একজন ‘শিশুসাথী’ জুবায়ের

প্রকাশিত : ২০ মার্চ, ২০১৯     আপডেট : ১ বছর আগে  
  

মোফাজ্জল করিম : বিসমিল্লাহ হিররাহমানির রাহিম, সিলেট সিটি কর্পোরেশনের অত্যন্ত সুযোগ্য জনপ্রিয় মেয়র প্রীতিভাজনেষু আরিফুল হক চৌধুরী। আমার শ্রদ্ধেয় বড় ভাই মাসউদ খান সাহেব, অন্যান্য গুণিজন যারা আজকে মঞ্চে উপবিষ্ট আছেন এবং সম্মানিত দর্শকবৃন্দ আসসালামু আলাইকুম। আজকে আমি সত্যি কথা বলতে গেলে একটু ভাবাবেগে আপ্লুত। আমি আজকে এই ২০১৯ থেকে ক্রমাগত পিছু হাঁটতে হাঁটতে হাঁটতে চলে গেছি ১৯৬৩ সালের ২২ শে আগস্ট, সিলেট সরকারি মুরারি চাঁদ কলেজে আমি একজন লেকচারার হিসেবে যোগদান করি। তখন কেবল আমি বিশ^বিদ্যালয় থেকে বের হয়ে এসেছি। এর আগে নয় মাস একটি কলেজে চাকুরি করেছি, সেটা ছিল একটি বেসরকারি কলেজে, এখন অবশ্য সরকারি হয়েছে, মুনশিগঞ্জের হরগঙ্গা কলেজ। সেই কলেজটায় এককালে শ্রদ্ধেয় আবু মাল আব্দুল মুহিত সাহেবও আমার আগে সেখানে শিক্ষকতা করেছেন। ঢাকার কাছে বলে আমরা সবাই এরকম জায়গায় থাকতে চাইতাম। যাই হোক তারপরে সিলেটে এলাম, আমার ক্যামন লাগতো বলে বুঝাতে পারবো না। ভালো লাগার একটি বড়ো কারন হচ্ছেÑআমার সব সময় একটি স্বপ্ন ছিল যে আমি সিলেটের কলেজে অধ্যাপনা করব। এর কারন যেহেতু আমি সিলেটি সেটাত তো বটেই, দ্বিতীয়ত সিলেট এম.সি কলেজ যখন শুরু হয় তার দ্বিতীয় ব্যাচের ছাত্র ছিলেন আমার আব্বা। ১৯২২ সালে আব্বা এমসি কলেজে ভর্তি হন এবং ১৯২৬ সালে এখান থেকে পাশ করে অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে বের হয়েছেন। তারপর ছেলেবেলা থেকে আমার স্বপ্ন ছিল অধ্যাপনা করার। আমাকে যখন কেউ জিজ্ঞাসা করত তুমি বড় হয়ে কি হবে, পরীক্ষার খাতায় রচনায় এম-ইন-লাইফ ইত্যাদিতেও আমি কখনো ডাক্তার হবো, প্রকৌশলী হবো, মন্ত্রী হবো ইত্যাদি লেখতাম নাÑআমি লেখতাম অধ্যাপক হবো। তখন ভালো করে বোঝতামও না অধ্যাপক কি? কিন্তু খুব ভালো লাগত, মজা লাগত, আমার একটা দূর্ণিবার আকর্ষণ ছিল অধ্যাপনার প্রতি। এর একটি কারন আমার পিতাও শিক্ষকতা দিয়ে জীবন শুরু করেছেন, এই সিলেট শহরের সরকারি বালক বিদ্যালয়, যেটা সিলেট গভর্নমেন্ট স্কুল। এখানে তিনি শিক্ষকতা দিয়ে শুরু করেছিলেন তার কর্মজীবন, সেই ২৬ কিংবা ২৭ সালে। জেনারেল এম.এ.জি. ওসমানির মত শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি এবং আর অনেকে তারও ছাত্র ছিলেন। সরাসরি ছাত্র ছিলেন। আমার দূর্ভাগ্য যে সিলেট এম.সি. কলেজে পড়াশুনা করতে পারিনি। আমার আব্বা পরবর্তিতে বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় চাকুরি করেছেন, আমরাও সেখানে এক বন্দর থেকে আরেক বন্দরে চলে গেছি। এই জন্যে খুব আগ্রহ এবং আকাঙ্খা থাকা সত্বেও সিলেট কলেজে লেখাপড়া করতে পারিনি। কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাস করেছি। পরে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় ইত্যাদি।
