একজন দেশপ্রেমিকের জন্মদিন

প্রকাশিত : ২১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯     আপডেট : ১ বছর আগে  
  

 সৈয়দ সাকিব আহমদ:

” দুপুরের খাবার খেয়ে একটু ঘুমবো এমন
সময় অনন্ত সেন এসে হাজির! সাধারণত
এমন সময় কেউ কারো বাড়িতে আসে না
কোনো বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া। কিন্তু
অনন্ত সেনের বেলায় এমন কোনো নিয়ম
প্রযোজ্য নয়।
– কি খবর মশাই, কি করা হচ্ছে?
– এইতো দাদা, একটু ঘুমাবো
ভেবেছিলাম কিন্তু আপনাকে যখন
পেয়েছি তখন গল্প করেই না হয় সময় টা
কাটানো যাবে, কি বলেন?
– তা অবশ্য যথার্থ বলেছো।
অনন্ত সেন বড় রসের মানুষ, কিন্তু এই
অবেলায় তার মধুমাখা রস আমার কাছে
নিমের রসের মতোই লাগছে। কিন্তু কি
আর করা ভদ্রলোক যখন এসেছেন তখন না
হয় একটু গল্পই করি।
– তা হঠাৎ কি মনে করে দাদা, কোনো
উদ্দেশ্য আছে নাকি?
– না, উদ্দেশ্য তেমন একটা নেই তবে
একটা অপ্রাসঙ্গিক কারণ আছে!
– অপ্রাসঙ্গিক কারণ! বলুন দেখি কি?
– শুনলাম কাল রাতে নাকি শহরে
মিলিটারি নেমেছে,অনেক মানুষ মারা
পড়েছে।
– কি বলেন এইসব! আমি তো কিছুই জানি
না!
– আরে হ্যা। গ্রামের সবাই বলাবলি
করছে।
– তাতে আমাদের কি, আমরা গা’য়ের
মানুষ,আমাদের মারবে কেন, আমাদের
কি অপরাধ।
– সারা দেশেই নাকি মিলিটারি
ছড়িয়ে পড়েছে, যাকে পাচ্ছে তাকে
মারছে, ওদের আসল টার্গেট নাকি
হিন্দুরা!
– ওরা মুসলমান বলে হিন্দুদের মারবে!
আমাদের কি বাঁচার অধিকার নেই?
– এসব কথা ছাড়ো, কাজের কথায় আসা
যাক, আমরা সবাই কাল বর্ডার পার হয়ে
ভারত চলে যাবো, আমাদের সাথে
তোমিও চলো,এদেশে থাকলে তো
বাঁচতে পারবো না আমরা।
– নাহ, নিজের দেশ ছেড়ে অন্যের
দেশে কেন যাবো… আপনারাই যান!
একটা চিন্তিত গম্ভীর মুখ নিয়ে
বেরিয়ে গেলেন অনন্ত সেন, তার
হাসি মাখা মুখে এই প্রথম চিন্তার ছাপ
দেখে ঘটনার ভয়াবহতা উপলব্ধি করতে
পারলাম!
কি হচ্ছে দেশে! পশ্চিম পাকিস্তানিরা
কি সত্যিই আমাদের শেষ করে দিবে?
আমাদের কি হাত-পা নেই,আমরা কি এর
প্রতিবাদ করতে পারি না?
এসব চিন্তাই এখন মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে,
রাতে ঠিকমতো ঘুমটাও হলো না।
পরদিন খুব ভোরে অনন্ত সেন
স্বপরিবারে আমার বাড়ির দরজায়
হাজির! ওনার সাথে ওনার স্ত্রী,৫
বছরের ছোট শিশু, ওনার বৃদ্ধ বাবা,অনেক
গুলি ব্যাগ, ট্রাংক। দেখে বুঝে গেলাম
ওনারা দেশ ছাড়ছেন, কাল বিকেলের
কথার প্রতিফল এগুলোই! ওনারা সত্যি
সত্যিই ভারত চলে যাচ্ছেন! আমার
কাছে থেকে বিদায় নিতে এসেছেন।
– কি ব্যাপার দাদা,এই সাজ সকালে
সবকিছু নিয়ে কোথায় চললেন?
– দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছি সবাইকে
নিয়ে, তোমার কাছে থেকে বিদায়
নিতে এলাম।
এর পরেই আমাদে জড়িয়ে ধরে কাঁদো
কাঁদো কন্ঠে বললেন ‘ বেচে থাকলে
আবার দেখা হবে, সাবধানে থেকো ‘
এর পরেই চলে গেলেন।
অনন্ত সেন আমাদের গ্রামেরই
লোক,আমাকে নিজের ছোট ভাইয়ের
মতোই দেখেন। আমি এখানে একা
থাকি, আপন বলতে ওনারাই আছেন।
অনন্ত সেন যাওয়ার পর সমস্ত ঘটনা জানার
জন্য বেরিয়ে পড়লাম গ্রামে, ঘটনা
সত্যিই! একে একে সবাই গ্রাম ছেড়ে
চলে যাচ্ছে।
এভাবেই চলতে থাকলো….
বেশ কয়েকদিন পর জানতে পারলাম
আমাদের গ্রামেও মিলিটারি
ঢুকেছে,গা’য়ে শান্তি কমিটি গঠিত
হয়েছে, অনেক লোক ঐ কমিটিতে নাম
লেখিয়েছে!
ঐদিন রাতেই এক উদ্ভট ঘটনা
ঘটলো…সন্ধ্যার পর অনন্ত সেন এসে
হাজির,সাথে ৪-৫ টা ছেলে!
– আরে দাদা তুমি! ফিরে এসেছেন
নাকি, আর এরা কারা?
ওনি বললেন সবাইকে ভারতে রেখে
তিনি আবার এখানে ফিরে এসেছেন,
ওনি নাকি দেশের জন্যে যুদ্ধ করবেন,
শুনে কিছুটা হাসি পেলো আমার… যেই
লোকটা শহরে মিলিটারি ঢুকেছে বলে
দেশ ছাড়লো সে নাকি আবার যুদ্ধ
করবে !!
কিন্তু একটা বিষয় লক্ষ করলাম ‘ ওনার কথার
গভীরে কোথাও যেনো একটা শক্তি,
একটা সাহস লোকিয়ে আছে।
ওনারা আজ ট্রেনিং এর জন্যে ভারতে
যাবেন,আমাকে দলে নিতে এসেছেন।
আমারও দেশের জন্য যুদ্ধ করার ইচ্ছা
ছিলো, তাই এই সুযোগটা হাতছাড়া
করলাম না…
আমরা ০৫ জন ঐ রাতেই বেরিয়ে
পড়লাম,বর্ডার ত্রস করে ভারতে গেলাম।
ওখানে গিয়ে দেখলাম আরো অসংখ্য
ছেলে-মেয়েরা ট্রেনিং করছে
দেশের জন্যে যুদ্ধ করবে বলে।
বিষয়গুলো তখন থেকেই বুঝতে শুরু
করলাম,দেশ মানে মা!। মাকে মুক্ত
করতে হবে! পশ্চিম পাকিস্তানিদের
কাছ থেকে আমাদের দেশমাতা কে
স্বাধিন করার সময় এসেগেছে!
১ মাসের ট্রেনিং শেষে আমরা আবার
দেশে ফিরলাম,৯ জনের একটা দল, অনন্ত
সেন আমাদের কমান্ডার। ওনার মাঝে
যে এতো শক্তি, এতো সাহস, এতো
দেশপ্রেম আছে আমি তা আগে কখনো
উপলব্ধি করতে পারিনি। ধীরে ধীরে
ওনার প্রতি আমার অজানা একটা শ্রদ্ধা,
অজানা একটা ভালোবাসার সৃষ্টি হলো।
আমরা আমাদের গ্রামেই ফিরে
এলাম,মিলিটারিরা গ্রামের অনেককেই
হত্যা করেছে, নারী-পুরুষ,শিশু-বৃদ্ধ কেউই
বাদ পড়েনি,মুক্তিযোদ্ধাদের ধরে ধরে
নিয়ে মারছে,আর ওদের সাহায্য করছে
স্থানীয় কিছু লোকজন।
কমান্ডারের নেতৃত্যে একদিন রাতে
অপারেশন পরিচালনার প্ল্যান করা
হলো…কমান্ডার নিজে গিয়ে ওখানকার
সবকিছু খবর নিয়ে আসলেন। ওরা ৩০-৪০
জন আছে, সাথে ৮-৯ জন এদেশিও
দালাল।
মধ্যরাতে অপারেশন শুরু হলো,আমাদের
হঠাৎ আক্রমনে বেশ কয়েকজন মারা
গেলো। এভাবে বেশ কিচ্ছুক্ষণ ধরে
গুলাগুলি চলতে থাকলো। কমান্ডার বেশ
ভালোভাবেই নেতৃত্য দিচ্ছিলেন
আমাদের।
ভোরের দিকে হঠাৎ তার বুকের ডান
পাশে একটা গুলি এসে লাগলো,ওনি
পড়ে গেলেন। সবাই সাহায্যে জন্যে
আসলে তিনি সবাইকে যুদ্ধ চালিয়ে
যাওয়ার আদেশ দিলেন।
আমি ওনাকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় কাদে
করে ক্যাম্পে নিয়ে আসলাম।
ওনি যন্ত্রায় কাতরাচ্ছেন, আমার কাছে
পানি চাইলেন, আমি দিলাম।
দৌড় দিয়ে ডাক্তার বাবুর কাছে
যাবো এমন সময় তিনি আমার হাতটা ধরে
আমাকে বাধা দিলেন। বললেন এসবের
আর প্রয়োজন নেই।
এভাবে কিচ্ছুক্ষণ পর নিস্তব্ধ হয়ে
গেলেন,বুঝতে বাকি রইলো না তিনি
শহীদ হয়েছেন।
সকালে অন্যান্য মুক্তিযুদ্ধারা ফিরে
এলো…
– আমাদের কমান্ডার আর নেই!
কান্নায় ভেঙে পড়লো সবাই,সবাইকে
শান্তনা দিচ্ছিলাম… এমন সময় মনে একটা
শূন্যতা অনুভব করলাম, মনে হলো আমি কিছু
একটা হারিয়ে ফেলেছি!
আমি অনন্ত সেন কে হারিয়ে
ফেলেছি!
আমি আমার ভাইকে হারিয়ে ফেলেছি!
আমরা একজন মুক্তিযুদ্ধাকে হারিয়ে
ফেলেছি!
আমরা একজন দেশপ্রেমিককে হারিয়ে
ফেলেছি! ”
……
আজকে অনন্ত সেনের জন্মদিন। ওনার
ছবির পাশে দাঁড়িয়ে এইসব কথা ভাবতে
ভাবতে কখন যে চোখের কোণে জল
জমেছে নিজেও বুঝতে পারিনি।
ওনার জন্মদিনটাকে আমরা সবাই মিলে
প্রতি বছরইস্মরণ করি।
ওনার কবরের পাশে ওনার স্মরণে আমরা
একটা শিউলি গাছ লাগিয়েছিলাম,গাছ
টা আজ বড় হয়েছে, অনেক ফুল ধরেছে।
পাশের কয়েকটি গুলাপ গাছ,অনন্ত
সেনের প্রিয় ফুল সাদা গুলাপ।
প্রতি বছর ওনার জন্মদিকে ওনার ছবির
পাশে একটা করে সাদা গুলাপ
রাখতাম,এইবারও রাখলাম। ওনাকে স্মরণ
রাখার জন্য গ্রামে একটা স্কুল নির্মাণ
করেছি আমরা। ওপারে ভালো থাকুন
অনন্ত সেন,এতটুকুই চাওয়া আমাদের।
আসলে অনন্ত সেনেরা মরে না,বেচে
থাকে লক্ষ দেশপ্রেমিকের অনন্তরের
সুপ্ত ভালোবাসায়। “

আরও পড়ুন