একজন লেখকের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ পাঠক সৃষ্টি করা—এম আতাউর রহমান পীর

প্রকাশিত : ২৫ অক্টোবর, ২০১৮     আপডেট : ১ বছর আগে  
  

তাসলিমা খানম বীথি: প্রিন্সিপাল লে. কর্নেল (অব.) এম আতাউর রহমান পীর একজন শিক্ষানুরাগী, প্রাণবন্ত, পরিশ্রমী ও নিষ্ঠাবান ব্যক্তিত্ব। ৬৯ বছর বয়সে তিনি এখনও চির তরুণ, সজীব ও সতেজ। অমায়িক কথাবার্তা, আচার-আচরণ ও পরিপাটি রঙিন পোশাক যে কাউকে মুগ্ধ করবেই। কাজের প্রতি তাঁর দায়িত্ব ও প্রাণবন্ততার কারণে সকল মানুষই অনুপ্রাণিত ও উৎসাহিত হবে। যখন যেখানে যার সাথে দেখা হবে, হাসিমুখে কথা বলে কুশলাদি জিজ্ঞাসা করবেন-মনে হবে সেই মানুষটি ও তার পরিবারের একজন। তাঁর আচরণে ভালোবাসা, ¯স্নেহ, আন্তরিকতা ফুটে ওঠে। দেশ, সমাজ ও মানুষের কল্যাণে তিনি ছুটে বেড়ান দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। মানুষের জীবনে সময় কতটুকু মূল্যবান এম আতাউর রহমান পীর এর সাথে যারা কাজ করেন তারা জানেন। তিনি সময় এবং কাজকে সবচেয়ে গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। যেকোন অনুষ্ঠানে নিমন্ত্রণ রক্ষা করলে ঠিক সময়ে গিয়ে হাজির হন তিনি। একজন লেখক, সংগঠক ও সমাজকর্মী হিসেবে তাঁর খ্যাতি দেশে-বিদেশে ছড়িয়ে রয়েছে। লেখালেখি তার নেশা হলেও সাহিত্যকর্মের সাথে তিনি জড়িয়ে আছেন নিবিড়ভাবে। শিক্ষকতা হচ্ছে একটি আদর্শ ও মহৎ পেশা। সেই পেশায় তিনি এখনও নিজেকে জড়িয়ে রেখেছেন।

প্রিন্সিপাল এম আতাউর রহমান পীর তেমনি একজন আদর্শবান শিক্ষক-যিনি শিক্ষার আলোয় আলোকিত হবার জন্য শিক্ষার্থীদের সবসময় আহবান জানান। তিনি বলেন, পৃথিবীতে যারা ভালো কাজ করে কিংবা মানুষের সেবা করে তাদের সেই ভালো কাজ কখনো বৃথা যায় না। সেই ভালো কাজের প্রতিদান পরকালে তো পাবেই, পৃথিবীতেও পাওয়া যায়। সৎকর্ম মানুষকে মহৎ করে, কর্মই মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে। মানবতার কল্যাণে কাজ করে যাচ্ছেন এম আতাউর রহমান পীর।

পরের কারণে স্বার্থ দিয়া বলি,

এ জীবন মন সকলই দাও,

তার মত সুখ কোথাও কি আছে?

আপনার কথা ভুলিয়া যাও-এ আদর্শ নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন প্রিন্সিপাল লে. কর্নেল (অব.) এম আতাউর রহমান পীর। পৃথিবীতে যত আদর্শ প্রচারিত হয়েছে তা হয়েছে সুন্দর কথা দিয়েই। এম আতাউর রহমান পীর বলেন, লেখকদের সৃষ্টিশীলতা হতে হবে মানুষের কল্যাণে, মানববতার কল্যাণে। আমাদের সৃষ্টিশীলতাকে এগিয়ে নিতে সাহিত্যচর্চা একটি শক্তিশালী হাতিয়ার। যে কোন লেখককে তাঁর লেখার মাধ্যমেই মূল্যায়ন করতে হবে, ভালো মানুষ হবার জন্য দেশ ও সমাজের জন্য ভালো কাজ করতে হবে।

কথা বলছিলাম স্যারের সাথে বিভিন্ন সংগঠনের কাজ নিয়ে তখন তিনি বলছিলেন, প্রত্যেকের জীবনেই চ্যালেঞ্জের সাথে কাজ করতে হয়। মানুষের জীবন পরিবর্তনশীল। যখনই কোন কাজে পরিবর্তন আসবে তখন সেটার সঙ্গে জীবনকে খাপ খাইয়ে নিতে হবে। এক কথা যুগের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে হবে। ৮ই এপ্রিল ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দে সুনামগঞ্জ শহরের ষোলঘর মহল্লায় জন্মগ্রহণ করেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, লেখক ও সংগঠক, মদনমোহন কলেজের সাবেক প্রিন্সিপাল লে. কর্নেল (অব.) এম আতাউর রহমান পীর। তিনি মরমি কবি শাহ আছদ আলী পীর (রহ.)-এর প্রপৌত্র এবং স্বনামধন্য শিক্ষক মরহুম আব্দুল মান্নান পীর-এর জ্যেষ্ঠ পুত্র। তাঁর মায়ের নাম আইয়ুবুন্নেছা খাতুন। ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে তিনি এমসি কলেজ থেকে রসায়নে অনার্স এবং ১৯৭২ খ্রিস্টাব্দে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন। চাকরিকালীন ২০০৮ খ্রিস্টাব্দে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রথম শ্রেণিতে বি.এড এবং ২০০৯ খ্রিস্টাব্দে প্রথম শ্রেণিতে এম.ডি ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৭৪ খ্রিস্টাব্দে ময়মনসিংহ জেলার আঠারবাড়ি কলেজে শিক্ষকতা শুরু করে ১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দ থেকে একই জেলার গৌরীপুর কলেজে অধ্যাপনা করে ১৯৮০ খ্রিস্টাব্দে ১লা জানুয়ারি মদনমোহন কলেজে অধ্যপনা শুরু করেন এবং ২০০২ খ্রিস্টাব্দে প্রিন্সিপালের দায়িত্ব গ্রহণ করে ২০১০ খ্রিস্টাব্দে অবসর গ্রহণ করেন।

