আশরাফ হাসান মৌল চেতনার কবি

,
প্রকাশিত : ০৭ অক্টোবর, ২০২০     আপডেট : ২ মাস আগে
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সাঈদ চৌধুরী :
কবি আশরাফ হাসান একজন মৌল চেতনার কবি। বাংলা কবিতায় আধুনিকতার সাথে আধ্যাত্মিকতার মিশেলে এক নতুন বাঁক নির্মানে রয়েছেন সচেষ্ট। যেখানে ঐতিহ্য ও আদর্শ সমুন্নত রেখে অসহিষ্ণু সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রয়াস লক্ষণীয়। নান্দনিক বোধসত্তার কবি হিসেবে তিনি ভাবনার অন্তর্লোকে প্রবেশ করেন সহজাত ভঙ্গিতেl অন্তর্গত কাব্যদ্যুতির প্রসারণে তার স্বতন্ত্র শক্তিমত্তা পাঠক হৃদয়কে প্রবলভাবে আন্দোলিত করেl তার কবিতায় রোমান্টিসিজম এক আনন্দ প্রবণ অথচ নিবিড় পরিশুদ্ধতার আদলে উদ্ভাসিতl এমনি কিছু অনবদ্য পংক্তিমালা-
‘বৃষ্টির ভারে নত হয়েছে যে ফুল/ বলিও তারে এই প্রেমিকের কথা/ যার গন্ধ মেখে খুশবু জলের ঢেউয়ে ছলাৎ ছলাৎ/ হৃদয় উঠোনে তার লিখে দিও এই প্রেমিকের নথিl/ বাগানময় বিরান মৌসুমে/ যে বুনে ফসলের বীজ/ শোনাও তারে অভিন্ন হৃদয়ের কবিতাl/ নদী স্রোতে জেগে ওঠা চরের মতো যার বক্ষ পাঁজরে লেখা খরার অভিধান/ … আগুনের যে শিখা হয়েছে মৃত্তিকামুখী/ দখিনা হাওয়ার দাপটে যে শাখায় লেগেছে কম্পন/ রাতের ট্রেনের মতো আন্ধার ভেদ করে যে গতি/ তার কাছে রেখে যেয়ো এ গীতি নন্দনl’
কিম্বা প্রেমজাত পংক্তিমালায় ফুটে ওঠা সৌন্দর্যের শুদ্ধতা-
‘আমার সরল সৌন্দর্যের ভিড়ে/ তুমি বীরাঙ্গনার মতো দাঁড়িয়ে যাও/ দাঁড়িয়ে যায় তোমার চোখের সাহস/ যেনো কোনো পাহাড়ি ঈগল/ দৃষ্টি কোটরে জমা রেখেছে দিগবিভ্রম জিঘাংসা/ পাখনার ককপিটে জমা রেখেছে বিধ্বংসী বিস্ফোরকl/ তবু আমি কন্ঠক পথে বিছিয়ে রেখেছি সারল্য/… তুমি আর কতো বুনবে নীলপদ্মজাল/ জানি আমার দরবারে নেই কোনো ক্যাসিনো/ অঘ্রানের প্রতীক্ষায় তাই/ প্রেমিক কৃষকের মতো করে যাই কল্যাণীয়া চাষ/ মাছরাঙার প্রক্ষেপণের মতো দাঁড়িয়ে থাকি/ কোনো নতুন মৎস্য খামারের জলধি পাড়েl’
সমাজতান্ত্রিক বিশ্বের পতন ও স্নায়ুযুদ্ধ পরবর্তী ধনতান্ত্রিক মোড়লদের শ্বেত-আধিপত্যবাদ, দেশে-দেশে স্বার্থের সংঘাত, রেসিজম ও স্বৈরশাসনের উত্থান এক বিষাদময় বাস্তবতাl আশরাফ হাসানের কবিতায় এ আন্ত:আন্তর্জাতিক অস্থির সময়ের স্থিরচিত্র অনন্য বয়ান ও বয়নশৈলীতে প্রতিভাসিতl কবি মানবিক মুক্তির আকুলতা নিয়ে হাজির হন আদর্শবাদিতা আর ঐতিহ্যপ্রবণ প্রতীকী ব্যঞ্জনায়।
