একজন বরণ্য ব্যক্তিত্ব

প্রকাশিত : ১২ মার্চ, ২০১৯     আপডেট : ১ বছর আগে  
  

ফজলুল করিম আজাদ: ব্রিগ্রেডিয়ার জেনারেল জুবায়ের সিদ্দিকী (অব.), আমার সাথে বেশীদিনের সম্পর্ক নয় এই সাদা মনের মানুষটির সাথে, তবে কম দিনেরও নয়। তার দাদা শ্বশুর হযরত মাওলানা রমিজ উদ্দিন সিদ্দিকী (রহ.)-কে আমি দেখেছি। আমি যখন শৈশবে আমার আব্বা মরহুম মৌলানা ইসমাইল সাহেবের সাথে প্রথম সিলেট আসি, তখন আমরা তার বাড়িতে যাই। শায়খুল হাদিস হযরত মৌলানা রমিজ উদ্দিন (রহ.) ছিলেন আমার আব্বার সিলেট আলিয়া মাদ্রাসার ওস্তাদ ।
আমার সেই সফরটার কথা আজো ভুলতে পারিনি। আব্বা আমাকে নিয়ে তার আরেক ওস্তাদ হযরত মৌলানা ফৈয়াজ আলী খান সাহেবের বাড়িতে যান। সেখানে আমরা দুপুরের খানা খাই। অতঃপর আব্বা আমাকে নিয়ে মধুশহিদে কাজি মইদুল ইসলাম এডভোকেটের আব্বার সাথে দেখা করেন। তিনি আমার আব্বার মামা। খুব সুন্দর চেহারা, সুদর্শন মানুষ ছিলেন।
আমরা তিন দিন আম্বরখানা দত্তপাড়া নিবাসী নবীগঞ্জ কুর্শির জমিদার জহিরুল হক চৌধুরীর বাড়ির মেহমান হিসাবে অবস্থান করি। তাঁর ২ মেয়ে ও ২ ছেলে। মাশহুদা বেগম চৌধুরী, ডা. নিজামুল হক চৌধুরী, সোনালী ব্যাংকের সাবেক এমডি এনামুল হক চৌধুরী ও মাহবুবা খানম চৌধুরী। হবিগঞ্জ পৌরসভার প্রথম মুসলিম চেয়ারম্যান এডভোকেট হাবিবুর রহমানের সাথে মাশহুদা বেগম চৌধুরী বিয়ে হয়। তাদের তিন সন্তান, হারুনুর রশিদ (অব.)Ñউচ্চ প্রদস্থ বন কর্মকর্তা, মামুনুর রশিদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিষয়ে অনার্স মাস্টার ও রোকেয়া খাতুন গৃহিনী ।
উল্লেখিত বিষয় পাঠকের নিকট ধান বানতে গাজীর গীত মনে হতে পারে তাই………
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জুবায়ের সিদ্দিকী ১৯৪৯ সালে বালাগঞ্জ উপজেলার পাঁচ পাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন। বিখ্যাত শাহ সিদ্দিক (রহ.) ছিলেন তার পূর্ব পূরুষ। শাহ সিদ্দিক হযরত শাহজালাল (রহ.) সাথী ছিলেন। ঐতিহ্যবাহি পরিবারে জন্ম। তার দাদা ও দাদী হচ্ছেনÑ শাহ আব্বাস আলী সিদ্দিকী ও মজমুন নেছা। তারা অত্যন্ত দ্বীনদার ও পরহেজগার ব্যক্তি ছিলেন। শাহ তজম্মুল আলী সিদ্দিকী ও মরিয়মুন নেছা চৌধুরীর দশ সন্তানের মধ্যে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জুবায়ের সিদ্দিকী দ্বিতীয়। পিতৃকুল ও মাতৃকুল উভয় কুলই খুব সুনামধন্য। সিলেট অঞ্চলের সম্ভ্রান্ত পরিবার তালিকায় অগ্রগণ্য। বরইকান্দি চৌধুরী বাড়ীর একজন সুপুরুষ ইছহাক আলী চৌধুরী তার নানা এবং ধরাধরপুর মীরের বাড়ির বিদূষী রমণী সৈয়দা সাইয়েদুন নেছা তার আদরের নানি। তারা ভাই বোন সবাই নিজ নিজ অঙ্গনে প্রতিষ্ঠিত। পরিবারের সকল সদস্য শিক্ষাদীক্ষায় উন্নত ও প্রতিষ্ঠিত। রতœ গর্ভা মরিয়মুন নেছা চৌধুরী সন্তান যথাক্রমে: ১। আনসারুন নেছা সিদ্দিকা- অধ্যক্ষ (অব.) তাজপুর ডিগ্রি কলেজ। ২। জুবায়ের সিদ্দিকী ঃ ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ৩। শাহ নেওয়াজ সিদ্দিকী ঃ ব্যাংক ম্যানেজার (অব.) ৪। মুহসানা সিদ্দিকা (১৯৭২ সালের ১ ফেব্রুয়ারী তিনি জন্ম গ্রহন করেন ৫। মাহফুজা সিদ্দিকা, সহঃ অধ্যাপক ৬। শামীম সিদ্দিকী- এডভোকেট ৭। শাহরিয়ার সিদ্দিকী- লন্ডন প্রবাসী ৮। ফাতেমা সিদ্দিকা- গৃহিনী ৯। সাকেরা সিদ্দিকা- গৃহিনী ১০। জাকারিয়া সিদ্দিকী- লন্ডন প্রবাসী।
সপি আহমদ ও ফয়েজুন নেছার কন্যা, ওলিকুল শিরোমনি ও শায়খুল আছাতিজা শায়খুল হাদিস আল্লামা রজিম উদ্দিন সিদ্দিকী সাহেবের নাতনী দুলালী ইয়াছমিনের সাথে১৫ জুন ১৯৭৫ সালে ২৬ বছর বয়সে জুবায়ের বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। তাদের তিন কন্যা সন্তান। মৌরী জুবায়ের ঢাকার একটি স্কুলে শিক্ষক। তার স্বামী ক্যাপ্টেন এহসান পাইলট, তিনি কানাডার নাগরিক। মৌরী দম্পতির দুই ছেলে ইব্রাজ ও ইলাব।
দ্বিতীয় কন্যা তাইফা তাসনীম জুবায়ের স্বামী নাবিল আহমদকে নিয়ে ইংল্যান্ডে বসবাস করেন। তাদের ছেলে এক ছেলে সামিন আহমদ ও এক মেয়ে খাদিজা। কনিষ্ঠ কন্যা সাইনা জুবায়ের কানাডাতে অধ্যয়নরত।
এক নজরে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জুবায়ের সিদ্দিকীর ছাত্র ও কর্ম জীবন ঃ
প্রাইমারী শিক্ষা তিনি গ্রামের বাড়িতেই লাভ করেন। ১৯৬৪ সালে সিলেটের দি এইডেড হাই
স্কুল থেকে এসএসসি এবং ১৯৬৬ সালে মুরারী চাঁদ কলেজ থেকে এইচএসসি পাশ করেন। ১৯৬৭
সালে তৎকালীন পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে ৪১তম দীর্ঘ মেয়াদি কোর্সে রেগুলার কমিশন্ড অফিসার হিসেবে যোগ দেন। ১৯৬৯ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর আর্টিলারি কোরে কমিশন লাভ করেন। ১৯৭১ থেকে ১৯৭৩ সাল পর্যন্দ অন্যান্য আটকে পড়া বাঙ্গালিদের সাথে পাকিস্তানের নর্থ ওয়াজিরিস্তানের খাজুরি দুর্গে বন্দী ছিলেন। ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তনের পর বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর বিভিন্ন গুরুতৃপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি সেনা সদর, ডিভিশন ও ব্রিগেড সদর দফতর সমূহের স্টাফ অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালনসহ মোট তিনটি আর্টিলারি রেজিমেন্টের অধিনায়ক এবং দুইটি আর্টিলারি ব্রিগেডের কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৩ সাল থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের সামরিক উপদেষ্টা হিসেবে নতুন দিল্লিতে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ১৯৯৮-৯৯ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ চা বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯০-৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধে বাংলাদেশ সেনাদলের উপ-অধিনায়ক হিসাবে সউদি আরবে যুদ্ধে নিয়োজিত ছিলেন। তিনি বাংলাদেশ কমান্ড এন্ড স্টাফ কলেজ থেকে এবং চীনের ন্যাশনাল ডিফেন্স ইউনিভারসিটি থেকে যথাক্রমে পি এস সি এবং এন ডি ইউ ডিগ্রি লাভ করেন। দীর্ঘ ৩২ বছর সেনাবাহিনীতে চাকুরী করার পর ১৯৯৯ সালে অবসর গ্রহণ করেন। বর্তমানে সিলেটের স্কুলার্সহোম ইংরেজি মাধ্যম কলেজের অধ্যক্ষ হিসাবে কর্মরত আছেন।
আমার সাথে জুবায়ের সাহেবের ঘনিষ্টতা হয় তার ছোট ভগ্নিপতি অধ্যক্ষ আব্দুল হান্নানের মাধ্যমে । শাহজালাল জামেয়া ইসলামিয়ার সিনিয়র শিক্ষক যখন আমি, তখন অধ্যাপক আব্দুল হান্নান তাজপুর ডিগ্রি কলেজ থেকে এসে উক্ত প্রতিষ্ঠানে অধ্যক্ষের দায়িত্বে নিয়োগ প্রাপ্ত হন।
পরোপকারি ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জুবায়ের সিদ্দিকী মৃদুভাষি, সদা হাস্যোজ্জ্বল দৃঢ়চেতা সেনা কর্মকর্তা। তিনি প্রচার বিমূখ জীবন যাপন পছন্দ করেন। সাহিত্য সাধনা ও লেখালেখির গভীরতা আমরা জানতে পারি। তার লেখা স্মৃতির অলিন্দে গ্রন্থখানি পাঠ করে। তিনি বইটি উৎসর্গ করেছেন এই বলেÑ‘জীবনের সবচেয়ে কঠিন দিনগুলোতে যারা আমাকে দিয়েছিলেন অফুরন্ত প্রেরণা আর দুঃসময়কে অতিক্রম করার বুক ভরা সাহস তাদের স্মরণে’।
স্মৃতির অলিন্দে বইটিকে তিনি তার স্মৃতিকথা বলে উল্লেখ করেছেন। স্মৃতির অলিন্দে গ্রন্থটি ভূমিকা বাদ দিয়ে লেখক আটটি অধ্যায়ে ভাগ করেছেন। আট পর্বের প্রতিটি পর্বই রোমাঞ্চকর। বইটি অধ্যয়ন করলে পাঠক বুঝতে পারবেন তার লেখার মুন্সিয়ানা। প্রথম পদক্ষেপ, ১৯৭১ ও তারপর, দূর্গে অন্তরীন জীবন, অভ্যূত্থান থেকে বিপ্লব, অপারেশন মরুপ্রান্তর, চীনের দিনগুলো, ঘরে ফেরা ও আমার এ্যালবাম। অধ্যায়গুলো পাঠ করলে জানা যায় তার সৈনিক জীবন, স্বাধীনতা ও তার পরের ঘঁনাবলী, অভ্যূথান থেকে বিপ্লব অধ্যায়ে ৭৫ পরবর্তী বাংলাদেশের পরিস্থিতি। অপারেশন মরু প্রান্তর অধ্যায়ে চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে উপ-সাগরিক যুদ্ধের বিবরণ। চীনের দিনগুলোর অধ্যায়ে চীন দেশের ভৌগলিক ও প্রাকৃতিক বর্ণনা এবং চীনা সামাজিক সাংস্কৃতিক চিত্র।
এই বিদগ্ধ উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তা ও বিশিষ্ট শিক্ষবিদ অধ্যক্ষ ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জুবায়ের সিদ্দিকীর ৭০তম জন্ম বার্ষিকীতে সিলেটবাসীর পক্ষ থেকে জানাই লাল গোলাপ শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন। তার বাকী জীবনে সুস্থ্যতা ও দীর্ঘায়ু কামনা করি।
ফজলুল করিম আজাদ : কার্যকরী পরিষদ সদস্য, কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদ, সিলেট।

আরও পড়ুন



মাধবপুরে নারী সহ ৪ গাঁজা পাচারকারী গ্রেফতার

আবুল হোসেন সবুজ,মাধবপুর (হবিগঞ্জ) প্রতিনিধি:...

জগন্নাথপুরের আবুল হোসেন মালয়েশিয়ায় এমপি নির্বাচিত

সিলেট এক্সপ্রেস ডেস্ক: সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর...