আমাদের স্বাধীনতা!! …. মোশাররফ হোসেন সুজাত

প্রকাশিত : ১১ মার্চ, ২০১৮     আপডেট : ৩ বছর আগে
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সিলেট এক্সপ্রেস ডেস্ক : আমাদের স্বাধীনতা! মুক্তিকামী মানুষের প্রাণের স্বাধীনতা। স্বাধীনতা শব্দটি প্রত্যেক প্রাণির প্রাণের চেয়েও প্রিয়। পাখি তার ভুবনে স্বাধীনভাবে বাঁচতে চায়। স্বাধীনভাবে বাঁচতে চায় প্রত্যেকটি পশুও। এমনকি নদীর মাছও চায় স্বাধীনভাবে নিজেকে চালাতে। আর সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে আমাদের স্বাধীন সত্তা দিয়েই সৃষ্টি করা হয়েছে। যে কারণে আমাদের শরীরের শিরা-উপশিরায়, রক্তের কণায় কণায়, চিন্তার প্রত্যেকটি অলিতে গলিতে স্বাধীনতার চেতনা আন্দোলিত হয়। কোনোভাবে আমাদের স্বাধীনতা ব্যাহত হলেই তৈরী হয় প্রতিবাদের ভাষা গড়ে উঠে প্রতিরোধের দেয়াল। উচ্চারিত হয় সাহসী স্লোগান “এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম” আর সেই স্লোগানের পথ ধরেই আমরা পেয়েছি স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ।
মার্চ উত্তাল স্বাধীনতার মাস। ১৯৭১ সালের এ মাসেই স্বাধীনতার পতাকা পতপত করে উড়তে শিখেছে বাংলাদেশের নীল আকাশে। দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের ক্লান্তিময় সময়ে সূর্যের আলোর মতো বিকশিত হয়েছিল বাংলার দামাল ছেলেরা। তাইতো বাংলাদেশ আমাদের প্রাণের চেয়েও প্রিয়। ১৯৭১ সাল বাংলাদেশের আকাশে ইতিহাসের নতুন এক সূর্য উদয়ের বছর। হাজারো উত্তেজনা আর উৎকণ্ঠায় কেটেছে গোটা বছর। মার্চ মাসের ৭ তারিখের রেসকোর্স ময়দান। লক্ষ জনতার ভিড়ে থৈ থৈ গোটা এলাকা। সবার মুখে মুখে স্বাধীনতার স্লোগান, চোখের তারায় তারায় আন্দোলনের বারুদ। নতুন স্বপ্নের স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকাও তৈরি হয়ে গেছে ইতোমধ্যে। শুরু হলো বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অগ্নিঝরা ভাষণ। সারাদেশে বইতে থাকে স্বাধীনতা সংগ্রামের মাতাল হাওয়া। বাংলা ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘পাকিস্তান তমদ্দুন মজলিস’। ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাাহ, দেওয়ান মুহাম্মদ আজরফ, অধ্যাপক আবদুল গফুর অধ্যাপক গোলাম আজমসহ অসংখ্য গুণী বুদ্ধিজীবী এ মজলিসে শরিক হন। দানা বেঁধে ওঠে ভাষা আন্দোলনের। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানি বাহিনীর গুলিতে শহীদ হন আবদুস সালাম, আবুল বরকত, আবদুল জব্বার, শফিউর রহমান, রফিক উদ্দিন সহ অনেক। ছাত্রহত্যার প্রতিবাদে চট্টগ্রামের কবি মাহবুব-উল-আলম চৌধুরী ‘কাঁদতে আসিনি ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি’ শীর্ষক কবিতা রচনা করেন। নিশ্চিত হয় আমাদের বাংলা ভাষার অধিকার। আজ হাজারো ছড়া কবিতা আর গানে মুখরিত আমাদের প্রিয় বাংলা ভাষা।
পাকিস্তান আমলে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এবং বুয়েটসহ মেডিক্যাল, ইঞ্জিনিয়ারিং ও অনেক কলেজ, মাদরাসা-বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয় শিক্ষা সম্প্রসারণের জন্য। অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য প্রতিষ্ঠিত করা হয় বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ শিল্পপ্রতিষ্ঠান। কিন্তু পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী নানাভাবে আমাদের শোষণ করত। রাষ্ট্রের প্রধান প্রধান পদগুলোতে থাকত পশ্চিম পাকিস্তানের আধিপত্য। অর্থনৈতিক বৈষম্য শুরু হয় পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে। স্বাধীন পাকিস্তানে বসবাস করেও আমরা স্বাধীনতার স্বাদ পুরোপুরিভাবে গ্রহণ করতে পারতামনা। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আমরা পূর্ববাংলায় একচ্ছত্র বিজয়সহ সমগ্র পাকিস্তানে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও তারা আমাদের হাতে ক্ষমতা দিতে চায়নি। আমরাও ছিলাম দৃঢ়প্রত্যয়ী। তাই আরেকবার আমাদের গর্জে ওঠা স্বাধীনতার জন্য। অবশেষে আমাদের রাজনীতি আর ক্ষমতা গ্রহণের মধ্যে সীমাবদ্ধ রইলো না। পরিণত হয় স্বাধীনতার সংগ্রামে।
