একালে এখানে রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল

প্রকাশিত : 06 November, 2019     আপডেট : ১ মাস আগে  
  

মোহাম্মদ আব্দুল হক

সাহিত্য চর্চার দ্বারা বাংলাসাহিত্যকে যুগে যুগে যারা একটা শক্ত ভিত্তিতে নিয়ে এসেছেন তাঁরা চিরকাল স্মরণীয় এবং নিশ্চয়ই ওই মনীষীগণ আমাদের মাঝে সকল সময় বরণীয়। অনেকেই আছেন এই স্মরণীয় ও বরণীয় সাহিত্যিকদের তালিকায়। এ নিয়ে বিসদ আলোচনা করে একটি দীর্ঘ প্রবন্ধ উপস্থাপন করার সুযোগ অবশ্যই রয়েছে। তবে এ কাজটি করতে প্রয়োজন সাহিত্যে গভীর ধ্যানের। এ পর্যন্ত বাংলা সাহিত্যের স্মরণীয় ও বরণীয় গুণী মানুষদেরকে পাঠকের সামনে যথাযথ ভাবে তুলে ধরা বহুল জ্ঞানের অধিকারী ও সাহিত্যে পন্ডিত মানুষের পক্ষেই সম্ভব। তাই এ কাজটি হাতে নেয়ার দুঃসাহস আমার নাই। তবে আমাদের এ অঞ্চলে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলাম সমান্তরাল ছুটে চলেছেন বিশেষ করে তাঁদের গান ও কবিতা নিয়ে বিংশ শতাব্দীর প্রায় প্রথম দিক থেকেই। এই দুই মনীষী আমাদেরকে বিশেষ ভাবে আজও অনেকটাই প্রভাবিত করে চলেছেন। তারপরও সময়তো আর সেই শতবর্ষ আগের পরিবেশ ও পরিস্থিতিতে নেই। এজন্যেই কোথাও কোথাও রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল তাঁদের গল্প ও কিছু কিছু গান নিয়ে এ সময়ের তরুণ তরুণীর মাঝে খুব ভালো প্রভাব ফেলতে পারছেন না। তারপরও আমাদের নজরুল ও রবীন্দ্র প্রেমিক অনেকে অনেকটা জোর করেই যেন বিভিন্ন অনুষ্ঠানে, বাংলাদেশ বেতার ও বাংলাদেশ টেলিভিশনে কাজী নজরুল ইসলাম ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সকল গানই সকল সময় খাওয়াতে চান দর্শক ও শ্রোতাদেরকে। আমি মনেকরি, তাঁদের সকল গান যে সকল সময় সেই পুরনো সুরে প্রচার করলে ভালো হওয়ার চেয়ে তাঁদের প্রতি বিরূপ প্রভাব জন্ম নেয় মানুষের মনে, তা বিচার করার সময় এসেছে।

সিলেটের শিক্ষিত সমাজের সর্বত্র আলোচিত হচ্ছে, সিলেটে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আগমনের শতবর্ষ পুর্তি নিয়ে। ১৯১৩ খ্রীষ্টিয় সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সিলেট এসেছিলেন ১৯১৯ খ্রীষ্টিয় সালের নভেম্বর মাসে। এখন ২০১৯ খ্রীষ্টিয় সালের নভেম্বর মাস। তাই সিলেটে আড়ম্বর পূর্ণ রবীন্দ্রনাথ স্মরণোৎসব পালন করা হয়। এ ব্যাপারটা নিঃসন্দেহে গৌরবের। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন। এ কথাটি অনস্বীকার্য। তাই সাহিত্য-প্রেমী কেউ কেউ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও তাঁর সাহিত্যসৃষ্টি নিয়ে আগ্রহভরে গবেষণা করেন, যাতে আমাদের সকল প্রজন্মের মানুষ শিকড়ের খোঁজ করে নিজেকে চিনে নিতে পারে। আমাদের এখানে অনেকে বাড়াবাড়ি রকমের রবীন্দ্র প্রেমিক। জোর করে আস্ত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে অনেকেই এ প্রজন্মের বাঙালিদেরকে খাওয়াতে চান। অনেকেই বুঝেননা এখনকার ছেলে ও মেয়েরা বাসায়, ফাস্টফুড দোকানে বা রেস্টুরেন্টে যেমন নতুন মজার খাবার খায় তেমনি জীবনকে রাঙাতেও অনেক নতুনের রসাত্মক কবিতা, গান, গল্প ও নাটকও পেয়েছে। এরা সেকাল থেকে যে এসেছে ঠিক-ই বুঝে ; তবে এরা আর সেকালের ঢঙে বসে নেই। এখনকার ছেলে ও মেয়ে কে কষ্ট করে বিশ্ব মাঠে বের হতে হয়না। সকল ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কে এখন টেনে এনে আমাদের এ যুগের নতুন তরুণ তরুণীর মাঝে তুলে ধরলে সেটা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্যে ভালো হবেনা। এ যুগের বাঙালি মেয়েরা শোয়ার্জনেগার এর পেশীবহুল শরীর যেমন দেখে তেমনি ছোটো খাটো শরীরের সাকিব ও মুশফিকুর রহিম কেও দেখে বিশ্বমাঠে। আমাদের ছেলেরাও এখন ব্রিটনী স্পেয়ার্স, মালালা ইউসুফ জাই যেমন খুঁজে তেমনি সাবিলা নূর, মেহজাবিন কে খুঁজে। ওদের সাথে সাথে আমিও এখন প্রায় প্রতিদিন ‘ইউ টিউব’ এ এখনকার নতুন নতুন চমৎকার গল্পের নাটক দেখি। এখনকার ছেলে ও মেয়েরা আর রবীন্দ্র – সাহিত্যের শত বছর আগের সেই বাঙালি ছেলে ও মেয়ে নয় যে তারা তেমন করে লুকিয়ে লুকিয়ে প্রেমের কবিতা পড়বে বা একজন অন্যজনকে ‘ভালোবাসি’ কথাটি বলতে দীর্ঘ মাস বা বছর পার করবে। প্রিয়ার খোঁপায় ফুল গুঁজে দেয়ার জন্যে এখন আর প্রেমিক-প্রেমিকার লুকোচুরি খেলা হয়না। তবে এখনও প্রেম হয় এবং তাতে নানান রঙও থাকে আবেগও থাকে। তাই এখন নজরুল ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সকলকিছু এদেরকে খাওয়াতে চাইলে এরা চিবিয়ে ফেলে দিবে, গিলবে না।

