আহমদ-উজ-জামান -একজন নিভৃতচারী কথাশিল্পীর নাম

,
প্রকাশিত : ১৬ জানুয়ারি, ২০১৯     আপডেট : ২ বছর আগে
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

বায়েজীদ মাহমুদ ফয়সল : আহমদ-উজ-জামানÑএকজন নিভৃতচারী কথাশিল্পীর নাম। সতেজ ইতিহাস, ক্ষুরধার পর্যবেক্ষণ আর প্রখর স্মৃতিভরা তাঁর লেখাগুলো পাঠককে পুলকিত করে; নদীর স্রোতের মতো সমুদ্রের দিকে নিয়ে যায়। কিন্তু অন্তর্মুখী কিংবা আড়াল-প্রয়াসী চারিত্র্য তাঁর আরও গদ্য পাঠ থেকে আমাদের বঞ্চিত করেছে। ছোটোগল্প দিয়ে লেখালেখির যাত্রা শুরু হলেও তাঁর প্রথম প্রকাশিত গ্রন্থ ‘বহে না কুড়া নদী’Ñএকটি আত্মকথার স্মারক; তাঁর ভাষায় পারিবারিক জার্নাল। মধ্যিখানে ছোটোগল্পের পাশাপাশি রেডিও ও টেলিভিশনের জন্য অনেকগুলো নাটক ও ফিচার রচনা করেছেন।
আহমদ-উজ-জামানের জন্ম ১৯৩২ খ্রিষ্টাব্দের ১৭ অক্টোবর সিলেটের সংস্কৃতি ও শিক্ষার পাদপীঠ গোলাপগঞ্জের ভাদেশ্বরের এক সংস্কৃতিবান বনেদি পরিবারে। তাঁর পিতা জমির আহমদ চৌধুরী এবং মাতা তুহফাতুন্নেছা চৌধুরী। তার প্রাথমিক লেখাপড়া শুরু হয় সিলেট শহরের ধোপাদিঘির পূর্বপার হজরত ওমর সমরকন্দী (র.) মাজার সংলগ্ন তাৎকালীন মক্তবে (বর্তমান সিলেট সিটি কর্পোরেশন প্রাথমিক বিদ্যালয়) দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রভাব সিলেট শহরে বিস্তার হওয়ার ফলে তার শহরে লেখাপড়া হয়ে ওঠেনি। চলে যান গ্রামের বাড়িতে, ভাদেশ্বর পূর্বভাগ পাঠশালায় পুনরায় প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন। এরপর ১৯৪৩ খ্রিস্টাব্দে ভাদেশ্বর উচ্চবিদ্যালয়ে মাধ্যমিক শিক্ষা শুরু এবং ঐ কলেজ থেকে ১৯৫৭ খ্রিস্টাব্দে বি এ ডিগ্রি লাভ করেন।
তিনি ভাদেশ্বর এইচ. ই. স্কুল থেকে ১৯৫১ খ্রিস্টাব্দে ম্যট্রিকুলেশন এবং সিলেট মুরারি চাঁদ কলেজ থেকে ১৯৫৭ খ্রিষ্টাব্দে গ্রাজুয়েশন করেন। অতঃপর ১৯৫৯ খ্রিস্টাব্দে তৎকালীন রেডিও পাকিস্তানের ঢাকা কেন্দ্রে প্রোগ্রাম প্রোডিউসার পদে যোগদান করেন। চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্র (১৯৬২) ও রংপুর বেতার কেন্দ্রে (১৯৬৭) অনুষ্ঠান সংগঠক ও সহকারী আঞ্চলিক পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন। স্বাধীনতার পর ঢাকা বেতার কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত আঞ্চলিক পরিচালক হিসেবে কাজ করেন। পরবর্তীতে সিলেট বেতার কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত আঞ্চলিক পরিচালক এবং রংপুর ও খুলনা বেতার কেন্দ্রের আঞ্চলিক পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ১৯৯৩ খ্রিস্টাব্দে সরকারি চাকরি থেকে অবসরগ্রহণ করেন।