বর্তমানে তিনি সিলেট সেন্ট্রাল কলেজে প্রিন্সিপাল হিসেবে কর্মরত আছেন। ১৯৮৪ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশ ন্যাশনাল ক্যাডেট কোর-এর অফিসার হিসেবে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় কর্তৃক কমিশনপ্রাপ্ত হন এবং ২০০৬ খ্রিস্টাব্দে লেফটেনেন্ট কর্নেল হিসেবে পদোন্নতি লাভ করেন। তার সমাজসেবামূলক কার্যক্রমের স্বীকৃতি স্বরূপ তিনি ২০০১ খ্রিস্টাব্দে সিলেট মুক্তিযোদ্ধা একাডেমি কর্তৃক এবং ২০০২ খ্রিস্টাব্দে দেশের শ্রেষ্ঠ শিক্ষক হিসেবে সম্মাননা ও স্বর্ণপদক লাভ করেন। এছাড়া ২০০৬ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ স্কাউট কমিশনার পদক, ২০০৯ খ্রিস্টাব্দে কলকাতা গ্লোবাল ইনস্টিটিউট থেকে সমাজসেবা পদক এবং ২০১১ খ্রিস্টাব্দে বিএনসিসি থেকে আজীবন সম্মাননা পদক লাভ করেন। এম আতাউর রহমান পীর ১৯৯৭-১৯৯৮ রোটারি বর্ষে রোটারি ক্লাব অব জালালাবাদ-এর সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন এবং দেশের শ্রেষ্ঠ সভাপতি মনোনীত হন। তিনি সিলেট মোবাইল পাঠাগার; মেট্রোপলিটন ল’ কলেজ, সিলেট; মেট্রোপলিটন কিন্ডার গার্টেন, সিলেট; জামেয়া হাফিজিয়া দরগাহে শাহ আছদ আলী পীর (রহ.), ষোলঘর সুনামগঞ্জ এবং ওমর ফারুক (রা.) হাফিজিয়া ইসলামিয়া মাদ্রাসা সিলেট-এর প্রতিষ্ঠাতা। তিনি মরহুম জননেতা আব্দুস সামাদ আজাদ ফাউন্ডেশন ঢাকা; মজলুম জননেতা মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী ফাউন্ডেশন সিলেট; সুনামগঞ্জ সমিতি সিলেট-এর উপদেষ্টা; গ্যাস বিদ্যুৎ গ্রাহক কল্যাণ কেন্দ্রীয় সমিতি এর আহবায়ক; ভাষা আন্দোলনের সূচনাকারী সংগঠন তমদ্দুন মজলিস, সিলেট-এর বিভাগীয় কমিটির সভাপতি। ২০০৬ খ্রিস্টাব্দে তিনি সুনামগঞ্জ শহরে শাহ আছদ আলী পীর (রহ.) ফাউন্ডেশন গঠন করে একই বছর থেকে চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র-ছাত্রীদের জন্যে মেধাবৃত্তি চালু করেন। তিনি বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত। বাংলা একাডেমি; বাংলাদেশ রসায়ন সমিতি; রেডক্রিসেন্ট সোসাইটি সিলেট; রোটারি হাসপাতাল সিলেট; ডায়বেটিক সমিতি সুনামগঞ্জ; প্রবীণ হিতৈষী সংঘ সিলেট; প্রবীণ হিতৈষী সংঘ সুনামগঞ্জ প্রভৃতি সামাজিক সংগঠনের তিনি আজীবন সদস্য। তার প্রকাশিত গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে : উচ্চ মাধ্যমিক ব্যবহারিক রসায়ন (১৯৮২); ¯œাতক ব্যবহারিক রসায়ন (১৯৮৫); দ্যা ক্রিড অভ ইসলাম-অনুবাদ (২০০৬); ইসলাম : কালজয়ী জীবনাদর্শ-প্রবন্ধ সংকলন (২০০৭); সুখের সন্ধানে-প্রবন্ধ সংকলন (২০০৯); জেনারেল ওসমানী-সম্পাদনা গ্রন্থ (২০০৯); দৈনন্দিন জীবনে মহানবী (সা.) Prophet Mohammed (sm) in Everyday Life (২০০৯); দৈনন্দিন জীবনে কুরআনের শিক্ষা Teaching of The Quran in Everyday Life ২০১০ ভাষা সৈনিক শিক্ষাবিদ অধ্যক্ষ মাসউদ খান-যৌথ (২০১৫), মহানবী (সা.)-কে নিবেদিত পঙ্ক্তিমালা (২০১৫) ইত্যাদি। প্রিন্সিপাল এম আতাউর রহমান পীর ২০১৯-২০ সালের রোটারি জেলা ৩২৮২ এর জেলা গভর্নর নির্বাচিত হয়েছেন। তার সহধর্মিণী মিসেস ফিরোজা আক্তার একজন স্কুল শিক্ষিকা। তাদের দুই পুত্র ও এক কন্যা সন্তান রয়েছেন। দু’পুত্রই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং জ্যেষ্ঠ পুত্র রানা এম এস রহমান পীর অস্ট্রেলিয়ার সিডনী বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং কনিষ্ঠ পুত্র শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জনের জন্য গবেষণারত আছেন। একমাত্র কন্যা নাবিলা এ বছর এইচএসসি পরীক্ষার্থী।

সিলেটের প্রথম অনলাইন দৈনিক সিলেট এক্সপ্রেস ডট কম-এর পক্ষ থেকে প্রিন্সিপাল লে. কর্নেল (অব.) এম. আতাউর রহমান পীর-এর একটি সাক্ষাৎকার গ্রহণ করা হয়। সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেন সিলেট এক্সপ্রেস-এর স্টাফ রিপোর্টার তাসলিমা খানম বীথি।

বীথি: কবে থেকে লেখালেখি শুরু করেছেন? প্রথম লেখা কী ছিলো এবং সেটি কত সালে প্রকাশিত হয়?

