার্ক করত নিয়মিত; সিলেটি ভাষায় ‘কইন্যা পাড়া দিয়ে হাঁটা নয়’Ñ রীতিমতো ঘামঝরানো জগিং। তার সকালবেলার সাথি ছিলেন আমাদের উভয়ের ভায়রা আব্দুর রউফ তালুকদার। পেশায় ব্যাংকার। ডিজিএম হিসেবে রিটায়ার্ড করেন সোনালী ব্যাংক থেকে। তার শশুর আমার মামাশ্বশুর মরহুম আনোয়ার আহমেদ আমার খুব প্রিয় মানুষ ছিলেন। রউফের স্ত্রী জেবা আমাতুল হান্না মদনমোহন কলেজের অধ্যাপক, বিদুষী নারী। সিলেটের আঞ্চলিক নাগরি হরফে লেখা পুঁথির উপর তার একটা গবেষণালব্ধ বই আছে। দুই ভায়রা মঈন ও রউফ রসনাবিলাসী ছিলেন। মর্নিং ওয়াকের পর আয়েশ করে খেতেন পরোটা, গরুর কালো ভুনা বা তেহারি অথবা অন্য কোনো মুখরোচক খাবার। এসব খবর তারা নিজ নিজ বাসায় চেপেও যেতেন। এমনি সরল ছিল এই যুবক।
যুক্তরাষ্ট্রে আমার বন্ধু ডা. ইউসুফ গজনবী সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরলেন। ডা. কয়ছর রশিদের অবস্থাও স্থিতিশীল। এই স্বস্তিকর খবরের পাশাপাশি বেদনাদায়ক সংবাদ সিলেটে প্রথম করোনা রোগী হিসেবে সনাক্ত ডা. মঈন উদ্দিন। মনটা বিষাদে ভরে গেল। আমার সাথে মঈনের দেখা-সাক্ষাত ও কথাবার্তা তেমন হতো না। তার প্রশংসা শুনেছি খালা জয়গুন নেছা, বড় বোন প্রফেসর ফরিদা বেগম, ভাগ্নি রুবিনা আফরোজ মুনা এবং ভাগনা সাহারুল কিবরিয়ার কাছ থেকে। আমার খালা মারা গেছেন এক বছর আগে। নবতিপর বৃদ্ধা ছিলেন তিনি। প্রথাগত লেখাপড়া কম থাকলেও খুবই বিদুষী নারী ছিলেন তিনি। বিয়ানীবাজারে পাতনগ্রামে এক উঁচু পাহাড়ের উপর তার বাড়ি। পাহাড়ের বুক কেটে তৈরি হয়েছে উপরে উঠার আঁকাবাঁকা পথ। খালার বয়স হয়েছিল কিন্তু বুড়িয়ে যাননি তিনি। রসবোধ ছিল প্রখর। তিনি এ পাহাড়-কাটা পথ অতিক্রম করে প্রায়ই সিলেটে চলে আসতেন। আর তাকে দেখত খালার প্রিয় মঈন ডাক্তার। আমরা আমাদের মাকে হারাই ১৯৭৭ খ্রিষ্টাব্দে। তার বয়স তখন ৪৭। নয় মাস পর বাবাকে হারাই ১৯৭৮ খ্রিষ্টাব্দে। বাবা-মা হারানোর বেদনা বড় মর্মন্তুদ। আর তা যদি হয় অপরিণত বয়সে দুঃখের শেষ থাকে না। আমাদের সাত ভাইবোনের জন্য খালা ছিলেন মাতৃস্নেহের ধারাবাহিকতা। ডা. মঈন সেরকম একজনকে চিকিৎসা দিয়ে আমাদের কৃতজ্ঞতাপাশে আবদ্ধ করে। আমার বড়বোন অধ্যাপিকা ফরিদা বেগমও তার চিকিৎসাধীনে ছিলেন দীর্ঘ সময়। তিনি মঈনের সুন্দর ব্যবহারে প্রীত আর সযত্ন চিকিৎসায় আস্থাবান ছিলেন। ভাগিনা ইমন যেমন ভাগ্নি মুনাও তার ভুয়সী প্রশংসা করেছে। আমার একটা দায় ছিল তার প্রতি শুকরিয়া জ্ঞাপনের। তা আর হলো না। যে আমাদের চেয়ে বয়সে অনেক ছোট সে কিনা অন্তিম যাত্রায় সামিল হলো। এ করোনায় আক্রান্তদের ১৩ থেকে ১৪ শতাংশের লক্ষণ প্রকাশ পায়। তাদের মধ্যে ৫ শতাংশের শারীরিক অবস্থার গুরুতর অবনতি ঘটে। মঈনের ক্ষেত্রে শারীরিক অবস্থা অবনতির কারণ কী?
