আনোয়ার শাহজাহান রচিত প্রামাণ্যগ্রন্থ ‘স্বাধীনতাযুদ্ধে খেতাবপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা’

প্রকাশিত : ১৯ আগস্ট, ২০২০     আপডেট : ১ মাস আগে
  • 1
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    1
    Share

সাঈদ চৌধুরী :
প্রবাসী সাংবাদিক আনোয়ার শাহজাহান একজন আত্মপ্রত্যয়ী নির্ভীক লেখক। ‘স্বাধীনতাযুদ্ধে খেতাবপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা’ শীরোনামে তার দু’খন্ডের বইটি খুবই সময়োপযোগী লেখা। আমাদের মহান স্বাধীনতা সংগ্রামে অনন্য অবদানের জন্য যাঁরা জীবন বাজি রেখে আন্দোলন-সংগ্রামে সামনের সারিতে ছিলেন, তাদের মধ্যে খেতাবপ্রাপ্ত ৬৭৬ জন বীর যোদ্ধার বীরত্বগাথা কাহিনী এটি। বইটি প্রকাশ করেছে ঢাকার বইপত্র প্রকাশন। চমৎকার প্রচ্ছদ এঁকেছেন অনন্ত আকাশ।
১৯৭৩ সালের ১৫ ডিসেম্বর প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের গেজেট নোটিফিকেশন নম্বর-৮/২৫/ডি-১/৭২-১৩৭৮ এর মাধ্যমে ৬৭৬ জন মুক্তিযোদ্ধা বিভিন্ন খেতাবে ভূষিত হন। বীরত্বসূচক খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধার মধ্যে ছিলেন ৭জন বীরশ্রেষ্ঠ, ৬৮জন বীরউত্তম, ১৭৫জন বীরবিক্রম এবং ৪২৬জন বীরপ্রতিক। প্রধানমন্ত্রী ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অনুমোদিত মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক বঙ্গবীর এমএজি ওসমানী স্বাক্ষরিত মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রকাশিত তালিকা থেকে খেতাবপ্রাপ্ত যোদ্ধাদের নাম সংগ্রহ করে বিভিন্ন সুত্র থেকে একে একে সবার পরিচিতি এবং মুক্তিযুদ্ধে তাঁদের আত্মত্যাগের বর্ণনা লিপিবদ্ধ করা হয়েছে।
নতুন প্রজন্মের সামনে এই বীরদের তুলে ধরা আমাদের জাতীয় দায়িত্ব। আত্মপ্রত্যয়ী আনোয়ার শাহজাহান সাহসী প্রয়াস চালিয়ে ঐতিহাসিক দায়িত্ব আঞ্জাম দিয়েছেন।৭৫৬ পৃষ্ঠায় দুটি খণ্ডে প্রকাশিত ‘স্বাধীনতাযুদ্ধে খেতাবপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা’ বইটির প্রথম খণ্ডে রয়েছে বীরশ্রেষ্ঠ, বীরউত্তম ও বীরবিক্রম এবং দ্বিতীয় খণ্ডে বীরপ্রতীক মুক্তিযোদ্ধাদের জীবন-বৃত্তান্ত। বইটি মৃক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিষয়ক প্রামাণ্যগ্রন্থ বা অনন্য দলিল হিসেবে বিবেচিত হবে বলে আশা করা যায়।
‘স্বাধীনতাযুদ্ধে খেতাবপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা’ বইটির ভূমিকা ও মুসাবিদা লিখেছেন মুক্তিযুদ্ধের ৩ নম্বর সেক্টর কমান্ডার মেজর জেনারেল (অব.) কে এম শফিউল্লাহ বীরউত্তম, ৪ নম্বর সেক্টর কমান্ডার মেজর জেনারেল (অব.) চিত্তরঞ্জন দত্ত বীরউত্তম এবং ৩ নম্বর সেক্টরের সাব-সেক্টর কমান্ডার মেজর জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ আজিজুর রহমান বীরউত্তম।
আনোয়ার শাহজাহান রচিত এই গ্রন্থের মূল অভিব্যক্তি হচ্ছে, আমাদের জাতীয় ইতিহাসে শ্রেষ্ঠতম অধ্যায় হলো মুক্তিযুদ্ধ এবং সে অধ্যায়টি জাতির যেসব শ্রেষ্ঠ সন্তান রচনা করেন তাঁরাই মুক্তিযোদ্ধা। ত্রিশ লাখ শহীদের রক্ত আর হাজার হাজার মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে নয় মাসে অর্জিত হয়েছিল স্বাধীনতা, জন্ম হয়েছিল স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ।