এম আতাউর রহমান পীর: লেখা শুরু করেছি বললে বলতে হবে, তৃতীয় শ্রেণি থেকে। তখনই বলতে গেলে লেখার হাতেখড়ি। আমাদের ক্লাস টিচার ছিলেন (মরহুম) আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী স্যার। আমাদের বাংলা পড়াতেন, ছিলেন পন্ডিত ব্যক্তিত্ব। ক্লাসে প্রায়ই গল্প বলতেন, তারপর আমাদেরকে লেখতে বলতেন। আমরা লেখতাম। এভাবে এক বছরে অনেক গল্প লেখেছিলাম। আমি বলব, সেই স্যারের মাধ্যমেই লেখার শুরু। তবে সেটা লেখার কারণে লেখা নয়। লেখার কারণে লেখার শুরু ১৯৮১ খ্রিস্টাব্দে, মদন মোহন কলেজ বার্ষিক ম্যাগাজিনে। সে লেখাটি ছিল মরমী কবি, কামেল ওলী শাহ আছদ আলী পীর (রহ.) কে নিয়ে। তিনি আমার প্রপিতামহ। মাওলানা কেরামত আলী জৈনপুরীর খলিফা। তারপর ‘ইসলামে মূল্যবোধ’ নামে একটি প্রবন্ধ লেখি ঢাকা থেকে প্রকাশিত দৈনিক ইনকিলাব পত্রিকায়। এরপর থেকে মাঝে মধ্যে লেখি। লেখার মান পাঠকরা যাচাই করবেন। আমার লেখার প্রতিপাদ্য বিষয় হচ্ছে তরুণদের নিজ জীবন গঠনে ও দেশ গঠনে উদ্বুদ্ধ করণ, শান্তিময় বিশ্ব গঠনে প্রচারণা আর ইসলাম শান্তির ধর্ম, অসাম্প্রদায়িক ধর্ম এবং ইসলাম সন্ত্রাসকে যে কখনও সমর্থন করে না তা প্রচার করা।

বীথি: এ পর্যন্ত আপনার কতগুলো বই বের হয়েছে। নতুন কোন বই বের করার পরিকল্পনা আছে কী?

এম আতাউর রহমান পীর: এ পর্যন্ত ১৫ টা বই প্রকাশিত হয়েছে। তবে মৌলিক গ্রন্থ ৩ টি। বাকিগুলো সম্পাদনা ও সংকলিত। অদূর ভবিষ্যতে একটি ধর্ম সংক্রান্ত বই প্রকাশের ইচ্ছা আছে।

বীথি: লেখালেখি ক্ষেত্রে কাদের উৎসাহ সবচেয়ে বেশি পেয়েছেন?

এম আতাউর রহমান পীর: লেখালেখির ক্ষেত্রে পরিবার, বন্ধুবান্ধব, সহকর্মী আর ছাত্র-ছাত্রীদের সহযোগিতা ও উৎসাহ আমাকে প্রেরণা দিয়েছে।

বীথি: শৈশব কৈশোর কোথায় কেটেছে? শৈশবের স্মরণীয় কোন স্মৃতির কথা বলুন?

এম.আতাউর রহমান পীর: শৈশব কৈশোর দু’টোই কেটেছে আমার সুনামগঞ্জে। স্কুল কেটেছে ঐতিহ্যবাহী সুনামগঞ্জ সরকারি হাই স্কুলে আর উচ্চ মাধ্যমিক পড়েছি সুনামগঞ্জ কলেজে। কলেজটি তখন ছিল বেসরকারি। শৈশব কৈশোরের স্মৃতির মধ্যে বেশি মনে পড়ে পরিবারে ঘনিষ্ঠতার কথা। ওই সময় পরিবারগুলোর মধ্যে যে সহমর্মিতা ছিল, এখন কোথায় জানি তা হারিয়ে গেছে। কিছুটা অভাবের তাড়নায় আর বাকিটা যান্ত্রিকতার কারণে। শৈশবে ১০-১২ এমন কি ২০ মাইল হেঁটে হেঁটে ফুফুর বাড়ি কিংবা মামা বাড়ি যাওয়ার কথা এখন গল্পের মতো মনে হয়।

বীথি: লেখালেখি নিয়ে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?

এম আতাউর রহমান পীর: লেখালেখি কোন পরিকল্পনা করে কি হয়? জানি না। অন্তত আমার তো হয় না। তবে মওলানা ভাসানীকে নিয়ে একটা সম্পাদিত গ্রন্থ করতে চাই। আমার মনে হয় বর্তমানে তাঁর যথার্থ মূল্যায়ন হচ্ছে না। অথচ তিনি ছিলেন মজলুম জনগণের নেতা। ছিলেন যথার্থ দেশপ্রেমিক। এমন কোন আন্দোলন নেই যেখানে এ নেতার উপস্থিতি ছিল না।

বীথি: লেখার ক্ষেত্রে কোন বিষয়টি আপনাকে প্রভাবিত করে?

এম আতাউর রহমান পীর: লেখার ক্ষেত্রে নৈতিকতার বিষয়টিকে আমি প্রাধান্য দেই সব থেকে বেশি। তাছাড়া তরুণদের উদ্বুদ্ধকরণের বিষয়টিও আমি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় রাখি। আর নৈতিকতার প্রসঙ্গ আসলে স্বভাবতই আসে ধর্মীয় মূল্যবোধের কথা। পৃথিবীর প্রতিটি ধর্মই খারাপকে ঘৃণা করে, মন্দ কাজ থেকে দূরে থাকতে বলে, মানুষের কল্যাণের কথা বলে। এবিষয়গুলোই লেখার ক্ষেত্রে আমাকে প্রভাবিত করে। তা ছাড়া একজন রোটারিয়ান হিসেবে আমি বিশ্বশান্তিতে বিশ্বাসী। তাই আমার লেখার মধ্যে সব সময়ই বিশ্বশান্তি প্রাধান্য পায়।

বীথি: একজন রোটারিয়ান হিসেবে আপনি বিশ্বশান্তিতে বিশ্বাসী। তাহলে বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য কী করা উচিৎ বলে আপনি মনে করেন?

এম আতাউর রহমান পীর: বিশ্বশান্তির জন্য সর্বাগ্রে প্রয়োজন গণতন্ত্র আর সুশাসন। অর্থাৎ সৎ লোকের শাসন। এছাড়াও প্রয়োজন শিক্ষা। তবে সে শিক্ষার সংঙ্গে নৈতিকতা থাকতে হব। বিশ্ব শান্তির জন্য আরো প্রয়োজন ক্ষুধা ও দারিদ্রমুক্ত সমাজ। কেবলমাত্র সুশাসন ও শিক্ষাই মানুষের দারিদ্র দূর করতে পারবে। যে সমাজে আইনের শাসন নেই, যেখানে অন্ন, বস্ত্র, স্বাস্থ্য, শিক্ষা আর বাসস্থানের সুব্যবস্থা নেই সেই সমাজে শান্তি আসতে পারে না। সমাজে শান্তি না থাকলে দেশে শান্তি থাকে না, দেশে দেশে শান্তি না থাকলে বিশ্বে শান্তি আসবে কীভাবে?