‘তুমি লিখে যাচ্ছ দ্বান্দ্বিক দলিল/ তোমার ভিশন যুক্ত প্রথম অনুচ্ছেদ/ বিমুক্ত পাখির মতো ডানা ঝাপটায়l/ কাউন্টার অনুচ্ছেদের মতো পরক্ষণে/ বেমালুম ভুলে যাও আদর্শবাদিতা/ যেনো কপট প্রণয়ী গাঁথে প্রেমোপাখ্যান;/ ঝোপের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে গোয়েবলস/ গ্যাস চেম্বারে বসিয়ে দেয় বোধ ও বিবেককে/ চারপাশ ঘিরে দাঁড়িয়ে থাকে মুসোলিনি চেঙ্গিস/ আবু লাহাব এগিয়ে আসে প্রস্তর হাতেl/ তুমি হয়ে যাও আত্ম প্রবঞ্চিত প্রেমিকার উপমা/ গুমোট জিঘাংসাগুলো রুদ্ধশ্বাস হয়ে বেরিয়ে আসতে থাকে বারুদের মতোl/ তুমি লিখে যাচ্ছ আত্ম প্রবঞ্চণার দলিলl’
আশরাফ হাসানের কবিতায় উপস্থাপন ভঙ্গির মুন্সিয়ানা ও উপমা-চিত্রকল্পের যুৎসই প্রয়োগ পাঠককে অভিভূত করেl একই সমান্তরালে অধ্যাত্মবোধ, পরিশুদ্ধ প্রেমানুভুতি, দেশাত্ববোধের অনবদ্য প্রসারণ এ কবিকে দিয়েছে বিশিষ্টতাl ‘সুন্দরের লোবান’ কবিতায় এ বৈশিষ্ট্য উজ্জ্বল ভাবে দৃশ্যমান-
‘জানি একদিন তুমিও নামাজে দাঁড়াবে/ রোজা থাকবে কোনো দূরগামী মুসাফিরের মতো/ ইফতারের ওয়াক্ত হওয়ার আগেই মিনতি ভঙ্গি নিয়ে বসে পড়বে জায়নামাজে/ যেভাবে ভালোবাসার উত্তাপ হৃদয় খুঁড়ে চলে যায় দীলের গহীনে / সেভাবে তুমিও একদিন প্রার্থনার হাতে তুলে নেবে অপ্রস্তুত সন্ধ্যার নামতাl/ জানি একদিন তুমিও মাস্তুলে লাগা ঢেউয়ের মতো জিকিরের ছন্দ তুলবে/ শ্রাবণ মেঘের দিন যেভাবে কান্নায় ভেঙে পড়ে পৃথিবীর কোলে/ সেভাবে তুমিও সজল স্পর্শে তুমুল ভেজাবে সিজদার প্রিয় মাটিl/ … জানি তোমারও পাথুরে হৃদয় ভেঙে যাবে একদিন/ …দুচোখে আদিগন্ত ঔদ্ধত্ম্যের লেগুন/ তুমিও একদিন মমির ঘর থেকে তুলে আনবে/ স্বপ্ন নিদ্রাহত প্রেমের কঙ্কালl/ একদিন তুমিও আলো আলো বলে/ চিৎকার করতে করতে মুক্তির প্ল্যাকার্ড সজ্জিত/ মিছিল নিয়ে সাভার শহীদ মিনার ঢাকা মেডিকেল/ সোহরাওয়ার্দী উদ্যান সূর্যসেন হল টিএসসি/ মধুর ক্যান্টিন হয়ে পৌঁছে যাবে কেন্দীয় মসজিদের চির সবুজ উদ্যানেl/ শপথে শপথে বলীয়ান হাতগুলো পরম মমতায়/ খুঁজতে থাকবে কোনো মায়ের ম্লান মুখচ্ছবিl’
কবি আশরাফ হাসান নব্বই দশকের সরব কবি। কবিতায় তার মৌলিকত্ব ইতোমধ্যে তিনি নির্মাণ করেছেন। কবিতায় জগত ও জীবনের কথা বলেছেন তিনি। ‘রোদচোখে নি‘ইয়র্ক‘ কবিতায় আশরাফ হাসান তার অপরিমেয় ভাবনা নিপুণ ভঙ্গিতে ফুটিয়ে তুলেছেন-
‘এখানেও ওড়ে চলে জালালী কৈতর দলবেঁধে/ দ্বিধাহীন, মনে হয় পাশেই ঘুমোনো শা’জালাল;/ সত্যের সবক হাতে হয়তো-বা এসেছিল কেউ/ মজলুম হরিণীর ডাকে, ভীতিবহ কতকালl/ নূরের ঝলকে নুয়ে পড়া স্বৈরশির, নৃ-সরফ/ আগ্রাসি বাঘের গালে শাসনের যুগল আঙ্গুল/ ছুঁয়েছিল তার আর করেছিল বাঘ প্রেমপাঠ/ সুরমা-ও পড়েছিল বুকে তার স্রোতের হরফ।/মানুষের অভিধান হাতে রোদচোখে নি’ইয়র্ক/ পাখির গতির মতো শিখিয়েছে বাঁচার তাকিদ/ বরফের হিমঘরে বেঁচে থাকে প্রাণের নকিব/ সমতার সুর গেঁথে রাত্রি-ঘ্রাণে যৌবনা নিনিদl
