আমাদের অহংকার আমরি প্রিয় ভাই

প্রকাশিত : ০৬ মার্চ, ২০১৯     আপডেট : ১ বছর আগে

মাহফুজা সিদ্দিকা:

সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর।
সময়ের দ্রুত প্রবাহে জীবনের বছরগুলো পেছনে চলে যায়। জীবন চক্রের শৈশব, কৈশোর, যৌবন শেষে যেন আবার পড়ন্ত বিকেলে আমরা উপনীত হই। আল্লাহ তায়ালার বিশাল সৃষ্টির সব কিছু সময়ে সাঁতার কেটে নিজ নিজ কক্ষপথ অতিক্রম করছে। মানুষও তার ব্যতিক্রম নয়। ১৯৪৯ সালের ৯ মার্চ জন্মগ্রহণ করেন আমার বড় ভাই ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) জুবায়ের সিদ্দিকী। আমাদের গর্বিত পিতা পেশায় ছিলেন স্কুলের প্রধান শিক্ষক। মা ছিলেন একজন আদর্শ গৃহিণী। আমরা দশ ভাই বোন ছিলাম। ভাই বোনের সমতা ছিল খুব সুন্দর পাঁচ ভাই, পাঁচ বোন। ভাই বোনদের মধ্যে সবার বড় ছিলেন বোন অধ্যক্ষ (অব.) আনসারুন নেসা। ভাইদের মধ্যে সবার বড় ছিলেন জুবায়ের সিদ্দিকী (সাথী)। মা বাবার অক্লান্ত পরিশ্রম, সততা, ন্যায়পরায়ণতা, মমতার বন্ধনে সাথী ভাই সবার সাথে বড় হন সিলেট শহরে। মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান হলেও পিতা মাতার সংগ্রাম ছিল সকল সন্তানকে শিক্ষিত করা। এক্ষেত্রে সফলতা লাভ করেছেন।