বীথি: কোন লেখকের লেখা পড়ে আপনি অনুপ্রাণিত হয়েছেন লেখালেখির ক্ষেত্রে?

এম আতাউর রহমান পীর: কারো লেখা পড়ে লেখার জন্য অনুপ্রাণিত হয়েছি বলে মনে হয় না। ছাত্রজীবনে অনেকের লেখাই পড়েছি। যা পেতাম তা-ই পড়তাম। কোন বাছবিচার করতাম না। শিক্ষকতা জীবনেই লেখালেখি শুরু, তাও ছাত্রদের অনুরোধে। ছাত্ররা সবসময়ই শিক্ষকদের জ্ঞানী ও সবজান্তা মনে করে। আমার বেলাও ঘটেছে তাই। বিভিন্ন ম্যাগাজিনের জন্য ছাত্ররা লেখা চাইতো। লেখা না দিলে মান ইজ্জত যাবে, তাই লেখতে হতো। এভাবেই লেখক (?) হয়ে গেছি। তবে আমার লেখাগুলো আমার খুব পছন্দ। কেননা আমার অধিকাংশ লেখায় আমি আমাদের আগামী প্রজন্মকে দিকনির্দেশনা দেওয়ার চেষ্টা করেছি।

বীথি: সিলেটের সাহিত্য চর্চাকে আপনি কিভাবে মূল্যায়ন করবেন? সাহিত্য সংগঠন নিয়ে আপনার মতামত কী?

এম আতাউর রহমান পীর: সিলেটের সাহিত্য চর্চার গৌরবোজ্জ্বল অতীত রয়েছে। এ এলাকায় নিজস্ব লিপিতেও সাহিত্য চর্চা হয়েছে। বর্তমানে যেমন প্রতিথযশা সাহিত্যিক রয়েছেন তেমন উদীয়মান সাহিত্যিকের ও সংখ্যা অনেক। তাই সিলেটের সাহিত্য চর্চা আপন গতিতেই এগুবে বলে আমার বিশ্বাস। সিলেটের সাহিত্য সংগঠনগুলোর কার্যক্রম খুবই আশাব্যঞ্জক।

বীথি: সিলেটের সাহিত্য সংগঠন নিয়ে আপনার মূল্যায়ন কী?

এম আতাউর রহমান পীর: সিলেটের সাহিত্যাঙ্গন খুবই সমৃদ্ধ। চর্যাপদে অনেক সিলেটি শব্দ পাওয়া গেছে। সিলেট বাউল ও মারিফতি গানেও সমৃদ্ধ ছিল। আধুনিক সাহিত্যেও সৈয়দ মুজতবা আলী, শাহেদ আলীসহ অনেকেই অবদান রেখেছেন। বর্তমান প্রজন্মের যারা সাহিত্য চর্চা করছেন তারাও বিশ্ব সমাজে বরেণ্য হচ্ছেন। সিলেট হচ্ছে প্রকৃতির লীলাভূমি। এখানে সাহিত্যিকের জন্ম হবে এটাই স্বাভাবিক। আর এই স্বাভাবিকতার কল্যাণে এখানে জন্ম নিচ্ছে হাজার হাজার কবি, সাহিত্যিক আর লেখকের। এ ধারা অব্যাহত রাখতে সিলেট কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদ ও সিলেট মোবাইল পাঠাগার নিজ সামর্থ অনুযায়ী কাজ করে যাচ্ছে।

বীথি: আপনার লেখার মধ্যে এমন কোন লেখা আছে কী যা পাঠকের মনে দাগ কেটেছে? উল্লেখ্যযোগ্য কোন লেখাটি?

এম আতাউর রহমান পীর: আমার কোন লেখায় কারো মনে দাগ কেটেছে কি না, সেটা আমি বলবো কিভাবে, সেটাতো পাঠকরা জানে। আমার লেখায় তেমন উল্লেখযোগ্য কিছু আছে বলে আমার মনে হয় না। ভবিষ্যতে পাঠকরা যদি কোন লেখাকে গ্রহণ করে তাহলে সেটাই হবে আমার উল্লেখযোগ্য লেখা। তবে আমার মনে যে লেখাটি দাগ কেটেছে সেটি হচ্ছে আল্লামা আবুল হাশিম লিখিত ‘দ্য ক্রীড অভ ইসলাম’ যার অনুবাদ আমি করেছি। এমন প্রাঞ্জল অনুবাদ আমার পক্ষে আরেকবার করা সম্ভব হবে না। এ বইয়ে ইসলামকে যেভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে তা তুলনাহীন।

বীথি: লেখালেখির ক্ষেত্রে অনলাইন পত্রিকা বা লিটল ম্যাগাজিনগুলো কতটুকু ভূমিকা রাখছে বলে আপনি মনে করেন?

এম. আতাউর রহমান পীর: লেখালেখির ক্ষেত্রে লিটল ম্যাগাজিনগুলোর ভূমিকা অপরিসীম। আমি মনে করি লিটল ম্যাগাজিনগুলো লেখক সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখছে। তবে অনলাইন পত্রিকাগুলো লেখক সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা না রাখলেও সংবাদকর্মী সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখছে।

বীথি: কবে থেকে শিক্ষকতা পেশার সাথে জড়িত হলেন? শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নিলেন কেন?

এম আতাউর রহমান পীর: চাকরির শুরুটাই আমার শিক্ষকতা দিয়ে। ১৯৭৪ খ্রিস্টাব্দে ময়মনসিংহ জেলার আঠারবাড়ি কলেজে ১ম চাকরিতে যোগ দিয়েছিলাম। আমার আব্বা ও চাচা ছিলেন শিক্ষক, আমার দুই নানা ও এক মামা ছিলেন শিক্ষক, তাই শিক্ষকতা ছিল আমার মনের মুকুরে গাঁথা একটা পেশা। তাছাড়া আমি সব সময়ই মনে করি শিক্ষকতা একটি মহান পেশা। এ পেশার মাধ্যমে দেশের জন্য, সমাজের জন্য, যোগ্য নাগরিক গড়া যায়। একজন শিক্ষক সমাজ গঠনে ভূমিকা রাখতে পারেন। তাই এটাকে আমি পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছিলাম। তবে সমাজ গঠনে আমি কতটুকু করতে পেরেছি জানি না, ভবিষ্যৎ এর মূল্যায়ন করবে। তবে আমি আপ্রাণ চেষ্টা করেছি, এখনও করছি।

বীথি: আপনার সাংগঠনিক জীবন সম্পর্কে জানতে চাই? সংগঠক হিসেবে আপনার ভূমিকা কতটুকু রয়েছে?