তার মতো ত্রাণপ্রদ যদিও এখানে নেই কেহ/ পায়রা-পালকে তবু জেগেছে সবুজ সমারোহl‘
নতুন বছর কবিতায় আশরাফ হাসান প্রত্যাশা করেন নূহের প্লাবনের মতো আসুক নতুন বছরl
‘সাইমুম ঝড়ের মতো আসুক নববর্ষ/ আসুক সেমিটিক রুক্ষতার তীব্র দাবদাহে/ লু-হাওয়ার তাওয়ায় সিদ্ধ হোক/ শতাব্দীর ক্রুর হাসি/ ক্ষমতার স্বৈর সন্ন্যাসl/এই যে যুগান্ধকারে তোমার বিষণ্ণ আকাশ/ নারঙ্গি শাখার মতো দোলে ওঠা কিশোর বিপ্লবী/ সারিবদ্ধ উষ্ট্রলাগাম ধরে থাকা দুর্ধর্ষ বেদুইন/ সান্ধ্য কাফেলায় নেমে আসা মরুতস্কর।/ অশ্রুক্ষরণে গলে যাওয়া জেরুজালেম -/ অনিবার্য বসন্ত হয়ে আসুক সেখানে/ আসুক নববর্ষের আরব্য প্রভাতl/ এই যে ব্যথাভারে ন্যুব্জ ওহুদ পাহাড়/ শত্রু সম্ভারে কেঁপে ওঠা বদর-খন্দক/ দগ্ধ দুপুরের ন্যায় জ্বলজ্বল করে ওঠা – রক্তস্নাত গাজা-পশ্চিম তীর- অপহৃত ফিলিস্তিন/ ত্রাসের পাখায় ভর করে ওড়া মরু ঈগল -/ দরিয়ার দুরন্ত উচ্ছ্বাস হয়ে আসুক নববর্ষ/ মুক্তির স্কোয়ারে জ্বলে উঠুক মেষের রাখালl/ এই যে প্রস্তরে উৎকীর্ণ তোমার হলুদ বিকেল/ চান্দ্র্য-তামামি বয়ে আনে নীল নিশ্বাস;/ আবাবিলের পাখনায়- চঞ্চুর ক্ষিপ্রতা বেয়ে নেমে আসুক সেখানে,/ নেমে আসুক নববর্ষ নূহের প্লাবনের মতো/ আসুক নতুন বছরl‘
নাগরিকত্ব সনদ কবিতায় আশরাফ হাসানের প্রত্যয়দীপ্ত উচ্চারণ-
‘আমার অস্তিত্ব জুড়ে অপাংক্তেয় দ্রাবিড়/ দুহাত ভরে কিনে নিয়েছি দুর্ভোগের যাতনা শৈলী/ বিনিময়ে তুলে দিয়েছি আলোর ঝলকানি/ সাফল্যের সমতলে যাত্রা তোমার/ আমার দীর্ঘশ্বাস থেকে জন্ম নিয়েছে যে বিষাদরেণু/ তুমি সেখান থেকে কুড়িয়ে নিয়েছ দীপ্ত আগামী/ আমি যাত্রীহীন ট্রেনের মতো ছুটে চলেছি/ কম্পার্টমেন্টে বোঝাই শূন্য-স্কোর/ আকাশচ্যুত মেঘখন্ডের উড়াল সন্ন্যাস যেনো/ আমি অকৃতকার্য হয়েছি বলেই/ তুমি উর্ত্তীর্ণ হয়ে গেলে পরীক্ষার চৌকাঠ/ জেনে গেলে কিভাবে নিতে হয় নাগরিকত্ব সনদl‘
টিনেজার পৃথিবী কবিতায় আশরাফ হাসান তার এই চেতনা সম্ভূত সমাজ অর্জনের আকাঙ্ক্ষা ও মানব-জাগরণের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন এভাবে-
‘মধ্যবয়েসী রাতl রোনাজারির আকাশ থেকে ঝরে পড়ছে খন্ডখন্ড পাথরমেঘl জ্যোৎস্নাকলায় কলাকৈবল্য দেখে আড়ি দিয়েছে বৃষ্টির বোধবালকl/ জলহীন চলনবিলl বিষাদ সন্ত্রাসে বিধ্বস্ত বাড়ির অস্থিমজ্জাl উত্তেজনার থার্মোমিটারে ঊর্ধমুখী পারদl / পোড়াবারুদ আর খানাখন্দক পিঠে গেরস্থালি সময়l প্রাগৈতিহাসিক গাধা বয়ে চলে নার্ভাসনেসের টোটালিটারিয়ান চরl মুমূর্ষু গাছের মতো শুয়ে থাকে টিনেজার পৃথিবীl‘
