উপন্যাস:দরজার আড়ালে (২য় পর্ব)-কামরুল আলম

,
প্রকাশিত : ২১ অক্টোবর, ২০২০     আপডেট : ৬ মাস আগে
  • 14
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    14
    Shares

এক্সপ্রেস সাহিত্য ডেস্ক ধানক্ষেতের নিচে ঘাপটি মেরে বসে থাকা সাগরের শরীরটা ক্রমশঃ ক্লান্ত হতে থাকল। রাজ্যের ঘুম এসে তার চোখ দুটো বন্ধ করে দিতে চাচ্ছে। কিন্তু নাছোড়বান্দা সাগর, ঘুমকে তাড়ানোর জন্য প্রচেষ্টা চালাতে লাগল। সে দাঁড়িয়ে হাঁটার চেষ্টা করে দেখল। ঘুমের ঠেলায় চোখ মেলে ঠিক মতো তাকাতেই পারছে না। আবার বসে পড়ল। কিছুক্ষণ জিরিয়ে নিলে বোধহয় মন্দ হবে না। এদিকে কার্তিকের কড়া রোদে তপ্ত হয়ে আছে মাঠের সবুজ ধানক্ষেত। ধানের ছড়াগুলো হলুদবরণ হতে শুরু করেছে। আধা হলুদ আধা সবুজ। অনেকটা লেমন গ্রীন কালারে পরিণত হয়েছে পুরো জমিন। সাগর কবি নয়, না হলে কবিতা লেখার এই চমৎকার উপকরণটি হাতছাড়া করত না।

সাগরের হাতে হাত রাখল শারমিন। সাগর অবাক হয়ে তাকাল শারমিনের দিকে। কী মায়াবি চেহারা মেয়েটির। শারমিনের হাতের ছোঁয়ায় সাগরের গোটা শরীর শিহরিত হচ্ছে। কারো মুখে কোনো কথা নেই।
সাগর সাহেব! কিছু বলছেন না যে!
শারমিনের কথা বলার সময় গালে টোল পড়ে। মুখের মিষ্টি চেহারাটা আরও আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। সাগরের খুব ইচ্ছে হয় শারমিনকে জড়িয়ে ধরতে। সে শারমিনকে কাছে টানে, তার বুকের কাছে। শারমিন ভেজা বিড়ালের মতো সাগরের বুকে মাথা রাখে। ঘুম ভেঙে যায় সাগরের।
এদিক ওদিক তাকায় সাগর। যেন শারমিনকেই খুঁজছে সে। এই সবুজ ধানক্ষেতে শারমিন কীভাবে আসবে? এটা তো স্বপ্নই ছিল তাহলে। বুঝতে বাকি থাকে না সাগরের। মাথার ওপরে থাকা সূর্যটা হেলে পড়েছে। রোদের তেজটাও কমে গেছে। ধীরে ধীরে সন্ধ্যা হয়ে যাবে। নাতিদীর্ঘ একটা ঘুম দিয়েছে সাগর। ঘুমের মধ্যে স্বপ্নও দেখেছে। এবার ধানক্ষেতের আল ধরে হাঁটতে হবে। দ্রুত কোনো লোকালয়ের দিকে যেতে হবে। সাগরের ভাবনাগুলো মাথায় চক্কর দিতেই হাঁটা শুরু হয়ে গেল। ডানে-বামে এবং সামনের দিকে তাকাল। চারদিকের লোকালয়ই খুব দূরে। আশপাশে কোনো ঘরবাড়ির চিহ্ন দেখা যাচ্ছে না। সে দ্রুত পায়ে সামনের দিকেই এগোল। অল্প কিছুক্ষণ হাঁটার পরই একটি কাঁচা রাস্তার সন্ধান পেলো সে। রাস্তাটি আকারে খুব বেশি বড় নয়। রিকশা চলারও উপযোগী নয়, তবে সাইকেল চালানোর মতো। রাস্তাটিতে উঠে দাঁড়াল সাগর। চারদিকে সবুজ ধানক্ষেত। ধানের ছড়াগুলোতে হলুদ হলুদ ভাব চলে আসায় দারুণ সুন্দর লাগছে। সাগরের মনে পড়ল সুফিয়া কামালের সেই কবিতাটির কথা।
সবুজ পাতার খামের ভেতর
হলুদ গাঁদা চিঠি লেখে
কোন পাথারের ওপার থেকে
আনল ডেকে হেমন্তকে!
কবির চোখে হেমন্ত ধরা পড়ে। সাগর আজ স্বচক্ষে দেখছে। কোনো এক অজানা ধানক্ষেতের মধ্যখানে দাঁড়িয়ে আছে সে হেমন্তের এক পড়ন্ত বিকেলে। এ দেশের কবিরা যদি তা জানতে পারত! কোনো ফটোগ্রাফার যদি এদিকে আসত, নিশ্চয়ই সাগরের একটি ছবি তার ক্যামেরায় বন্দি করত। প্রকৃতি তার রূপের পসরা সাজায় হেমন্তকালে। কিন্তু বেশিদিন কি এরকম থাকে। অল্প কিছুদিন পরেই এ সবুজ ধানক্ষেত হলুদ হয়ে যাবে। পাকা ফসল তুলতে দল বেঁধে মাঠে নামবে কৃষকেরা। ঘরে ঘরে শুরু হবে উৎসব। শুকনো মাঠে ছুটে বেড়াবে দুরন্ত কিশোরেরা। আবার বৃষ্টি হবে। আবারও ধান চাষ হবে। আল্লাহর বেঁধে দেওয়া নিয়মেই চলে প্রকৃতি।
..
সাগর সামনে পেছনে তাকাল। কোনদিকে হাঁটলে কোথায় যাবে কিছুই জানা নেই তাঁর। সূর্য তখন ডুবে যাচ্ছে প্রায়। সাগর লক্ষ্য স্থির করে নিল। যেদিকে সূর্য ডুবে যাচ্ছে সেদিকেই হাঁটা শুরু করল সে। সূর্যটা একসময় ডুবেই গেল। অন্ধকার নামতে শুরু করেছে। সাগরের পা যেন আর চলে না। কোনো বাড়িঘর বা হাটঘাটের সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না। হঠাৎ এক ঝাঁপ মেরে রাস্তার এ ধার থেকে ও ধারে ছুটে গেল কয়েকটি শেয়াল! সাগর শেয়ালের চেহারা দেখে প্রথমে ভেবেছিল কুকুর। কারণ সচরাচর তো শেয়াল দেখা যায় না। এই শেয়ালগুলো সাগরকে ভয় পেয়েছে নিশ্চয়। তাই দ্রুত পালিয়েছে। কিন্তু সাগরের মনেও কিঞ্চিৎ ভয় এসে দানা বাঁধতে শুরু করেছে। নির্জন এই সন্ধ্যায় ধানক্ষেতের মাঝখানে সরু পথ দিয়ে হেঁটে বেড়াচ্ছে সে। শেয়ালের পাল যদি তাকে ঘিরে ধরে! কী করবে সে? কী করার আছে তার। সাগরের ভাবনাগুলো মাথায় ঘোরপাক খাচ্ছিল। ঠিক সেই মুহূর্তেই একেবারে নিকটবর্তী জায়গা থেকে একদল শেয়াল সুর করে গান গাইতে লাগল। শেয়ালের ডাকের মধ্যেও একধরনের সুর আছে। একসাথে সবগুলো সুর মিলিয়ে চেঁচাচ্ছে। সাগর ভয় পেল। এই শেয়ালগুলো কি তাহলে তাকে ঘিরে ধরবে?