সিলেটের ডা. শামসুদ্দিন চৌধুরী হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল তাকে। সেখানে করোনা চিকিৎসার বিশেষজ্ঞ বা প্রয়োজনীয় লজিস্টিকস ছিল না। শেষ পর্যন্ত তাকে সড়কপথে ঢাকায় আনা হয়। ভর্তি করা হয় কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে। আমাদের বন্ধু মেট্রিক ও ইন্টার সতীর্থ বিএমএ মহাসচিব ডা. ইহতেশামুল হক চৌধুরী সব ব্যবস্থা করে দেয়। কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তির পর আমি আমার ছোটবোন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নুরুন্নাহার ফাতেমাকে তার চিকিৎসা সম্পর্কে খোঁজখবর নিতে বলি। সে হাসপাতালের পরিচালকের সাথে সমন্বয়ের মাধ্যমে চিকিৎসা দেখভাল করে। রিজভী নিয়মিত আমার ছোটবোন ফাতেমার সাথে লিয়াজোঁ রেখেছে। সব বাধা উপেক্ষা করে মঈনের পাশে রিফাতের পাশে দাঁড়িয়েছে বারবার। কিন্তু সবার সব চেষ্টা সব দোয়া আশীর্বাদ হার মানিয়ে ১৫ এপ্রিল ভোর ৫:৫৫ মিনিটে মঈন যাত্রা করলো অন্তরলোকে।
আমি ছেলে ফারদিনসহ সুরক্ষা পোশাক পরে হাজির হলাম কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে। পুকুরপাড়ের খোলা চত্বরে দাঁড়িয়ে ছিলাম অনেকক্ষণ। চোখের সামনে কার পার্কিংয়ে এসে থামছে একের পর এক লাশ বহনকারী গাড়ি। লাশ নিয়ে বেরিয়ে গেল অন্তত ১০টি গাড়ি। ডা. মঈনের লাশ ছাতকে তার গ্রামের বাড়িতে দাফনের অনুমতি দিয়েছে সরকার। লাশ বহনের জন্য চলে এসেছে মারকাজের রেফ্রিজারেটর এম্বুলেন্স। ডা. মঈনের স্ত্রী রিফাতকে বহনের জন্য আরেকটা গাড়ির ব্যবস্থা করা হলো। সেই গাড়িতে তার সঙ্গী হলো বড় ভাই রিজভী।
সুন্দরভাবে ডা. মঈন সমাহিত হলো নিজের বাড়িতে বাবার পাশে। তার মৃত্যু সারাদেশকে আলোড়িত করে। প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় মঈনের মৃত্যু ছিল শিরোনাম। তার জীবনের যত অপূর্ণতা ছিল মৃত্যুর মহিমা দিয়ে আল্লাহতাআলা তা পূরণ করে দিয়েছেন। করোনাকালে মৃত্যুবরণ করা বেশ কিছুই বিশিষ্টজন বড় জানাজা, জনাকীর্ণ শোকসভা এবং পাদপ্রদীপের আলো থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। ডা. মঈনের ক্ষেত্রে উল্টো ঘটেছে। তার মৃত্যু ছিল করোনাকালের সবচেয়ে বড় বিষাদময় ঘটনা। কারণ, সে করোনার বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে আক্রান্ত হয়েছিল। যখন মঈনের লাশ নিয়ে রিজভী ও রিফাত সিলেটের পথে, কখন রিয়াদ ও জায়য়ান বাবা-মার প্রতীক্ষার প্রহর গুনছে। এ বাসাতেও চলছে হোম কোয়ারেন্টিন। কাজের মেয়ে ওদের খবর দিলোÑ তোমাদের আম্মু আসছেন। ক্ষীণ কণ্ঠে জায়য়ান বলল, ‘আম্মু আসবে বাবা আসবে না।’ এর কী জবাব দিবে কাজের মেয়ে। রিয়াদের কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। চুপসে গেছে সে। কুর্মিটোলা হাসপাতাল থেকে একদিন বাচ্চাদের সাথে কথা বলেছিল মঈন। জায়য়ান প্রশ্ন করল, বাবা তোমরা কবে সিলেটে ফিরবে? এর কোনো জবাব দিলো না। পরে রিফাত তাকে জিজ্ঞেস করল, তুমি কি সুস্থ হয়ে সিলেট যাবে না? এর কোনো উত্তরও মঈন দেয়নি। শেষ পর্যন্ত চলে গেছে না ফেরার দেশে।
ডাঃ মঈনের মৃত্যু একটি বার্তা। চিকিৎসকদের জীবন কতটা ঝুঁকিপূর্ণ তার জ্বলন্ত উদাহরণ। তাকে চরম শারীরিক কষ্ট ও শ্বাস যন্ত্রণা নিয়ে সড়কপথে ঢাকায় আসতে হয়। হেলিকপ্টার ব্যবস্থা করা যায়নি। ডা. মঈনের পর আরো দুজন ডাক্তার করোনায় মারা গেছেন। ৩মে দেশের অন্যতম হেমোটজিস্ট ও ল্যাবরেটরি মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক কর্নেল (অব.) মোহাম্মদ মনিরুজ্জামানের মৃত্যু হয়। ১৩মে করোনভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে আরো একজন চিকিৎসক মারা যান। তিনি রাজধানীর ইবনে সিনা হাসপাতালে রেডিওলজি বিভাগের প্রধান মেজর (অব.) ডা. আবুল মোকারিম।
এ কে এম বদরুদ্দোজা প্রাবন্ধিক হিসেবে অধিক পরিচিত হলেও মূলত তিনি বহুমাত্রিক লেখক। একাধারে ঔপন্যাসিক, চিন্তাবিদ ও বিশিষ্ট কলামিস্ট। তার লেখায় বাংলাদেশি জাতিসত্তার পরিচয় প্রস্ফুটিত হয়। তিনি কলমকে অস্ত্রে পরিণত করেছেন। সমকালীন অনেকে যা লিখতে হিমশিম খায়, তিনি তা লিখেন অসংকোচে, অবলীলায়। সামাজ ও রাষ্ট্রের যে কোন অন্যায়-অবিচার ও অপসংস্কৃতির বিরুদ্ধে তার ক্ষুরধার লেখনী আমাদের প্রেরণা যোগায়।
নষ্ট রাজনীতির সুরতহাল
চয়ন প্রকাশন থেকে বের হয়েছে একেএম বদরুদ্দোজার ‘নষ্ট রাজনীতির সুরতহাল’। বইটি পাঠক এবং বোদ্ধা মহলে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়। এটি সত্যিকার অর্থে আমাদের পচনশীল রাজনীতির ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন। বইটি পড়তে কোন রকম ক্লান্তি বা বিরক্তি আসে না। ঘটনার সাথে জীবন ও রাজনীতি খুব গভীর ভাবে সম্পৃক্ত। নিচের একটি বাক্য দিয়েই বইটির অন্তপ্রাণ অনুধাবন করা যায়।
“রাজনীতি বড় অপয়া হয়ে গেছে। দ্যাখোনা বিশ্বজিৎ ছেলেটাকে কিভাবে মারলো। নিরীহ নিরস্ত্র একটা ছেলে। তাকে দল বেধে কুপিয়ে মেরেছে। আমি সহুদকে নিয়ে খুব দুশ্চিন্তায় আছি মা। কাসেমের পেছনে নিজের দলের লোকজন লেগে গেছে। ভয় হয় সহুদও না ঝামেলায় জড়িয়ে যায়। মা সহুদতো একজন না অসংখ্য অজস্র। একটা দুষ্ট চক্র গ্রাস করছে রাজনীতিকে। আপনি একজন সহুদকে কি করে আলাদা করবেন। রাজনীতি সুস্থ ধারায় ফিরে না এলে সহুদদের নিয়ে মায়েদের দুশ্চিন্তা কখনোই দূর হবে না। ওরা তো মা একত্রে বসতেও রাজী না।”
হে ধরনী শুদ্ধ হও
একুশে বইমেলা উপলক্ষে চয়ন প্রকাশন থেকে ‘হে ধরনী শুদ্ধ হও’ শীরোনামে আরেকটি বই বেরিয়েছে। একেএম বদরুদ্দোজার লেখায় অনেক জ্ঞান, অনেক তথ্য ও গভীর দর্শন প্রকাশ পায়। একটি উদাহরণ থেকেই বইটির মর্মকথা পাঠকমাত্র বুঝতে সক্ষম হবেন। “দাউ দাউ আগুন জ্বলছে। পুড়ছে ব্যাগ ব্যাগেজ কাপড় চোপড়। কবি সোহেল রায়হানের “সাহসী উচ্চারণ” ছাই হচ্ছে। পুড়ছে লকিয়তের রুম থেকে আনা অর্থনীতির একগাদা বই। কিনস স্মীথ মার্শাল থেকে আহুজা কেউই রেহাই পাচ্ছেন না। মহসীন হলের ডাইনিং থেকে ঘটনাটি দেখছে আব্বাস। তার মাথা আউলে যাচ্ছে। লকিয়ত রতন গ্রুপের টপ ক্যাডার। তার উপর নিজের গ্রুপ চড়াও হলো কেন? এটা কি কোন অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব।”
অনারেবল এক্সিট
নন্দনতত্ত্ব যত না তত্ত্বের বিষয়, তার থেকে বেশি অনুধাবনের। বইটির নাম থেকেই প্রাসঙ্গিক-অর্থদ্যোতনা পাওয়া যায়। ‘অনারেবল এক্সিট’ লেখকের ষষ্ঠ উপন্যাস। এর উপজীব্য রাজনীতি ও প্রেম। ১/১১ এর সৃষ্ট সেনা সমর্থিত তত্তাবধায়ক সরকারের সময়কালের একটি চালচিত্র। কাছে থেকে দেখা আমাদের জাতীয় অধপতন সমূহ ফুটে ওঠেছে একেএম বদরুদ্দোজার লেখায়। একান্ত অভিজ্ঞতার আলোকে সহজ বাক্যে তিনি লেখেন- “দুর্নীতি দমন ব্যুরোতে সচিব হিসেবে কাজ করেছিলাম বছর দুয়েক। কোটি কোটি টাকা দুর্নীতি যারা করেন তাদের ভয় নেই। পাঁচ দশ কোটি টাকা খরচ করলেই কেল্লাফতে। কিন্তু যারা লাখ টাকার দুর্নীতি করে তাদের কপাল পোড়ে। ১/১১তে এসে রাঘব বোয়ালরা ধরা পড়েছেন ঠিকই। কিন্তু তাঁর বেরিয়ে যাবেন নির্ঘাত। ইতোমধ্যে দেশের বাইরে বিদেশী ব্যাঙ্ক হিসাবে টাকার পাহাড় জমা হচ্ছে। সাথে সাথে শিথিল হচ্ছে মামলার রশি।”
স্বাধীনতা যুদ্ধের গল্প
একটি চমৎকার উপন্যাস ‘স্বাধীনতা যুদ্ধের গল্প’। লেখক তার কৈশোরে দেখা মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিকে নতুন আঙ্গিকে সাজিয়ে তুলেছেন এই বইটিতে। একেএম বদরুদ্দোজার প্রথম উপন্যাস ‘পবিত্র শহরের গল্প’ এর দ্বিতীয় পর্ব ‘স্বাধীনতা যুদ্ধের গল্প’। লেখকের সুনিপুন বর্ণনায় বিধৃত হয়েছে মুকিযোদ্ধের সেই স্মৃতি ঝরা দিনগুলো। তিনি লিখেছেন, “পারভেজরা স্কুলের গেট পেরিয়ে কালীঘাট পর্যন্ত চলে এসেছে। বাদলের ডাক শুনে থামলো। দৌড়াতে দৌড়াতে এসেছে সে। হাপাচ্ছে রীতিমতো। স্কুল ব্যাগটা