আশরাফ হাসানের কবিতায় দেশাত্মবোধক আর পরকালীন চিন্তার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের আবেগ-অনুভূতি, সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্নাসহ গ্রাম বাংলার প্রতিটি পরশের ছোঁয়া রয়েছে। তার জীবনঘনিষ্ট উচ্চারণে বেদনা-বিরহের শিল্পতুলিতে আঁকেন হিরণ্ময় ক্যানভাসl কবিতা পৃথিবীর তাম্রলিপ্ত চেহারাকে হিরণ্ময় করে তুলে-এ অন্তরঙ্গ বোধই যেনো তার কবিতার সৌষ্ঠবে প্রবহমানl প্রকৃতিসখ্য উপমাসৌন্দর্যে বিধৌত ‘ঘাস ও অনুভূতির রঙ’ কবিতায়-
‘স্বপ্ন নিঃসাড় পড়ে থাকে/ যেনো বর্ণবাদ কবলিত কোনো বিধ্বস্ত গ্রাম/ প্রেমিক ডাহুকের মতো/ বাতাসের গলিতে হারিয়ে যায় বৃক্ষদের গান/ নদীপথে কারা দেয় লাগাতার অবরোধl’
কিম্বা ‘জলপাঠ’ কবিতায়-
‘বৃষ্টির বালিকা হাসে আকাশের লেনে/ বৃষ্টির ধারায় ধোয়া নাগর-হৃদয়/ মেটাতে পিপাসা তাই জলপাঠ চেনে/ তামাটে পৃথিবী চায় নিখাঁদ প্রণয়l’
অথবা ‘টোটালিটারিয়ান’ কবিতায়-
‘একদিন যে হাতে প্রতিপালিত হয়েছে কবিতাপুত্র/ সে হাতে লেগে আছে পলিমাটির চিরায়ত ঘ্রাণ/… অথচ অগ্রাহ্য করছ নদীর ঢেউ ও নৈসর্গবোধl’
কবিতায় মাধ্যমে শান্তি ও সম্প্রীতির সমাজ বিনির্মাণে সমতা ও বন্ধুত্বের প্রচার করে চলেছেন আশরাফ হাসান। তার কবিতার মূল প্রতিপাদ্য বিষয় হচ্ছে মহাজাগতিক রহস্য। ধর্মীয় মূল্যবোধ ও কাহিনিগুলো সামনে রেখে নীতিকথা অবলম্বন করে অনেক কবিতা লিখেছেন তিনি। কাঙ্ক্ষিত বিজয়ের জীর্ণ চেহারা দেখে কবি-হৃদয় উদ্বেগাকুল হয়ে উঠেl সনেটের আঙ্গিকে ‘পাখিদের নীড় নেই’ কবিতায়-
‘বিজয়ের পথে পথে হায়েনা আবার/ লুটেরা লোলুপ এ-কী সবুজের গ্রামে/ চঙ্গলে সরোজ ভেঙে করেছে সাবাড়/ পুরোনো শ্লোকের মতো কে-বা সংগ্রামেl’
অথবা বিশ্বের সর্বত্র হিংসার দহন দৃষ্টে তার কবিতা প্রতিবাদী হয়ে উঠেl ‘প্রেমদাহ ছড়িয়ে পড়ছে হেরার রাজতরণে’ কবিতায়-
‘তুমি যে আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছ দেড়শ কোটি হৃদয়-বন্দরে/ …এ আগুন ছড়িয়ে পড়ছে মসজিদে নববী থেকে আল-আকসা/ বায়তুল্লাহ থেকে বায়তুল মামুর/ …এর অগ্নিস্ফুলিঙ্গ ছড়িয়ে পড়ছে/ বদর থেকে ওহুদ-খন্দক জেরুজালেম হয়ে/ কারবালার সূর্যস্নিগ্ধ প্রান্তরে/ শহীদ তিতুমীরের বাঁশের কেল্লায়/ …স্পেনের কান্নারত মসজিদের কার্নিশমর্মরে/ …তাওহীদের কালেমা খচিত শুভ্র পলেস্তরায়/ এর দাহ্যশক্তি অনুধাবনের অন্তর্দৃষ্টি তোমাদের নেইl/ জেনে রেখো এরা অগ্নিবিজয়ী ইবরাহীমের বংশধর/ যার প্রেমজলোছ্বাসে আগুন হয়ে যায় স্নিগ্ধশীতলl’
‘তোমাদের রাইফেলগুলো প্রত্যাহার করে নাও/ যেগুলো তাক করা আছে ক্রাইস্টচার্চের মতো অগণিত মসজিদের দিকে/ …স্নিগ্ধ আলোর জলের মতো বেগবান সেখানে অহিংস প্রেমের নদী/ …সেখানে বর্ণবাদের কোনো অনুচ্ছেদ নেই/ শহীদি নজরানায় প্রসবিত সূর্যের ন্যায় ওখানে টগবগ করে ওঠে মুক্তির নেশাl’