স্বাধীনতা যুদ্ধে বীরত্ব প্রদর্শনের জন্য যুদ্ধকালীন এবং পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ সরকার মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্ন ধরণের সম্মাননা প্রদান করে। সেগুলো কয়েকটি ভাগে বিভক্ত ছিল। যেমন বীরত্বসূচক খেতাব, প্রধান সেনাপতির প্রশংসাপত্র, মুক্তিযুদ্ধের স্মারক পদক এবং আহতসূচক ফিতা। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ছিল বীরত্বসূচক খেতাব। এই খেতাব হলো (গুরুত্বের ক্রমানুসারে) বীরশ্রেষ্ঠ, বীরউত্তম, বীরবিক্রম ও বীরপ্রতিক। মুক্তিযুদ্ধে যাঁরা চরম সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন, তাঁদের অবদানের জন্য এসব খেতাবে ভূষিত করা হয়। ১৯৭৩ সালের ১৫ ডিসেম্বর বাংলাদেশ গেজেটের একটি অতিরিক্ত সংখ্যায় প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এই খেতাবপ্রাপ্ত যোদ্ধাদের নাম ঘোষনা করা হয়।
‘স্বাধীনতাযুদ্ধে খেতাবপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা’ গ্রন্থের মুসাবিদায় মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার ও এস ফোর্সের প্রধান, সেক্টর কমান্ডারস ফোরামের চেয়ারম্যান সাবেক সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল কেএম শফিউল্লাহ বীর উত্তম লিখেছেন, বাংলাদেশের ইতিহাস লিখতে গেলে সবচেয়ে মহান বিষয় হলো আমাদের স্বধীনতা যুদ্ধ। যাঁরা এই মহান স্বাধীনতা অর্জনের জন্য নিজেদের জীবনের সবটুকু স্বপ্নকে বিসর্জন দিয়ে এ দেশের মানুষের জন্য, এই মাটির জন্য সর্বোচ্চ আত্মত্যাগ করলেন, তাঁদের জন্য আমরা কতটুকু করতে পেরেছি? সেই মর্মযাতনায় দগ্ধ হয়েই বোধকরি লেখক আনোয়ার শাহজাহান ‘স্বাধীনতাযুদ্ধে খেতাবপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা’ বইটি লিখতে অনুপ্রানিত হয়েছেন। হয়তো তিনি ভেবেছেন এতেও যদি কিঞ্চিৎ পরিমান ঋণ শোধ করা যায়। এর জন্য লেখককে অক্লান্ত পরিশ্রম করতে হয়েছে। দিনের পর দিন অবিরাম চেষ্টা করে তিনি বইটি সমৃদ্ধ করার চেষ্টা করেছেন এবং সফলও হয়েছেন আশা করি।
‘স্বাধীনতাযুদ্ধে খেতাবপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা’ বইটির ভূমিকায় মেজর জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ আজিজুর রহমান বীর উত্তম লিখেছেন, ইদানিং সামাজিক প্রচার মাধ্যম গুলোতে মাঝেমধ্যে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কারো কারো কাছ থেকে এমনও ভাষ্য পাওয়া যায় যে, মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে এত হইচই আর কত দিন চলবে। এবার দেশ গড়ায় মন দেয়া দরকার। মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এগুলো থেকে বেরিয়ে সামনের দিকে অগ্রসর হওয়া যাক, ইত্যাদি ইত্যাদি। তাদের এই কথাগুলো বলার কারণ, আমরা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে তাদের কাছে সঠিক ভাবে পৌছাতে পারিনি। তাদের আমরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ করতে পারিনি। এই দায় আমাদের।
আমরা যারা সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহন করেছিলাম, আমরাও আমাদের সেই বীরত্বের কাহিনী কি লিখে রেখেছি? হ্যাঁ, কেউ কেউ লিখেছেন। কিন্তু আমরা বেশির ভাগই লিখিনি। সুখের কথা যে আমরা আমাদের কাজগুলো করতে না পারলেও এই সমাজে অনেক ব্যক্তি আছেন, প্রতিষ্ঠান আছে, যাঁরা এই কাজগুলো করে যাচ্ছেন। সে জন্য বাংলাদেশ এখনো একটি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ হিসেবে বিশ্বের বুকে সগৌরবে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে। ধীরে লয়ে হলেও আমাদের দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। দেশের মানুষের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা না থাকলে তা সম্ভব হতো না। যাঁরা দেশের ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, মুক্তিযোদ্ধাদের কথা নিয়ে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন, তাঁদের একজন আনোয়ার শাহজাহান।
মুক্তিযুদ্ধের সময় ৪নং সেক্টরের সেক্টর কমান্ডারের দায়িত্বে ছিলেন মেজর জেনারেল (অব.) চিত্ত রঞ্জন দত্ত বীরউত্তম। বইটি সম্পর্কে তিনি বলেন, “স্বাধীনতাযুদ্ধে খেতাবপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা বইয়ে রয়েছে মুক্তিযোদ্ধাদের সংক্ষিপ্ত জীবনপঞ্জি, যা পড়ে ভাবীকালের প্রজন্ম উৎসাহিত হবে, মুক্তিযুদ্ধের গৌরব ও সংগ্রামের ইতিহাসের সাথে তারা পরিচিত হবে। অন্যায় ও অসত্যের কাছে, ভীরুতা ও কাপুরুষতার কাছে বাঙালি যে কখনো কোনো দিন মাথা নত করেনি, বর্তমান ও অতীতের গৌররোজ্জ্বল ইতিহাস তারই জ্বলন্ত সাক্ষী।
বাংলা একাডেমির সাবেক মহাপরিচালক বাংলা ও ফরাশি ভাষার অধ্যাপক প্রফেসর ড. মাহমুদ শাহ কোরেশী লিখেছেন, আনোয়ার শাহজাহান একজন সাহসী ও দৃঢ়প্রত্যয়ী লেখক ও গবেষক। তাঁর প্রকাশিত ৬টি বইয়ের মধ্যে একটি হচ্ছে ‘স্বাধীনতাযুদ্ধে খেতাবপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা’। মুক্তিযুদ্ধের ওপর লেখা উল্লেখযোগ্য এ বই ইতিহাসের অংশ হয়ে থাকবে। ভবিষ্যতে খেতাবপ্রাপ্ত বীরযোদ্ধাদের নিয়ে যাঁরা গবেষণা করবেন, তাঁদের কাছে মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবান এ বই রেফারেন্স হিসেবে বিবেচিত হবে।
এ পর্যন্ত উল্লিখিত বিষয়ে দু-একটি বই প্রকাশিত হলেও আনোয়ার শাহজাহান রচিত ‘স্বাধীনতাযুদ্ধে খেতাবপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা’ বইটি খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে একটি সম্পূর্ণ বই বলা যেতে পারে। বইটি ইতিহাসের এক অনন্য দলিল। মহান মুক্তিযুদ্ধের বীর সন্তানদের সাহসিকতার ইতিহাস জানতে হলে বইটি অধ্যয়ন করা প্রয়োজন। এটি আমাদের উত্তরসূরিদের জন্য এক অনবদ্য নথি হয়ে থাকবে।
বিশিষ্ট লেখক ও গবেষক ড. রেণু লুৎফার মতে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের কাহিনী সংগ্রহ করে প্রকাশ করা একটি বিরাট কর্ম। একজন প্রবাসী লেখক জাতির জন্য সেই দু:সাধ্য কাজটি করে দিয়েছেন।এবার ইতিহাস বিমুখ জাতিকে নিজেদের শিকড়ের ইতিহাস জানতে হলে গ্রন্থটিকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অর্ন্তভূক্ত করতে হবে।
আনোয়ার শাহজাহান ১৯৭৩ সালে সিলেট জেলার গোলাপগঞ্জ উপজেলার ঢাকাদক্ষিণ ইউনিয়নের রায়গড় গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা হাজী আব্দুল মুতলিব এবং মাতা আনজুমান আরা বেগম। আনোয়ার শাহজাহান ১৯৯০ সাল থেকে লেখালেখি ও সাংবাদিকতার সঙ্গে সম্পৃক্ত। ১৯৯৪ সালে গোলাপগঞ্জ প্রেসক্লাব প্রতিষ্ঠায় তার ভূমিকা অগ্রগণ্য। তিনি ক্লাবের জন্য ভূমি প্রদান ও ভবন নির্মান করে দিয়েছেন। এছাড়া তিনি গোলাপগঞ্জ ধারাবহর গ্রামে প্রতিষ্ঠা করেছেন আনোয়ার শাহজাহান প্রাথমিক বিদ্যালয়। ১৯৯৫ সাল থেকে বিলেতে এসেও সাহিত্য-সাংবাদিকতা অব্যাহত রেখেছেন। লন্ডন বাংলা প্রেসক্লাবের সক্রিয় সদস্য তিনি। ব্যক্তিগত জীবনে বিবাহিত। তার সহধর্মিণী নাসরিন শাহজাহান বিলেতে কমিউনিটি কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত। তারা দুই পুত্র ও দুই কন্যা সন্তানের জনক।


  • 1
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    1
    Share

আরও পড়ুন

নৌকার সমর্থনে ১৩নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের কর্মীসভা

         সিলেট এক্সপ্রেস ডেস্ক: আওয়ামী লীগ...

সরকারি অগ্রগামী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজে বার্ষিক মাহফিল

         সিলেট এক্সপ্রেস ডেস্ক :  প্রতি বছরের...

নূরজাহান মেমোরিয়াল মহিলা ডিগ্রি কলেজে স্বাধীনতা দিবস পালন

         সিলেট এক্সপ্রেস ডেস্ক: নূরজাহান মেমোরিয়াল...

সন্তানদেরকে কুরআন-হাদীসের শিক্ষা দিতে হবে -আল্লামা ওলীপুরী

         বিশ্বনন্দিত মুফাসসিরে কুরআন আল্লামা নূরুল...