মাত্র কিছুদিন আগে মানুষরূপী হায়নাদের কবল থেকে বেঁচে গিয়েছিল সাগর। আজ পড়তে হচ্ছে শেয়ালের কবলে। আল্লাহই একমাত্র রক্ষাকর্তা। সে মনে মনে বারবার পড়তে লাগল- লা হাওলা ওয়া লাক্বুওয়াতা ইল্লাহ বিল্লাহ।অর্থাৎ ‘আল্লাহ ছাড়া কোনো ভরসা নেই; কোনো ক্ষমতা বা শক্তি নেই।’
শেয়ালের ডাক ধীরে ধীরে আরও কাছে চলে আসছে। সাগর হাঁটার গতি বাড়াতে লাগল। শেয়ালগুলোও সম্ভবত দৌড়াতে দৌড়াতে আসছে। সাগর আল্লাহর সাহায্য চাইল। তার মনে পড়ল, আজকে সে নামাজ পড়তেই ভুলে গেছে। আল্লাহর কাছে সাহায্য চাইতেও তাই লজ্জা লাগছে এখন তার। সে কী করে নামাজের কথা ভুলে গেল। ধানক্ষেতের আলে বসেছিল। সেখানেই তো নামাজ পড়তে পারত। জোহর গেল আসর গেল। এখন মাগরিবের ওয়াক্তও প্রায় যায় যায়। সাগর সিদ্ধান্ত নিল, এই শেয়ালদের কবল থেকে উদ্ধার হওয়া মাত্রই সে নামাজে দাঁড়াবে।
সাগরের পথ চলার সঙ্গী হলো কয়েকজন যুবক। সংখ্যায় ১০/১২ জন মানুষ হঠাৎ করেই সাগরের পেছন থেকে হাঁটতে হাঁটতে সামনের দিকে চলে যেতে লাগল। এরা প্রত্যেকের হাতেই লাঠি এবং দা-কুড়াল, টুকরি ইত্যাদি। গ্রামের দিনমজুরই হবে এরা। সবারই পরণে লুঙ্গি। কেউ হাফ হাতা গেঞ্জি পরেছে আবার কারও কারও গায়ে শার্ট। কারো গলায় গামছা বাঁধা, কারো বা কোমরে। তারা সবাই দ্রুত পায়ে হাঁটছে। কিন্তু অবাক করার মতো বিষয় হলো কেউ সাগরের দিকে তাকাল না। সাগরকে পাশ কাটিয়ে সামনে এগোতে লাগল।
ঘটনা কোনদিকে যাচ্ছে তা না ভেবেই সাগরও এই দিনমজুর দলের পিছনে ছুটতে লাগল। এদের পায়ের গতি দেখে অবাক হলো সে। তাদেরকে কোনোভাবেই চোখের আড়াল করা যাবে না। সে দ্রুত পায়ে হাঁটতে লাগল। মাঝে মাঝে দৌড়াতেও হলো। যাই হোক শেয়ালদলের আওয়াজ ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে গেছে। এখন আর শেয়ালকে ভয় পাচ্ছে না সাগর। মানুষের চেহারা দেখার পরই শেয়ালের ভয় দূর হয়ে গেছে তার। অথচ মানুষদেরই একটি অংশ তাকে মেরে ফেলতে চায়! এই মানুষগুলোও চাইলে সাগরকে মেরে ফেলতে পারত। কিন্তু এরা কেউ সাগরকে চেনে না। তার সঙ্গে কারো পরিচয় নেই।
হাঁটছে আর ভাবছে সাগর। এখন সে যাবে কোথায়। হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ খেয়াল হলো সামনের দিনমজুরের দলটিকে আর দেখা যাচ্ছে না। সর্বনাশ! এত দ্রুত কোথায় হাওয়া হয়ে গেল এরা! সাগর আরও দ্রুত পায়ে হাঁটল। না, কোথাও কেউ নেই। তবে একটা বিষয় খেয়াল করল সে, এখন আর চারদিকে ধানক্ষেত নয়, কিছু বাড়িঘর দেখা যাচ্ছে আশপাশে। অন্ধকার গাঢ় হবার আগেই সাগরকে একটা আশ্রয়কেন্দ্র খুঁজে বের করতে হবে। সবচেয়ে ভালো হয়, কোনো মসজিদের সন্ধান পাওয়া গেলে। ছোট রাস্তাটি একটি মাঝারি রাস্তায় এসে মিলি হয়েছে। সাগর এখন কোন দিকে পা ফেলবে, বুঝে উঠতে পারছে না। এই রাস্তাটিও কাঁচা রাস্তা। তবে গাড়ি চলাচলের উপযোগী। নিশ্চয়ই কোনো বাজার এলাকায় যাওয়ার রাস্তা হবে এটি। সাগর কিছুক্ষণ তেমুখী পয়েন্টে দাঁড়িয়ে রইল। যদি কোনো পথিকের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়। কিন্তু না, নির্জন রাস্তায় একা একা দাঁড়িয়ে থেকেও কোনো লাভ হলো না। ব্যাপার কী! এই এলাকায় মানুষজন থাকে না নাকি! হঠাৎ রাস্তার বাম দিক থেকে ‘ঘেউ ঘেউ’ করে দুটো কুকুর ছুটে এলো সাগরের দিকে। শেয়ালের ভয় কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই কুকুরের খপ্পরে পড়তে হলো এবার। সাগর কুকুরকে খুব বেশি ভয় পেল না। ছোটোবেলা সাগরের বাড়িতে পোষা কুকুর ছিল। তাই কুকুরের দৌড় সম্পর্কে বেশ অবগত রয়েছে। এই কুকুরগুলো যদি কারো বাড়ির পোষা কুকুর হয় তাহলে এরা তাকে কামড়াবে না। বরং তাড়িয়ে দেবে। সাগর মাঝারি রাস্তার ডান দিকে পা ফেলল ‘বিসমিল্লাহ’ বলে। কুকুরগুলো পেছনে পড়ে রইল। সাগরের কাছাকাছি এলো না। হতে পারে কুকুরগুলো তাদের এলাকায় অপরিচিত কাউকে প্রবেশ করতে দিতে চায় না। সাগর সামনের দিকে হাঁটতে লাগল। রাস্তার এক ধারে একটি খাল, প্রচুর গাছগাছালি এবং আগাছার ঝোঁপ। অপর পাশে একটি বাঁশের বেড়া। এই বাঁশের বেড়ার ভেতরে উঁচু পাহাড়ের মতো টিলা। পাহাড় হবে না, তবে বড় কোনো পুকুরের পাড় হতে পারে, ভাবল সাগর। তার মানে দাঁড়াচ্ছে সে কোনো একটি গ্রামের ভেতরের রাস্তায় প্রবেশ করেছে। আশার আলো জ্বলে উঠলো সাগরের মনে। আর কিছুদূর যেতেই একটি বৈদ্যুতিক বাতির সন্ধান পাওয়া গেল। ডানে-বামে তাকালেও দূরে আলোর সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে। হতে পারে এতক্ষণ ইলেকট্রিসিটি ছিল না। অথবা এইমাত্র লোকালয়ে এসে প্রবেশ করেছে সে। অবশ্য রাস্তায় কোনো আলোর ব্যবস্থা নেই। সাগর তার সামনে জ্বলে থাকা বৈদ্যুতিক বাতিকে টার্গেট করে এগোতে লাগল। বেশিক্ষণ লাগল না। কাছাকাছি চলে এসেছে। একটা মসজিদ এটা। মসজিদের উঠোনে একটা বাতি জ্বলছে। ভেতর অন্ধকার। মসজিদের প্রবেশদ্বারে বাঁশের তৈরি গেট। তাও আবার লক সিস্টেম। সাগরের কাছে এটা অপরিচিত নয়। তাদের গ্রামের মসজিদেও একসময় এরকম ছিল।
গেটলক খুলে মসজিদে প্রবেশ করল সাগর। একটি ছোট পুকুর রয়েছে মসজিদে। পুকুরের পানি একদম নিচের দিকে। এখন যে শুকনো মৌসুম তা জানান দিচ্ছে এই পুকুর। পুকুরঘাটের কাছেই একটি পানির কল। পানির কলটি দেখামাত্রই সাগরের পানি পানের ইচ্ছে হলো। সে পানির কলে চাপ দিয়ে পানি বের করতে লাগল। [চলবে]


  • 14
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    14
    Shares

পরবর্তী খবর পড়ুন : কবিতা: দিনলিপি-কে জে লিপি

আরও পড়ুন

সিলেট জেলা আইনজীবী সমিতির নির্বাচনে ভোট গ্রহণ চলছে

         সিলেট এক্সপ্রেস ডেস্ক: সিলেট জেলা...

দক্ষিণ সুরমার শিশু নাঈম হত্যা মামলায় চারজনের ফাঁসি

         সিলেটের দক্ষিণ সুরমায় আরেক চাঞ্চল্যকর...

মুজিববর্ষ বাংলাদেশ ব্যাংক ক্লাব ক্রিকেট লীগ শুরু

50        50Sharesসিলেট এক্সপ্রেস সিলেট জেলা স্টেডিয়ামে...

ছাত্র খুনের ঘটনায় দুই কিশোর গ্রেফতার

         সিলেটের দক্ষিণ সুরমার আলমপুর কারিগরি...