আধুনিক বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে কৃষি নির্ভর অর্থনীতির বিকাশ ঘটাতে হবে

,
প্রকাশিত : ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৮     আপডেট : ৩ বছর আগে
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সা্ঈদ চৌধুরী :  কৃষি ব্যাংকের এমডি মো: আলী হোসেন প্রধানিয়া বলেছেন, সাধারণ কৃষকদের মাঝে ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে কৃষি ও পল্লী ঋণ নীতিমালা ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। দেশে পরিবেশ বান্ধব ও টেকসই কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে চলতি অর্থবছরে ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহন করা হয়েছে। ঋণ বিতরণের নতুন নীতিমালায় ভাসমান পদ্ধতিতে চাষাবাদ, সমন্বিত কৃষি ব্যবস্থা, টার্কি পালন সহ বেশ কিছু বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। আধুনিক বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে কৃষি নির্ভর অর্থনীতির বিকাশ ঘটাতে হবে। এজন্য সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে আমরা কাজ করছি।

১৪ সেপ্টেম্বর শুক্রবার সকালে এক্সেলসিয়র সিলেট হোটেল এন্ড রিসোর্টে অনুষ্ঠিত একান্ত আলাপচারিতায় কৃষি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো: আলী হোসেন প্রধানিয়া একথা বলেন। এসময় তার সাথে ছিলেন ব্যাংকের ডিএমডি মোহাম্মদ ফখরুল আলম, ডিএমডি ড. মো: লিয়াকত হোসেন মোড়ল, ডিএমডি মোঃ আফজাল করিম, জিএম (আইসিটি) দিলীপ কুমার ভট্টাচার্য, জিএম (সিলেট বিভাগ) মীর মোফাজ্জল হোসেন ও সিলেট কর্পোরেট ব্রাঞ্চ ম্যানেজার মো: শামসুদ্দিন।

কৃষি ব্যাংকের এমডি মো: আলী হোসেন প্রধানিয়া জানান, গত ফেব্রুয়ারি মাসে তিনি কৃষি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে যোগদান করেছেন। এর পূর্বে তিনি অগ্রণী ব্যাংকে উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৬ সালে অগ্রণী ব্যাংকে প্রবেশনারী অফিসার পদে তার ব্যাংকিং ক্যারিয়ার শুরু। বর্ণাঢ্য কর্ম জীবনে তিনি অগ্রণী ব্যাংকে শাখা ব্যবস্থাপক ও প্রধান কার্যালয়ের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি একই ব্যাংকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, ট্রেজারি, সিএএমএলসিও, বিভিন্ন সার্কেল প্রধান, জনসংযোগ ও প্রধান শাখার দায়িত্ব দক্ষতার সঙ্গে পালন করেন। তিনি ২০০৮ থেকে ২০১৪ পর্যন্ত অগ্রণী এক্সচেঞ্জ হাউস, সিঙ্গাপুরের সিইও হিসেবে দায়িত্বে থাকাকালীন ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধিতে অসাধারণ ভূমিকা পালন করেন।

বিশিষ্ট ব্যাংকার মো: আলী হোসেন প্রধানিয়া বাংলাদেশ ফরেন এক্সচেঞ্জ ডিলারস এসোসিয়েশনের (বাফেডা) টেকনিক্যাল কমিটির চেয়ারম্যান। তিনি দেশ-বিদেশে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ও সেমিনারে অংশগ্রহণ করেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। বর্তমানে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যায়ের বিজনেস স্টাডিজ অনুষদে ডক্টরেট অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশনে (ডিবিএ) অধ্যয়নরত। তিনি চাঁদপুর জেলার মতলব উপজেলায় এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।

উল্লেখ্য, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক একটি শতভাগ রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বিশেষায়িত ব্যাংক। বাংলাদেশের কৃষির মতো প্রকৃতি নির্ভর অনিশ্চিত এবং ঝুঁকিপূর্ণ খাতে অর্থায়নের জন্য ১৯৭৩ সালে প্রতিষ্ঠা করা হয় দেশের বৃহত্তম বিশেষায়িত এই ব্যাংক। আমানত, ঋণ, বৈদেশিক বানিজ্যসহ সব ধরনের আধুনিক ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনা করে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক।

