•  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সেলিম আউয়াল:
হাউজিং এস্টেটের গেইটের পাশে নোহা ব্রান্ডের মাইক্রোবাসে বসে ইকবাল মনসুর। চিকিৎসার জন্যে দ্বিতীয় বার ভারত যাচ্ছেন। গাড়িতে গিয়ে দেখা করলাম। ভেবেছিলাম দুমড়েমুছড়ে পড়া এক যুবক দেখবো। ভারী মন নিয়ে যে দোয়া চাইবে। ইকবাল মনসুর দোয়া চাইলো, কিন্তু তাকে খুব কনফিডেন্ট মনে হলো। বললো, এই একটু চেক আপে যাচ্ছি। তার যেন কিছুই হয়নি।
শাদাকালো জামানার ফটো সাংবাদিকতা আজকে ডিজিটাল ক্যামেরা হাতে ছুটে চলা তরুণ সাংবাদিকরা অনুভব করতে পারবেন না। ছবি তুলতে যতো না ঝুকি তার চেয়ে বেশী ঝুকি ফটো প্রিন্ট নিয়ে। ক্যামেরায় রোলটা ঠিকমতো বসেছে কি না। বসলেও দেখা গেলো ডেডেলপ করতে গিয়ে একটু সমস্যায় সব শ্রম পন্ড হবে। পুরো ফিল্মটা হয়ে যাবে শাদা। সেই শাদাকালো জামানায় যুগভেরীতে চোখ কাড়ে কিছু ছবি, একটু আলাদা ধরনের মনে হয়। তখন তো সিলেটে হাতে গোনা ফটো সাংবাদিক আতা ভাই, দুলাল হোসেন, আবদুল বাতিন ফয়সল এই কয়জন। যুগভেরীর সেই ছবিগুলোর নীচে নাম লেখা ইকবাল মনসুর। তার সাথে আমার পরিচয় নেই। আমি আগ্রহ ভরে তার ছবি দেখি। নিজের ছোট্ট ধারনা থেকে ছবি বিশ্লেষণ করি। একটি ছবির হয়তো প্রিন্ট ভালো হলো, কিন্তু দেখা যাবে এঙ্গেলটি ভালো হয়নি। তখন তো আর আজকের মতো একটির পর একটি ছবি তোলা যেতো না। গুণে গুণে ছবি তুলতে হবে। একটি ফিল্মে ছত্রিশটি ছবি তোলা যায়। পত্রিকা আর কতোটা ফিল্ম দেবে। তাই কম স্ন্যাপে ভালো ছবি তোলা চাট্টিখানি কথা নয়।
তারপর একসময় পরিচয় হলো। অনুজ ফয়সলের সাথে পেশাগত সীমানা পেরিয়ে বন্ধুত্ব। আমাকেও বড়ো ভাইয়ের মতো শ্রদ্ধা করেন। যুগভেরীর ছবি তোলার জামানা থেকে মৃত্যুর দিন পর্যন্ত আমার এক ধরনের অনুভবে ছিলেন মনসুর। যুগভেরীর ছবি, পরবর্তীতে শ্যামল সিলেটে তার ছবি আমি গভীরভাবে দেখতাম। তারপর তারা করলো ফটো জার্নালিস্ট এসোসিয়েশন। নানা কারনে এসোসিয়েশনের সবগুলো কাজই আমি জানতাম। বলা যায় খবর রাখতাম। সিলেটে কি হচ্ছে খবর রাখতাম, ঢাকায় চট্টগ্রামে খুলনায় কখন কোথায় এসোসিয়েশনের কী হচ্ছে সবই খবর রাখতাম। একবার মনসুর ফয়সল চীন গেলো, সেখানে ওরা সম্মেলন করলো, একজিবিশন করলো ছবি-টবি দেখলাম। সব খবর রাখি। ভালো ভালো এইসব খবর শুনতে শুনতে একদিন শুনি ইকবাল মনসুরের অসুখ।
টাইফয়েড ধরনের অসুখ হয়েছে ইকবাল মনসুরের প্রথমে শুনলাম। তারপর শুনলাম দূরারোগ্য ক্যান্সার বাসা বেধেছে ওর লিভারে। লিভার পাল্টাতে হবে। মফস্বলের একজন সাংবাদিকের কতো টাকা আর আয়। লিভার পাল্টানোর মতো টাকা পয়সার কথা তো ভাবাই যায় না। তার মানে ইকবাল আমাদের চোখের সামনে ধুকে ধুকে মরবেন। এর চেয়ে ভয়াবহ আর কী হতে পারে। সেই দিনগুলোতে আমাদের প্রবাসী ভাইবোনেরা এগিয়ে এলেন। আশার বাতি জ¦ললো আমাদের মনে। আমাদের চেয়ে আরো বেশী আশাবাদী ইকবাল মনসুর। দ্বিতীয়বার ভারত যাবার পর ডাক্তাররা তার সহযাত্রীদেরকে বলে দিলেন, চিকিৎসার আর কোন সুযোগ নেই। রোগী যা খেতে চায় খেতে দেবেন। ইকবাল তখনো আশাবাদী। শরীরটা তার কাছে ভালো ঠেকছে।
আশার বাতি এইভাবে দেখতে দেখতে ইকবালের জীবনবাতি গেলো নিভে। শবে বরাতের পবিত্র রাতে ইকবাল ভালো হয়ে উঠলেন। দুদিন আগেও তার বাসায় তাকে দেখতে গিয়েছিলাম, বিছানায় শুয়ে আছেন। অনেক কষ্টে আল্লাহ শব্দ উচ্চারণ করছেন। কিন্তু কথা বলতে পারছিলেন না, ঘনিষ্ট জনকেও চিনছিলেন না_সেই ইকবাল শবে বরাতের রাতে তার ঘনিষ্টজনদের সাথে মোবাইল ফোনে কথা বললেন। তার বোনেরা, স্নেহময়ী জননী স্বপ্ন দেখতে শুরু করলেন এবং স্বপ্নের অবসান হলো বুধবার সকালে। সারা রাত ইবাদতের পর শহরবাসী ঘুমাচ্ছিলেন। সবার নিদ টুটে গেলো। ভিড় জমে উঠলো ইকবাল মনসুরের কানিশাইলের বাসায়। অবাক রকম ভিড় বাদ আছর তার জানাজায়। নগরীর ভাতালিয়া জামে মসজিদে নামাজে জানাজা। পুরো মসজিদ ভরে গেলো, ভিড় উপচে পড়লো রাস্তায়। এলাকাবাসী বন্ধ করে দিলেন রাস্তা। তারপর ফুরায় এ জীবনের লেনদেন_ইকবালকে শুইয়ে দেয়া হলো তার নানা নানীর কবরের পাশে।

