আমাদের ‘আলয়’ ভরে উঠুক আলোয়

প্রকাশিত : ২৪ জুলাই, ২০১৮     আপডেট : ২ বছর আগে
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

মোহাম্মদ আব্দুল হক: আমাদের শান্তিতে বাঁচার অধিকার আছে এই স্বাধীন দেশে। আমাদের অনেক কিছুই আছে। এপর্যন্ত আমাদের অর্জন একেবারে কম নয়। আমাদের সুশিক্ষার জন্যে আছে ধর্মালয়, আছে বিদ্যালয় এবং সুচিকিৎসার জন্যে আছে চিকিৎসালয়। ছোটোবেলায় সন্ধি বিচ্ছেদ শিখেছি, ধর্মালয়= ধর্ম + আলয়, বিদ্যালয় = বিদ্যা + আলয়, চিকিৎসালয়= চিকিৎসা + আলয়। ধর্ম, বিদ্যা এবং চিকিৎসা শব্দের অর্থ, উচ্চারণেই একজন অক্ষরজ্ঞানহীন মানুষ বুঝে যায়। সাধারণে এখন সহজে বুঝে ধর্ম হচ্ছে গোত্র, গোষ্ঠী বা সম্প্রদায়ের সৃষ্টিকর্তা কর্তৃক ইহলৌকিক শান্তি ও পারলৌকিক পরিত্রাণ লাভের উদ্দেশ্যে অনুসৃত আচার আচরণ উপাসনা পদ্ধতি। এক কথায় সৃষ্টিকর্তা নির্দেশিত নিয়মকানুন মেনে চলাই ধর্ম। বিদ্যা হচ্ছে জ্ঞান আহরণ করা, যাতে সমাজ জীবনে নোংরামি পরিহার করে সুন্দরভাবে চলতে শিখা যায়। চিকিৎসা হচ্ছে অসুস্থ হলে সেরে ওঠার ব্যবস্থা। ‘আলয়’ হচ্ছে ঘর। সেদিক থেকে ধর্মালয় হচ্ছে পবিত্র ঘর যেখানে ধর্মকর্ম সুন্দরভাবে শেখানো ও সম্পাদন করার ব্যবস্থা থাকে। সেখানে ধর্মীয় জ্ঞানে সমৃদ্ধ সচ্চরিত্রবান ব্যক্তির কাছ থেকে আমাদের সন্তানেরা তাদের কথা, চলন ও অন্যান্য আচরণ দ্বারা প্রভাবিত হয়ে উন্নত চরিত্র গঠন করে। আমরা স্বাভাবিক ভাবেই জানি মসজিদ ধর্মালয় এবং মসজিদের ইমাম-মোয়াজ্জিন হচ্ছেন ধর্মালয়ের সেবক এবং মানুষের অনুকরণীয়। কেনো অনুকরণীয়? কারণ; মসজিদ পবিত্র স্থান, মহান আল্লাহর ঘর। কাজেই মসজিদের ইমাম-মোয়াজ্জিন সাধারণের চেয়ে মনে ও শরীরে সর্বাবস্থায় অধিক পবিত্র এবং মহৎ চরিত্রের। তাই তো মা-বাবারা নিজ সন্তানদেরকে নেক আমল শেখার জন্যে মসজিদের ইমাম সাবের কাছে পাঠান। কিন্তু ইমাম-মোয়াজ্জিন সাবদের কেউ যদি চারিত্রিক ত্রুটি লালন করেন মসজিদ কিংবা ঘরে, তাহলে আমরা কেনো সন্তানকে মসজিদের ইমামের কাছে পাঠাবো। আমি বলছি না; ধর্মালয়ে যাওয়া বাদ দিতে হবে। অবশ্যই ধর্মালয়ে আমরা যাবো, আমাদের সন্তানেরা যাবে এবং অবশ্যই আমরা আমাদের মসজিদ কিয়ামত পর্যন্ত পবিত্র রাখতে সচেষ্ট থাকবো। এখানে শুধু নামাজ পড়াতে জানা আর ধর্মীয় ইতিহাস বলতে পারা ইমাম-মোয়াজ্জিন নয়; বরং দৃঢ় নৈতিক চরিত্র সম্পন্ন শ্রদ্ধাভাজন ইমাম সাহেবদের প্রয়োজন অধিক বেশি। একই ভাবে আমরা মক্তব বা মাদ্রাসা বা বিদ্যালয়ে শিশুদের পাঠাবো বিদ্যা শিক্ষার জন্যে, ঘুষ-দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গড়ার শিক্ষা গ্রহণের জন্যে। অর্থাৎ বিদ্যালয় হবে নৈতিক চরিত্র গঠনের কারখানা, যেখানে শিক্ষকগণ দ্বিতীয় জন্মদাতার ভূমিকা নিয়ে থাকেন। এখানে মনে রাখতে হবে, অবশ্যই পরিবার হচ্ছে আসল শিক্ষালয়। একজন পিতা বা মাতা যদি ধূমপায়ী বা তামাকক সেবনে আসক্ত হন কিংবা ঘুষখোর হন তাহলে সন্তান বাড়িতেই ধূমপানের শিক্ষা পায় এবং ঘুষ ব্যাপারটা তার কাছে স্বাভাবিক হয়ে ওঠে। দিনে দিনে সে অন্যান্য নেশায় আসক্ত হয় এবং সমাজের বড়ো ঘুষখোর হয়ে ওঠে। তেমনি বিদ্যালয়ের শিক্ষকের কাছ থেকে অনৈতিক শিক্ষা পেলে ছাত্রটি বড়ো হতে হতে সহজেই অনৈতিক পথে পা বাড়ায়। এভাবেই সমাজ কলুষিত হয়। মারাত্মক নেশায় সে আসক্ত হয়ে পড়ে, সন্ত্রাসী কাজে জড়িয়ে পড়ে। এক পর্যায়ে মা-বাবা, শিক্ষক বুঝতে পারলেও কিছুই করার থাকে না। কারণ এ শিক্ষা সে তাদের আচরণ থেকেই পেয়েছে। আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম হয়ে ওঠে দুর্নীতিবাজ। সমাজের নেতৃত্ব চলে যায় নষ্টদের দখলে। যারা কষ্ট করে ভালোভাবে বেঁচে থাকতে চায়, তারা হয় অসহায়। কারণ; হায়েনারূপী দেহকাঠামোর মানুষের অভয়ারণ্যে শান্তিপ্রিয় মানুষ বারবার মরে।
আমাদের আরেক ‘আলয়’ হচ্ছে চিকিৎসালয়। আমরা অসুস্থ শরীর, মন নিয়ে অসহায় অবস্থায় ছুটি চিকিৎসকদের কাছে চিকিৎসালয়ে। চিকিৎসকের হাসিমুখের কথা শুনে রোগী ও রোগির স্বজন ভরসা পায়। বড়ো নির্মম সত্য আজ এখানে চিকিৎসালয়ে নির্ভয়ে নয়, আশায় নয় ; বরং যেতে হয় ভয়ঙ্কর কোনো অঘটন ঘটে যায় কি না স্বয়ং চিকিৎসকের দ্বারা এমন আশঙ্কা নিয়ে। আমাদের চিকিৎসালয় কসাইখানা, চিকিৎসক কসাই এমন কথা পুরনো। এখন যোগ হয়েছে আমাদের চিকিৎসকদের কেউ কেউ রোগী ও রোগির সহযোগীর ধর্ষক। সরকার মহোদয়ের কাছেই প্রশ্ন, আমাদের চিকিৎসালয় যদি ধর্ষণালয় হয়ে ওঠে তবে কি কাজ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের? আমাদের ধর্ম মন্ত্রণালয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সকলেই বড়ো বড়ো গাড়ি হাঁকিয়ে চলেন। তারপরও কেনো এমন হয়? তবে আমাদের আশা ভরসার জায়গা কোথায়?