ষাটের দশকের অন্যতম প্রধান সাহিত্যিক বিশ্বাসী কবি কন্ঠ আফজাল চৌধুরী ‘দশ আকাশে একশো তারা‘ কাব্যগ্রন্থের সমালোচনা লিখতে গিয়ে আশরাফ হাসান সম্পর্কে বলেন ‘এই কবির আধ্যাত্মিক উপলব্ধি আছেl ঐতিহ্যের প্রজ্ঞায় যা স্নাতl‘। তিনি আরো বলেন – তার ‘বসন্ত বেলা‘ কবিতায় একটি ধুয়া পংক্তি আছেl এ কারণে তার এ কবিতার স্থায়িত্ব অন্যান্য কবিতার চেয়ে বেশিl‘
সিলেট এমসি কলেজের তৎকালীন বাংলা বিভাগীয় প্রধান বিশিশ্ট লেখক ও গবেষক ড. শফিউদ্দিন আহমদ সিলেট মোবাইল পাঠাগারের একটি অনুষ্ঠানে তার (আশরাফ হাসান) সাহিত্য সমালোচনামূলক লেখা সম্পর্কে মন্তব্য করেন- ‘আশরাফ হাসানের সাহিত্য সমালোচনা মূলক লেখা এক নিপুণ শিল্পকর্মl‘
কবিতার পাশাপাশি প্রবন্ধ-নিবন্ধ ও সমালোচনা সাহিত্যে পাঠক দৃষ্টি আকর্ষণে সক্ষম হয়েছেন আশরাফ হাসান। তার লেখা ইতোমধ্যে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন পত্রিকায় ছাপা হয়েছে। প্রবাসের ব্যস্ত জীবনের কর্মপ্রবাহের পাশাপাশি কবি সামাজিক মিডিয়াতে নিয়মিত সাহিত্য চর্চা করে যাচ্ছেন।
কবি আশরাফ হাসানের প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘দিগন্ত আজ বৃষ্টি ভরা’ (যৌথ কাব্য̈গ্রন্থ, ১৯৯৮), ‘দশ আকাশে একশ তারা’ (যৌথ কাব্য̈গ্রন্থ, ১৯৯৯), ‘সুরাহত সামগীত’ (২০১৪) ও পাখিলৌকিক জোছনা (২০১৯)।
কবি আশরাফ হাসান ১৯৭৪ সালের ২২ মে সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার বারকাহন গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা বিশিষ্ট ইসলামিক স্কলার মরহুম মাওলানা সাইদুল হাসান ও মাতা মরহুমা লতিফুন্নেছা খাতুন। বর্তমান আমেরিকা প্রবাসী কবি শিক্ষকতা পেশা দিয়ে কর্মজীবন শুরু করেন। তার জীবন সঙ্গিনী সৈয়দা ছামিয়া বেগম। তাদের দুই কন্যা জাকিয়া ইফফাত হাসান, জাহরা মাকছুরা হাসান ও একমাত্র পুত্র সাজেদুল হাসান তাজরিয়ান।
একান্ত আলাপচারিতায় কবি আশরাফ হাসান বললেন শিশু কালের কথা। তার নিজের ভাষায়- ‘ছয় ভাই ও দুই বোনের সর্বকনিষ্ঠ হওয়ায় বাবা-মা, ভাই-বোনের অনির্ণেয় স্নেহ-ভালোবাসায় সিক্ত হয়েছে আমার শৈশব-কৈশোর-তারুণ্যের প্রাণোচ্ছল দিনগুলোl কিন্তু জীবনের মহাসড়কে স্থিত হতে না হতেই ক্রমান্বয়ে ঘটতে থাকে বিয়োগান্তুক সব ঘটনাl একে একে ঝরতে থাকে আকাশের দ্যুতিময় নক্ষত্রl হঠাৎ করেই পারিবারিক গ্রামে নেমে আসে ছায়াহীনতা, মায়াশূন্যতার খড়গ-রৌদ্রl মাত্র ক’বছরের ব্যবধানে পৃথিবীর আলো-বাতাস থেকে হারিয়ে যান সাথিসম অগ্রজ ভাই, মমতাময়ী মা, অভিভাবক বড় ভাই এবং সবশেষে দীঘল ছায়াবিস্তারি পিতাl যাদের মা-বাবা বেঁচে নেই সম্ভবত তারা পৃথিবীর সবচেয়ে দুখী মানুষl আর আমি সেই দলেরই একজন কমজুর মুসাফিরl‘
