আব্বাস উদ্দীনের স্বর ও সুরে মানুষকে মোহিত করে

প্রকাশিত : ২৮ অক্টোবর, ২০১৮     আপডেট : ২ বছর আগে  
  

সাঈদ চৌধুরী: ২৭ অক্টোবর পল্লীগীতি সম্রাট কিংবদন্তী সুর সাধক আব্বাস উদ্দীনের ১১৭তম জন্মবার্ষিকী। ১৯০১ সালে বর্তমান ভারতের কোচবিহার জেলার তুফানগঞ্জ মহকুমার বলরামপুর গ্রামে এই ক্ষনজন্মা শিল্পীর জন্ম হয়। তাঁর পিতা মৌলভী মোহাম্মদ জাফর আলী আহমদ ছিলেন একজন প্রথিত যশা আইনজীবী।

জন্মগায়ক আব্বাস উদ্দীনের স্বর ও সুরে ছিল মানুষকে মোহিত করে দেয়ার এক বিরল ঐশী ঝিলিক। এক অজানা মোহিনী সুরের ঐন্দ্রজালিক ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন আব্বাস উদ্দীন। শুধু দেশে নয় লস এ্যাঞ্জেলস, শিকাগো, নিউ ইয়র্ক, লন্ডন, প্যারিস, টোকিও, মেলবোর্ণসহ পৃথিবীর বহু দেশে তিনি সঙ্গীত পরিবেশন করে আমাদের গানকে বিশ্বসভায় স্থান করে দিয়েছেন। প্রায় পাঁচ হাজার অনুষ্ঠানে গান গাইতে গিয়ে তিনি সংগ্রহ করেছেন অনেক দূর্লভ ভাওয়াইয়া সহ অসংখ্য লোকগীতি ও পল্লীগীতি। বেশির ভাগ গানে তিনি সুর সংযোজন করে এগুলোকে সুখ শ্রাব্য করেছেন।

আব্বাস উদ্দিন আহমদ বাঙ্গালি মুসলিম সমাজের মনের কথা এদেশের ‘‘লোকগীতি’ ও তাদের প্রাণের কথা ‘‘ইসলামী গান’’ গেয়েছেন অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে। পল্লীর সাধারণ মানুষের সুখ-দু:খ, হাসি-কান্না, আশা-নিরাশা এবং জীবনবোধের সহজ ও স্বতস্ফূর্ত প্রকাশ ঘটেছে তার কন্ঠে। গ্রাম বাংলার সাধারণ মানুষের মুখে মুখে প্রচলিত লোকসঙ্গীত ও ভাওয়াইয়া গানের তিনি ছিলেন কিংবদন্তি। আধুনিক গান, স্বদেশী, সারি, ভাটিয়ালী, পালাগান সবই তিনি গেয়েছেন। তবে পল্লীগীতিতে তার মৌলিকতা ও সাফল্য সবচেয়ে বেশি।

কোচবিহারের এক অনুষ্ঠানে আব্বাস উদ্দীন আহমদের গান শুনে কাজী নজরুল ইসলাম বিমোহিত হয়েছিলেন। তাঁকে তিনি কলকাতায় আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। কাজী নজরুল ইসলামের অনুপ্রেরণা এবং সহযোগিতায় আব্বাস উদ্দীনের কণ্ঠে ইসলামী গানের পাশাপাশি একাধিক ভাওয়াইয়া গানের রেকর্ড হয়েছিল। গানগুলি সে সময় অনেক জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। পরবর্তীতে আব্বাস উদ্দীনের কী গান বাজারে আসছে তা শোনার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতেন গ্রামোফন কোম্পানির লাখো লাখো স্রোতা।