আহমদ-উজ-জামান লেখালেখি শুরু করেন কিশোর বয়স থেকেই। তখন থেকেই তার ভেতরে ঢুকে যায় কথাসাহিত্যের বীজ। তিনি গল্প লেখার চেষ্টা করে। তৎকালীন সিলেটের সাপ্তাহিক নওবেলাল পত্রিকায় লেখালেখির মধ্যদিয়ে তার প্রথম হাতেখড়ি। ছোট কথাশিল্পী আহমদ-উজ-জামান ছোটোগল্প, নাটক, প্রবন্ধ-নিবন্ধ, স্মৃতিকথা প্রভৃতি বহুমাত্রিক গদ্য রচনা করেছেন। ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দে সাপ্তাহিক নওবেলাল পত্রিকায় তাঁর প্রথম ছোটোগল্প ছাপা হয়। তাঁর উল্লেখযোগ্য গল্পগুলো হচ্ছেÑ বিদায়, দাবী, প্রায়াশ্চিত্ত, ইতিহাসের পাতা। তাঁর নাটকগুলোও রেডিও-টেলিভিশনে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। সিলেটের সাহিত্যপত্র, স্থানীয় ও জাতীয় দৈনিকগুলোতে তাঁর অসংখ্য নিবন্ধ প্রকাশিত হয়। বর্তমানে রংপুরবাসী এই লেখক রংপুরের দৈনিক যুগের আলো পত্রিকায় দীর্ঘদিন প্রবন্ধ লিখেছেন। এ জন্য দৈনিক যুগের আলো তাঁকে ১৯৯৭ ও ২০০০ খ্রিস্টাব্দে শ্রেষ্ঠ কলামিস্ট হিসেবে সম্মাননা প্রদান করে। ‘গুল্ম পাতায় কাঁপন’ শিরোনামে তাঁর চাকরি জীবনের স্মৃতিকথা বেতার বাংলায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়। তাঁর আত্মজীবনী ‘বহে না কুড়া নদী’ ২০০৫ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত হয়। গ্রন্থটিতে তিনি তাঁর সময়ের স্মৃতিকে রোমন্থন করেছেন অত্যন্ত প্রাঞ্জল ভাষায়। তথ্য ও উপাত্ত হিসেবে ইতিহাসের নানা প্রসঙ্গ এসেছে অবলীলায়। তার গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোর মধ্যে হলো : মুসলিম লিখিত প্রথম বাংলা উপন্যাস ‘প্রেম-দর্পণ’-এর ঔপন্যাসিক অন্ধকবি আর্জুমন্দ আলীর কথা যেমন এসেছে তেমনই আসামের মন্ত্রী আবদুল মতিন চৌধুরী, বিচারপতি সিকান্দর আলী, লোকসাহিত্যিক চৌধুরী গোলাম আকবর এবং দানবীর রাগীব আলীকে তিনি তুলে এনেছেন আপন বর্ণনায়। আর এইসব প্রাগ্রসর মানুষদের মূল্যায়ণধর্মী লেখা নিয়ে গ্রন্থিত হচ্ছেÑ‘সিলেটের পাঁচ মনীষা ও প্রাসঙ্গিক ভাবনা’। অন্ধকবি আর্জুমন্দ আলী ও তাঁর প্রেম-দর্পণ, বিস্মৃত আবদুল মতিন চৌধুরী, আইনের এক উইজ্যার্ড বিচারপতি সিকান্দর আলী, লোকসাহিত্যের সাধক চৌধুরী গোলাম আকবর, সরব সমাজসেবক দানবীর রাগীব আলীÑশিরোনামের লেখাগুলোয় পাঠক-সমক্ষে আলোকিত মানুষের পরিচয় উদ্ভাসিত হবে।