আমি কিন্তু একটু সময় নিয়ে নিচ্ছি, কিছু মনে করবেন না। কারন আমি আগে বলছি আমি খুব স্মৃতি ভারাক্রান্ত হয়ে পড়েছি। আমাকে ডি.পি.ও অফিস থেকে বলা হল আপনাকে সিলেক্ট করা হয়েছে, আপনাকে নির্বাচিত করা হয়েছে প্রভাষক হিসেবে অর্থাৎ লেকচারার হিসেবে। কোথায় পোসিং চান, আমি বললাম সিলেট। তারা অবাক হয়ে প্রশ্ন করে, সিলেট কেন, সবাই তো ঢাকায় থাকতে চায়। আমি বললাম, না আমি সিলেট কলেজের মাস্টার হতে চাই। সঙ্গে সঙ্গে সিলেট কলেজে পোস্টিং হয়ে গেল, এভাবে সিলেট আসলাম। খুব খুশী বাকি জীবন অধ্যাপক হিসেবে পার করে দেব। কিন্তু আল্লাহর ইচ্ছা ছিল অন্য রকম। সত্যি কথা বলতে গেলে আব্বা-আম্মার ইচ্ছা অন্য রকম। বিশেষ করে আব্বার ইচ্ছে, তার একটি ছেলে যেন অন্তত: সিভিল সার্ভিসের দিকে যায়। যার ফলে এখানে তিন বছর শিক্ষকতা করলাম। তারপরে ভারাক্রান্ত হৃদয়ে বলব, অবশ্য এভাবে বললে এটা আবার বেশি মুনাফিকি হয়ে যাবে, তবে সত্যি কথা বলতে কি, ব্যথার পাশাপাশি খুশীতো ছিলাম বটে। পাকিস্তানের সবচেয়ে ভালো চাকুরি সি.এস.পি হয়েছি। কিন্তু মনটা খুব ভার লাগছিল এই জন্যে যে, হায় এই প্রিয় ক্যাম্পাস, এই প্রিয় ছাত্রছাত্রী, যাদের সঙ্গে তিনটি বছর কাটালাম তাদেরকে ছেড়ে চলে যেতে হচ্ছে। আরেক জনের কথা বলতে হয়Ñআমার পরম শ্রদ্ধেয় প্রিন্সিপাল সলমান চৌধুরী, তাকে সবাই ভয় পেত। মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীর চাইতেও বেশি ভয়। তখন ছাত্র-ছাত্রী, শিক্ষক সবাই তাকে ভয় পেত। বহু কারনে ভয় পেত সলমান চৌধুরী সাহেবকে। আমি সিলেট আসলে যখন শাহজালাল সাহেবের দরগা জিয়ারতে যাই, তখন অবশ্যই আমি সেখানে আমার প্রিয় এই শ্রদ্ধেয় প্রিন্সিপালের কবরটাও জিয়ারত করি। যদিও দুঃখের সঙ্গে বলছি বেশ কয়েক বছর ধরে দেখছি তার নামের যে নাম ফলকটা ছিল সেটা উঠে চলে গেছে। ওখানে আমি বলেছিলাম ওখানকার যারা কর্তাব্যক্তি আছেন তাদেরকে, যে সলমান চৌধুরীর মতো মানুষের নাম ফলকটা একেবারে তুলে ফেলা ঠিক হয়নি। তার আত্মীয়-স্বজন দুয়েকজনকে বলবার চেষ্টা করেছিলাম। যাই হোক সেই সময়ে আমার শিক্ষকরা কি ছিলাম, বিশেষ করে আমি আমার নিজের কথা বলবো। কারন আমি তো আগেই বলেছি যে আমি সাংঘাতিক আনন্দের সঙ্গে শিক্ষকতা করতে এসেছি। এম.সি কলেজে যে তিনটি বছর ছিলাম, প্রতি মূহুর্তকে আমি উপভোগ করেছি। আমার প্রতিটি মূহূর্ত উপভোগ করেছি, কারন শুধু ক্লাসে লেকচার দেওয়া নয় আমি আমার ছাত্র-ছাত্রীদের সঙ্গে আমি সেখানে সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে অংশ নিয়েছি। আমি সেখানে নাটক করেছি, আমি এম.