দীর্ঘ নয় মাস রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে আমরা অর্জন করলাম স্বাধীনতা। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর অর্জিত হলো আমাদের বিজয়। আর থাকল না কোনো পাকিস্তানি দমনপীড়ন, থাকল না কোনো হানাদার, থাকল না কোনো হিংস্র দানবের শাসন। বাংলাদেশের সব মানুষ হয়ে গেলো ভাই ভাই। আমরা স্বপ্ন দেখতে থাকলাম ঐক্যবদ্ধভাবে স্বাধীন জীবনযাপনের। কিন্তু ক্ষমতার লোভ ও ক্ষুদ্র স্বার্থের সংঘাত যেন আমাদের পিছু ছাড়েনি। স্বাধীন সোনার বাংলাদেশে আবারো বিদেশী আধিপত্য ও ষড়যন্ত্রে ছায়া আবর্তিত হতে থাকল। বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে আবারো শুরু হলো বিভাজন, রাজনৈতিক সংঘাত আর দ্বিধাবিভক্তি। অথচ আমরাতো সবাই একই দেশের মানুষ। কেন এ বিভাজন? তাই আমরা কোনো বিভাজন চাই না। আমরা একটি সুখী সমৃদ্ধশালী বাংলাদেশ চাই। যেখানে আমাদের সন্তান থাকবে দুধে ভাতে, আমাদের সন্তানেরা পাবে স্বপ্নের সোনালি ভোর। নিশ্চিত হবে তাদের নিরাপদ ভবিষ্যৎ। প্রতিষ্ঠিত থাকবে আমাদের আদর্শ বিশ্বাস, বজায় থাকবে আমাদের সাহিত্য-সাংস্কৃতির স্বকীয়তা।
আজ স্বাধীনতার সাড়ে চার দশক পেরিয়েছে। এখনো হতাশাগ্রস্ত আমাদের মুক্তিযুদ্ধের অনেক সিপাহসালার। অনিরাপদ আমার মা বোনের ইজ্জত আব্রু। অনিশ্চিত আমাদের ভবিষ্যত, আমাদের উত্তরসূরীদের জীবন মানের নিশ্চয়তা আজও আমরা দিতে পারিনি। যে সুশাসনের জন্য আমাদের পূর্বসূরীরা সংগ্রাম করেছিলেন সেই আইনের শাসন আজও প্রতিষ্টিত হয়নি। শত শত সাগর রুনি আর তনুদের হত্যা মামলার বিচার অন্ধকারে, ক্ষমতার রাজনীতির গ্যাড়াকলে বিচারের বাণী নিরবে কাঁদে। হত্যা ধর্ষণ ছিনতাই আর নির্যাতনের এক অভয়ারন্যের নাম আজকের বাংলাদেশ। বিচার বহির্ভূত হত্যা, প্রশাসনিক নির্যাতন, নগ্ন দলীয়করণ ক্ষমতার আজ বড় হাতিয়ারে পরিনত হয়েছে। বিদেশী ভাষা ও সংস্কৃতির আধিপত্য আমাদের দেশজুড়ে। টিভি খুললেই ভিনদেশী চ্যানেলের দাপট। বিনোদন মানেই ভিন্ন ভাষার গান-নাটক-সিনেমা। সংস্কৃতি মানেই অবিশ্বাসী ঘরানার নগ্ন মডেল। আজো আমরা তাকাতে পারিনি আমাদের বিবেকের দিকে। খুঁজে পাইনি আমাদের ধর্মিয় মূল্যবোধ ও বিশ্বাস। আজো আমরা আমাদের শেকড়ের প্রতি আস্থাভাজন হতে পারিনি। এখনো আমরা মাথা উঁচু করে ন্যায়সঙ্গত অধিকারের কথা বলতে ব্যর্থ হচ্ছি। অথচ স্বাধীনতা মানেইতো ন্যায়সঙ্গত অধিকার ফিরে পাওয়া। স্বাধীনতা মানেইতো দেশের কল্যাণে নিজের কল্যাণ খোঁজা। স্বাধীনতা মানেই নিরাপত্তার গ্যারান্টি। স্বাধীনতা মানেই বিশ্বাসের পতাকা হাতে নিয়ে নির্ভয়ে ও নির্বিঘ্নে সামনে এগিয়ে চলা। স্বাধীনতা মানেই আমার দেশ আমার জীবন। স্বাধীনতা মানেই মনের সবুজ স্বপ্নের বিনির্মাণ।
ছেলেহারা মায়ের মতো আজো আমরা দৃপ্ত শপথে সে পথেই চেয়ে আছি। জানিনা কবে আসবে সে মাহেন্দ্রক্ষণ। কবে আমরা ফিরে পাবো আমাদের কথার স্বাধীনতা ভোটের স্বাধীনতা মনের স্বাধীনতা। কবে আমরা নব্য মীরজাফদের কবল থেকে মুক্ত করবো আমাদের সোনার বাংলাদেশ।


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আরও পড়ুন