মায়ের কাছে শোনা গল্প:
আমাদের একজন ভাই নাম ছিল হেলাল, জন্মের কিছু দিন পর তার মৃত্যু হয়। আম্মার মনে খুব ভয় ছিল, এই ভাইয়ের জন্মের পূর্বে তিনি আমাদের গ্রামের বাড়িতে চলে যান। গ্রামের নাম পাঁচপাড়া, উপজেলা বালাগঞ্জ। সেই গ্রামে জন্ম হয় এই ভাইয়ের। নাড়ি ছেড়া সন্তানের জন্য মায়ের রাতের ঘুম কমে গিয়েছিল, বুকের সাথে আকড়ে রাখতেন। নিঃশর্ত ¯েœহ-ভালবাসার চাদরে মুড়িয়ে দিতেন তাকে।
জন্মের কয়েক মাস পর বড় ভাইয়ের খুব কাঁশি হয়েছিল। কেউ একজন মাকে পরামর্শ দিয়েছিল, তিনি যদি আদা খেতে পারেন তবে বুকে দুধ খেলে তার সন্তানের কাঁশি কমে যাবে। মা এত বেশি আদা খেয়েছিলেন, অবশেষে তার গায়ে জ্বালা শুরু হয়। সন্তানের জন্যে মায়ের ত্যাগ, অপরিসীম ভালবাসা, পরম সহিষ্ণুতা, সকল সন্তানের জন্য ছিলেন একজন নিবেদিত প্রাণ।
১৯৬৭ সালে আর্মিতে যোগদানের জন্য বড়ো ভাই বাড়ি থেকে চলে যান পাকিস্তানে। তখন আমি বেশ ছোট, কিন্তু মায়ের কান্না গোটা পরিবেশকে যেন ভারী করে তুলেছিল। আজকের মত টিএনটি ফোন ও মোবাইল ফোনের ছড়াছড়ি কিছু ছিলনা। ডাকপিয়নের অপেক্ষায় থাকতেন মা। পিয়ন আসলে সবাই উদগ্রীব হয়ে উঠতেন কোন চিঠি এসেছে কিনা। পরিবারের সবাই জড়ো হয়ে সেই চিঠি পড়া শুনতেন। অশ্রু ভেজা নয়নে মা বার বার চিঠি পড়তেন এবং সযতেœ সংরক্ষণ করতেন সব চিঠি-ই।
ছুটিতে যখন বাড়িতে আসতেন ভাই। আমাদের তখন কি যে আনন্দ হত, রাত জেগে সবাই মিলে গল্প আর গল্প করা হত। আমাদের পরিবারিক পরিবেশ ছিল অফুরান ভালবাসা বন্ধনে আবদ্ধ। সবাই মিলে তার আর্মি একাডেমির ট্রেনিংয়ের কষ্টের কথা শুনতাম। পাকিস্তানের কাকুলের শীতের বর্ণনা শুনে আমরা অবাক হয়ে যেতাম। প্রতিবার দেশে আসার সময় আমাদের জন্য কাপড়, আংগুর মাল্টা ইত্যাদি ফল আনতেন। বর্তমানে সব ফল আমাদের দেশে পাওয়া যায়, পাকিস্তান আমলে এসব খুবই কম দেখা যেত।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সংগ্রাম শুরু হলে, পাক সেনাবাহিনী বাঙালি অফিসারদেরকে দূর্গে অন্তরীন করে রাখে। বাংলাদেশে সরাসরি যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। খোঁজ খবর না পাওয়াতে আমাদেও পরিবারে নেমে আসে দুঃখের বন্যা। বাবা-মা ও ভাইবোন সবার মাঝে শুরু হয় হাহাকার কান্না। মায়ের তো অশ্রুপাত। মা বাবা বড় ভাইকে ‘সাথী’ নামেই ডাকতেন। দেশ স্বাধীন হলেও সরাসরি কোন চিঠি পত্র আসত না। খুব সম্ভবত লন্ডন হয়ে আসত। আমার মা মনে করতেন ভাই চিঠি লিখেছেন, পাড়ার দুষ্টু লোক তা ছিঁড়ে ফেলে দেয়। স্বাধীনতার পর শুরু হয় আমাদের আরেকটি কাজ কাগজের টুকরা কুড়ানো। কাগজের টুকরো কুড়িয়ে এনে আমরা মাকে দিতাম। মা উদাসী মন নিয়ে কাগজের লেখা পড়তেন, কিন্তু এ লেখাত তার ছেলে ‘সাথী’র নয়, আমাদের আড়াল করে শাড়ির আঁচলে চোখ মুছতেন। আবার পরের দিন দোকানের পাশে ফেলে রাখা সব কাগজ কুড়িয়ে নিয়ে আসতাম। রাতে হারিকেনের আলোতে ছেলের হাতের লেখা খুঁজতেন মা আর নির্জনে বসে কাঁদতেন। একটা চিঠির অপেক্ষায় দীর্ঘদিন পার হওয়া। এরই মধ্যে উপস্থিত হল রমজান মাস। রমজানের শেষ দশ দিন বাবা মসজিদে ইতেকাফ করতে গেলেন। মায়ের কাছ থেকে শুনতে শুরু করলাম এবার আমাদের বাসায় ঈদের কাপড় আসবেনা, কোন ভাল খাবার রান্না হবে না। আমার ছোট মনে খুব আঘাত লেগেছিল। বাবার জন্যে মসজিদে ইফতারি নিয়ে যেতাম, উনি খুব কম কথা বলতেনÑতোমরা ভাল আছো তÑএইটুকু। আমি মনে মনে ফন্দি আটলাম, কি করে ঈদের দিন অন্তত ভাল খাবারের ব্যবস্থা করা যায়। মসজিদে ইফতার দিয়ে এসে মাকে বল্লাম, বাবা বলেছেন ঈদের দিনে বড় একটা রাজহাঁস রান্না করতে। মা রাগ করে নীরবতা ভেঙ্গে বললেন, ‘সাথী’র কোন খোঁজখবর নেই আর তিনি ইতেকাফে বসে হাঁস খাবার কথা বলছেন। এটা যে ¯্রফে আমার প্ল্যান ঈদের দিনে বাবা আসার পর জানলেন। এ সময়টা আমাদের জন্য কত কঠিন ও নির্মম ছিল। মায়ের মনে এত ভয় ছিল যে, সাথী কি ফিরে আসবে? দীর্ঘ এই সময় শংকায় দুঃখে দু:চিন্তায় আমাদের পরিবারকে দুবির্ষহ অবস্থায় ফেলেছিল। কষ্টের দিন অনেক দীর্ঘ হয়, দীর্ঘ হয় নিঃশ^াস, ব্যথিত অস্তরে অপেক্ষার আধাঁর ভেদ করে ভাইয়ের খবর পেলে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরি। সেটা ছিল ১৯৭৩ সাল, যখন বাড়িতে ফিরলেন ভাই, আনন্দের বন্যায় সকল দুঃখ কষ্টের গ্লানি মূছে গেল। আমাদের কাছে সে সময়টা সোনালী সকাল ছিল।