এম আতাউর রহমান পীর: আমি নিজেকে সংগঠক হিসেবে ভাবি না। আমার নেশা ও পেশা শিক্ষকতা। শিক্ষক হিসেবে যা করার তা-ই করেছি সব সময়। এতে হয়তো কিছু সাংগঠনিক কাজ হয়ে গেছে। ছাত্রজীবনেই আমি নেতৃত্বে থাকতাম। যখন স্কুলে পড়তাম তখন ক্লাস ক্যাপ্টেন ছিলাম। কলেজ জীবনে কাজ করি তমদ্দুন মজলিসের কর্মী হিসেবে। এ সংগঠনটি ভাষা আন্দোলনের সূচনা করেছিল। তাই এ সংগঠনকে পছন্দ করতাম, এখনও করি। তমদ্দুন মজলিস সিলেট বিভাগীয় কমিটির বর্তমান সভাপতি আমি। সরাসরি ছাত্র রাজনীতি কখনও করিনি বললেই চলে। তবে একাদশ শ্রেণিতে পড়ার সময় কলেজ ছাত্র সংসদে যখন ভোট দেওয়ার সময় এলো তখন ছাত্র ইউনিয়নকে ভোট দিয়েছিলাম। এম.সি কলেজে যখন অনার্স পড়তাম তখন ছাত্রশক্তিকে পছন্দ করতাম। প্রায় নিয়মিত তাদের সভায় যেতাম। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় প্রতিবাদী সংগঠন হিসেবে জাসদ ছাত্রলীগকে পছন্দ করতাম। তবে সরাসরি কখনও রাজনীতি করিনি। শিক্ষকতায় যোগ দেওয়ার পর কোন রাজনৈতিক দলের সদস্য হইনি কিংবা কোন রাজনৈতিক দলের সভায়ও যাইনি। তবে সব সময়ই প্রগতিশীলদের পছন্দ করেছি। শিক্ষক হিসেবে ছাত্র-ছাত্রীদের ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য ক্যাডেট কোর এবং রোভারিং করেছি। পরবর্তীতে রোটারি ক্লাবে যোগ দেই এবং যুব পুরুষ ও মহিলাদের জন্য রোটারির যে কার্যক্রম রয়েছে রোটারেক্ট ও ইন্টারেক্টদের উন্নয়নে তথা যুব সমাজকে ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার প্রয়াস চালিয়েছি। এছাড়াও সচেতন মানুষ হিসেবে সব সময়ই সমাজ উন্নয়নে সকল কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার চেষ্টা করেছি। সচেতন নাগরিক হিসেবে সিলেটের ন্যায্য দাবি আদায়ের অনেক আন্দোলনের সঙ্গেও আমি যুক্ত ছিলাম ও আছি। শিক্ষার উন্নয়নে ভূমিকা রাখার চেষ্টা করি। তবে এতে এটা প্রমাণিত হয় না যে আমি একজন ভালো সংগঠক।

বীথি : আপনি দীর্ঘদিন থেকে শিক্ষকতা সাথে যুক্ত রয়েছেন। সেই প্রেক্ষিতে বর্তমান আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

এম আতাউর রহমান পীর: আমাদের বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা যুগোপযোগীর কাছাকাছি নিঃসন্দেহে। কিন্তু এর ত্রুটি অনেক। যেমন আমরা সৃজনশীল পদ্ধতি শুরু করেছি, অথচ অধিকাংশ শিক্ষক জানেন না সৃজনশীল পদ্ধতি কি? তাই বাধ্য হয়ে তারা গাইড বইয়ের দ্বারস্থ হন। আবার অভিভাবকদের অর্থকষ্ট লাঘবের জন্য বইয়ের আকার ছোট করা হয়েছে। এতে অনেক তথ্য সন্নিবেশিত হয়নি। অথচ প্রশ্ন করা হয় বইয়ে যা দেওয়া হয়নি তা থেকে। তাই ছাত্রদেরও গাইড বই পড়া ছাড়া কোন গন্তব্য নেই। এসব বিষয়ের প্রতি মন্ত্রণালয়কে যতœশীল হওয়া প্রয়োজন। তা ছাড়া পাশের হার বাড়ানোর জন্য বোর্ডগুলো প্রতিযোগিতায় ব্যস্ত। তাই শিক্ষার মান নি¤œমুখী। এটা আমাকে খুবই আহত করে।

বীথি: আপনার দীর্ঘ শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা ক্ষেত্রে নতুন কোন চিন্তাধারা আছে কী?

এম আতাউর রহমান পীর : প্রথমে বলতে হয় আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা আনপ্রডাকটিক। জিপিএ ৫ আর শতভাগ পাশ করানো জন্য সরকার যেন বদ্ধপরিকর। তারপর লাখ লাখ বিএ এমএ তৈরি হচ্ছে দেশে। চাকরি নেই, তাই অধিকাংশ বেকার। যারা বিদেশ যাচ্ছে তারা বেশির ভাগই অদক্ষ। তাই অনেকে মানবেতর জীবনযাপন করছে। অথচ এরাই যদি কারিগরী শিক্ষায় শিক্ষিত হতো তা হলে নিজে যেমন উপকৃত হতো, দেশও উন্নত হতো। আমার পরামর্শ অধিকাংশ সাধারণ কলেজকে কারিগরী কলেজ, ভোকেশনাল স্কুল, ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত করা হোক। দেশের তরুণ সমাজকে দক্ষ জনশক্তিতে পরিণত করার ব্যবস্থা নেওয়া হোক। সাধারণ কলেজের অনুমোদন বন্ধ করে কারিগরী প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন সহজ করা হোক। এতে দক্ষ জনশক্তি বৃদ্ধি পাবে। সরকারের ভিশন মধ্য আয়ের দেশ গঠন সহজ হবে।

বীথি: আপনার সময়ে কয়েকজন গুণী শিক্ষকদের কথা বলেন যাদেরকে দেখে আপনি অনুপ্রাণিত হয়েছেন?

এম আতাউর রহমান পীর: গুণী শিক্ষকদের তো অভাব ছিলনা একসময়। এখন না অভাব দেখা দিয়েছে। ক’জনের নাম বলব। আমার আব্বাই আমার প্রথম শিক্ষক। তিনি ছিলেন বাংলা বিষয়ের পন্ডিত। খুব ভালো পাটিগণিতও জানতেন। জীবনে কখনও প্রাইভেট পড়াননি যদিও অভাবের সংসার ছিল আমাদের। রসায়নের আমার শিক্ষকদের মধ্যে সুনামগঞ্জ কলেজের গীতেশ রঞ্জন আচার্য, এম সি কলেজের ড. শফিকুর রহমান, ড. আব্দুল মজিদ, ড. আজিজুর রহমান মিঠু, প্রফেসর আব্দুল মতিন, প্রফেসর বিধু ভূষণ চন্দ প্রফেসর শ্রী নিবাস দে, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. আবু সালেহ ও ড. সরোজ হাজারী-এর নাম বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হয়। সুনামগঞ্জ জুবিলী হাই স্কুলের কাজী শামসুদ্দিন স্যার, মোহাম্মদ আলী স্যার, আবুল হোসেন স্যার, মাসুদুল হাসান স্যারসহ প্রায় সকল শিক্ষকই আমার মতো সকল জুবিলিয়ানের প্রেরণার উৎস।

বীথি: আপনি একাধারে একজন শিক্ষক, লেখক, সংগঠক, সমাজসেবক ও রোটারীয়ান এর মধ্যে কোন পরিচয়টি আপনাকে গর্বিত করে?

এম.আতাউর রহমান পীর: আমি একজন শিক্ষক এভাবে পরিচিত হতেই আমি গৌরব বোধ করি।

বীথি: বিভিন্ন পেশার সাথে বিভিন্ন ভাবে আপনি জড়িয়ে রয়েছেন এবং কাজ করছেন। এসব কাজ করতে গিয়ে কখনো কী কোন সমস্যার সম্মুখিন হয়েছেন?

এম.আতাউর রহমান পীর: কাজ করলে সমস্যা থাকবেই। যারা কাজ করে তাদেরকে সব প্রতিকূলতার কথা চিন্তা করেই কাজ করতে হয়। বিশেষ করে আমি কোন কাজ শুরু করার আগে ওই কাজের সম্ভাব্য অসুবিধাগুলোর কথা চিন্তা করে প্রস্তুতি নিয়ে রাখি। তাই খুব একটা অসুবিধার সম্মুখিন আমি কখনও হই নি। তারপরও আমার পরিকল্পনা অনুযায়ী সবকাজ হয় না। যখন হয় না, তখন সেই পরিস্থিতিতে সমাধানের চেষ্টা করি।

বীথি: অতীতের স্মৃতি থেকে উল্লেখযোগ্য একটি স্মৃতির কথা বলেন যা আপনাকে আনন্দ দেয় বা কষ্ট দেয়?

এম আতাউর রহমান পীর: আনন্দদায়ক স্মৃতি অনেক আছে। শিক্ষক পিতার অভাবের সংসারে লেখাপড়া করা, শিশু বয়সে মা হারানোর পর চাচা-চাচি, ফুফুতো, চাচাতো ভাই-বোনদের অত্যাধিক আদরে লালিত হওয়া, মাস্টার্স পর্যন্ত পড়তে পারা, বিয়ে, স্ত্রী-সন্তানাদি, চাকরী, বি এন সিসি, রোভার ও রোটারির মাধ্যমে মানুষের সেবা করা, স্কুল-কলেজ- মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করা সবগুলোই আনন্দদায়ক কাজ। তবে সুদীর্ঘ ৩০ বছর মদন মোহন কলেজে চাকরি করে স্বাভাবিক অবসরের মাত্র ৫ মাস আগে কলেজের কতিপয় স্বার্থান্বেষী শিক্ষকের কারণে এবং রাজনৈতিক বিবেচনায় অবসরে চলে যাওয়াটা আমাকে খুব পীড়া দেয়। আমি চাই শিক্ষাঙ্গন রাজনীতির প্রভাবমুক্ত থাকুক। রাজনৈতিক বিবেচনায় প্রিন্সিপাল নিয়োগ, ভিসি নিয়োগ বন্ধ হোক। শিক্ষাঙ্গনগুলো প্রকৃত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে উঠুক।

বীথি: শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে সন্ত্রাসমুক্ত হলে কি পদক্ষেপ নেয়া উচিৎ বলে আপনি মনে করেন?

এম আতাউর রহমান পীর: শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাস ক্যান্সারের রূপ ধারণ করেছে। সন্ত্রাসের কারণে শত শত মায়ের বুক খালি হচ্ছে। এটা বন্ধ করতে প্রথমেই সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে, তারপর শিক্ষকদের রাজনীতি ও রাজনৈতিক দলের লেজুরবৃত্তি বন্ধ করতে হবে, দলীয় পরিচয়ে শিক্ষক নিয়োগ বন্ধ করে মেধাবীদের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দিতে হবে, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে অবিলম্বে নির্বাচন দিয়ে তরুণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে নেতৃত্বের গুণাবলী অর্জনের সুযোগ করে দিতে হবে।

বীথি: দেশের উন্নয়নে লেখক বা শিক্ষকরা কী ধরণের ভূমিকা রাখতে পারেন বলে আপনি মনে করেন?

এম আতাউর রহমান পীর: লেখক ও শিক্ষকরা হচ্ছেন শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ। অন্যদের চেয়ে তারা দেশ নিয়ে বেশি ভাবেন বলে আমার ধারণা। তাই লেখকরা তাদের লেখনির মাধ্যমে জনগণকে দেশ গঠনে উদ্বুদ্ধ করতে পারেন, আর শিক্ষকরা এদেশের তরুণ সমাজকে দেশপ্রেমে উদ্ভুদ্ধ করতে পারেন।

বীথি: বাংলাদেশ নিয়ে আপনার স্বপ্নের কথা বলেন?

এম আতাউর রহমান পীর: বাংলাদেশ আমার মাতৃভূমি। এদেশের স্বাধীনতার পেছনে কাজ করেছিল শোষণ, বৈষম্য আর পাঞ্জাবী সেনাদের অবৈধ শাসন। অধিকাংশ মানুষের মুখের ভাষা বাংলা হলেও রাষ্ট্রভাষার মর্যাদার জন্য রফিক, সালাম, বরকতসহ অনেকেই জীবন দিয়েছেন। স্বাধীনতা যুদ্ধের লাখ লাখ মানুষ জীবন দিয়েছেন, মা-বোনেরা তাদের ইজ্জত হারিয়েছেন। সবার মত আমারও আশা ছিল এদেশে গণতন্ত্র থাকবে, সুশাসন থাকবে, এদেশে থাকবে না শোষণ, থাকবে না নিপীড়ন। কিন্তু সেটা শতভাগ বাস্তবায়িত হয়নি। আমাদের দীর্ঘদিনের অসাম্প্রদায়িক ঐতিহ্য লালন করব দিনের পর দিন। এদেশটি সত্যিকারের সোনার বাংলা হিসেবে গড়ে উঠবে।

বীথি: একজন সফল শিক্ষকের কী গুণ থাকা উচিৎ ?

এম আতাউর রহমান পীর: একজন ভালো শিক্ষক তিনিই, যিনি তার বিষয়টি সকল ছাত্রকে তার মেধার সামর্থ অনুযায়ী বুঝাতে পারেন। তাছাড়া সফল শিক্ষকের যে গুণাবলী থাকা জরুরি তা হচ্ছে:

মেধা, শিক্ষার্থীকে বুঝার ক্ষমতা, শিক্ষার্থীর আচরণ সম্পর্কে জ্ঞান, শিক্ষার্থীর প্রতি ভালোবাসা। এছাড়াও শিক্ষক হবেন: সৌম্য-মধুর ব্যক্তিত্বের অধিকারী, শান্ত- মেজাজ ও পরিমিতিবোধের অধিকারী, শিক্ষার্থীর আপনজন, সহ্যশক্তি, ক্ষমাগুণ এবং সহজাত প্রসন্নতার অধিকারী এবং তার চলাফেরা হবে সরলরেখার মতো-যাতে করে শিক্ষার্থীরা সরল ও সঠিক প্রেরণায় উজ্জীবিত হয়।

বীথি: একজন লেখকের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী? বই প্রকাশ আর বই পড়ার ক্ষেত্রে তথ্য প্রযুক্তির প্রভাব নিয়ে আপনার অভিমত কী?

এম আতাউর রহমান পীর: আমার কাছে মনে হয় লেখকের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ পাঠক সৃষ্টি করা এবং একই সঙ্গে ক্রেতা সৃষ্টি করা। পাঠক সৃষ্টি করা সহজ, কারণ বই ধার করেও পাঠ করা যায়, কিন্তু ক্রেতা সৃষ্টি হলে বই ক্রয় করবে। এতে লেখকের লাভ হবে। আমাদের দেশে ১৬ কোটি মানুষ।যদি ১ কোটি পাঠক থাকে তাহলে গড়ে প্রতি জেলায় দেড় লাখ পাঠক। প্রতি জেলায় এ পরিমাণ পাঠক থাকলে ১০০০ ক্রেতা থাকবে না কেন? তাই আমার কাছে মনে হয় লেখকদের বড় চ্যালেঞ্জ ক্রেতা সৃষ্টি করা। বই প্রকাশের ক্ষেত্রে তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহার খুবই জরুরি। পাঠক সৃষ্টিতেও তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে, কিন্তু ক্রেতা সৃষ্টিতে তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষ কাজে লাগবে বলে আমার মনে হয় না।

বীথি: একজন লেখক বা শিক্ষক হিসেবে নিজেকে কতটুকু সফল ভাবেন?

এম আতাউর রহমান পীর: একজন শিক্ষক হিসেবে আমি তৃপ্ত। শিক্ষাদানে আমার কোন ত্রুটি ছিল বলে মনে করি না। তাই নিজেকে একজন সফল শিক্ষকই ভাবি। আর লেখক হিসেবে তো আমার হাতেখড়ি। যা লিখেছি তাতে নিজেই তৃপ্ত না। অনেক কিছু লেখতে ইচ্ছে হয়। পারি না। তাই লেখক হিসেবে অতৃপ্তি যেমন আছে মনে হয় আমৃত্যু সেটা থাকবে।

বীথি: জীবনে কী হতে চেয়েছিলেন?

এম.আতাউর রহমান পীর: শিক্ষক হতে চেয়ে ছিলাম। তাই অন্য কোন পেশা খুঁজিনি কখনও। আমার পিতা ও পিতৃব্য ছিলেন শিক্ষক। তারা ছিলেন সাদা মনের মানুষ। শিক্ষকতা ছিল তাদের নেশা। তাদের দেখেই শিক্ষকতার প্রতি আমার আগ্রহ জন্মে। কলেজ জীবনে এসে শিক্ষকদের সুন্দর জীবনযাপন দেখে শিক্ষকতার প্রতি আরও বেশি আকৃষ্ট হই। আমার শিক্ষক গীতেশ আচার্য-এর পাঠদান আমাকে মুগ্ধ করে, তাই হতে চাই তার মত রসায়নের শিক্ষক। পড়াশোনা করি রসায়ন বিষয়ে। পরবর্তীতে ড. শফিকুর রহমান (এমসি কলেজ) ও ড. এম এ সালেহ (চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়) আমাকে আরও মুগ্ধ করেন। শিক্ষক হিসেবে তাঁরা আমারআদর্শ।

বীথি : প্রিয় লেখক? প্রিয় বই?

এম আতাউর রহমান পীর: প্রিয় লেখক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। আর প্রিয় বই যাযাবর লিখিত ‘দৃষ্টিপাত’।

বীথি: কোন সময়টাতে বই পড়া বেছে নেন আর প্রতিদিন কয় ঘন্টা বই পড়েন?

এম আতাউর রহমান পীর: বই পড়ার কোন নির্দিষ্ট সময় নেই। যখন সময় পাই তখনই পড়ি। এক সময় রাত জেগে বই পড়তাম। ভালো বই পেলে এখনও রাত জেগে পড়ি।

বীথি: কী খেতে ভালোবাসেন?

এম আতাউর রহমান পীর: সব কিছুই আমি খাই। তবে মাছ আর শুটকি হচ্ছে প্রিয়। মধু, পনির, সাতকরা খেতেও ভালো লাগে। ফলের মধ্যে আম, পেঁপে, আনারস।

বীথি: কী অপছন্দ করেন?

এম আতাউর রহমান পীর: মিথ্যা কথা, পরচর্চা। তবে পরচর্চা তথা গীবত থেকে বেঁচে থাকা খুব কষ্টকর।

বীথি: কাকে সবচেয়ে বেশি মিস করেন?

এম আতাউর রহমান পীর: মাকে আমি হারিয়েছি ৩ বছর বয়সে। তাই সব সময়ই তাঁর অনুপস্থিতি অনুভব করি।

বীথি: যে স্বপ্ন আপনাকে ঘুমাতে দেয় না?

এম আতাউর রহমান পীর: আমার স্বপ্ন একটি শোষণহীণ সমাজ। এজন্য প্রয়োজন সফল গণতন্ত্র আর আইনের শাসন। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে আমাদের দেশে এ দু’টোরই অভাব। এ ধরণের সমাজ গড়তে হলে সুশিক্ষিত, মানবদরদী যুব সমাজের প্রয়োজন। এমন যুব সমাজ আমাদের দেশে গড়ে তুলবো এটা আমার স্বপ্ন। আর এ স্বপ্ন আমাকে তাড়িয়ে বেড়ায়।

বীথি: আপনার জীবনে সেরা উপদেশ কী ছিলো?

এম আতাউর রহমান পীর: আমার আব্বা বলতেন, ভালো মানুষ হও। আমার মনে হয় এটাই আমার জীবনের সেরা উপদেশ। সারাজীবন চেষ্টা করেছি ভালো মানুষ হতে। জানি না কতটুকু মানুষ হতে পেরেছি। তবে আজীবন মানুষ হওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাব।

বীথি: আপনি সবসময় ব্যস্ত থাকেন বিভিন্ন কাজে।পরিবারকে তেমন সময় দিতে পারেন না। এই নিয়ে কী কখনো অভিযোগ শুনেছেন সদস্যদের কাছে?

এম আতাউর রহমান পীর: ব্যস্ততাই তো জীবন। তাই অনেক কাজেই ব্যস্ত থাকি। তবে পরিবারকে ও সময় দেওয়ার চেষ্টা করি। তারপরও অভিযোগ থাকাই স্বাভাবিক। তবে আমি যে দায়িত্ব নেই সেটাই আমার কাছে প্রধান। তবে সবকিছুকে মেনেজ করে নিতে পারলে ভালো হয়। যদিও সব সময় পারি না।

বীথি: আপনার তারুণ্যের পেছনে রহস্য কী?

এম আতাউর রহমান পীর: চিন্তা করছি। সহজ প্রশ্ন, কঠিন উত্তর–আমি তরুণ কি না জানি না। তবে আমি তারুণ্যকে পছন্দ করি। তরুণকে ভালোবাসি। তাই তরুণদের নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করেছি। এর মধ্যে বি এনসি সি-এর ক্যাডেট, স্কাউট, রোটারেক্টর, ইন্টারেক্টর আমার আপনজন। তরুণদের নিয়ে থাকি বলেই হয়তো আমার মাঝে তারুণ্য কাজ করে।

বীথি: বর্তমানে কী নিয়ে ব্যস্ত রয়েছেন?

এম আতাউর রহমান পীর: বর্তমানে ব্যস্ততা হচ্ছে রোটারি কর্মকান্ড নিয়ে, এটা আমার নেশা। এর মাধ্যমে সম্মিলিতভাবে সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য কাজ করা যায়।

বীথি: অবসরে কী করেন?

এম আতাউর রহমান পীর: অবসর বলতে সত্যিকার অর্থে কিছু নেই। কলেজ, রোটারি কর্মকান্ড, বইলেখা, বইপড়া, পারিবারিক কিছু কাজ করার পর আর অবসর বলতে কিছু থাকে না।

বীথি: আগামী প্রজন্মের প্রতি আপনার কী উপদেশ থাকবে?

এম আতাউর রহমান পীর: আগামী প্রজন্মকে বলবো, নিজের প্রতি বিশ্বাস রাখো, স্বপ্ন দেখ এবং স্বপ্নের পেছনে ছুটো। আর সত্যিকারের মানুষ হও। শেখার ক্ষেত্রে শুধু সিলেবাসের উপর জোড় দিয়ে এ+ পাওয়ার জন্য না ছুটে জানার জন্য তথা জ্ঞান অর্জনের জন্য পড়াশুনা করতে হবে।

বীথি: মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক কোন স্মৃতি কথা মনে পড়ে কী?

এম আতাউর রহমান পীর: স্বাধীনতা যুদ্ধ এদেশের মানুষের অহংকার। হায়েনাদের সাথে নয় মাস যুদ্ধ করে এদেশকে আমরা স্বাধীন করেছি। স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে পারিনি, তাই সবসময়ই আপসোস হয়। তবে আমি সবক্ষেত্রে ছিলাম স্বাধীনতার পক্ষে। কেননা আমি সবসময়ই অন্যায়ের বিরুদ্ধে থাকি। অন্যায়ের বিরুদ্ধে আমি সবসময়ই প্রতিবাদী কণ্ঠ। হানাদার বাহিনী যেভাবে নিরীহ মানুষকে হত্যা করছিল তা বিবেকবান মানুষ হিসেবে সমর্থন করতে পারিনি। সুনামগঞ্জের মরহুম মুক্তিযোদ্ধা শহীদ চৌধুরী এবং জাফলং এলাকার (গোয়াইনঘাট উপজেলা) মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল হান্নান ভাই এবং আমার খালাত ভাই মুক্তিযোদ্ধা মরহুম সৈয়দ মহিদ আলীর সঙ্গে ছিল আমার নিয়মিত যোগাযোগ। যখন যেভাবে পেরেছি মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য করেছি।

বীথি: আপনাকে সিলেট এক্সপ্রেসের পক্ষ থেকে আন্তরিকভাবে ধন্যবাদ।

এম আতাউর রহমান পীর: আপনাকে এবং সিলেট এক্সপ্রেসকেও ধন্যবাদ।

আরও পড়ুন