আহমদ-উজ-জামান-এর বিভিন্ন দেশ ভ্রমণের সুযোগ হয়েছে তিনি প্রশিক্ষণে গিয়ে অনেক দেশ ভ্রমণ করেন। ১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দে পল্লী উন্নয়ন রেডিওর ভূমিকা-প্ল্যানিং অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট। তৎকালীণ পশ্চিম জার্মানি : ভয়েস অব জার্মেনী : কলোন । ১৯৮০ খ্রিস্টাব্দে এডুকেশন মিডিয়া : প্ল্যানিং অ্যান্ড প্রডাকশন; কুয়ালালামপুর; মালয়েশিয়া। ১৯৮৭ খ্রিস্টাব্দে রিফ্রেশার্স কোর্স- প্লানিং অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট: ভয়েস অব জার্মেনী, কলোন। ১৯৮৯ খ্রিস্টাব্দে জনসংযোগ ও পল্লী উন্নয়ন সেমিনার) : শ্রীলঙ্কা।
আহমদ-উজ-জামান মূলত জীবনের সত্যকে মেনে নিয়ে লিখে গেছেন। এই ক্ষমতা সবার থাকে না। সঙ্কুচতা কেটে ওঠার শক্তি অর্জন করেছিলেন তিনি। আলোচ্য আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থে অকপটভাবে লিখেছেন যা কিছু তার মনের ভেতের উদিত হয়েছে, সব লিখেছেন। কিছু আড়াল করার চেষ্টা করেননি। শৈশব থেকে কৈশোর, কৈশোর থেকে যৌবনের সকল প্রবাহ ধরা পড়েছে তার লেখায়। পরিবার আত্মীয় স্বজন ও স্থানীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের কথা, ব্যক্তিগত বিষয় এবং বংশীয় অনেক ব্যাপার এসেছে গ্রন্থদ্বয়ে । এছাড়াও উঠে এসেছে তেতাল্লিশের দুর্ভিক্ষের কথা, ৪৭-এর দেশভাগের কথা। পাকিস্তান আন্দোলনের ইতিহাসখণ্ড এবং হিন্দু-মুসলিম সম্পর্কের কথাও এসছে। তবু সবকিছুর পর গ্রন্থগুলো আক্ষরিক অর্থেই একান্ত ব্যক্তিগত আত্মজীবনীগ্রন্থ হয়ে উঠেছে। এই মেধাবী লেখক বাল্যকালের মতো চঞ্চল সজীব ও দুরন্ত চরিত্রে পাঠকসমাজে বেঁচে থাকবেন।
বহে কুশিয়ারা। বহে না কুড়া নদী : দুরন্ত শৈশবের স্মৃতি : বহে না কুড়া নদী আহমদ-উজ-জামান এর শৈশব ও কৈশোর কালের স্মৃতসম্ভার। তিনি এ গ্রন্থে তার শৈশবের আনন্দবেদনার কথা বলেছেন, কৈশোরের কথা বলেছেন। এই স্মৃতি বলার ভঙ্গি তার নিজস্ব, কথা বলার ধরন তার একদম আলাদা। নিজের গল্পগুলো তিনি তার মতোই বলার চেষ্টা করেছেন। একেবারে খাঁটি আটপৌরে ভাষায় বর্ণনা করার চেষ্টা করেছেন তিনি। কুড়া নদী তার বাড়ির পাশের নদী। বাংলাদেশের অসংখ্য ছোট নদীর মতো কুড়াও একটি নদী। এই নদীতে বর্ষা আসে, স্রোত বয়ে যায়। জোয়ার আসে, আবার ভাটা পড়ে জোয়ারে। লেখক তার শৈশবকালকে কুড়া নদীর সঙ্গে তুলনা করেছেন। এর কারণ হলো তিনি একটি রূপক সৃষ্টি করতে চেয়েছেন। যে কুড়া নদী একসময় থরথর, কলকল করে চলত, সেই নদী যেন এখন স্রোতহীন ম্লান। অনেকটা নির্জীব। তিনি তার জীবনকে এই কুড়া নদীর মতো দেখছেন। একসময় তারও ছিল নদীর মতো চঞ্চল জীবন ও আনন্দ। এখন তিনি সেই সময়ে নেই। নির্জীব হয়ে আছেন কুড়া নদীর মতোই। গ্রন্থে তিনি সুখের গল্প বললেন নাকি দুখের গল্প বললেন সেটা মুখ্য নয় । তার স্মৃতিতে যা উঠে এসেছে তাই তিনি লিখেছেন। ব্যক্তিগত বিষয়, পারিবারিক বিষয়, আত্মীয় স্বজন, শিক্ষক, মা বাবা অনেকের কথাই তিনি অকপটে লিখে গেছেন। নিজের কথা বলতে গিয়ে তিনি লেখার ফাঁকে ফাঁকে ঢুকিয়ে দিয়েছেন ইতিহাস, ব্যক্তিগত অনুভূতির কথা। সবমিলে তার গ্রন্থটি এক অমূল্য আত্মজীনীতে রূপ নিয়েছে। শৈশবে তাদের বাসা ছিল সিলেট শহরের ধূপাদিঘির পূর্বপারে। এখানের অনেক কথা তার গ্রন্থের বিশাল অংশ জুড়ে আছে। বিভিন্ন প্রসঙ্গে এই ধুপাদিঘির কথা এসেছে। কুড়া নদীকে তিনি ছোটবেলা কীভাবে দেখেছেন এর একটি চমৎকার বর্ণনা আছে তার গ্রন্থে। বর্ষার মৌসুমে কুড়া নদীর পার ডুবে যেত। নদী ও হাওরের জলে সব একাকার হয়ে যেত। বন্যার পানি নদী ও হাওর পেরিয়ে গ্রামের ভেতরে ঢুকে পড়তো। লেখক ২০০৩ খ্রিস্টাব্দে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন : ‘ গ্রীষ্মের সময় ইস্কুলের পেছন দিকে যে কৃষ্ণচূড়ার যে গাছটি ছিল তাতে ফুল ফোটে লাল রং ধরে গাছটির মাথা একাকার হয়ে যেত। ঐ ফুল পেড়ে এনে ক্লাসের টেবিলের ওপর সাজিয়ে রাখা হতো। ক্লাসে সেকেন্ড পণ্ডিত শ্রী গঙ্গাধর বাবু এলে তাকে গলায় ফুলের মালা পরিয়ে দেয়া হতো। গঙ্গাধর বাবুুর একটি চোখ ভীষণ ট্যারা ছিল (বাঁকা) ছিল। তার উপরে সাদা নিকেলের ফ্রেমের চেপটা আকারের চশমা ফিতায় ঝুলতো, সেই চশমার উপর দিয়ে তার চোখ তুলে ছেলেদেরকে উপদেশ দিতেন- গ্রীষ্মের ছুটি কীভাবে কাটাতে হবে। কীভাবে পড়াশোন করতে হবে। বৈশাখে গ্রীষ্মের ছুটিতে বাতাসে এক মিষ্টি মিষ্টি সুবাস ছড়িয়ে দিত! কিন্তু এটা তো সেই ১৯৪৩ খ্রিস্টাব্দের কথা। আহমদ অনেকটা ট্যাংগা হয়ে যখন হাই ইস্কুলে ভর্তি হয়েছিল সেই সময়ের কথা। কৈশোরের বয়স এসে গেছিল। কিন্তু কৈশোরের আগে তো শৈশব ছিল । সেই শৈশবে সিলেট শহরের ধুপাদিঘির পূর্ব পার তার কিছূদিন কেটেছিল। ওখানেই ছিল আমাদের পিতার বাসা। গ্রামের পূর্ব পুরুষের ভিটায় যে পুরোনো ঘর থাকে সেটা তো হলো বাড়ি। আর শহরে যে ঘরে বা আস্তানায় বাস করা হয় তা হলো বাসা। ঐ যেমন পাখির বাসা থাকে। পাখির বাড়ি থাকে না। কিন্তু আহমদ কি তখন পাখির বাসা আর মানুষের বাড়ির মধ্যের তফাৎ বুঝতে পারতো!’ এখানেও আমরা সে সময়ের সিলেটর একটি রূপ দেখতে পাই। শৈশবের কী দারুণ স্মৃতি কথা । অত্যন্ত সুন্দর করে তিনি লিখেছেন। এই শৈশব যেন অনেকেরই শৈশব। পাঠক তার গদ্য পাঠ করে নিজের শৈশবকে দেখার আনন্দ পাবেন। শৈশবের মজার দৃশ্যগুলো প্রত্যেক মানুষের যেন একরকম। পৃথিবীর সব মানুষের সুখের গল্প এক হলেও মানুষের দুঃখের গল্প ভিন্ন ভিন্ন। লেখকের শহরের বাসার পাশে