সম্প্রতি ( জুলাই ২০১৮ খ্রীষ্টাব্দ) সিলেটে ইমাম কর্তৃক এবং চিকিৎসক কর্তৃক ধর্ষণ নিয়ে সমাজ তোলপাড় করা ঘটনা ঘটেছে। ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনায় কলম চলছে না। আমি ঠিক বুঝছি না বিচার কার কাছে চাইবো। আমাদের পুলিশ ভাইরাও প্রায় প্রতিদিন নানান অপকর্মের ঝুড়ি মাথায় নিয়ে পত্রিকার শিরোনাম হয়ে ওঠেন। প্রকৌশলীরা দুদকের অভিযানে ধরা পড়েন। অনেক অফিসের অনেক বড়োকর্তা কলংকিত ঘুষে কিংবা নারী কেলেঙ্কারিতে। ( ১৮ জুলাই ২০১৮… পত্রিকার শিরোনাম ‘ডিআইজি মিজান সাময়িক বরখাস্ত’)। আমরা যাবো কোথায়? ধর্মে, সংস্কৃতিতে, শিক্ষায়, মানবতায় আমাদের সকল অর্জন কি বৃথা হয়ে যাবে? আমি জানি, আমাদের এই দেশটিতে একটি সংবিধান আছে যা ত্রিশ লক্ষ শহিদের রক্তে গড়া বাংলাদেশের। কলম চলছে না। অন্ধকার দেখছি। এখন চেয়ে আছি, মাননীয় আদালত, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, মহামান্য রাষ্ট্রপতি আমাদেরকে নষ্ট সমাজের কষ্ট থেকে রক্ষা করুন। ঘুষ, দুর্নীতি, ধর্ষণ, চাঁদাবাজি, গুম, খুন, ফুটপাত দখল, খাদ্যে ভেজাল, চিকিৎসালয়ের অনাচার ইত্যাদিতে নীতিহীন পরাকাষ্ঠা ভেঙে ফেলুন। কঠিন, কঠোর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হোক সকল অপরাধীর। আমাদের ঘর, আমাদের সকল নিরাপদ ‘আলয়’ ভরে উঠুক শুভ্র আলোয়। আমরা বাঁচতে চাই, আমাদের সন্তানরা বাঁচুক সবুজ সতেজ নিরাপদ বাংলাদেশে।।
লেখক কলামিস্ট, কবি ও প্রাবন্ধিক


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আরও পড়ুন

মরহুম আলহাজ্ব আতিকুর রহমান ফাউন্ডেশনের ইফতার মাহফিল

         সিলেট সদর উপজেলার ১নং জালালাবাদ...

মৃত্যুর পর চল্লিশা করা কি ঠিক?

         ইসলাম ও জীবন ডেস্ক: চল্লিশা...

বাসা ভাড়া ও বিদ্যুৎ বিল মওকুফ করলেন সিলেটের এক বাড়িওয়ালা

         করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে সিলেটের...