‘আবদুল্লাহ’ ও আমার কিছু অনুভূতি

প্রকাশিত : ১৪ মে, ২০১৮     আপডেট : ২ বছর আগে  
  

তাসলিমা খানম বীথি: আমাদের বাসায় আজ ১৪৪ দারা জারি করেছেন বাবা। সবার ঘরে যখন কালার টিভি তখন আমাদের ঘরে সাদা কালো টিভি। এজন্য মাঝে মাঝে নিজের কাছে খুব খারাপ লাগতো কালার টিভি দেখতে পারিনা বলে। একদিন আলাদিনের চেরাগের মত আমিও একটি পুরষ্কার পাই। জীবনে প্রথম লেখা এবং প্রথম পুরষ্কার পঁচিশ হাজার টাকা। সেই টাকা দিয়ে প্রথমেই একটি কালার টিভি কিনি। সেইদিন বাবা প্রচন্ড রেগেছিলেন আমার ওপরে। কালার টিভি কিনেছি ঠিকই কিন্তু ডিস লাইন লাগানোর সাহস পাইনি।

চার বছর পর…. ছোট মামার বাসায় ডিস লাইন লাগিয়ে দিলোও তা বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। বাবার ১৪৪ দারা জারি হবার পর ডিস লাইন কেটে দেওয়া হয়। ডিস লাইন যখন ছিলো তখন অবসর পেলেই টিভির সামনে বসে পড়তাম। তাই বই পড়া হত না। কিন্তু বই পড়া অভ্যাস ছিলো সেই ছোটবেলা থেকেই। নতুন কোন বই পেলে পড়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত এক মুহূর্তের জন্য হাতছাড়া করতাম না। কেন জানি নতুন বইয়ের গন্ধ, নতুন কিছু জানার আগ্রহ সারাক্ষণ মনের ভেতর ওড়াওড়ি করতো। ডিস লাইন বন্ধ করে দেওয়ার জন্য বাবাকে মনে মনে অনেক ধন্যবাদ দিয়েছি।

তার বিশেষ কারণ হলো আমার ছোট বোন। আমার বোনের কাছে বই পড়া অভ্যাস হচ্ছে সবচেয়ে বিরক্তকর অভ্যাস। তাই যখনই আমি কোন বই পড়তাম তখনই বইয়ের কোন মজার ঘটনা তাকে বলতাম। সে খুব আনন্দ পেত এবং মজার ঘটনাকে জানতে বই পড়া শুরু করে দিত। বাবার জন্যই আজ বই পড়ার অভ্যাসটা আবার ফিরে এসেছে আমাদের দুই বোনের। অবসরে এখন টিভি না দেখে দু’বোন মিলে বই পড়ি।

এখন থেকে প্রায় আশি-নব্বই বছর আগের সে সময় দেশের অবস্থা, সমাজব্যবস্থা একেবারেই অন্য রকম ছিল। কাজে তখনকার পরিস্থিতি ভালমতো জানা না থাকায় ‘আবদুল্লাহ’ উপন্যাসটি বুঝতে একটু অসুবিধা হয়। ‘আবদুল্লাহ’ উপন্যাসটি অনেকদিন থেকে পড়ছি। কিন্তু বুঝতে পারি না বলে একবার পড়ে রেখে দেই। হঠাৎ একদিন বইটিকে হাতে নিয়ে উল্টে পাল্টে বার বার দেখছি আর স্পর্শ করছি। ‘আবদুল্লাহ’ উপন্যাসটি আগের পড়ার অনুভূূতি ছিল একরকম আর এখন পড়ার অনুভূতি অন্যরকম। কারণ ‘আবদুল্লাহ’ উপন্যাসটি কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিজে পড়েছিলেন আর সেই বই আমি পড়ছি। ভাবতেই এত আনন্দ লাগছে যা ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না। নতুন কোন বই হাতে নিয়ে প্রথমে কবি বা লেখকের পরিচিতিসহ ভূমিকা পড়ে তারপর বই পড়ি। কিন্তু‘আবদুল্লাহ’ উপন্যাসটি লেখকের কোন পরিচিতি ছিল না। তাই লেখকের সর্ম্পকে জানার আগ্রহ মনের ভেতর থেকে গেলো। সেই ইচ্ছাটি পূরণ হলো একটি পত্রিকা সাহিত্য পাতা পড়ে। রাতে ঘুমানোর আগে বাসায় যখন পত্রিকার সাহিত্য পাতা পড়ছিলাম হঠাৎ চোখে পড়ল দেশবরেণ্য সাহিত্যিক কাজী ইমদাদুল হক এর সম্পর্কে একটি লেখা।

দেশবরেণ্য সাহিত্যিক কাজী ইমদাদুল হক। ১৮৮২ সালে ৪ নভেম্বর খুলনার পাইকগাছা উপজেলার গদাইপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার শৈশব ও প্রথম জীবন কাটে খুলনা শহরে। পিতা নাম কাজী আতাউল হক। তিনি খুলনা জজ কোর্টের একজন প্রখ্যাত আইনজীবী ছিলেন।

খুলনা জেলা স্কুল থেকে ১৮৯৬ সালে অত্যন্ত কৃতিত্বের সাথে এন্ট্রান্স পাস করেন। ১৯০০ সালে কলকাতা প্রেসিডেন্ট কলেজ থেকে বিএ পাস করেন। তিনি আসামে শিক্ষা বিভাগে উচ্চমানের রেকারি পদে কর্মজীবন শুরু করেন। ১৯০৩ সালে কলকাতা মাদরাসার শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। ১৯১১ সালে ঢাকা টিচার্স ট্রেনিং কলেজের ভূগোলের শিক্ষক নিযুক্ত হন। এখানে শিক্ষকতা করার সময় বিটি পরীক্ষা দিয়ে প্রথম স্থান অধিকার করেন। প্রথম মহাযুদ্ধের সময় তিনি ছিলেন অ্যসিস্ট্যান্ট ইন্সপেক্টর অব স্কুলস ফর মোহামেডান এডুকেশন। ১৯১৭ সালে কলকাতা টিচার্স ট্রেনিং স্কুলের অধ্যক্ষ নিযুক্ত হন। ১৯২১ সালে ঢাকা মাধ্যামিক উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের সচিব নিযুক্ত এবং আমৃত্যু এই পদে বহাল ছিলেন। কাজী ইমদাদুলের জীবন ও সাহিত্য অবিচ্ছেদ্য। এই জীবনে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা তার সাহিত্যে আত্মপ্রকাশ করেছে। তৎকালীন মুসলিম সমাজে বিরাজমান সমস্যা একজন নিপুণ শিল্পীর মতো তার সাহিত্য ক্যানভাসে তুলে ধরেছেন। স্যার সৈয়দ আহম্মদ আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করে মুসলিম সম্প্রদায়কে আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত করে যুগোপযোগী করে তুলতে চেয়ে ছিলেন। আর ইমদাদুল হক মুসলিম সমাজকে এক আধুনিক ও উন্নত ব্যবস্থায় আচ্চাদিত করতে চেয়েছিলেন। কাজী ইমদাদুল হকের প্রথম উপন্যাস আব্দুল্লাহ (১৯১৮) প্রকাশিত হওয়ার সাথে সাথে সাহিত্য জগতে তার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে।

‘আবদুল্লাহ’ উপন্যাস সম্পর্কে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন:- ‘আবদুল্লাহ’ উপন্যাস পড়ে আমি খুশি হয়েছি। এই বই থেকে মুসলমানদের ঘরের কথা জানা গেল। আব্দুল্লাহ উপন্যাস পাঠে কাজী ইদাদুল হকের উদার দৃষ্টিভঙ্গি ও স্বচ্ছমানসিকতার পরিচয় পাওয়া যায়। সমাজের উঁচু-নীচু ভেদাভেদ ও কুসংস্কার দূর করে মুসলিম সমাজকে জ্ঞান-বুদ্ধি দিয়ে মুরুব্বির মতো এগিয়ে নিতে চেয়েছিলেন তিনি। এই উপন্যাসের মাধ্যমে তিনি পুরনো ধ্যান-ধারণার বিরুদ্ধে সংস্কারপতœী নতুন প্রজন্মকে মুখোমুখি দাঁড় করে পুরাতনের দুর্গ শিরে নতুনের বিজয় কেতন উড়াতে চেয়েছেন।

কাজী ইমদাদুল হক ছাত্রজীবন থেকে সাহিত্যচর্চা শুরু করেন। তার প্রথম সাহিত্যকর্ম নয়টি কবিতা সংবলিত আঁখিজল প্রকাশ হয় ১৯০০ সালে। মাদরাসার শিক্ষকতা করার সময় তার লেখা ভূগোল শিক্ষা প্রণালী প্রথম ও দ্বিতীয় ভাগ প্রকাশিত হয়। ১৯০৪ সালে মুসলিম জগতে বিজ্ঞানচর্চা ভারতী পত্রিকার প্রকাশিত হয়। ১৯১৭ সালে নবী কাহিনী এবং ১৯১৮ সালে দুই খন্ডে তার প্রবন্ধলিপি প্রকাশিত হয়। এই প্রবন্ধমালা বইয়ে ‘আলেকজান্দ্রিয়ার প্রাচন পুস্তাকাগার, আব্দুর রহমানের কীর্তি, ফ্রান্সে মুসলিম অধিকার, আলহামরা, মুসলিম, জগতের বিজ্ঞানচর্চা দেখানো হয়। এ সময় তিনি আব্দুল্লাহ উপন্যাস শুরু করেন। ৩০টি পরিচ্ছেদ লিখে তিনি পান্ডুলিপিটি মোসলেম ভারত পত্রিকায় প্রকাশের জন্য দেন এবং এগুলো ওই পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়। এরপর পত্রিকাটি বন্ধ হয়ে যায়। অবশিষ্ট ১১টি পরিচ্ছেদ তার মৃতুর পর খসড়া অবলম্বনে তার বন্ধু কাজী আনারুল কাদির লিখে শেষ করেন। ১৯৬৮ সালে কেন্দ্রীয় বাংলা উন্নয়ন বোর্ড আব্দুল কাদিরের সম্পাদনায় প্রকাশ করে কাজী ইমদাদুল হকের রচনাবলী।