আমি যেমন দেখেছি বড় ভাই কে
অতি সাধারণভাবেই পরিবারে বড় হয়েছেন। সত্যভাষী ও সাহসী ছিলেন। আমাদের সবার মতই তিনি বাবা-মার সাধ্যের ভেতরে যা পেতেন তা নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতেন। সন্ধ্যার পূর্বে সবাইকে ঘরে ফিরতে হতÑএটার ছিল পরিবারে আইন। একবার সন্ধ্যার পরে ঘরে ফিরে আসাতে বাবার কাছে ভাইকে কারন দর্শাতে হয়েছে। তার তিন জন বন্ধু তারা হলেন, শাহীন ভাই, লাহিন ভাই, অঞ্জু ভাইÑতাদের সাথে বাসায় খুব আড্ডা দিতেন। মাঝে মাঝে লাহিন ভাইকে দরাজ গলায় গান করতে শুনা যেত, এইটা বাইরের ঘরে। আমরা তার কন্ঠে গানগুলো খুবই উপভোগ করতাম।
আমাদের বাসার পাশে টিলা এবং জঙ্গল ছিল। একবার এখানে বাঘ এসেছে বলে হই চই শুনা গেল। পরে রাতে বড় ভাইসহ তার বন্ধুরা মিলে বাঘ শিকারের জন্য প্রস্তুতি নিলেন। অবশেষে একটা মেছো বাঘ শিকার করলেন। পিতা মাতার প্রতি তার ভালবাসার কোন অভাব ছিল না। তাদের প্রতি সম্মান দেখানো এবং তাদের আরাম আয়েশের জন্য যতœবান ছিলেন। অসুখে বিসূখে খোঁজ খবর রাখতেন সব সময়। বাবা ক্যানসার ব্যাধিতে আক্রান্ত হলে ভাই বাবাকে ঢাকায় নিয়ে চিকিৎসা করান এবং যতœ নেন।
ভাই হিসেবে ছিলেন ভাইদের মধ্যে বড়, তেমনি বড় মাপের জীবন গড়ে ছিলেন। কর্ম পাগল তিনি সেই ১৯৬৭ সাল থেকে অনেক পট পরিবর্তনে মধ্য দিয়ে নিজের কার্যক্রম বর্তমানেও চালু রেখেছেন।
১৯৭৫ সালে আমি ঢাকায় পড়াশোনার ইচ্ছে প্রকাশ করলে ভাই আমাকে হোম ইকনমিক্স কলেজে ভর্তি করে দেন। তিনি তখন ছিলেন ঢাকায়। এটাই ছিল আমার প্রথম ঢাকা যাওয়া। ঢাকায় নানা ঝামেলার মধ্যে আমাকে দেখতে ভাই কলেজে আসতেন, এটা প্রমান করে তার মমতা ও দায়িত্বশীলতার। আমার ঢাকাতে লেখাপড়ার খরচটা বহন করেন তিনি ও বাবা। নিয়মিত খোঁজ খবর নিতেন সার্বিক সহযোগিতা করেছেন। আমাকে আগলে রেখেছেন পরম মমতায়।
পরিশেষে বলি জুবায়ের সিদ্দিকী (সাথী) ভাইয়ের জীবন ছিল বিচিত্র সুখ-দুঃখ মিলে। তাঁর জীবন থেকে দীর্ঘ সত্তরটি বছর চলে গেছে। প্রথম জীবনে ছাত্র অবস্থায় ছিলেন মা বাবার বাধ্য, কড়া শাসনের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করেন শৈশব ও কিশোরকাল। চরিত্র গঠনের শিক্ষা পরিবার থেকে অর্জন করেনÑঅল্পে তুষ্ট থাকা নীতি-নৈতিকতা, সত্যবাদীতা নিষ্ঠার সাথে কাজ করা, সৎ ভাবে বাঁচতে হলে ন্যায়ের সংগ্রাম করা, সৎ বন্ধু নির্বাচন করা, অন্যায়কে প্রতিহত করা।
সেনাবাহিনীতে যোগদানের পর তার জীবনে মোড় পরিবর্তন হয়। প্রশিক্ষণের কষ্ট, বিরামহীন শ্রম, শৃংঙ্খলাবদ্ধ জীবনÑযেন এক খাঁচায় বন্দি পাখির মত। অনেক ত্যাগ, কষ্ট সহ্য করে বৈরী পরিবেশে প্রশিক্ষণ শেষে সেবা বাহিনীতে কমিশন লাভ করেন। এরপর আবার শুরু হয় শংকিত জীবনÑদুই বছর বন্দি জীবন। কষ্টের পর বাংলাদেশে এসে ৭৫ সালে মা-বাবার পছন্দের পাত্রী বিয়ে করেন। দেশের বিভিন্ন জেলাতে দায়িত্ব পালন করেন। রাষ্ট্রপতির নিরাপত্তা বাহিনীতে কাজের দায়িত্ব পালনের সময় অনেক পরিচিত জন তার কাছে বিভিন্ন সুপারিশ নিয়ে যেতেন, তিনি কারো জন্য কোন সুপারিশ জীবনেও করেনি, তদরিরের প্রতি তার ছিল খুব বেশী ঘৃণা। পরিবারের কোন ভাই বোন কারও জন্য তার জীবনে কোন সুপারিশ করেননি।
চাকুরিরত অবস্থায় ট্রেনিংয়ের জন্য যুক্তরাষ্ট্রর হাওয়াইয়ে যান। চীন, সউদি আরব, ইরাক, যুক্তরাজ্য, সহ বহুদেশে ভ্রমণ করেছেন। বাংলাদেশের সামরিক উপদেষ্টা হিসেবে দিল্লিতে কর্মরত ছিলেন। অবশেষে চা বোর্ডেও চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেছেন। কর্মময় জীবনে পরিবারের প্রতি দায়িত্ব পালন করেছেন, আমাদেও সাথে সব সময় যোগাযোগ রক্ষা করে চলতেন, জীবন ছিল ভারসাম্যপূর্ণ।
অবসর পরবর্তীতে পিতার মহান পেশা শিক্ষকতায় যোগ দেন। এ পেশা আমাদের রক্তে মেশানো। আমাদের ফুফু ব্রিটিশ আমলে বাড়িতে মেয়েদের স্কুল করে ছিলেন, যাতে সহযোগিতা করেছে ব্রিটিশরা। বাবা ছিলেন শিক্ষক, মামা ছিলেন শিক্ষক, বড় বোন ও আমি পেশায় শিক্ষক।
তিনি কর্ম জীবনের পাশাপাশি একজন ভাল লেখক। অনেকগুলো বই লিখে প্রশংসা কুড়িয়েছেন।
স্কলার্স হোমের অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন, বয়সের কাছে হার না মানা এই যোদ্ধা। সাফল্যের সৌরভ ছড়িয়ে দীর্ঘদিন ধরে তাঁর পথচলা। তার একাত্তরতম জন্ম দিনে দোয়া রইলো তার সুস্থতার।

মাহফুজা সিদ্দিকা: অধ্যাপক মঈনউদ্দিন আদর্শ মহিলা কলেজ,সিলেট

পরবর্তী খবর পড়ুন : একজন আদর্শ মানুষ

আরও পড়ুন

ছড়া সংরক্ষন প্রকল্প পরিদর্শন করেছেন সিসিক মেয়র

করোনাকালের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে নানা সীমাবদ্ধতার...

প্যারিসে শেষ হল দিনব্যাপী একুশে বইমেলা

বদরুজ্জামান জামান প্যারিস থেকে: ‘শিক্ষা-সংস্কৃতি-ভাষার...

মোল্লারগাঁওয়ে টিপিএল ক্রিকেট টুর্ণামেন্টের সমাপনী খেলা সম্পন্ন

সিলেটের দক্ষিণ সুরমার মোল্লারগাঁও ইউনিয়নের...