কবির আরো কিছু একান্ত অনুভূতির বুদ্বুদ, কিছু ঢেউ ও কলতানের গল্পl নস্টালজিক সময়ের উজান-ভাটির চিত্র পাঠকদের জন্য তুলে ধরা যায়। কবি জানালেন, ‘আম্বরখানা সরকারি কলোনি স্কুলে পাঠশালা চুকিয়ে ভর্তি হই সিলেট সরকারি আলিয়া মাদ্রাসায়l জীবনের উল্লেখযোগ্য সময় কাটে ঐতিহ্য প্রাচীন এ প্রতিষ্ঠানেl স্কুল জীবনের সোনালী দিনগুলো এখনো জ্বলজ্বল করে স্মৃতির আঙিনায়l তখন পড়ালেখার আগ্রহটাই ছিল আলাদাl অন্যরকম সুখ ও সফল প্রাপ্তিতে ভরে উঠতো মনl ক্লাস শুরু হওয়ার পূর্বে স্কুল মাঠে জাতীয় পতাকার সামনে দাঁড়াতাম আমরাl সকালের অধিবেশনl কালের বিবর্তনে অবশ্য ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়াতে এসে দেখলাম সেটা নাম ও কিছুটা আঙ্গিক পরিবর্তন করে হয়েছে ‘মর্নিং এসেম্বলী’l যাই হোক, তারপর একজন সুর করে গাইতো জাতীয় সংগীতl কন্ঠ মেলাতাম সবাইl তারপর শারীরিক কসরতl একজন ক্যাপ্টেনের নেতৃত্বে চলতো ‘সোজা হও, আরামে দাঁড়াও, লেফট রাইট/ লেফট রাইট’ ইত্যাদিl
মেধাবী ছাত্র আশরাফ হাসান ক্লাসে ১ম ছিলেন এবং ৮ম শ্রেণী বৃত্তি পেয়েছেন। এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘সহপাঠীদের সাথে কেটেছে অমলিন আনন্দঘন সময়l দুপুরের বিরতিতে ইস্কুল মাঠে প্রাণোচ্ছল খেলার স্মৃতি এখনো অম্লানl ১ম শ্রেণী থেকে ৮ম শ্রেণী পর্যন্ত ফার্স্টবয় হওয়ার অনুভূতি অজান্তেই নিজেকে অশ্রুসিক্ত করেl প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলামl কিন্তু পাইনিl তবে মাদ্রাসায় ৮ম শ্রেণীতে বৃত্তি পেয়েছিলামl সে বছর পড়াশোনায় বেশ পরিশ্রম করতে হয়েছিলl তখন সিলেট বিভাগে মাদ্রাসা বোর্ড থেকে মাত্র দুটো বৃত্তি এসেছিলl এর একটি আমি আর অন্যটি পেয়েছিল আমার ক্লাসমেট মাহবুবুল আলমl অসম্ভব মেধাবী মাহবুব হাফেজে কুরআন ছিলl দাখিল পাশ করে কলেজে চলে যায়l পরবর্তীতে ওসমানী মেডিকেল থেকে এমবিবিএস পাশ করেছিলl‘
চারুশিল্প মেধাতালিকায় স্থান পাওয়া আশরাফ হাসান ভাল ছবি আকঁতেন। এ প্রসঙ্গে জানালেন, ‘পাঠশালায় গ্রাম আর প্রকৃতির ছবি আঁকার জন্য স্যার-ম্যাডামরা নাছোড়বান্দার মতো লেগে থাকতেনl বলতেন, আমি নাকি ভালো ছবি আঁকতে পারিl একবার শিক্ষক-শিক্ষিকা সবাই মিলে আমাকে চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার জন্য সিলেট শিশু একাডেমিতে নিয়ে গিয়েছিলেনl অনেকের মধ্যে আমার চারুশিল্প মেধাতালিকায় স্থান পেয়েছিলl‘
কর্মজীবনের কঠিন বাস্তবতার মাঝেও লেখালেখির চালিয়ে যাওয়া এবং কেমুসাস তরুণ লেখক পদক লাভ তার জীবনের বাঁক ঘুরিয়ে দেয়। এর পেছনে বাবা-মা‘র প্রেরণাকে স্মরণ করে আশরাফ হাসান বলেন, ‘ব্যাচেলর স্টাডি শেষ হতে না হতেই দরোজায় কড়া নাড়ে পুরোদস্তুর ব্যস্ত কর্মজীবনl স্কুলে শিক্ষকতা ও সাংবাদিকতা চলে পাশাপাশিl এরপর বেশ কিছুদিন ম্যারেজ রেজিস্ট্রার হিসেবেও দায়িত্ব পালন করিl একই সময় (নয়ের দশকের মাঝামাঝি) কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদ কেন্দ্রিক সাহিত্য চর্চায় জড়িয়ে পড়িl সাহিত্য সংসদ কর্তৃক তরুণ লেখক পদক প্রবর্তিত হলে অপ্রত্যাশিত ভাবে কবিতায় প্রথম পদকটি পেয়ে যাই (১৯৯৭)l তখন সংসদের সভাপতি ছিলেন দেওয়ান ফরিদ গাজী এমপি এবং সাধারণ সম্পাদক হিসেবে সৃষ্টিশীল দায়িত্ব পালন করছিলেন কবি-সংগঠক রাগিব হোসেন চৌধুরীl মনে আছে অনুষ্ঠানে পদক তুলে দিয়েছিলেন জাতীয় অধ্যাপক দেওয়ান মুহাম্মদ আজরফ ও কালজয়ী কথাশিল্পী অধ্যাপক শাহেদ আলীl এসব যাদের কল্যাণে ও অনুপ্রেরণায় তারা তো মা-বাবাইl
আশরাফ হাসান তার পিতা বিশিষ্ট আলেমে দ্বীন মাওলানা সাইদুল হাসান প্রসঙ্গে বলেন, ‘বাবা সিলেট সরকারি আলিয়া মাদ্রাসায় কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখে ছাত্রজীবনের সমাপ্তি টানেনl উত্তরাধিকার সূত্রে তেমন বিত্ত-সম্পদের অধিকারী না হওয়ায় পিতার কাছ থেকে টাকা না এনে বৃত্তির টাকা দিয়ে পড়াশুনার খরচ চালিয়েছেনl ছাতকের বারকাহন গ্রাম থেকে সিলেট শহরে চলে আসেন শিক্ষা অর্জনের দুর্বার টানেl তার পিতা (আমার দাদা) বিশিষ্ট আলেমে দ্বীন মওলানা আব্দুল লতিফ তৎকালীন জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের সক্রিয় সদস্য হিসেবে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে পড়েন এবং এক সময় কারারুদ্ধ হনl
আব্বা (সাইদুল হাসান) তৎকালীন আসাম শিক্ষা বোর্ডে আলিম পরীক্ষায় (১৯৪৪) ১ম শ্রেণীতে ৩য় স্থান অধিকার করেনl ১৯৪৬ সালে ফাজিল পরীক্ষায় বোর্ড মেধাতালিকায় ১ম শ্রেণীতে ১ম স্থান অধিকার করতে সমর্থ হনl একই ভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে কামিল (মাস্টার্স) পরীক্ষায় সমগ্র পূর্ব পাকিস্তান মেধা তালিকায় ১ম শ্রেণীতে ৫ম স্থান অর্জন করে কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখেনl অসামান্য মেধাগুণে তাকে আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নিl অচিরেই তিনি একই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ লাভ করেনl পর্যায়ক্রমে দীর্ঘ অধ্যাপনার পথ পাড়ি দিয়ে সহযোগী অধ্যাপক, শায়খুল হাদিস এবং মাদ্রাসার প্রিন্সিপালের গুরু দায়িত্বে আসীন হনl বর্ণাঢ্য কর্মজীবনের ইতি টানেন ১৯৮৬ সালে অবসর গ্রহণের মধ্য দিয়েl
পিতার সততা ও আত্মপ্রতিষ্ঠার চমৎকার বর্ণনা দিয়ে আশরাফ হাসান বলেন, ‘কর্মজীবনে সর্বাত্মকভাবে সৎ থাকার চেষ্টা করেছেনl তিল তিল করে পরিশ্রমের কষ্টার্জিত টাকা দিয়ে সংসার পরিচালনার পাশাপাশি সিলেট শহরে ক্রয়কৃত জায়গার উপর নিজস্ব বাড়ি নির্মাণ করেনl তিনি উত্তরাধিকার সূত্রে অথবা প্রদত্ত সম্পদের চেয়ে পরিশ্রম করে টাকা উপার্জনকে অধিক পছন্দ করতেনl সেজন্য নিজের আত্মপ্রতিষ্ঠা ও আত্মশক্তির মাত্রাকে বাড়িয়ে দিতেনl সততার মাধ্যমে নিজের অল্প সম্পদ ব্যবহারে সুখ অনুভব করতেনl লোভ ও সম্পদের উচ্চাকাঙ্ক্ষা তাকে কখনো স্পর্শ করতে পারেনিl তার এক জামাতা আমার ভগ্নিপতি যিনি প্রবাস জীবনে আমার অনিবার্য অভিভাবক বিশিষ্ট কমিউনিটি ব্যক্তিত্ব ইকবাল আহমদ মাহবুব যার মাধ্যমে আমার যুক্তরাষ্ট্রে আসা; তিনি বাবাকে এক সময় আমেরিকা অভিবাসী হতে অনুরোধ জানালে তিনি বলেছিলেন, আমাকে আর দুনিয়ার লোভ দেখাবেন নাl
স্বভাবতই তিনি ছিলেন নিভৃতচারিl আত্মপ্রকাশ কিংবা প্রচারণা থেকে নিজেকে সযত্নে দূরে সরিয়ে রাখতেনl তিনি মনে করতেন এর ফলে তার মধ্যে অহংকারের প্রাদুর্ভাব ঘটতে পারে এবং মানুষ তার প্রতি অপ্রত্যাশিত ভাবে ঝুঁকে পড়তে পারেl আর অহমবোধের কারণে আল্লাহর কাছে কোনো ইবাদাতই কবুল হবে নাl অবিশ্বাস্য হলেও সত্য তিনি কখনো নিজে তার নামের অগ্রভাগে মাওলানা বা মুহাদ্দিস ইত্যাদি উপাধি ব্যবহার করতেন নাl আমাদের নানা (আব্বার শ্বশুর ও শিক্ষক) তৎকালীন সময়ের অন্যতম শীর্ষ আলেম ও বুজুর্গ ব্যক্তিত্ব, সিলেট আলিয়া মাদ্রাসার প্রধান মুহাদ্দিস শায়েখ আব্দুল ওয়াহিদ রহ. এর একটি জীবনী গ্রন্থে এরই প্রমান পাওয়া যায়। চাকুরীকালীন সময়ে তিনি এটি লিখেছিলেনl গ্রন্থের লেখকের জায়গায় ছিল- মো. সাইদুল হাসানl আরবি, উর্দু, ফার্সি ভাষার পাশাপাশি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে আব্বার দখল ছিলl গ্রন্থের চমৎকার শব্দচয়ন ও ভাষাশৈলীর ব্যবহারে সেটা উপলব্ধি করা যায়l
কবি আশরাফ হাসান তার জীবন ও সাহিত্য সাধনায় যোগ্য পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করে মৌল চেতনা সমুন্নত রেখে সত্য-সুন্দরের পথে এগিয়ে চলেছেন দূর্বার গতিতে।


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আরও পড়ুন

করোনায় মৌলভীবাজার জেলা আওয়ামী লীগ নেতার মৃত্যু

         মৌলভীবাজার জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি,...

মেয়র আরিফের স্ত্রী শামা হক বাড়িতে সুস্থ রয়েছেন

         সিলেট সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র...

দুর্গন্ধময় ধোপাদিঘীকে নান্দনিক সৌন্দর্য্যে রূপ দেওয়ার কাজ শুরু

         সিলেট এক্সপ্রেস ডেস্ক: ‘ধোপাদিঘীর আকার...

কানাইঘাট গোয়ালজুরে আদর্শ পাবলিক লাইব্রেরি উদ্বোধন

87        87Sharesসিলেটের কানাইঘাট উপজেলার গোয়ালজুর গ্রামে...