ধুপাদিঘির কথাও উঠে এসেছে চমৎকারভাবে। তার বর্ণনা থেকে আমরা জানতে পারি, ওখানে বছরজুড়ে দিঘিতে কাপড় ধোয়া হতো। সেখানে অনেকগুলো ঘাট ছিল। প্রত্যেকটি ঘাটে গোসলের জন্য মানুষের ভিড় লেগে লাগতো। দিঘির পারের সকালকে অসাধারণ মনে হতো। শীতল একটি ভাব বিরাজ করতো ওখানে সবসময়। দৃশ্যও ছিল খুবই মনোরম। লেখকের কাছে দিঘিটি মনে হতো রূপকথার কোনো সুন্দর সরোবরের মতোই। দিঘির পশ্চিম দিকে রয়েছে বিশাল জেলখানা। জেলের কি উচ্চ প্রাচীর ! জেলখানার ড্রেনের পানি এসে পড়তো দিঘির এক কোণায়। আমরা আহমদ-উজ-জামান এর লেখায় তৎকালীন সিলেটের ছবি দেখতে পাই। শহরের পুরোনো দিনের ছবি দেখতে পাই। এই ছবি আমাদের মনে একধরনের মায়াবী স্পর্শ দিয়ে যায়। আসলে স্মৃতি তো সততই মধুর। আর সমস্ত স্মৃতির মধ্যে শ্রেষ্ঠ স্মৃতি হচ্ছে শৈশব কৈশোরেরস্মৃতি। এই স্মৃতিই সবচেয়ে প্রবল প্রখর হয়ে থাকে। তার এই গ্রন্থে শিক্ষক আত্মীয় স্বজন সহ অনেকের গল্প ও স্মৃতিকথা স্থান পেয়েছে। এরমধ্যে আছেন আফতাব উদ্দিন চৌধুরী, মকবুলুর রব চৌধুরী সহ অনেকে। এছাড়াও আরো অনেক মধুর স্মৃতি তার এ আত্মকাহিতে স্থান পেয়েছে। ভাদেশ্বরের জনগোষ্ঠীর স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি বলেন : ভাদেশ্বরের জনগোষ্ঠীর পরিচয় কী? আহমদ কৈশোরে ইস্কুল জীবনে যেমন জানতো না, এই বৃদ্ধ বয়সেও জানে না। মজা লাগে ভাবতে আহমদ পরীক্ষার জন্য শেষ রাতে ঘরের কোঠায় শেষ রাতে চেয়ার টেবিলে বসে রামায়ন মহাভারতের গল্প মুখস্ত করেছে। ভারতে দ্রাবিড় বলে এক জাতি ছিলো,সেই দ্রাবিড়দের কথা মুখস্ত করেছে। এই দ্রাবিড়দের পেশল দেহের ছবি ছোট্টো এক ইতিহাসের পাতায় ছিল বলে মনে পড়ে। কিন্ত দ্রাবিড় কারা? সিলেটের লোক দ্রাবিড় কিনা তার কিছুই জানতো না, শিখেও নাই। বাংলা প্রদেশ যে একসময় মুসলমান বাদশা ও সুলতানদের শাসনে ছিল এটা আহমদ ম্যাট্রিক কেন কলেজে গিয়েও জানতে পারে নাই। ১৯৪৭ সালের পরে ‘ভারতবর্ষের ইতিহাস’ নামক বইর সাথে যুক্ত হয় ইসলামের ইতিহাস। (১৯৪৯) । তার বহেনা কুড়া নদী গ্রন্থ সম্পর্কে ড. আশরাফ সিদ্দিকী বলেন : বহে না কুড়া নদী বইটি আমি কয়েকবার পড়েছি, এর ভাষা ও বর্ণনা, ভাদেশ্বরের স্মৃতিমুখর দিনগুলি পড়তে খুবই ভালো লেগেছিল। বর্ণনা ও ভাষা ছিল কুড়া নদীর মতোই বেগবান, এইরকম স্মৃতিচারণীমূলক বই তোমার আরো লেখা উচিত। এসব কথাই লিখেছিলাম পত্রে যা তুমি হয়ত পাওনি। রংপুরের পত্র-পত্রিকায় তোমার আরো লেখা বের হওয়া প্রয়োজন। গত পত্রেও লিখেছিলাম ভাদেশ্বরের সোনার ছেলে রংপুরে বাসা বাধলো কেন? আমার কথা শেষ হলো। লেখা ছাড়বে না। লিখে যাবে, ছাপা কোনো একদিন হবেই। রংপুরে বাসিন্দা হবার কারণটা জানতে চাই। যা হোক। ওখানকার জীবন এবং সমাজ সম্বন্ধে যাওয়ার দিন থেকে লিখবে, কারণ লেখার হাত তোমার চমৎকার।