পারভেজের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললো, দোস্ত আমার ব্যাগটা ধর। মার কাছে পৌঁছে দিয়ে বলবি আমি যুদ্ধে গেছি। পলাশের মৃত্যুর প্রতিশোধ না নিয়ে আমি ঘরে ফিরবো না।” … “পারভেজরা স্কুলের গেট পেরিয়ে কালীঘাট পর্যন্ত চলে এসেছে। বাদলের ডাক শুনে থামলো। দৌড়াতে দৌড়াতে এসেছে সে। হাপাচ্ছে রীতিমতো। স্কুল ব্যাগটা পারভেজের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললো, দোস্ত আমার ব্যাগটা ধর। মার কাছে পৌঁছে দিয়ে বলবি আমি যুদ্ধে গেছি। পলাশের মৃত্যুর প্রতিশোধ না নিয়ে আমি ঘরে ফিরবো না।”
জীবন গড়ার পাথেয়
এই বইটি মূলত বঙ্গবন্ধুর ভাষণের সুষমাময় বর্ণনা। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ ঢাকার রমনা রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) জাতির উদ্দেশ্যে প্রদত্ত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর ঐতিহাসিক ভাষণ সম্পর্কে লেখক তার হৃদয়ানুভূতি প্রকাশ করেছেন। একেএম বদরুদ্দোজা লিখেছেন, “মুজিব যা করেছিলেন তা তার সময়ের আগের বা পরের কাজ নয়। তিনি সময়ের কাজ করেছিলেন। আর তার কাজে সবচেয়ে বড় অস্ত্র ছিল কাব্য সুষমাময় জাগরনী ভাষণ। তার বক্তৃতা শিল্পীর তুলিতে আঁকা ছবি- সে ছবি বাংলাদেশের, তার ভাষণ কবির কবিতা- যার আত্মা বাংলাদেশ। শেখ মুজিবের কবিতা প্রতীম ভাষণগুলো সংকলিত হলে সেটি অনেক বড় কাজ হবে। কেবল ৭ই মার্চের ভাষণ দিয়ে রাজনীতির এই কবিকে পুরোপুরি উন্মোচন করা যাবে না।”
আমাকেও করো লজ্জাহীনা
ঊষার দুয়ার প্রকাশনা বের করেছে একেএম বদরুদ্দোজার বই ’আমাকেও করো লজ্জাহীনা ’। প্রযুক্তির যুগে নতুন প্রজন্মের ক্রিয়েটিভ চিন্তা শক্তির নানা দিক ফুটে উঠেছে বইটিতে। “জিনিয়াও পৃথিবীর মানুষকে দুই শ্রেনীতে বিন্যস্ত করে। একদল এবিসি। বাকিরা বিবিসি। এবিসি মানে আফটার দ্যা বার্থ অফ কম্পিউটার। এই প্রজন্মকে কম্পিউটার শিখতে হয় না। শৈশবেই কম্পিউটারের সাথে ভাব হয়ে যায় তাদের। খেলতে খেলতে কম্পিউটারকে বাগে নেয় তারা। জিনিয়া এবিসি প্রজন্মের প্রতীক। বিবিসি মানে বিফোর দি বার্থ অফ কম্পিউটার। এরা সহজে কম্পিউটারের সাথে ভাব তৈরি করতে পারে না। কম্পিউটারের ভাষা তাদের কাছে দুর্বোধ্য মনে হয়। মোবাইল ফোনের ব্যাবহারের ক্ষেত্রেও দুই প্রজন্মে দুস্তর ব্যাবধান। তরুণদের হাতে মোবাইল তার সব মাত্রা ও কার্যকারিতা নিয়ে সদা ব্যাঙ্গময়। বড়রা কেবল এক টিপ দিয়ে কল রিসিভ করে, আরেক টিপ দিয়ে কল থ্রো করে।”
একদফা একদাবি
ঊষার দুয়ার প্রকাশনা থেকে একদফা একদাবি শীরোনামের একেএম বদরুদ্দোজার দুর্দান্ত এই বইটি সাহসী মুনুষদের প্রেরণা যোগায়। তার একটি সহজ বাক্যের মধ্যে গন্থের মর্মকথা ফুটে ওঠেছে। … “রেজা সৈয়দ বিবেকের বন্দি। কোন অন্যায় করেননি তিনি। কারো বাড়া ভাতে ছাই দেননি। অসাংবিধানিকভাবে ক্ষমতা দখলকারী জান্তার বিরুদ্ধে হক কথা বলা যদি অপরাধ হয় রেজা অপরাধী, আমিও অপরাধী। যতদিন বেঁচে আছি রেজা, আমি, আমরা বারবার এই অপরাধ করবো।”
জঙ্গি তকমা
ঊষার দুয়ার প্রকাশনা থেকে বেরিয়েছে একেএম বদরুদ্দোজার ’জঙ্গি তকমা’ একটি থ্রিলার ধর্মী বই। গুম-খুনের ভীতিকর বর্ণনা বিধৃত হয়েছে বইয়ের পরতে পরতে। “ভাস্কর সোলাইমান আহসান সুস্থ হয়ে রাজিব মারিয়ার বিয়ের অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন। মিডিয়া বারবার তার মুখ থেকে কথা বের করার চেষ্টা করেছে। তিনি মুখ খুলেননি। একটাই জবাব দিয়েছেন। মনে নাই, কিচ্ছু মনে নাই। গুম এমনি এক জিনিস, ফিরে আসেন খুব কম লোক। যে দু’একজন আসেন তাদেরও কিছু মনে থাকে না।”
এ কে এম বদরুদ্দোজা আশির দশকে সিলেটের সাহিত্যাঙ্গনে পা রাখেন।নব্বই দশকে জাতীয় পর্যায়ে তার লেখক পরিচিতি ব্যাপকতা লাভ করে। সমসাময়িক লেখকদের মধ্যে তিনি ছিলেন একেবারেই আলাদা। মানবিক মূল্যবোধ ও উদারনৈতিক গুণাবলির জন্য তিনি অনন্য। তার লেখা খুব সহজ ও সুখপাঠ্য। সমসাময়িক ও পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি তুলে ধরেন তিনি। ক্ষুরধার কলমের কারণে রাষ্ট্রশক্তি ও সামরিক জান্তার বিরাগভাজন হয়েছেন, তবে ভীত কিংবা চকিত হননি কখনো।বক্তব্যের স্পষ্টতা আর তীব্রতার জন্য খুব দ্রুত পাঠকদের মধ্যে সাড়া ফেলেন তিনি।
লেখক এর অনেকগুলো বইয়ের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি এখানে আলোকপাত করা হলো। বিস্তারিত পরিসরে সবগুলো বই নিয়ে পরবর্তীতে বিশদ আলোচনার আশা রাখি।


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আরও পড়ুন

শ্রীমঙ্গলে কিন্ডারগার্টেন শিক্ষক ঐক্য পরিষদ গঠন সভাপতি এহসান ও সম্পাদক আলী আহমদ

         মৌলভীবাজার প্রতিনিধি : মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে...

নবনির্মিত নতুন কারাগারে বন্দি স্থানান্তর সম্পন্ন

         সিলেট এক্সপ্রেস ডেস্ক: সিলেট শহরতলীর...

বালাগঞ্জে ষড়যন্ত্র করে জমির প্রকৃত মালিককে হয়রানির অভিযোগ

225        225Sharesবালাগঞ্জ থেকে সংবাদদাতা: বালাগঞ্জের মুসলিমাবাদ...

প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলায় ওয়ার্ড ভিত্তিক সচেতনতা বাড়ানো জরুরী- মেয়র আরিফ

         সিলেট এক্সপ্রেস ডেস্ক: প্রাকৃতিক দুর্যোগ...