কাজী ইমদাদুল হক চার ছেলে ও দুই মেয়ের জনক। ছেলেরা স্ব-স্ব কর্মক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত ছিলেন। তার মেজো ছেলে কাজী সামছুল হক ছিলেন রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর ভায়রা।

কাজী ইমদাদুল হকের জ্যেষ্ঠ ছেলে কাজী আনারুল হক বাঙালিদের মধ্যে সর্ব প্রথম পূর্ব পাকিস্তান চিফ সেক্রেটারী পদে নিয়োগ লাভ করেন। ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশ সরকার পরিবর্তনের পর তাকে রাষ্ট্রপতির উপদেষ্টা ও মন্ত্রিপরিষদের যোগদানের আমন্ত্রণ জানানো হয়। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বিচারপতি সায়েম ও বিচারপতি আব্দুস সাত্তার রাষ্ট্রপতি থাকাকালে তিনি ছয় বছর উপদেষ্টা মন্ত্রী পদে বহাল ছিলেন। অবসর গ্রহনের পরে তার দেখা ও অভিজ্ঞতা আলোকে ব্রিটিশ পাকিস্তান ও বাংলাদেশে সময়ের অনেক না জানা তথ্য আন্ডার থ্রি ফ্লাগনামক পুস্তক লিখে প্রকাশ করেন। তার আরেকখানি অমর গ্রন্থ ইন কোয়েস্ট অব ফ্রিডোম।

শিক্ষা বিভাগে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখার জন্য ব্রিটিশ সরকার তাকে ১৯২১ সালে খান সাহেব ও ১৯২৬ সালে খান বাহাদুর উপাধিতে সম্মানিত করেন। তার সুযোগ্য ছেলেরা কাজী ইমদাদুল হকের গদাইপুরের বসত বাড়িটি অসহায় কারী নূরুল ইসলামের নামে বিনামূল্যে রেজিস্ট্রি করে দেন, যা অত্র এলাকার সুধী মহলে প্রশংসিত হয়।

দেশবরেণ্য সাহিত্যিক কাজী ইমদাদুল হক আমাদের মাঝ থেকে বিদায় নিয়েছেন ১৯২৬ সালে ২০ মার্চ। তিনি ছিলেন আমাদের সাহিত্য জগতের উজ্জ্বল নক্ষত্র। তিনি আজীবন সাহিত্য সাধনা করে গেছেন। তার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা প্রদর্শন করছি। তার হৃদয়ে চির শান্তির জন্য কায়মনো বাক্য দোয়া করছি।

‘আবদুল্লাহ’ উপন্যাসটি পড়তে যিনি আমাকে সহযোগিতা করেছেন তাকে আন্তরিক ধন্যবাদ এবং কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। আমার বিশ্বাস ‘আবদুল্লাহ’ উপন্যাসটি আমার জীবনে বিশেষ তাৎপর্য বহন করবে। কারণ সুস্থ, সুন্দর ও সমৃদ্ধ জাতি গঠনে বই পড়ার কোনো বিকল্প নেই। বই মানুষের সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ ঘটায়, মননশীলতার সম্প্রসারণ ও জ্ঞানের গভীরতা বাড়ায়। তাই বড় স্বপ্ন দেখতে হলে, বড় মনের মানুষ হওয়ার জন্য সবাইকে বইয়ের সান্নিধ্যে আসতে হবে।

পরিশেষে দার্শনিক স্পেনোজা ভাষায় বলতে চাই:- ভালো খাদ্যবস্তুতে পেট ভরে, কিন্ত ভালো বই পড়া মানুষের আত্মাকে পরিতপ্ত করে। সুতরাং বই পড়–ন, নিজেকে আলোকিত করুন এবং দেশকে আলোকিত করুন।

তথ্যসূত্র : ‘কাজী ইমদাদুল হক বরেণ্য সাহিত্যিক’ রবিউল ইসলাম। দৈনিক নয়া দিগন্ত ১৪ মার্চ ২০১৪।

১৪ মার্চ ২০১৫

আরও পড়ুন



মহাকাশে কোরআন সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছেন যে নভোচারী

ইতিহাসে নাম লেখাতে যাচ্ছেন সংযুক্ত...

সাংবাদিক মঞ্জুর বাসায় সন্ত্রাসী হামলা, আহত ৪

সিলেট এক্সপ্রেস ডেস্ক: চ্যানেল এস...

মেয়র আরিফের ঈদ শুভেচ্ছা

সিলেট নগরের সর্বস্থরের নাগরিকদের প্রতি...