মি কলেজের মাঠে খেলাধুলা করেছি। আমার এই বর্তুল আকৃতির চেহারা দেখে মনে করবেন না যে আমি সব সময় এরকম ছিলাম। জীবনের শুরুতে মোটামুটি একটু হালকা পাতলা ছিলাম, খেলাধুলা করতাম রেগুলার। প্রিন্সিপাল সলমান চৌধুরী সাহেব আমরা আরো তিন চার জন বোটানির প্রফেসর গোলাম রসুল সাহেবও ছিলেন, আরো দু’চারজন মিলে নিয়মিত টেনিস খেলতাম। ওখানে আজকাল টেনিস খেলা হয় কি না জানিনা। এখন আমার খুব খারাপ লাগে খুব দুঃখ লাগে একটা জিনিস দেখে, এম.সি কলেজের দিকে তাকানো যায় না। এম.সি কলেজের বয়েস হয়েছে ঠিক কথা। সেই ২০ সাল থেকে শুরু করে আজকে ৯০বছর বা ৮৮বছর হয়ে থাকে, কিন্তু কলেজটা দেখলে মনে হয় বয়েস ৫০০বছর হয়ে গেছে। এ রকম জরাক্রান্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে খুব কম আছে। এত কষ্ট লাগে, তাকানো যায় না। চারদিকে গাছগাছালি মানে ভাল অর্থে নয় সুশোভিত বৃক্ষরাজি নয়, জঙ্গলাকীর্ণ। দালানগুলোর আস্তরও খসে খসে পড়ছে। আপনারা যে দিকে তাকাবেন মনে হবে দৈন্য দশা। আমাদের সময় কি সুন্দর দুর্দান্ত পরিবেশ ছিল। লোকে আসতো বাইরে থেকে, কলেজ দেখতে আসতো। যাই হোক কি করবেন সব কিছু ভাল যাবে এমন কোন কথা নয়। সব কিছু মিলিয়ে এখন জীবন সায়াহ্নে এসে একটা কথা মনে হয়Ñদেখলাম তো অনেক অনেক, আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের লাখ লাখ কোটি কোটি শোকর যে আমার মত একটা অযোগ্য অপদার্থ ব্যক্তিকে তিনি এত সুখ-স্বচ্ছন্দের জীবন দিয়েছিলেন, সন্তুষ্টির একটি জীবন দিয়েছিলেন। এতো বিভিন্ন কাজে দায়িত্ব পালনের সুযোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু এখন যেন কেমন মনে হয়।
আচ্ছা ভালো কথা, একটু আগে আমার ¯েœহাস্পদ ড. কবির চৌধুরী বলে গেল তার বয়েস কত, জন্ম তারিখ কত। না আমি জন্ম তারিখ-টারিখ বলবনা, তবে আমি একটা কথা বলব, গত প্রায় পনেরো-বিশ বছর যাবত কেউ আমাকে যখন জিজ্ঞাসা করে হাউ ওলড আর ইউ? তখন আমি বলি-আই এম সেভেন্টি ফাইভ ইয়ার ইয়াং। এখন আপনাদের সামনে বলে দিই, আই এম সেভেন্টি এইট ইয়ার ইয়াং। আমি সেভেন্টি এইট ইয়ার ইয়াং বলি, সেভেন্টি এইট ইয়ার ওল্ড বলি না। আল্লাহ্ যদি আমাকে হায়াত দেন, যত দিন দেন, আমি বলবো ইয়াং। ওলড এবং ইয়াংÑএসব হচ্ছে মনের মধ্যে, হৃদয়ের মধ্যে। আপনার শরীর দিয়ে ওলড হবেন না। একজন ৯০বছর বয়েস হয়ে যেতে পারে, কিন্তু হৃদয় চির তরুণ থাকতে পারে, নবীন থাকতে পারে এবং সেই তারুণ্য সেই ঔজ্জ¦ল্যÑএটাই সে বিকিরণ করবে সকলের জন্যে, তার আশেপাশে যারা আছে সবার জন্যে। তার তারুণ্য দিয়ে তার দিপ্তি দিয়ে তার গুণাবলী দিয়ে সে সবাইকে উজ্জ্বল করবে এটাই প্রার্থনা করছি।
আজকে সত্তর বছর হয়েছে এই আমাদের জুবায়ের সিদ্দিকীর। তার ডাক নাম সাথী এবং কেউ কেউ বলেন সে সকলের সাথী। ভাল কথা, আমি বলবো আল্লাহ্ তাকে শিশু সাথী করে পাঠিয়েছেন। শিশু সাথী এজন্যে বলছি, যুদ্ধ বিগ্রহ যা কিছু করেনা কেন, সামরিক বাহিনী থেকে অবসর গ্রহণ করে শিশুদেরকে মানুষ করার জন্য তাদের সাথী হয়ে গেলো জুবায়ের। সেই শিশু সাথী হয়ে সে এই শিশুদের, এই কিশোরদের, এই যুবকদেরকে বড় করার জন্য কাজ করছে। আমি শুনলাম জুবায়েরের বড় বোন জুবায়েরের নাম রেখেছিলেন ‘সাথী’। আমি বলবো বোনের সাথী নামকরণ সার্থক হয়েছে। আমাদের এই সাথী সকলের সাথী। পরম সুহৃদ, বিশেষ করে আমি আজকে তাকে বলছি সে ‘শিশু সাথী’। কারন তার মনের মধ্যে এটা ছিল, সে আমি শিশুদের সঙ্গে কিশোরদের সঙ্গে তরুণদের সঙ্গে বাকি জীবন কাটাবো। আল হামদুলিল্লা, আল্লাহ্ তাকে সেই সামর্থ দিয়েছেন, সেই সফলতাও পেয়েছে। আমরা দোয়া করব আমৃত্যু সে যেন এইভাবে চলতে পারে এবং তার আর্দশটা যেন প্রতিফলিত হয় শিশুদের মধ্যে। তাদের মধ্যে সে বাকী জীবন, প্রথম কর্ম জীবনের পরে দ্বিতীয় কর্ম জীবনটা কাটাচ্ছে, খুব ভালো লাগছে।
সাংবাদিক মুকতাবিস-উন-নূর একটা রিকুয়েস্ট করেছে, আমাদের জীবনের কিছু কিছু না বলা কথা যেন প্রকাশ করি। তুমি তো জানই আমি আমার সারা জীবন চেষ্টা করেছি আত্মজীবনী লেখবো না। তার পরে একটি বিশেষ কোয়ার্টার থেকে, সেটা বলা যাবে না, বার বার রিকুয়েস্ট আসতে থাকে। বলা হয়, যে কোন দিন তুমি দুনিয়া থেকে চলে যাবে ইত্যাদি ইত্যাদি। তখন কলম ধরলাম, সেটা ২০১০ সাল আমার আত্মজীবনী লেখা শুরু করলাম। এখন পাঁচ খন্ডে সেই আত্মজীবনী শেষ হয়েছে। একটা একটা করে খন্ড করে করে পাঁচ খন্ড আল্লাহ চাহেত শেষ হয়ে গেছে। এখন যেটা বলব সেটা শুনে আপনারা তালি দেবেন, না ধিক্কার দেবেন আল্লাহ জানেন। সিলেটে আমার আত্মজীবনী পড়ার জন্য আগ্রহ তেমন কেউ প্রকাশ করেন না। কিন্তু আমাকে এক ভদ্রলোক এখানকার বন্ধু ল্যাইব্রেরির মাহবুবুল আলম মিলন অত্যন্ত বিদগ্ধ ব্যক্তি, মননশীল ব্যক্তি, সেই ভদ্রলোক কেমনে কার কাছ থেকে আমার খবর-টবর নিয়ে আমাকে ফোন করেনÑআপনার কিছু বই চাই, আমি একটা যোগসূত্রে আমার প্রকাশক অনন্যার সাথে যোগাযোগ করিয়ে দিই। অনন্যা ঢাকার প্রকাশনী। অনন্যা আবার মার্কেটিংয়ে খুব দূর্বল, বাজারজাতকরণ জানে না। অনন্যার সাথে যোগাযোগ করে দিয়েছিলাম এবং মিলন সাহেব বেশ কিছু বই এনেছেন। আমি সে জন্য কৃতজ্ঞ। এখন বোধ হয় আমার বই পাওয়া যেতে পারে। যেটা বলছিলাম আত্মজীবনী লিখেছি, কিন্তু আত্মজীবনীর মধ্যে কিছু আত্মগোপন করে রেখেছি, এটা তো বলার অপেক্ষা রাখেনা। তা হলে শুনেন। শরৎচন্দ্রকে এক সময় নাকি কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, তোমার জীবন এত বৈচিত্র্যময়Ñতুমি বাংলাদেশ থেকে চলে গেলে, তুমি রেঙ্গুন বার্মা মুল্লুকে চলে গেলে, তারপর তোমার অনেক বৈচিত্রময় কাহিনী তোমার কিছু কিছু লেখার মধ্যেও এসেছে, তুমি তোমার আত্মজীবনী লেখো না কেন? তখন নাকি শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বলেছিলেন আপনি যদি আপনার আত্মজীবনী লেখেন তা হলে পাঠকরা এটা লুফে নেবে, আর আমি যদি আত্মজীবনী লেখি সরকার সেটা সঙ্গে সঙ্গে নিষিদ্ধ ঘোষণা করবে। কারন এর মধ্যে এমন এমন কিছু থাকবে যেগুলো–যাই হোক আরো অনেক কিছু ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন। আমি অবশ্য সেই জন্যে সু-কৌশলে কিছু কিছু বিষয় যেমন.. কোন কোন ক্ষেত্রে চাকুরি করতে গেলে যেমন হয় আর কি.. এটা জুবায়েরের হয়েছে বা অন্যান্য যারা চাকুরি করেন, বস্দের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সঙ্গে টক্কর লাগে। আমার সারা জীবন এই টক্কর লাগাতে গেছে। কারন কেন জানি আমি আপোস করতে করতে জানি না। এটা আমার দূর্বলতা বলেন বা আমার একটা খারাপ দিক আর কি! কোন বিষয়ে যখন আমার বিবেক সায় দেবে না সেখানে কখনো আপোস করি না। যে গুণটা আমি জানি বেশ কিছুদিন যাবত আমাদের আরিফের মাঝে সাঙ্গাতিকভাবে লক্ষ্য করছি। আপোস করে না বলে আপনাদের অনেকে বলেন আতংক ইত্যাদি ইত্যাদি। আপোস করে না বলেই সে আজকে সিলেট নগরীতে অনেক উন্নতি করেছে। আল-হামদুলিল্লা আমার খুব গর্ব হয় যে, আরিফ মাশা আল্লাহ্ এখানের অন্যতম একজন নেতা। যদি আপনি আপোসকামি হয়ে যান, বা একজন জুবায়ের সিদ্দিকীকে এসে বললো যে অমুক আপনার আত্মীয়, কি করব পাশ করে দেন। নো, আত্মীয় হোক আর যা-ই হক ‘নো’। সকলের জন্য একই আইন। এটাই হওয়া উচিত। দুঃখের বিষয় বাংলাদেশে এটা হয় না। বাংলাদেশ এখন উন্নতিতে একেবারে উলম্ফন হচ্ছে, এটা আমি প্রায়ই আমার কলামে লিখে। আমি খুশী, আল-হামদুলিল্লা সকলের প্রচেষ্টায় উন্নতি হচ্ছে, আমাদের কৃষকের প্রচেষ্টায়, আমাদের গার্মেন্টস কর্মীদের প্রচেষ্টায় হচ্ছে, আমাদের বিদেশে যারা অর্থ উপার্জন করছে তাদের প্রচেষ্টায় হচ্ছে। ঠিক আছে এবং এটাও স্বীকার করতে হবে সরকারে যারা থাকেন তারাও সঠিক পথে উন্নয়নের দিকে। কিন্তু উলম্ফন হচ্ছে উন্নয়নে আর সু-শাসনের অধঃগমণ হচ্ছে। যত দিন যাচ্ছে নিচের দিকে যাচ্ছে সু-শাসন, অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে বলছি। কারন সারা জীবন আমি প্রায় ৪০বছর এই প্রশাসনের সঙ্গে জড়িত ছিলামÑদেশে বিদেশে সবখানে। কিন্তু এরকমটি দেখিনি আমি। এখন যেটা হচ্ছে এর কারনটা কি? ওই যে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন স্বাধীনতা যুদ্ধের পরেÑআমি এত কষ্ট করে নিয়ে আসি তোদের জন্যে এত কিছু, আর আমার এত কিছু সব কিছু চাটায় খায়। বাংলাদেশে চাটার সংখ্যা, সেই চাটার সংখা এত বেশি, দেশ যেন ভরে গেছে অসংখ্য চাটায়, তারা উন্নয়ন খেয়ে ফেলছে। এইটাকে দমন করতে হবে, এই দূর্নীতিটাকে দমন করতে হবে, এই স্বজনপ্রিয়তাকে দমন করতে হবে। অমুকে মার্ডার করেছে, ধরে নিয়ে আসো এখনি বেধে ফেলো, মাইর দাও। অমুকে মার্ডার করেছে, রাখেন রাখেন অমুক অমুকের আত্মীয়। তিনি বললেন, ওহ আচ্ছা আচ্ছা ঠিক আছে শুনো, আমার সাথে যোগাযোগ করতে বলো এইটাই। কাউকে থানায় ওসি সাহেব ধরে নিয়ে আসছে নিয়ে আসার পরে সে বলতেছে ধরে তো নিয়ে আসছেন কতক্ষণ রাখতে পারবেন জানেন? পাঁচ মিনিট পরে টেলিফোন আসছে উনি অমুকের অমুক, উনারে ছেড়ে দাও। এই সমস্ত বন্ধ করতে হবে। এইসব নিজের বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে বললাম। আমরা যখন চাকুরি করেছি পাকিস্তানি আমলে তখনো এই সমস্ত তদবির ছিলো, কিন্তু এই রকম মাত্রায় ছিল না। আমি আপনাদেরকে সমস্ত দায়িত্ব নিয়ে বলছি এই ধরনের রাজনৈতিক তদবির বিশেষ করে মন্ত্রীদের তদবির, অন্যায় তদবির বা মন্ত্রীদের এমনি অহরহ তদবির, মামলা মোকদ্দমাতে অন্যায় তদবির, কখনো ফেইস করি নাই। আমি তিনটা জেলাতে ডিসি ছিলাম। আমি কুষ্টিয়ায় ডিসি ছিলাম, আমি খুলনাতেÑসবগুলো বৃহত্তর জেলা। আমি ঢাকা জেলারও ডিসি ছিলাম। রাজশাহীতে কমিশনার ইত্যাদি ছিলাম। পাকিস্তানের দ্ইুটা জায়গায় এসডিও ছিলাম, পশ্চিম পাকিস্তানের। কোথাও তো এই ধরনের তদবির ফেইস করি নাই। আইনে যেটা হবে, সেটাই হবে। হ্যা কেউ কেউ তদবির করেছে, আমি বলেছি, স্যরি পারবো না বা এটা হবে না। ব্যস্ এখানেই খেল খতম পায়সা হজমÑবাড়ি যাও।
আমাদেরকে যোগ্যতা সৃষ্টি করতে হবে, নিজের যোগ্যতাকে কাজে লাগাতে হবে। নিজের যোগ্যতাকে কাজে লাগাবার এই শিক্ষাটাই আমাদের শ্রদ্ধেয় শিক্ষকরাÑজুবায়ের সিদ্দিকী বা কবির চৌধুরী দিচ্ছেন। মাসউদ ভাই অধ্যক্ষ ছিলেন তারা দিচ্ছেন। এই শিক্ষাটাই সকলের দেওয়া উচিত এবং গার্জিয়ান হিসেবে আপাদের কাছে বিনীত অনুরোধ আপনারাও আপনাদের সন্তানকে এই শিক্ষটা দেন। আপনারা আপনাদের বাচ্চাদেরকে মানুষের মতো মানুষ করবেন। তাদেরকে বলবেনÑবাবা দেখ তুমি অমুকের ছেলে অমুক, তোমার দাদা অমুক ছিলেন এই সমস্ত নয়, বা তুমি অমুক রাজনৈতিক নেতা সাহেবের ভাতিজা বা নাতি এগুলো নয়। তুমি তোমার যোগ্যতা বলে এবং দক্ষতা বলে যেটুকু যাবার, সেটুকুই যাবে। তুমি চেষ্টা করবে যাতে সব সময় ন্যায় পথে থাকো, বিবেকের অনুসরণ করো। এটা করতে পারলে দেখবেন আমাদের দেশটা কোথায় চলে যাবে।
আমরা এই পৃথিবীতে বেশি দিন থাকব না। কিন্তু আল-হামদুলিল্লাহ আপনারা থাকবেন, দোয়া করি সবাই শতায়ু হোন। দোয়া করি আপনাদের সন্তানেরা এই দেশের মুখ উজ্জ্বল করুক। সবার কাছে একটাই বিনীত আরজÑদেশটা উন্নয়নের পথে যাচ্ছে, এটাকে ধরে রাখতে হবে। কিন্তু এইভাবে যদি কামড়া-কামড়ি, খাউলা-খাউলি চলে তা হলে এই দেশ বেশি দিন টিকবে না। মুকতাবিস-উন-নূর আত্মজীবনীতে তিক্ত অভিজ্ঞতা লিখতে বলেছে। শোন হে নূর, তোমাকে একটা কথা বলিÑঅনেক কিছু লিখি নাই। পাঁচ খন্ডে আমার আত্মজীবনীর যে শেষ খন্ড বের হয়েছে, সেটা নাম ‘শেষ হয়ে হইল না শেষ’। গত বছর মে মাসে ‘শেষ হয়ে হইল না শেষ’ বের হয়েছে। ‘শেষ হয়ে হইল না শেষ’-এর পরে ভাবলাম শেষ যখন হয় নাই তা হলে আরেকটা লেখা দরকার এবং সেইটাতে ভাবছি শিরোনাম হবে ‘ছেছা গুতোর জীবন’। ‘ছেছা গুতা’ আমরা সিলেটো খই ছেছা গুতা, ‘ছেছা গুতোর জীবন’। একবার চিন্তা করি লেখবো এক পা এগিয়ে যাই, আবার তিন পা পিছিয়ে যাই। কারন ‘ছেছা গুতোর জীবন’ লিখতে গেলে পরে কত জনের পায়ের উপর দিয়ে পা মাড়াতে হবে, কত জনের যে ইয়ে হবে গোমর ফাক হবে। সেজন্যে আবার ভাবি, না করব না। তার পরে অপেক্ষা করছি, দেখি আল্লাতালা যেদিন হুকুম দেবে যে তোকে লিখতে হবে, তুই তো এককালে মনে করেছিলি লিখবি না, পাঁচটা খন্ড লিখেয়েছি। তখন লিখতে শুরু করবো ইনশা আল্লাহ। আমি আবার লং হ্যান্ডে লিখি, আমি ওই সমস্ত কম্পিউটার-টম্পিউটার বুঝি না, করিও না। সব লংহ্যান্ডে লিখি। প্রায় তিন চার হাজার পৃষ্ঠা লং হ্যান্ডে লিখেছি। আল-হামদুলিল্লাহ সেটা যখন আল্লাহ তা’লা তওফিক এনায়েত করেছেন। আল্লাহ্ যদি হুকুম দেন তোমার রিকুয়েস্টে নয় উনার নির্দেশ যদি আসে তা হলে লিখবো ‘ছেছা গুতোর জীবন’। তখন অনেকেরই চেহারা মুবারক সেই আয়নাতে প্রতিফলিত হবে। তুমি যে জানতে চাইলে একটু আগে ফাক দিয়ে বলেছো, আমি শুনেছি। আমি কেন কি কারনে লন্ডন থেকে ফিরে আসতে হলো সে সমস্ত দুঃখের কাহিনী কিছু কিছু ছোট পলিটিকেল। আবার ইংরেজি এসে গেল যাই হোক, এসব বললে কিছু কিছু নিম রাজনীতি এসে যাবে, এজন্যে বলছি না। তবে হে বটে এটাই। আমার দোষ ছিল আমি প্রথম লন্ডনে পা দিয়ে এয়ারপোর্টে যখন দেখলাম অন্তত শত-দেড়শ’ সিলেটি জমায়েত হয়েছেন। আমার আত্মীয়স্বজন, হাইকমিশনের কর্মী-সহকর্মীরা এসেছেন আমাকে সংবর্ধনা জানাতে। তারা বললেন, দু’চারটা কথা বলেন। আমি প্রথমেই বলেছিলাম, আমি এখানে এসেছি বাংলাদেশের হাই কমিশনার হিসেবে। কোন দলের নয়, কোন মতের নয়, আমি সকলের হাই-কমিশনার। আজ থেকে মনে রাখবেন আমি আপনাদেই একজন এবং আমার আগে তখন লোক সংখা ছিল প্রায় চার লাখ, মানে যুক্তরাজ্যে বাঙ্গালি ছিল প্রায় চার লাখ। আমার আগে তিন লাক্ষ নিরান্নবই হাজার নয়শ নিরান্নবই জন যারা এসেছেন তারা সবাই এমবেসেডর, আর আমি হচ্ছি চার লাখ নাম্বার এমবেসেডর। বাংলাদেশের সবাই আমরা রাষ্ট্রদূত। সবাই আমরা রাষ্ট্রদূত এবং আমাদের দেশের মান ইজ্জত, দেশের স্বার্থ নিয়ে কথা বলবÑসেই কথাটা আমি আমৃত্যু বিশ^াস করি। আমার দেশ সব কিছুর উপরে, আমার বিবেকের অনুশাসনে আমি চলব, কারো ভালো লাগলে লাগবে। এজন্য অবশ্য অনেক ধেক্কাধোক্কা খাইছি, বহুত ছেছা গুতা খাইছি, অতাও মনো করিয়ার লেখি লাইতাম মনে হয় লেখা উছিত অইব। তারপরে বলি, সেটা হচ্ছে ওইযে তারাশংকর বন্দোপাধ্যায়ের কবি উপ্যনাসটা সবাই পড়েছেন আপনারা। সেখানে একটা বিখ্যত লাইন আছেনা, যেখানে ঠাকুরজীকে যখন কবি বলছেন ‘জীবন এত ছোট কেনে’ ‘জীবন এত ছোট কেনে’। সত্যি জীবনশেষে বেলাশেষে এটাই মনে হয়Ñজীবন এতো ছোট কেনে। কত কিছু করার ছিল, কত কিছু ভেবেছি, কিছুই তো হলো না, অতৃপ্তি থেকে যায়। তবুও আল-হামদুলিল্লা আল্লাহ্র শোকর। আমি সব সময় খেতে বসে সব সময় মনে করি যে আল্লাহ্ তুমি আমাকে যেটুকু দিয়েছো বাংলাদেশে শতকরা নিরান্নবই জন লোক তো সেটাও পায় না। আমি তো শতকরা একশ জনের মধ্যে সৌভাগ্যবান সেই একজনের মধ্যে আছি। আল-হামদুলিল্লা চিন্তা করে দেখুন, আমি অনেক সময় খেতে বসে বলিÑএটা কি, আজকে আলু ভরতা আর ডাল ইয়ে রাখছো, আর কিছু নাই? আজকে আর বাজার হয় নাই বা এই নেই, সেই নেইÑএসব নিয়ে রাগ করার কিছু নাই। মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশের শতকরা অন্তত: পঁচান্নবই জন এটাই পাচ্ছেনা, সেখানে তো আল্লাহ্ তায়ালা আমাকে অনেক কিছু দিয়েছে। চাকুরি যেটা পেয়েছেন সেটা তো লক্ষ লক্ষ জন পায় নাই। এটাও তো মনে রাখতে হবে।
আমরা স্কুলে থাকতে একটা কবিতা পড়েছিলাম, আমাদের স্কুল মানে সেই পাকিস্তান আমলে পঞ্চাশ দশকের প্রথম দিকে ‘উড়হ’ঃ ঃযৎড়ি ধধিু ড়হ ঃযব ভষড়ড়ৎ. উড়হ’ঃ ঃযৎড়ি ধধিু ড়হ ঃযব ভষড়ড়ৎ. ঞযব ভড়ড়ফ ুড়ঁ পধহ’ঃ বধঃ, ভড়ৎ হচ্ছে এখানে নবপধঁংব, নবপধঁংব ঃযবৎব ধৎব সধহু ংঃধহফরহম ড়হ ঃযব ফড়ড়ৎ, যিড় সু ঃযরহশ রঃ যিু ধ ঃযৎবধঃ.’ যে জিনিসটা ভাল্লাগছে না খেতে, ইচ্ছা করছে না, পঁচা মনে করে ছুড়ে দিতে ইচ্ছে করছে, এটা ছুড়ে দিও না। তার কারন তোমার দরজার বাইরে হয়তো আরো অনেক শত শত জন দাঁড়িয়ে আছে, যাদের কাছে এটা একটা মহা ভোজ মনে হতে পারে। তোমার মধ্যে এই তছল্লিটা, এই সন্তুষ্টিটা থাকতে হবে। আমি এই কথাটা বলে শেষ করব, সেটা হচ্ছে জীবনে সবর এবং শোকর এই দুইটাকে প্রাধান্য দিতে হবে। এই দুইটাকে প্রাধান্য দিতে হবে। এই দুইটি একজন সুফি দরবেশের কাছ থেকে শিখেছিলাম। সারা জীবন আমল করার চেষ্টা করেছি। সেই সুফি দরবেশÑআমার পিতা আমার আব্বা। তিনি মেট্রিকে তার সেই আমলে সেকন্ড হয়ে স্ট্যান্ড করেছিলেন। বি.এ তে ডিস্টিংকশন, সেই এম.সি কলেজে ইত্যাদি ইত্যাদি। তারপরে তিনি স্কুলের মাস্টারি দিয়ে তার জীবন শুরু করেছিলেন। কারন তার কোন ব্যাকিং ছিল না, তিনি বিধবার পুত্র ছিলেন। হাও এভার, যিনি আমাদের শিখিয়ে দিয়েছেন এটা, বাবা সারা জীবন সবর-শোকর করবা। আল্লাহ্ তায়ালা যেটা দেবে, যেটুকু দেবে বলবে আল্হামদুলিল্লা। আর শোকর গোজার করবা আল্লাহ্ তায়ালার, হে আল্লাহ্ তুমি দিয়েছো, আমি কিছুই না।
আজকের সভায় আপনারা আমার সম্বন্ধে যত ভালো কথা বলেন না কেন, আমি কিছুই না। আমি অত্যন্ত নগণ্য ব্যক্তি, যা দিয়েছেন আল-হামদুলিল্লাড সমস্ত কিছুর প্রশংসার মালিক তিনি।
————————————————————————————–

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) অধ্যক্ষ জুবায়ের সিদ্দিকীর ৭০ বছর পূর্তিতে আয়োজিত সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি সাবেক হাইকমিশনার, সরকারের সাবেক সচিব, কবি মোফাজ্জল করিম’র বক্তব্য। অনুলিখন: আকবর হোসেন মোজাহিদ

আরও পড়ুন