নতুনকে কষ্ট করেই উদ্ভাসিত হতে হয়। আমরা চাইলেই নতুন কিছু নিয়ে আসতে পারিনা। নতুনের আগমন যদিওবা হয়, আমরা সকলে পুরাতনের মোহ কাটিয়ে নতুনকে আপন করতে পারিনা। আমরা যে নতুনকে দেখিনা তা কিন্তু নয়; বরং আড় চোখে লুকিয়ে লুকিয়ে দেখি। আমাদের ক্ষুদ্রতার কারণে বা উদারতার অভাবে আমরা অনেকটা জোর করেই নতুনদেরকে পুরাতনে বেঁধে রাখতে চাই। এজন্যেই নতুন কোনো কিছু উঁকি দিয়ে তার উপস্থিতি জানান দিলেও আমাদেরকে পুরাতনে সাঁতার কাটতে হয়। নতুন কিছু আমাদের সামনে ঠেলে এসে হাজির না হওয়া পর্যন্ত সেই চলমান বা পুরাতন রূপ ও রসের পুকুরেই আমাদেরকে হাবুডুবু খাওয়া ছাড়া কোনো উপায় থাকেনা। আমরা সাহিত্যে মৌলিক সৃষ্টির কথা বলি। কিন্তু মৌলিকতা কি জিনিস? কোনো লেখা পড়ে বা শুনে যখন মনে হবে এ-তো নতুন কিছুর সাথে পরিচয় হলো, তখনই তা মৌলিক। নতুন কিছু যে এসেছে তা আবার উপস্থাপনার ঢঙ বা ভঙিমায় প্রকাশ পায়। এভাবেই নতুন একসময় জায়গা করে নেয়।

সাহিত্যের মাঠের হে স্বজন, শুভেচ্ছা। সাহিত্য-মাঠ আমার প্রিয় মাঠ। সিঁড়ির মাঝামাঝি ধাপে দাঁড়িয়ে যেমন প্রথম ধাপকে অস্বীকার করা যায় না তেমনি সাহিত্যের শক্ত ভিত্তিতে দাঁড়িয়ে এ পর্যন্ত খুঁজে পাওয়া সাহিত্যের প্রাচীন ভিতকে স্মরণ রেখেই আমাদেরকে সাহিত্য চর্চা করতে হবে। কিন্তু আমরা কেবলই ভিত্তিতে পড়ে থাকলে কতোটুকু এগিয়েছি সেটা বুঝা যাবে না। তাই সময়কে বিবেচনায় নিয়ে পরিবেশ ও পরিস্থিতিতে নিজেকে খাপ খাইয়ে এ যুগের আমরা মন ও মননে কোথায় এসে পড়েছি তা খুঁজতে হবে।।
# লেখক _ মোহাম্মদ আব্দুল হক
কলামিস্ট, কবি ও প্রাবন্ধিক

আরও পড়ুন



কোম্পানীগঞ্জ থানার ওসির প্রত্যাহার দাবি

সিলেট এক্সপ্রেস ডেস্ক: কোম্পানীগঞ্জ থানার...

নৌকা প্রতীকই মানুষের ওদেশের উন্নয়ন এনে দিতে পারে

সিলেট এক্সপ্রেস ডেস্ক: বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের...