একজন জাফরুল্লাহ চৌধুরীর জন্য প্রার্থণাঃ

প্রকাশিত : ১৯ জুন, ২০২০     আপডেট : ৩ মাস আগে
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

মুক্তা বেগম
আজ এমন একজন নিভৃত মহান দেশপ্রেমিকের কথা লেখতে বসেছি যার গুণ আর দেশপ্রেম এবং দেশের জন্য তারঁ নিরলস অবদানের বর্ণনা এই ক্ষুদ্র পরিসরে লিখে পূর্ণতা দান সম্ভব নয়। যিনি অসামান্য জ্ঞানী আর দেশের জন্য নিবেদিত প্রাণ মহান ব্যক্তিত্ব। দেশের স্বাধীনতার অর্জনে যিনি বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, যার কাছে এ জাতি চির ঋণে আবদ্ধ। তিনি আর কেউ নন, তিনি ডাঃ জাফরুল্লাহ চৌধুরী। তিনি এমন এক বাবার ঔরষজাত সন্তান যার শিক্ষাগুরু স্বয়ং দেশপ্রমিক বিপ্লবী মাস্টার’দা সূর্য সেন। এই কারনে হয়তো জন্মগতভাবে দেশপ্রেম তারঁ রক্তে মিশে আছে।
জাফরুল্লাহ চৌধুরী চট্টগ্রামে জন্ম গ্রহণ করলেও শুধু মাত্র এই এক জেলার গন্ডির ভিতরে আবদ্ধ না থেকে বিশ্বব্যাপী তারঁ কাজের ব্যাপ্তি প্রসার লাভ করেছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের পিছনে যেমনি রয়েছে লাখো মানুষের আত্মত্যাগ তেমনি স্বাধীন এই দেশের মানুষকে চিকিৎসা বিজ্ঞান আর উন্নত সেবা দানের জন্য তিনি নিরলস নিরবে, নিভৃতে কাজ করে যাচ্ছেন। ঢাকা কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাশ করার পর ভর্তি হন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে। ১৯৬৪ সালে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাশের পর তিনি উচ্চ শিক্ষার জন্য ইংল্যান্ডে চলে যান। সেখানে ১৯৬৭ সালে মেডিক্যাল প্রাইমারি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। সেখানে এফ আর সি এস পড়ার সময় নিজ দেশে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে চূড়ান্ত পর্ব শেষ না করেই মাতৃভূমির প্রতি গভীর ভালবাসা কারনে তিনি দেশে চলে আসেন। দেশে এসে জীবনের মায়া ত্যাগ করে মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। ইংল্যান্ডে থাকাকালীন সময়ে এদেশের জনগণের ওপর পাকিস্তান হানাদার বাহিনী নির্মম আর নিষ্ঠুর অত্যাচার চালানোর প্রতিবাদ স্বরূপ লন্ডনের হাইড পার্কে জড়ো হয়ে পাকিস্তানী পাসপোর্ট ছিড়ে পুড়িয়ে দেবার কারনে সেই সময়ের পাকিস্তান সরকার যাদেরকে দেশদ্রোহী হিসাবে চিহ্নিত করেছিল ডাঃ জাফরুল্লাহ তাদের অন্যতম । ছাত্রজীবনে তিনি ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন। ঢাকা মেডিক্যালে কলেজে পড়ার সময়ই তিনি সেখানকার অনিয়ম আর দূর্নীতির বিরোদ্ধে প্রতিবাদ সভা করার কারনে তৎকালীন সময়ে অনেকের রোষানলে পড়েন।
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে বিচারপতি আবু সাইদ চৌধুরী মুক্তিযুদ্ধে সহায়তার জন্য প্রবাসী বাঙ্গালীদের কাছ থেকে যে ১০ লক্ষ পাউন্ড সংগ্রহ এর পরামর্শ দাতা ছিলেন দেশপ্রমিক জাফরুল্লাহ চৌধুরী। শহীদ জননী জাহানারা ইমামের লেখা যুদ্ধ দিনের স্মৃতিকথা বই একাত্তরের দিনগুলি’র পৃষ্ঠা নং ১৬১-১৬২ পর্যন্ত তিনি বিস্তারিত বর্ণনা দিয়ে লিখেছেন পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর নির্মমতায় নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে ডাঃ জাফরুল্লাহ ও ডাঃ মবিনের বেঁচে যাওয়ার কাহিনী। যুদ্ধকালীন সময়ে আহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা সেবার জন্য ২নং সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার মেজর খালেদ মোশাররফের সহায়তায় আগরতলার বিশ্রামাগারের মেলা ঘরে গড়ে তোলেছিলেন ১৮০ শয্যার ফিল্ড হাসপাতাল। কিন্তু উক্ত হাসপাতালে ছিলনা পর্যাপ্ত পরিমাণ সেবিকা। তখন তিনি কিছু সংখ্যক সাহসী মেয়েদের দেশপ্রেমে উদ্ভূদ্ধ করে তাদেরকে ফিল্ড হাসপাতালে নিয়ে আসেন এই হাসপাতালে সেচ্ছায় সেবাদানের জন্য। পর্যাপ্ত প্রশিক্ষক না থাকার দরুন তিনি নিজেই উল্লেখিত মেয়েদের নার্সিং প্রশিক্ষন দেন। স্বাধীন বাংলাদেশে স্বেচ্ছায় সেবাদানে মেয়েদের অংশ গ্রহণ এটাই প্রথম। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিজয় লাভের পরে এই বীর মুক্তিযোদ্ধা দেশের মানুষের চিকিৎসা সেবা সুনিশ্চিত করার জন্য স্বাধীন দেশে এই ফিল্ড হাসপাতালটিকে পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল রূপে কুমিল্লায় স্থাপন করেন।যার নামকরণ করেন স্বয়ং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিজে। যার নাম হয় ‘গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র। এর পর হাসপাতালটি ঢাকার ইস্কাটনে স্থাপন করা হয়। পরব্তীতে ” চলো গ্রামে ফিরে যাই” এই শ্লোগানকে বাস্তব রূপ দিতে ঢাকার অদূরে সাভারে বঙ্গবন্ধুর দেয়া নামটি রেখেই বৃহৎ পরিসরে পরিপূর্ণ হাসপাতাল গড়ে তোলেন। এই হাসপাতালটির জন্য বঙ্গবন্ধু নিজে সাভারে ৩১ একর জমিও দান করেন। মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদান এবং জাতীয় ঔষধনীতি প্রবর্তনের জন্য ১৯৭৭ সালে তাকে ‘স্বাধীনতা পদক প্রদান করা হয়। তারপর তিনি ১৯৮২ সালে স্বাস্থ্যসেবায় গভীর মনোনিবেশ করেন। তৎকালীন সময়ে আমাদের দেশে যে ২২৫ টি ঔষধ আমদানী হতো তা বেশীর ভাগই ছিল নিম্নমানের। সেসব নিম্নমানের ঔষধকে দেশ থেকে হটিয়ে দেশে গড়ে তোলেন ঔষধ শিল্প। বর্তমানে দেশের ৯০%ঔষধই নিজ দেশে উৎপাদিত। বিশ্বে বাংলাদেশকে ঔষধ রপ্তানীকারক দেশ হিসাবে প্রতিষ্ঠা করার অনন্য ভূমিকা পালন করেন ডাঃ জাফরুল্লাহ চৌধুরী। তারঁ এই ঔষধনীতিতে কিছু অসাধু চিকিৎসকের স্বার্থে আঘাত লাগে। এমনকি তারা মহান এই দেশপ্রেমিকের ফাঁসী দাবী করে পোষ্টারিং পর্যন্ত করে।কিন্তু আমরা জানি যে সততা আর দেশপ্রেমের কখনো মৃত্যু হয় না তাই সে সময় তিনি প্রাণে বেঁচে যান ডাঃ জাফরুল্লাহ চৌধুরী।
বৈশ্বিক মহামারী কোভিড-১৯, নভেল করোনা ভাইরাসের কারনে সমগ্র বিশ্বের সাথে বাংলাদেশও আক্রান্ত হলে বিশ্বব্যাপী এই রোগের কোনো ভ্যাকসিন না থাকায় চলছে অক্লান্ত পরিশ্রমের গবেষণা।আমাদের দেশে এ রোগ নির্ণয়ের জন্য যন্ত্রপাতি(কিট)দূর্লভ এবং অপ্রতুল। আর এ কারনেই তিনি এই নিজ উদ্যোগে তাঁর প্রতিষ্ঠান থেকে এবং সর্বাত্মক সহযোগিতা ফলে তাঁরই প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞানী ডাঃ বিজন কুমার শীল আবিস্কার করেন করোনা সনাক্তকরণ কিট বা যন্ত্রপাতি। এখানেও তিনি বাধাগ্রস্ত হলেন। দেশব্যাপী প্রতিবাদের ঝড় ওঠার কারনে শেষমেষ অনুমোদন দেয়া হয় গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের রেপিড কিটের। তারঁ প্রতিষ্ঠানের আবিস্কৃত কিট এখন দেশে করোনা সনাক্ত করার কাজে ব্যবহার হওয়ার পাশাপাশি বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে। মহামারী থেকে দেশের মানুষকে বাঁচানোর জন্য কাজ করতে গিয়ে তিনি নিজেই আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু পথযাত্রী। দেশপ্রমিক এই মানুষটি করোনা সনাক্ত হওয়ার পরে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্তই তিনি তাঁর নিজ বাসভবনে হোম কোয়ারেন্টাইন এবং আইসোলেশনে ছিলেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে তারঁ স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটলে তাকে তারঁই হাসপাতালে ভর্তি করে সবধরনের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা প্রদান করা হয়। যদিও বা করোনা সনাক্ত হওয়ার সংবাদটি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী অবগত হওয়ার পরে এবং মুক্তিযোদ্ধাদের প্রস্তাব ও সুপারিশের ফলে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে বিশেষ ব্যবস্থাপনার একটি নির্দিষ্ট কেবিন তাঁর জন্য প্রস্তুত রাখা হয়। কিন্তু তারঁ নিজের প্রতিষ্ঠানের প্রতি অগাধ আস্থার কারনে ওখানেই তারঁ প্লাজমা থেরাপি সহ সকল চিকিৎসা প্রদানের ফলে তিনি সুস্থ্য হয়ে ওঠছিলেন। গতকাল সকালে তিনি সম্পূর্ন সুস্থ্য হয়েও ওঠেন। কিন্তু পরে বিকাল বেলার দিকে তারঁ শারিরীক অবস্থার অবনতি ঘটে। এটাই হচ্ছে গুপ্ত ঘাতক করোনা ভাইরাসের রোল। আক্রান্ত ব্যক্তি ঝুঁকির মধ্য দিয়েই রোগীর হঠাৎ করেই হার্ট এ্যাটাক, কিডনী ডেমেজ, ব্রেন স্ট্রোক হতে পারে। তিনি এখন বয়োবৃদ্ধ। এই অতি মানব যিনি শুধু আমদের দেশ ও জাতিকে নিঃসার্থভাবে দিয়েই গেলেন। আসুন আমরা ধর্ম-বর্ণ-গোত্র, নির্বিশেষে জাতির দূর্লভ প্রাপ্তি আমাদের অমূল্য রতন, এই দেশপ্রেমিক মহান বীরের জন্য মসজিদ-মন্দির-গীর্জা- প্যাগোডায় একযোগে সর্বশক্তিমান,পরম করুণাময় তারঁ দয়ার অফুরান ভান্ডার থেকে ডাঃ জাফরুল্লাহ চৌধুরী তথা আমাদের প্রিয় মাতৃভূমির প্রতি এতটুকু দয়া বর্ষণ করে তিনি যেনো অসহায় বিপদগ্রস্ত জাতিকে রক্ষা করেন এবং ডাঃ জাফরুল্লাহ চৌধুরীর সুস্থ্য, সুুন্দর দীর্ঘায়ূ দান করেন। হে বীর হে জ্ঞানী আপনি সুস্থ্য হয়ে আমাদের মাঝে ফিরে আসুন। সমগ্র দেশবাসী আপনার মহান রবের দয়ার আশায় বুক বেঁধে আছেন। ব্যাকুল আর্তনাদ আপনি আরোগ্য লাভ করুন। বিঃ দ্রঃ লেখার মাঝে কোন ভুল- ত্রুটি পাঠক ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আরও পড়ুন

সৌদিতে বিস্ফোরণে সিলেটের একজনসহ ৮ বাংলাদেশি নিহত

         সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের দাখেল...

জৈন্তাপুর তৈয়ব আলী ডিগ্রি কলেজে অভিভাবক সমাবেশ

         সিলেট এক্সপ্রেস ডেস্ক : ক্লাসে শিক্ষার্থী...

সিলেটে ঈদ উল ফিতরের প্রধান জামাত সকাল সাড়ে ৮ টায়

         সিলেট এক্সপ্রেস ডেস্ক: সিলেটের ঐতিহ্যবাহী...