ইকবালের আস্থা ছিলো তার বন্ধুবান্ধবের উপর। সেই আস্থায় চির ধরেনি। দেশে বিদেশে ছড়িয়ে থাকা বন্ধু-গুণগ্রাহী-সুধী-সহমর্মীরা এগিয়ে এসেছিলেন তার চিকিৎসার জন্যে। দেশের প্রেক্ষাপটে যে সহায়তা ছিলো, তাকে ছোট করে দেখার অবকাশ নেই। আর চ্যানেল এস-এর মাধ্যমে সুধীজনের সহায়তা ইকবালের চিকিৎসা ব্যয় মেটাবার জন্যে যথেষ্ট ছিলো। এরচেয়ে আনন্দের কী হতে পারে, অন্তত অর্থের অভাবে তার চিকিৎসা ব্যাহত হয়নি। তারপরও তো জীবনমৃত্যু মহান আল্লাহর হাতে। আমাদের প্রত্যেককেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। কেউ একটু আগে আর কেউ একটু পরে। আমাদের ইকবাল মনসুর আমাদের চেয়ে আগে পাড়ি জমালেন পরপারে। মহান আল্লাহ কাছে আমাদের কামনা মাবুদ যেন তাকে জান্নাত নসিব করেন। আর তার কন্যা, প্রিয় জননী আর বোনদের জন্যে আল্লাহর সাহায্য কামনা করবো এবং ইকবালের সতীর্থরা নিজেদের সাধ্য অনুযায়ী তাদের পাশে থাকবেন_আমার এ বিশ্বাস রয়েছে।
ইকবাল মনসুর আজ অনেক দূরের পাখি। যে পাখি ধরা যায় না। কিন্তু কান পাতলেই স্বজনেরা তার প্রিয় পাখির গানের সুর শুনে। এইভাবে ইকবাল অনেকের মনে সুর তুলে গাইবে অনেকদিন, বহুদিন।
২.৫.২০১৮.


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

পরবর্তী খবর পড়ুন : বনের রাজা বানর!

আরও পড়ুন

‘বঙ্গভূম’ অ্যালবা মেরমোড়ক উন্মোচন

         সিলেট এক্সপ্রেস ডেস্ক : শিশুদের...

ক্ষুধার জ্বালা মানে না লকডাউন :মিজান চৌধুরী

         করোনাভাইরাসের কারণে বর্তমান সংকটময় সময়...

দি সোয়াদ রেষ্টুরেন্ট এন্ড পাটি সেন্টার এর উদ্বোধন

         নগরীর জিন্দাবাজারে আধুনিক পরিবেশে উন্নত...

সিলেট-১ আসনে ড. মোমেন বিভিন্ন স্থানে গণসংযোগ ও সভা

         জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সিলেট-১ আসনে...