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের বিখ্যাত গান ‘ও মন রমজানেরই রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ’ প্রথম গেয়েছিলেন আব্বাস উদ্দিন আহমদ। এটি এমন একটি গান, যা না শুনলে রোজার ঈদকে স্বাগত জানানো হয়েছে বলেই মনে হয় না। আব্বাস উদ্দিনের দরদী কন্ঠে “ত্রিভুবনের প্রিয় মহম্মদ এলোরে দুনিয়ায়” গানটি শুনে লাখো লাখো মানুষ আজো মুগ্ধ হন। কবি নজরুলের লেখা ও সুরকরা রোজা, নামাজ, হজ, যাকাত, ঈদ, শবেরাত, ফাতেহা, ইসলামী গজল সহ অনেক গানে তিনি কন্ঠ দিয়েছেন। অসংখ্য হামদ্, নাত, উর্দুগান ও মুর্শিদীজারী গেয়েছেন। গায়কের পাশাপাশি আব্বাস উদ্দিন আহমদ অভিনয়ও করেছেন।

আব্বাস উদ্দীন আহমদ শৈশব থেকেই তীক্ষ্ম বুদ্ধি ও মেধাসম্পন্ন ছিলেন। ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দের ১৪ আগষ্ট তিনি তৎকালীন রেডিও পাকিস্তানে গান গাওয়া শুরু করেছিলেন। এ কে ফজলুল হকের মন্ত্রীত্বের সময় রেকর্ডিং এক্সপার্ট হিসেবে আব্বাস উদ্দিন সরকারি চাকরিতে প্রবেশ করেন।

চল্লিশের দশকে আব্বাস উদ্দিনের গান পাকিস্তান আন্দোলনের পক্ষে মুসলিম জনতার সমর্থন আদায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর ঢাকায় এসে তিনি সরকারের প্রচার দপ্তরে এডিশনাল অর্গানাইজার হিসেবে চাকরি করেন। পাকিস্তানের প্রতিনিধি হিসেবে ১৯৫৫ সালে ম্যানিলায় দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় সঙ্গীত সম্মেলন, ১৯৫৬ সালে জার্মানিতে আন্তর্জাতিক লোকসংগীত সম্মেলন এবং ১৯৫৭ সালে রেঙ্গুনে প্রবাসী বঙ্গ সাহিত্য সম্মেলনে তিনি যোগদান করেন।

আব্বাস উদ্দীনের গানের রেকর্ডগুলি এক অমর কীর্তি। আমার শিল্পী জীবনের কথা (১৯৬০ খ্রি:) তাঁর রচিত একমাত্র গ্রন্থ। তিনি সঙ্গীতের অবদানের জন্য “মরনোত্তর প্রাইড অব পারফরমেন্স (১৯৬০ খ্রি:)”, “শিল্পকলা একাডেমী পুরস্কার (১৯৭৯ খ্রি:)” এবং “স্বাধীনতা দিবস পুরস্কারে (১৯৮১ খ্রি:)”

বাংলাদেশের সাবেক প্রধান বিচারপতি মোস্তফা কামাল , জনপ্রিয় শিল্পী মোস্তফা জামান ও কণ্ঠশিল্পী ফেরদৌসী রহমানের পিতা লোকসংগীত জগতের প্রবাদপ্রতিম উজ্জল নক্ষত্র, ভাওয়াইয়া ও পল্লীগীতির জনক ১৯৫৯ সালের ৩০ ডিসেম্বর সকাল সাড়ে ৭টায় না ফেরার দেশে চলে যান। অর্ধশতাধিক গ্রন্থ প্রনেতা মোস্তফা জামান আব্বাসী তাঁর বাবা আব্বাস উদ্দিনকে নিয়ে ৬০০ পৃষ্ঠার জীবনী গ্রন্থ লিখেছেন। ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি এটি প্রকাশ করেছে।

(সুর সাধক আব্বাস উদ্দীনের ১১৭তম জন্মবার্ষিকী, কাজী নজরুল ইসলাম মিলনায়তন সিলেটে ২৭ অক্টোবর শনিবার বিকেল চারটায়। অতিথি শিল্পীবৃন্দ: মুস্তাফা জামান আব্বাসী, পশ্চিমবঙ্গ থেকে আহুত শিল্পী ও সিলেটের শিল্পী)

আরও পড়ুন