বিশিষ্ট লেখক, গবেষক, লেখক চৌধুরী হারূন আকবর বলেন : আহমদ উজ-জামানও সুশিক্ষিত মার্জিত সুশীল ব্যক্তিত্ব, একটি সংস্কৃতিবান পরিবারে তার জন্ম। তার ভাষায় তার পূর্বপুরুষরা কলম পেশায় জীবিকা নির্বাহকারী শিক্ষিত লোক ছিলেন। সরকারের প্রচার বিভাগে চাকরি করার কারণে অনেকের সাথে তার জানাশোনা। নিজের দৃঢ় চরিত্রের এক সত্যবাক লোক। জীবনকে তিনি দেখেছেন বাস্তবের নিরীখে। তার উপলব্দি অনুভূতি জীবনবোধ অত্যন্ত প্রখর ও সজাগ। শৈশবেই তার বিচার বিশ্লেষণ শক্তি হৃদয়কে নানা প্রশ্নে ভরে দিত। বালাক বয়সেই তিনি চারপাশকে তিনি দেখেছেন নির্মল আনন্দে,প্রচ্ছন্ন দৃষ্টিতে , সরসমনে কিন্তু চুপচাপে নীরবে। তার স্মৃতিকতায় পারিবারিক, সামাজিক ব্যক্তিজীবন, লোকালয় শিক্ষালয়, বৈষয়িক মনোমালিন্য চিত্রায়িত হয়েছে শিল্পের মাধুর্যে । নিজে কথাশিল্পী হওয়ায় কথা বলেছেন ঔপন্যাসিকের কায়দায়, পরোক্ষভাবে, অনেকক্ষেত্রে তৃতীয় পুরুষে, অতৃপ্ত মেজাজে , মনের ভেতর ফাঁক,ফোকর ছিল প্রচুর, ফলে অনেককিছুই স্থান পেয়েছে।
এখানে তার স্মৃতি কথা বলতে গিয়ে ইতিহাস এবং তার নিজের না-জানার কথা বলেছেন। এভাবে নিজের ব্যক্তিগত কথা অনুভূতির ভেতরে তিনি ইতিহাস ঢুকিয়ে দিয়েছেন।
আহমদ-উজ-জামান তার জীবনের স্মৃতি নিয়ে আরেকটি গ্রন্থ রচনা করেছেন তাহলো বহে কুশিয়ারা। এটিও তার বহে না কুড়া নদীর মতো বাল্যকালের নানান ঘটনা নিয়ে লেখা। তার এ গ্রন্থে বাল্যকালের এত অপূর্ব বর্ণনা আছে যে পাঠ করলে মুগ্ধতা ধরে আসে। লেখকের বর্ণনায় যে দৃশ্য উঠে এসেছে : তখন ভাদ্র মাস ছিল , তখন চতুর্দিকে মাছে ভাঁজা গন্ধে ম ম করছে। ভাদ্রের বৈশিষ্ট্য যেন জীবনে ভিন্ন রকম এক আনন্দ নিয়ে এসছে। এই বছর শ্রাবণ গেল তেমন বৃষ্টি হতে দেখা গেল না। আকাশ নীল, আকাশে শাদা শাদা মেঘ। কিছুটা শীত পড়তে শুরু করেছে। নুনার হাওরের পানিতে টান পড়েছে। হাওর শুকিয়ে যাচ্ছে। হাওর এখন আসলে হাওর নেই; ধান ফসলের মাঠে পরিণত হয়ে গেছে। আগে আশ্বিন মাস পর্যন্ত বর্ষার পানিত ডুবে থাকতো, ভাদ্র মাস এলে পানি আস্তে আস্তে শুকাতে শুরু করতো। নাকের ভেতরে রাইয়া ও রানি মাছের গন্ধ এসে লাগতো। এরকম অসাধারণ অনেক লেখা আছে তার গ্রন্থে। সকল মানুষের বাল্যকালের মতো তার বাল্যকাল এ হিসেবে তিনি ব্যতিক্রম নন। বহে কুশিয়ারা গ্রন্থটিতে এমন আরো অনেক মজার ব্যাপার আছে : যেমন তিনি তার বাবার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে লিখেছেন : বাবা বিশ দশকের দিকে সিলেটে এক কার্নিভ্যালে দেড় টাকার লটারীর টিকিট কিনে লটারীতে জয়ী হয়ে এ ঘড়ি পেয়েছিলেন। বাবা সপ্তাহের একটি নির্দিষ্ট দিনে চেয়ারের ওপর ছোট এক টুল তুলে ঘড়িতে চাবি দিতেন। চাবিটি দেখতে বাংলা “ঞ” অক্ষরের মতো ছিল পীতলের তৈরি। বাবা ঘড়িতে চাবি দেওয়ার সময় এক যান্ত্রিক মৃদু শব্দ হত। ঘড়িটি কোনেদিন শ্লো হয় নাই। প্রতি ঘণ্টায় পূর্ণ সময়ে ঘণ্টা ধ্বনি শোনা যেত, তিরিশ মিনিটের সময় মাত্র একটি ধ্বনি বাজতো। বাবার ইন্তেকালের সময় ঘড়িটি শ্লো হতে থাকে তারপর একদিন বন্ধ হয়ে যায়। এ এক মধুর স্মৃতি । ঘড়ির স্মৃতি আমাদের জীবনে একটি মজার স্মৃতি। তখনকার যুগে সকলের হাতে হাতে ঘড়ি থাকতো না। যাদের হাতে ঘড়ি থাকতো তাদের মনে আলাদা একটা আভিজাত্য বিরাজ করতো। শিক্ষার্থীরা অনেক সময় স্কুলে যাওয়ার সময় তারা ঘড়িতে সময় দেখত না, দেখত টুল্লির ছায়াতে। ছায়া দেখে তারা সময় অনুমান করত। তার স্মৃতিগ্রন্থে এটাও ছিল এক মজার অধ্যায়। সব মিলিয়ে তিনি এক অনুপম স্মৃতিগ্রন্থ রচনা করেছেন।
আহমদ-উজ-জামান একজন স্বকন্ঠ কথাশিল্পী তাঁর রচনায় অতীত ও বর্তমানের গুণী মানুষের ছবি এঁকেছেন। আর আত্মজীবনী মূলক গ্রন্থে অকপটে বলে গেছেন তার শৈশব-কৈশোরের কথা। বহেনা কুড়া নদী আর বহে না কুশিয়ারা এ দুটি গ্রন্থে তার কৈশোর বিশাল আকারে ধরা পড়েছে। প্রত্যেক লেখকের তার সৃষ্টিই হলো মূলত তার আত্মজীবনী। লেখকেরা বস্তুত তাদের জীবনকেই চিত্রিত করেন। আহমদ-উজ-জামান নিশ্চয় এর ব্যতিক্রম নয়। সাহিত্য-সংস্কৃতি অন্তঃপ্রাণ আহমদ-উজ-জামান ৩০ মে ২০১৬ সোমবার ইন্তেকাল করেন। আমরা তার আত্মার শান্তি কামনা করছি। আসলে মহত মানুষের মৃত্যু হয় না। তারা কোনো না কোনোভাবে বেঁছে থাকেন। কারো না কারো না ভেতরে বেঁচে থাকেন। মহত চিন্তা ও কর্ম কোনোদিনই বিফলে যায় না। আহমদ-উজ-জামানও দীর্ঘকাল তার চিন্তা কর্ম ও সততায় মানুষের ভেতের বসবাস করবেন। আমরা তার গ্রন্থদ্বয়ের বহুল প্রচার ও প্রসার কামনা করছি।
লেখক : প্রকাশক, সংগঠক ও প্রাবন্ধিক


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আরও পড়ুন

মেলবোর্ন টেস্ট হারের পর অস্ট্রেলিয়া শিবিরে আরেকটি ধাক্কা

         সিলেট এক্সপ্রেস ডেস্ক ভারতের কাছে...

ছায়াবৃক্ষ

         নাসরিন জাহান মাধুরী: সময়টা ২০১৪।...

সিলেট ছাত্রদলের বিক্ষোভ মিছিল

         সিলেট এক্সপ্রেস ডেস্ক : দেশনেত্রী...

আমিরাতে সুজানগরের আগর আতরের গবেষণা কেন্দ্র চালুর দাবি

         লুৎফুর রহমান, মৌলভীবাজারের বড়লেখা সুজানগরের...