আমার ঘর কোথায়?

প্রকাশিত : ০৮ মার্চ, ২০১৮     আপডেট : ৩ বছর আগে
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

জিন্নিয়া সুলতানা:
শীতের সন্ধ্যা,
যতটা না অন্ধকার নামছে তার চেয়ে বেশি কোয়াশা পড়ে চারদিক আরো বেশি অন্ধকার করে রেখেছে।
নিলাশা তার ঘরের জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আছে।
উহু, তার নিজের ঘর বললে ভুল হবে, এটা আসলে তার বাবার ঘর।
ছয় মাস আগে খুব ভালো ভাবেই তার বিয়ে হয়েছিল পরিবারের পছন্দ করা ছেলে অঙ্কুর এর সাথে।
বিয়ের প্রথম রাতেই অঙ্কুর যখন নিলাশার দিকে বিরক্তি নিয়ে তাকিয়ে বলেছিল,
– আমার খুব টায়ার্ড লাগছে, আমি ঘুমাতে গেলাম, মাঝ রাতে ডেকে আমাকে বিরক্ত করো না।
খুব অদ্ভুত লেগেছিল নীলাশার, তবে সেদিন ই বুঝে গিয়েছিল খুব দ্রুত চারপাশ বদলে যাচ্ছে। ঠিক এই সন্ধ্যার মত চারদিক থেকে অন্ধকার নেমে এসেছিল।
নীলাশা বিয়েতে রাজি ছিল না যদিও, কিন্তু মা এসে কাধে হাত রেখে বললেন,
– নীলা, আমার মনে হচ্ছে এই ছেলের সাথে বিয়ে হলে তুই সুখী হবি, দেখে নিস মা।
তখন মাকে না করার মতন কোনো শক্তি ছিল না নীলাশার।
আজ মা কে গিয়ে জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করছে,
মা তুমি কি এই সুখের কথাই বলেছিলে আমায়?
কিন্তু নীলাশা কখনো এটা করতে পারবে না, কারণ সে ভালো করেই জানে,মা ও একজন মেয়ে মানুষ।
আমাদের সমাজ দেশ যতোই বলে মানুষ আধুনিক হয়েছে, মানুষের চিন্তা চেতনার পরিবর্তন হয়েছে , প্রকৃতপক্ষে লোক দেখানো আধুনিকতা মানুষের শেকড় বদলাতে পারে নি।
এখনো সবাই মনের ভেতর ঠিক আগের মতন কিছু চিন্তা চেতনা ধরে রাখে।
যার কারণে এই একবিংশ শতাব্দীতে এসেও একটা মেয়ের নিজের আলাদা কোনো অস্তিত্বই থাকেনা।
একটা মেয়ের বিয়ের আগে থাকে বাবার বা ভাইয়ের বাড়ি আর বিয়ের পর শ্বশুর বাড়ি বা স্বামীর বাড়ি।
কিন্তু এটা সবচেয়ে বেশি আফসুসের কথা যে, আমাদের সমাজের মানুষ মনে করে একটা মেয়ে বিয়ের পর সবচেয়ে বেশি নিরাপদ থাকে।
অথচ একটা মেয়ের সবচেয়ে বেশি নিরাপত্তাহীন অবস্থার সৃষ্টি হয় বিয়ের পরেই।
প্রতিটি পদ ফেলতে ডানে বামে তাকিয়ে ফেলতে হয়, পান থেকে চুন খসলেই জবাবদিহীতা অথবা অপমান হতে হয়।
একটা মেয়ে যতদিন সব কিছু ছাড় দিতে পারবে ততদিনই শ্বশুড় বাড়ি তার জন্যে নিরাপদ। অন্যথায় নয়।
এ কথাটা সেদিন থেকেই বুঝতে পেরেছিল নীলাশা যেদিন প্রথম স্বামীর জন্যে রান্না করতে গিয়েছিল।
তরকারিতে অল্প একটু বেশি ঝাল হয়েছিল বলে শ্বাশুড়ি বলে উঠেছিলেন,এটা তোমার বাবার ঘর না যে যা করবে তাই সবাই মেনে নেবে, শ্বশুড় বাড়ি এলে সব কিছু খেয়াল করে করতে হয়।
মা বাবা দেখি কিছুই শিখিয়ে পাঠায় নি।
নীলাশার তখন খুব কান্না পেয়েছিল, কিন্তু এটা শ্বশুড় বাড়ি,এখানে কাদতে হলেও সাবধান হতে হয়।
কথাটা এভাবে না বলে বুঝিয়েও বলতে পারতেন উনি, অথচ এমন ভাবে বললেন!
বিয়ের পর এক এক করে কত কিছু ছাড় দিতে হয় মেয়েদের।
নীলাশার ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম কিছু হয় নি।
একটা ভালো প্রাইভেট ফার্মে ভালো পোষ্টে একটা চাকরি করতো নীলাশা।
কিন্তু শ্বশুড় বাড়িতে পা দিতেই তাকে বলে দেয়া হল তাকে বাইরে চাকরি করতে হবেনা।এটা এ পরিবারের নিয়মের বাইরে।
সবার কথা ভেবে তাও মেনে নিয়েছিল নীলাশা।
সব কিছু মুখ বুজে সহ্য করে চলেছিল কিন্তু স্বামীর অস্বাভাবিক আচরণ দিন দিন বাড়তে থাকলো।
রাত হলে নীলাশা যখন ঘুমাতে যেত, অঙ্কুর লেপটপ নিয়ে বসতো।
অনলাইনে ইউটিউবে ইচ্ছে মত বাজে ছবি ভিডিও দেখতো, মাঝে মাঝে কোনো মহিলার সাথে ভিডিও চ্যাট ও করতো।
প্রথম প্রথম সে না দেখার ভান করলেও
খুব কষ্ট হতো তার স্বামীর এসব দেখে।
কিন্তু দিন দিন কোনো পরিবর্তন না দেখে তাকে এসব বাজে অভ্যাস থেকে বের করতে অনেক ভাবে বুঝিয়ে বলেছে নীলাশা, কিন্তু অঙ্কুর কোনো মতেই নীলাশার কথা মানতে রাজি না। উল্টো তার সাথে খারাপ ব্যবহার করে।
নীলাশার কোনো কথাতেই যখন অঙ্কুর এর ভ্রুক্ষেপ নেই তখন সে প্রতিবাদ করতে শুরু করলো, অথচ অদ্ভুত ভাবে পরিবারের সদস্যরা তাকে সাপোর্ট না দিয়ে উল্টো নানা বাজে কথা বলে তাদের ছেলেকে পরোক্ষ ভাবে রক্ষা করতে লাগলো।
ফলে বিয়ের ছয় মাসের মাথায় তাকে শ্বশুড় বাড়ি থেকে বের হয়ে আসতে হয়েছে। অথচ এখানে তার কি দোষ সে এখনো বুঝতে পারে নি।
একটা মেয়ে বিয়ের পর চীর চেনা পরিবেশ ছেড়ে একদম নতুন একটা পরিবেশে যায়।
এ অবস্থায় পরিবারের সবাই তাকে নতুন পরিবেশে মানিয়ে নিতে সাহায্য করার পরিবর্তে প্রতি পদে পদে ভুল ধরে অপমান অপ্রস্তুত করে রাখে।
আর এতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে পরিবারের মেয়েরা।
অথচ এই শ্বাশুড়ি ই এক সময় বউ ছিলেন,যে নিজেও বিভিন্ন সময় নির্যাতিত অপমানিত হতে হয়েছে, অথবা পরিবারের মেয়ে,যার নিজেকেই অন্য পরিবারে গিয়ে এরকম পরিস্থিতিতে পড়তে হতে পারে।
এই ব্যাপারটা নীলাশার কাছে বড় অদ্ভুত মনে হয়।
নীলাশা এখানে এসেছে সপ্তাহ দশদিন হবে, অথচ নিজের আত্মীয় স্বজনের কাছে যে কত প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়েছে।
এই তো সেদিনের কথা,
পরিবারের সবাই তাকে কত বেশি ভালবাসতো।
যে কোনো আবদার করলে তা সাথে সাথেই পূরণ করে দিত সবাই।
অথচ বিয়ের ছয় মাসের মধ্যে এই চীর চেনা মানুষ গুলি কেমন যেন বদলে গেছে।
এই দুঃসময়ে কেউ তার পাশে নেই। বরং তাকে দোষ দিতে পারলে যেন সবাই খুশি।
সকাল বেলা ছোট চাচী এসে বললেন,
– তুই এখনো যাস নাই?
অশান্তিতে থাকলে কি শ্বশুড় বাড়ি ছেড়ে আসতে হয়?
এভাবে কেউ বাবার বাড়ি এসে বসে থাকে?
স্বামীর ভাল মন্দ সব কিছু মেনে নিতে হয়, এভাবেই চলে আসছে যুগ যুগ ধরে।
তুই দুই কলম লিখাপড়া করে কী সব বদলে দিতে চাস ?
কিন্তু নীলাশার মাথায় আসেনা, স্বামীকে এভাবে দেখে কোন মেয়ে মেনে নিতে পারে?
সন্ধ্যার আবছা আলোয় জানলার বাইরে আকাশে তাকিয়ে নীলাশার  আজ বিধাতাকে একটা প্রশ্ন করতে ইচ্ছে করছে খুব,
হে বিধাতা,
জন্মের পর একটা মেয়ে আসে বাবার ঘরে, বিয়ের পর স্বামীর ঘরে, বৃদ্ধ বয়সে ছেলের ঘরে, তাহলে একটা মেয়ের নিজের ঘর কোনটা প্রভু?

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আরও পড়ুন

বিএনপি-জামায়াতের ৩২ নেতা-কর্মী গ্রেফতার

         সিলেটে মেট্রোপলিটন এলাকায় পুলিশী অভিযানে...

আগুন নিয়ন্ত্রণে এলেও নির্বাপণ শতভাগ হয়নি

         সিলেট এক্সপ্রেস ডেস্ক :  রাজধানীর...

‘পীর হবিবুর রহমান তাঁর জীবন ও সময়’ গ্রন্থ প্রকাশনায় প্রস্তুতি কমিটি গঠন

         সিলেট এক্সপ্রেস ডেস্ক: এদেশের প্রগতিশীল...