চলতি অর্থবছরের কৃষি ও পল্লী ঋণ নীতিমালা ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। দেশে পরিবেশবান্ধব ও টেকসই কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক ভবনে এই ঘোষণা দেন ডেপুটি গভর্নর এস এম মনিরুজ্জামান।
চলতি (২০১৮-২০১৯) অর্থবছরে বাংলাদেশ ব্যাংক ২১ হাজার ৮শ’ কোটি টাকার কৃষিঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। যা বিগত ২০১৭-১৮ অর্থবছরের লক্ষ্য মাত্রার তুলনায় প্রায় ৬ দশমিক ৮৬ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বাণিজ্যিক ও বিশেষায়িত ব্যাংকসমূহ ৯ হাজার ৮৭৫ কোটি টাকা এবং বেসরকারি ও বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংক সমূহ ১১ হাজার ৯২৫ কোটি টাকা বিতরণ করবে।

বিগত অর্থবছরে মোট ৩৯ লাখ ৬২ হাজার ৫০৮ জন কৃষিঋণ পেয়েছেন, যার মধ্যে ব্যাংকসমূহ নিজস্ব নেটওয়ার্ক ও এমএফআই লিংকেজের মাধ্যমে ১৫ লাখ ৭৬ হাজার ১৩৭ জন নারী ৬ হাজার ৩০৯ কোটি ৫৮ লাখ টাকার কৃষিঋণ পেয়েছে। গত অর্থবছরে ৩০ লাখ ৭৩ হাজার ১৫৩ জন ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষি বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ১৫ হাজার ৯২ কোটি এবং চর, হাওর প্রভৃতি অনগ্রসর এলাকার ৮ হাজার ৩৩৯ জন কৃষক ৩০ কোটি ৪৭ লাখ টাকার কৃষিঋণ পেয়েছে।

এই নীতিমালার উল্লেখযোগ্য সংযোজিত বিষয় সমূহ হচ্ছে- ব্যাংক গুলোর বার্ষিক লক্ষ্যমাত্রার ন্যূনতম ১০ শতাংশ মৎস্য সম্পদ খাতে বিতরণের বাধ্যবাধকতা আরোপ, ভাসমান পদ্ধতিতে চাষাবাদে ঋণ প্রদান, সমন্বিত কৃষি ব্যবস্থা, টার্কি পাখি পালনে ঋণ প্রদান। এছাড়া পেন পদ্ধতিতে মাছ চাষ, শস্য বা ফসল খাতে ঋণ বিতরণের জন্য একর প্রতি ঋণসীমা যৌক্তিক পরিমাণ বৃদ্ধি, বেসরকারি ব্যাংক সমূহে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত না হলে অনর্জিত লক্ষ্যমাত্রার সমপরিমাণ অথবা বিকল্পভাবে অর্জিত লক্ষ্যমাত্রার ৩ শতাংশ হারে হিসাবায়নকৃত অর্থ বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা রাখতে হবে।

বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক কৃষিঋণ কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে দেশের সর্ববৃহৎ জাতীয় বিশেষায়িত ব্যংকিং প্রতিষ্ঠান। ১৯৭৩ সালে কৃষি উন্নয়নের জন্য বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক আদেশবলে (রাষ্ট্রপতির আদেশ নং ২৭, ১৯৭৩) একটি বিশেষায়িত সরকারি ব্যাংক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি ১৯৫২ সালে প্রতিষ্ঠিত এগ্রিকালচারাল ডেভেলপমেন্ট ফাইন্যান্স কর্পোরেশন এবং ১৯৫৭ সালে প্রতিষ্ঠিত পাকিস্তান কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক-এর সমন্বয়ে ১৯৬১ সালে প্রতিষ্ঠিত পাকিস্তান কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের উত্তরসূরি। প্রাথমিকভাবে ব্যাংকের অনুমোদিত মূলধন ৫০০ মিলিয়ন টাকা এবং পরিশোধিত মূলধন ছিল ৩৭০ মিলিয়ন টাকা। সম্পূর্ণ শেয়ারই সরকার ক্রয় করে। পরবর্তীকালে ব্যাংকিং কার্যক্রম ও ব্যবসায় বৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে এর অনুমোদিত এবং পরিশোধিত মূলধন যথাক্রমে ২ বিলিয়ন ও ১ বিলিয়ন টাকায় উন্নীত করা হয়। ২০০৮ সালে কৃষি ব্যাংকের অনুমোদিত এবং পরিশোধিত উভয় মুলধনই ৩.৫ বিলিয়ন টাকায় উন্নীত করা হয়।

গ্রাম-বাংলার অর্থনৈতিক উন্নয়নের লক্ষ্যকে সামনে রেখে কৃষির সার্বিক উন্নয়নের মাধ্যমে দেশের খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের জন্য এই ব্যাংকের সৃষ্টি। দেশে কৃষিঋণ পরিচালনা কর্মকান্ডের সিংহভাগই এককভাবে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের অবদান। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক কৃষি খাতের জন্য একটি বিশেষায়িত উন্নয়ন ব্যাংক হলেও এটি অন্যান্য বাণিজ্যিক ব্যাংকের মতো সব ধরনের ব্যাংকিং কর্মকান্ড পরিচালনা করে থাকে। কৃষিঋণ বিতরণের পাশাপাশি বৈদেশিক বিনিময় ব্যবসা, বাণিজ্যিক ও কৃষিভিত্তিক শিল্প/প্রকল্প, প্রকল্পের চলতি মূলধন, এসএমই, পাইকারি ও খুচরা ব্যবসা, মাইক্রো ক্রেডিট, কনজ্যুমার ক্রেডিট এবং দারিদ্র্য বিমোচন কর্মকান্ড ইত্যাদি খাতে এই ব্যাংক ঋণ সহায়তা প্রদান করে থাকে।

২০০৭-০৮ অর্থবছরে দুইদফা বন্যা ও ঘূর্ণিঝড় সিডরে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলিতে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের গৃহীত পুনর্বাসন কর্মসূচি সরকারসহ সকল মহলে প্রশংসিত হয়। বৈদেশিক বাণিজ্য ব্যবসার জন্য এই ব্যাংকের রয়েছে ১৫টি অনুমোদিত বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় শাখা এবং ২২৫টি বিদেশি প্রতিসঙ্গী ব্যাংক। এই শাখাগুলির মাধ্যমে ব্যাংকের সকল শাখার বৈদেশিক রেমিট্যান্সের টাকা ৩ দিনের মধ্যে গ্রাহকের নিকট পৌঁছে দেওয়া হয়। এ ব্যাংকের মোট ৮২টি শাখা ওয়ানস্টপ সার্ভিসের আওতায় আনা হয়েছে।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর সরকার বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের (বিকেবি) কার্যক্রম দেখাশোনা করার জন্য প্রশাসক নিয়োগ করে। ১৯৭৩ সালের এপ্রিলে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক আদেশ-এর শর্তানুযায়ী একজন ব্যবস্থাপনা পরিচালক ব্যাংকের সার্বিক দায়িত্ব গ্রহণ করে। ১৯৭৫ সালের মার্চে সরকার ব্যাংকের পরিচালক পর্ষদ গঠন করে এবং ১৯৮১ সালের এপ্রিলে ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদাধিকারবলে পরিচালক পর্ষদের চেয়ারম্যান নিযুক্ত হয়। ১৯৮১ সালের এপ্রিলে চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকের জন্য দুটি ভিন্ন ভিন্ন অফিস প্রতিষ্ঠা করা হয়। সরকার কর্তৃক বিকেবি-র কর্মকর্তা নন এমন একজন পরিচালককে পর্ষদের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ করা হয়। পক্ষান্তরে ব্যবস্থাপনা পরিচালককে ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী করা হয়। বর্তমানে পরিচালক পর্ষদে চেয়ারম্যানসহ মোট ১১ জন পরিচালক রয়েছে। ব্যাংকের ঢাকাস্থ প্রধান কার্যালয়ে ৭টি বিভাগ রয়েছে, যথা প্রশাসন, ঋণ, অর্থ, কার্যক্রম, পরিকল্পনা ও ঋণ আদায়, নিরীক্ষা ও পরিদর্শন এবং আন্তর্জাতিক বিভাগ। ৭টি বিভাগের প্রতিটির প্রধানের দায়িত্বে রয়েছে একজন করে মহাব্যবস্থাপক।


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আরও পড়ুন

তরুণদের জ্ঞান-বিজ্ঞান ও গবেষণার ক্ষেত্রে সমৃদ্ধ হতে হবে: বদরুল ইসলাম শোয়েব

         সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার বদরুল...

দক্ষিণ সুনামগঞ্জে ট্রাফিক সপ্তাহ পালিত হয়েছে

         সালেহ আহমদ হৃদয়, সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি...