আত্মমর্যাদাবোধ এবং বংশমর্যাদা

,
প্রকাশিত : ২৫ মার্চ, ২০১৯     আপডেট : ২ বছর আগে
  • 1
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    1
    Share

বায়েজীদ মাহমুদ ফয়সল: মানুষের আত্মমর্যাদাবোধ ম্যাজিকের ন্যায় কাজ করে।সহজ কথায়, নিজেদের সম্পর্কে আমরা যা ভাবি সেইটিই হল আত্মমর্যাদা বোধ। নিজেদের সম্পর্কে আমাদের ধারণা আমাদের সমস্ত কাজকর্মকে, পারস্পরিক সম্পর্ককে, মাতাপিতা হিসাবে আমাদের দায়িত্ববোধকে এমনকি জীবনে চরিতার্থতা লাভ পর্যন্ত সমস্ত কিছুকেই প্রভাবিত করে। উন্নত আত্মসম্মান বোধ সুখী, পরিতপ্ত এবং অভীষ্ট লাভে উদ্যোগী জীবন যাপন সম্ভব করে। নিজের যথার্থ গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন না হলে আত্মসম্মানবোধ বাড়ে না। ইতিহাসের মহান বিশ্বনেতা ও আচার্যরাও এই কথাই বলেছেন যে অন্তরের প্রেরণা ব্যতীত সফল হওয়া যায় না।আমরা অজ্ঞাতসারে নিজেদের সম্পর্কে যে সমীক্ষা করি, সেইটিই অন্যের নিকট ব্যক্ত করি এবং তারাও সেইভাবেই আমাদের প্রতি তাদের মনোভাব গড়ে তোলেন।

উন্নত আত্মমর্যাদাবোধ সম্পন্ন মানুষের বিশ্বাস যোগ্যতা ও দায়িত্ব নেয়ার ইচ্ছাও উন্নত হয়। তারা আশাবাদী, সবার সঙ্গেই সুসম্পর্ক রাখেন এবং পরিপূর্ণ জীবন যাপন করেন। তাদের থাকে কর্মপ্রেরণা ও উচ্চাশা এবং তারা সংবেদনশীলও হয় অনেক বেশি। আত্মসম্মান বোধ কাজকর্মের মানকে উন্নত করে এবং ঝুঁকি নেয়ার ক্ষমতাও বাড়িয়ে দেয়। তাদের সামনে নতুন নতুন সুযোগের সম্ভাবনার দরজা যেমন খুলে যায়, তেমনি কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হওয়ার মানসিকতাও তৈরি করে। স্বচ্ছন্দ কুশলতার সঙ্গে তারা সমালোচনা ও অভিনন্দন দুই-ই মেনে নিতে পারেন। কোন কাজটি কল্যাণকর এই বিষয়ে সচেতনতা এবং সেই কাজ সুসম্পাদন করার পরিতৃপ্তি থেকেই আত্মসম্মান বোধের জন্ম।নিজ সম্মানের প্রতি সম্মানবোধ থাকাটাই আত্মসম্মানবোধ । নিজের অবস্থান, যোগ্যতা এবং মর্যাদা অনুযায়ী নিজের সম্মান বজায় রাখা।‘আত্মমর্যাদা’ কমবেশি দুটোই ক্ষতিকর। কম হলে হীনমন্যতা ও পরশ্রীকাতরতায় ভোগে আর বেশি হলে অহংকার তৈরি হয়। আত্মসম্মান হচ্ছে মানুষের মেরুদণ্ডের মত, যেটি ছাড়া মানুষকে মানুষ বলা যায় না।

মানুষের বংশমর্যাদা

ইসলামের দৃষ্টিতে আল্লাহর নিকটে মানুষের মর্যাদার মূল ভিত্তি হল, তাকওয়া-আল্লাহভীতি ও দ্বীনদারী। বর্ণ, গোত্র-বংশ মর্যাদা, অর্থ-সম্পদ ইত্যাদি নয়। এ মর্মে আল কুরআনের নিম্নোক্ত আয়াত ও হাদীসগুলো দেখুন:

💠 আল্লাহ তাআলা বলেন :

“হে মানুষ, আমি তোমাদেরকে এক নারী ও এক পুরুষ থেকে সৃষ্টি করেছি আর তোমাদেরকে বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি। যাতে তোমরা পরস্পর পরিচিত হতে পার। তোমাদের মধ্যে আল্লাহর কাছে সেই অধিক মর্যাদাসম্পন্ন যে তোমাদের মধ্যে অধিক তাকওয়া সম্পন্ন। (সুরা আল-হুজরাত: ১৩)

💠 রাসুলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন :

“একমাত্র তাকওয়া ছাড়া অনারবীর উপর আরবের কোন শ্রেষ্ঠত্ব নেই, আরবের উপর অনারবের কোন শ্রেষ্ঠত্ব নেই,শ্বেতাঙ্গের উপর কৃষ্ণাঙ্গের কোন শ্রেষ্ঠত্ব নেই আবার কৃষ্ণাঙ্গের উপর শ্বেতাঙ্গের কোন শ্রেষ্ঠত্ব নেই।” (মুসনাদে আহমদ,ত্ববারানী..সহীহ)

💠 রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আরও সাল্লাম বলেন :

“নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের দেহ ও আকার-আকৃতি দেখেন না, বরং তিনি তোমাদের অন্তর ও আমল দেখেন।’’ (বুখারী ও মুসলিম)

💠 রাসূল (সা.) তার চাচা আব্বাস, তার মেয়ে ফাতিমা, তার বংশ বনু হাশিম এর লোকদেরকে ডেকে সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, আখিরাতে বংশীয় মর্যাদা কোন কাজে লাগবে না বরং প্রত্যেককে তার আমল অনুযায়ী বিচার করা হবে।

💠 আরবের শ্রেষ্ঠ কুরায়শ বংশের বড় বড় সাহাবীর তুলনায় একজন কালো গোলাম বিলাল হাবাশী (রা.) যায়েদ বিন হারেসা (রা.) প্রমুখকে যে সম্মান দেয়া হয়েছে তা নজির বিহীন।

💠 ইসলামের ইতিহাস পড়লে এমন অনেক কৃতদাসের সন্ধান পাওয়া যায় যারা হাদীস, ফিকহ, তাফসীর ইত্যাদি ইলামের বিভিন্ন শাখায় শ্রেষ্ঠত্বের আসন আলংকৃত করেছেন এবং যারা যুগ পরম্পরায় মানব জাতির অনুসরণীয় ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়েছেন।

বিয়ের ক্ষেত্রে বংশ মর্যাদা :

বিয়ের ক্ষেত্রে বংশ মর্যাদা নয় বরং বংশীয় সমতার কথা এসেছে- যাকে বলা হয় কুফু। অর্থাৎ স্বামী এবং স্ত্রী যদি বংশ মর্যদার দিক দিয়ে সমপর্যায়ের হয় তাহলে তা উভয়ের মাঝে সমঝোতা ভালো হয়-যদিও তা আবশ্যক নয়।

আর হাদীসে বলা হয়েছে :

“মহিলাকে চারটি দিক দেখে বিয়ে করা হয়। যথা বংশ মর্যাদা, সৌন্দর্য, অর্থ-সম্পদ এবং দ্বীনদারী। অত:এব তুমি দ্বীনদারী নারীকে বিয়ে করে সফল হয়ে যাও…। (বুখারী ও মুসলিম)

এ হাদীসে উক্ত বিষয়গুলোকে দেখে বিয়ে করতে উৎসাহিত করা হয় নি বা বিয়ের ক্ষেত্রে বংশ মর্যাদাকে মানদণ্ড ধরা হয় নিবরং এখানে মানুষের সাধারণ আচরণ সম্পর্কে বলা হয়েছে। অর্থাৎ সমাজের মানুষ সাধারণত: এ চারটি দিক দেখে বিয়ে করে কিন্তু আমাদেরকে এগুলোর মধ্য থেকে দ্বীনদারী দেখে বিয়ে করার প্রতি উৎসাহিত করেছে। মোটকথা ইসলাম ভাষা, বর্ণ, গোত্র, বংশ আভিজাত্য ইত্যাদি অহংকারকে ধ্বংস করে কেবল তাকওয়া, দ্বীনদারী ও যোগ্যতাকে মর্যাদার মাপকাঠি হিসেবে নির্ধারণ করেছে।

বংশ এবং বর্ণের জন্য মানুষের মধ্যে পার্থক্য হওয়ার কোন সুযোগ ইসলামে নেই। ইসলামে মর্যাদা বৃদ্ধি বা কমতি হয় তাকওয়া বা আল্লহ ভীতির উপর ভিত্তি করে। তাই যদি না হত তাহলে চেহারার কারণে প্রথমেই ইসলাম থেকে বাদ পরতেন হযরত বিলাল (রা.) । অথচ রসুল সল্লাল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মিরাজে গিয়েও বিলাল (রা.) -এর খড়মের আওয়াজ শুনতে পেয়েছিলেন।

বর্তমানে আমরা নামের শেষে যে উপাধি দেখতে পাই, তার রহস্য না জানা থাকার কারণে অনেকের কাছে নিজের বংশের খুব গর্ব করতে দেখা যায়। এই উপাধি সমূহ আমাদের পূর্ব পুরুষগন আদি অবস্থায় থেকে নিয়ে আসেনি। ইতিহাসের তথ্যানুসারে বাংলার সুলতান শের শাহ যখন ক্ষমতায় ছিলেন তখন তার রাজ্যের কর বা খাজনা উঠানো থেকে শুরু করে বিভিন্ন দায়িত্ব পালনের জন্য বিভিন্ন উপাধি দিয়েছিলেন। সম্রাট আলমগিরের সময় পর্যন্তও কিছু নতুন উপাধি সংযোজনা করা হয়। পরবর্তী পর্যায়ে আমরা যারা তাদের সন্তান, তারা সে উপাধি নিয়েই অহংকারে ব্যস্ত আছি। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় যে,বর্তমান সময়ের চৌকিদার, দফাদার, তহশিলদার, নায়েব, মেম্বার, চেয়ারম্যান যেমন সরকারের দেয় একপ্রকার দায়িত্বপ্রাপ্ত উপাধি। আর বর্তমানে আমরা নামের পরে যে সকল উপাধি ব্যবহার করি, যেমন : চৌধুরী, পাটোয়ারী, মুকাদ্দম, খান, মণ্ডল ইত্যাদি। সেগুলোও ছিল তদানীন্তন সময়ের জন্য বিভিন্ন রাজ-রাজাদের দেয় উপাধি। আর এই উপাধিগুলো কেবল ভারত উপ মহাদেশেই সীমাবদ্ধ। যারা উচ্চ শ্রেণীর ইতিহাস পড়েছেন, তারা প্রত্যেকেই বিষয় গুলো ভাল করেই জানেন (কৌতূহলী ব্যক্তিগন ইতিহাসের অধ্যাপকদের কাছে জিজ্ঞাসা করতে পারেন)। যার কারণে আমরা আরব দেশ সমূহের কারো নামের পিছনে এই ধরনের কোন প্রকার উপাধি সংযোজনা দেখতে পাই না। রসুল (সা.)-এর এক বংশের নাম ছিল কুরাইশ বংশ। কুরাইশ ছিল তার পিতৃবংশের একজনের নাম। যেমন : মুহাম্মদ বিন আব্দুল্লাহ বিন আব্দুল মুত্তালিব, বিন কুরাইশ বিন হাশেম। তাহলে আমরা যে বংশীয় মর্যাদা নিয়ে এত অহংকার করি,সেই নামে কি আমাদের পিতৃবংশের কেউ ছিল? অবশ্যই-না! তাহলে আমাদের এত অহংকার কেন?

মধ্যযুগে সামন্তবাদী সমাজ ব্যবস্থার ফলে পরবর্তীতে বৃটিশ আমলে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সমান্তরালে বাঙালির পদবীর বিকাশ ঘটেছে বলে মনে করা হয়। অধিকাংশ ব্যক্তি নামের শেষে একটি পদবী নামক পুচ্ছ যুক্ত হয়ে আছে। যেমন উপাধি, উপনাম কিংবা বংশসূচক নামকে সাধারণ ভাবে পদবী বলা হয়।বাঙালির জমি- জমা বিষয় সংক্রান্ত কিছু পদবী যেমন- হালদার, মজুমদার, তালুকদার, পোদ্দার,সরদার, প্রামাণিক, হাজরা, হাজারী, মন্ডল, মোড়ল, মল্লিক, সরকার, বিশ্বাস ইত্যাদি বংশ পদবীর রয়েছে হিন্দু -মুসলমান নির্বিশেষে সকল সম্প্রদায়ের একান্ত রূপ। বাঙালি মুসলমানের শিক্ষক পেশার পদবী হলো-খন্দকার, আকন্দ, নিয়াজী ইত্যাদি। আর বাঙালি হিন্দুর শিক্ষক পদবী হচ্ছে : দ্বিবেদী, ত্রিবেদী, চর্তুবেদী ইত্যাদি।
এবার আপনাদের জানাবো বাঙালির কিছু বিখ্যাত বংশ পদবীর ইতিহাস। যেমন-শিকদার, সৈয়দ, শেখ,মীর, মিঞা, মোল্লা, দাস, খন্দকার, আকন্দ, চৌধুরী, ভুইয়া, মজুমদার, তরফদার, তালুকদার, সরকার,মল্লিক, মন্ডল, পন্নী, ফকির, আনসারী, দত্ত ইত্যাদি।

শিকদার : সুলতানি আমলে কয়েকটি মহাল নিয়ে গঠিত ছিল এক একটি শিক। আরবি শিক হলো একটি খন্ড এলাকা বা বিভাগ। এর সাথে ফারসি দার যুক্ত হয়ে শিকদার বা সিকদার শব্দের উদ্ভব হয়েছে। এরা ছিলেন রাজস্ব আদায়কারী রাজকর্মচারী। শব্দকোষে যাকে বলা হয়েছে শান্তিরক্ষক কর্মচারী। এরা শিক বন্দুক বা ছড়ি বন্দুক ব্যবহার করতো বলে শিকদার উপাধী পেয়েছিল; সেই থেকে বংশ পরমপরায় শিকদার পদবীর বিকাশ ঘটে।

সৈয়দ : সৈয়দ পদবী মূলত এসেছে নবী নন্দিনী হযরত ফাতেমা ও হযরত আলীর(রা.)-এর বংশ ধর থেকে। প্রায় দেড় হাজার বছর আগের এই বংশের সাথে কোনা যোগসূত্র না থাকলেও বাংলাদেশের অনেক মুসলমান পরিবার সৈয়দ বংশ পদবী ব্যবহার করে নিজেদের সম্ভ্রান্ত ও কুলীন মুসলমান বলে দাবি করে থাকেন। বাঙালি মুসলমান সমাজে সৈয়দ পদবীর অপব্যবহার ও পক্ষেপণ ঘটেছে সবচেয়ে বেশি। প্রকৃত পক্ষে সৈয়দ নন এবং পারিবারিক কোন কুলীন পদবীও নেই, অথবা পূর্ব পদবী ঐতিহ্য পরিত্যাগ করতে ইচ্ছুক এমন অনেক বংশ গোষ্ঠী বা ব্যক্তি বিশেষে বাংলাদেশে সৈয়দ পদবী আরোপিতভাবে ব্যবহার শুরু করেছিলেন।

শেখ : শেখ আরবি থেকে আগত পদবী। সম্ভ্রান্ত মুসলমানদের সম্মানসূচক বংশ পদবী শেখ। যিনি সম্মানিত বৃদ্ধ অথবা যিনি গোত্র প্রধান, তাকেই বলা হতো শেখ। হযরত মোহাম্মদ (সা.) সরাসরি যাকে বা যাঁদের ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত করেছিলেন, তিনি বা তার বংশ ধরও শেখ নামে অভিষিক্ত হতেন অথবা শেখ পদবী লাভ করতেন। বাঙালি মুসলমান সমাজে যারা শেখ পদবী ধারণ করেন, তারা এরকম ধারণা পোষণ করেন না যে, তারা বা তাদের পূর্ব পুরুষরা এসেছিলেন সৌদী আরব থেকে। বাঙালি সৈয়দ পদবী ধারীদের থেকে শেখ পদবীধারীদের এখানে একটা মৌলিক তাৎপর্যগত পার্থক্য রয়েছে। শেখ পদবী গ্রহণের নেপথ্যে রয়েছে ঐ পূর্বোক্ত চেতনা। নবীর হাতে মুসলমান না হলেও বাংলায় ইসলাম ধর্ম আর্বিভাবের সাথে সাথে যারা নতুন ধর্মকে গ্রহণ করে নেন; নও মুসলমান’ হিসেবে প্রাচীন ও মধ্যযুগে তারাই শেখ পদবী ধারণ করেছিলেন। পরবর্তীকালে তাদের বংশের উত্তর সূরীরাই শেখ পদবী ব্যবহার করে এসেছেন। এমনিতে অন্য ধর্মের লোকের কাছে মুসলমান মানেই শেখ বা সেক। কেউ কেই শেখ কেউ সেক কিংবা কেউ বা শেখ এর রূপান্তর শাইখও ব্যবহার করে থাকেন।

মীর: মির বা মীর শব্দটি এসেছে আরবি থেকে। আরবি শব্দ আমীর’ এর সংক্ষিপ্ত রূপ হচ্ছে মীর। সেই অর্থে মীর অর্থ দলপতি বা নেতা, প্রধান ব্যক্তি, সরদার ইত্যাদি। জিতে নেয়া বা জয়ী হওয়া অর্থে মীর শব্দের ব্যবহার হতো। তবে মীর বংশীয় লোককে সম্ভ্রান্ত এবং সৈয়দ বংশীয় পদবীধারীর একটি শাখা বলে গাবেষকরা মনে করেন।

মিঞা : মিঞা মুসলিম উচ্চ পদস্থ সামাজিক ব্যক্তিকে সম্বোধন করার জন্য ব্যবহৃত সম্ভ্রম সূচক শব্দ।এক অর্থে সকল মুসলমানের পদবীই হচ্ছে মিঞা। বাঙালি হিন্দুর মহাশয়’ এর পরিবর্তে বাঙালি মুসলমান মিয়া শব্দ ব্যবহার করে থাকে। মিঞা’ শব্দটি এসেছে ফারসি ভাষা থেকে। প্রভু বা প্রধান ব্যক্তি বুঝাতেও মিয়া শব্দের প্রয়োগ করা হয়ে থাকে। তবে গ্রামীন প্রধান বা সর্দার অর্থের মিঞা পদবী হিসেবে বাঙালি মুসলমান সমাজে ঠাঁই পেয়েছে।

মোল্লা : মোল্লা এবং মুন্সী বাঙালির দুটো জনপ্রিয় পদবী। তাদের প্রসার প্রায় দেশব্যাপী। বঙ্গীয় শব্দকোষ এ মোল্লা শব্দের অর্থ করা হয়েছে মুসলমান পুরোহিত। বস্তুত এভাবে মসজিদে নামাজ পরিচালনার কারনেও অনেকে মোল্লা উপাধি পেয়েছিল। প্রকৃত পক্ষে, মোল্লা হচ্ছে তুর্কি ও আরবি ভাষার মোল্লা থেকে আগত একটি শব্দ যার আভিধানিক অর্থ হচ্ছে পরিপূর্ণ জ্ঞান বিশিষ্ট মহাপন্ডিত ব্যক্তি। অন্য অর্থে মুসলিম পন্ডিত বা ব্যবস্থাপক বা অধ্যাপক হলেন মোল্লা। পরবর্তী কালে মসজিদে নামাজ পরিচারলনাকারী মাত্রই মোল্লা নামে অভিহিত হতে থাকে। এখান থেকেই সাধারণত বংশ পদবী হিসেবে তা ব্যবস্থার হওয়া শুরু হয়। তাঁরা সকল জ্ঞানের জ্ঞানী না হওয়া সত্ত্বেও মোল্লা পদবী ধারণ করে। যার ফলে মোল্লার দৌড় মসজিদ পর্যন্ত’ প্রবাদের উৎপত্তি হয়েছে।

দাস : বাঙালি হিন্দু সমাজে দাস বা দাশ বংশ পদবীর ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে। যে সমস্ত হিন্দু সম্পদায়ের মানুষ পদবীতে দাশ লিখেন তাদের পেশা ধীবর থেকে এসেছে বলে গবেষকরা মনে করেন। আর যারা দাস লেখেন তাদের পদবী স্রষ্টার ভূত্য চেতনা থেকে এসেছেন।

খন্দকার : মুসলিম সমাজের ফারসি শিক্ষক হিসেবে খোন্দকার বা খন্দকারের পরিচয় পাওয়া যায় । অন্য দিকে খোন্দকারের ‘ পদবী এসেছে সামন্ত সমাজ থেকে পেশাজীবী হিসেবে। সাধারণ ভাবে খোন্দকার বা খন্দকার অর্থ হচ্ছে কৃষক বা চাষাবাদকারী । মনে করা হয় ফারসি কনদহ ‘ এর যার অর্থ কৃষি’সাথেকার যুক্ত হয়ে কনদহকার> খনদহকার>খন্দকার হয়েছে। ভিন্ন মতে, খন্দকারের মূল উৎপত্তি সংস্কৃত কন্দ> খন্দ যার অর্থ ফসল বলা হয়েছে। এই খন্দ এর সাথে কার যুক্ত হয়েও খন্দকার>খোন্দকার হতে পারে। এবং এতেও পূর্বের খন্দকার’ শব্দের উৎসের অর্থের তারতম্য ঘটছে না। আবার ফারসি ভাষায়, খোন্দকার বলে একটি শব্দ আছে যার অর্থ শিক্ষক। সেখান থেকেও খোন্দকার পদবী আসা বিচিত্র কিছু নয়। অথবা খোন্দকার শব্দের যে ভিন্নভিন্ন অর্থ তার সবগুলো মিলিত তাৎপর্য থেকেই বিভিন্নভাবে খন্দকার পদবীর উৎপত্তি হয়েছে।

আখন্দ : খন্দকার ও আখন্দ বা আকন সমার্থক। আখন্দ ও আকন নামে যে সব পদবী তাও সম্ভবত খন্দকার পদবীরই রূপভেদ। খন্দকার>আখন্দ> আকন হয়ে থাকতে পারে। আবার ফারসি আখুন্দ থেকেও আখন্দ এসে থাকতে পারে। যার অর্থ শিক্ষক। তবে আকন্দ এসেছে আখন্দ থেকেই।

চৌধুরী : সংস্কৃত চতুধারী শব্দ থেকে এসেছে বাংলা চৌধুরী শব্দ। এর অর্থ চর্তুসীমানার অন্তগর্ত অঞ্চলের শাসক। বাংলাদেশের বেশির ভাগ জমিদারদের পদবী হচ্ছে চৌধুরী। আবার অনেকে মনে করেন চৌথহারী’ যার অর্থ এক চতুথাংশ রাজস্ব আদায়কারী, সেখান থেকে উচ্চারণ পরিবর্তনের মাধ্যমে এসেছে চৌধুরী’। সেদিক থেকে চৌথ আদায়কারী বা রাজস্ব আদায়কারী পদ সৃষ্টি হয়েছিল বাংলার রাষ্ট্র ব্যবস্থার। বঙ্গীয় শব্দকোষ বলছে, চতুর’ যার অর্থ তাকিয়া বা মসনদ, তার সাথে যুক্ত হয়েছে ধর’ (অর্থ ধারক) এবং এই দুয়ে মিলে হয়েছে চৌধরী’ আর তার থেকেই চৌধুরী’। তবে তা মূলত হিন্দী ও মারাঠি শব্দ। জাতি ধর্ম নির্বিশেষে চৌধুরী বংশ পদবী ব্যবহার করা হয় এদেশে। বৃটিশ-ভারতের প্রায় সর্বত্র এ পদবীর অস্তিত্ব ছিল। কারণ চৌধুরী ছিল সামন্ত রাজার পদবী।

ভূঁইয়া : এই বংশ পদবীটি এসেছে খোদ ভূমির মালিকানা অর্থ থেকে। বাঙালি হিন্দু-মুসলিম উভয় এর মধ্যে এ পদবীর প্রচলন আছে। বাঙালি হিন্দু সমাজে যাঁরাই ভৌমিক’ বাঙালি মুসলমান সমাজে তারা ভূঁইয়া’ হিসেবে পদবী ধারণ করেছেন। মূল সংস্কৃত শব্দ ভৌমিক > (প্রাকৃত) ভূমিকা > (বাংলা) ভূঁইয়া> থেকে ভূঁইয়া বা ভূঁঞা এসেছে। প্রাচীন বড় জমিদার বা সামন্ত রাজার উপাধিও ছিল ভূঁইয়া। প্রকৃত পক্ষে কুলীন বংশ পদবীই ছিল তা। আবার যে সব মানুষ আগে স্থান বিশেষে বনজঙ্গল পরিষ্কার করে বসতি ও চাষাবাদের পত্তন করেছে তারা স্থানীয় জমিদার রাজার কাছ থেকে ভূঁইয়া নামে অভিহিত হয়ে ঐসব জমি জমার স্বত্ব লাভ করেছে।
মজুমদারঃ মজুমদার’ পদবী মূল আসলে মজুনদার’। এর মূল ফারসি শব্দ হচ্ছে মজমু আনদার’। রাষ্ট্রের ও জমিদারির দলিল পত্রাদির রক্ষক রাজকর্মচারীর জন্যে এই পদবী সংরক্ষিত ছিল। হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে সমগ্র বাংলাদেশে মজুমদার’ পদবীর ব্যবহার লক্ষনীয়।

তরফদার : আরবি তরফ’ এবং ফারসি দার’ মিলে তরফদার শব্দের সৃষ্টি। রাজ্যের খাজনা আদায়ের মহালে তদারককারী বা খাজনা আদায়কারীর উপাধী ছিল তরফদার। এই পদবী ব্যবহারকারী গোষ্ঠীর পূর্ব পুরুষরা রাজকার্য পরিচালনার কাজে নিয়োজিত ছিলেন, সেখান থেকেই এই বংশ পদবী উৎপত্তি ও প্রচলন। অন্যমতে তরফদার তরফের রাজস্ব আদায়কারী লোক; তরফের মালিক; পদবী বিশেষ।
তালুকদার : আমাদের দেশে পরিচিত একটি বংশ পদবী। বাংলাদেশে জমিদারির পরই তালুক ভূ-সম্পত্তির একটি বিভাগ। মোগল ও বৃটিশ আমলে রাজস্ব ও ভুমি সংক্রান্ত বিষয়াদি থেকে যে সমস্ত পদবীর উৎপত্তি ও বিস্তার তার মধ্যে তালুকদার’ হচ্ছে অন্যতম পদবী। তালুক’ শব্দ থেকেও এই পদবীর মর্মাথ উপলব্ধি করা সম্ভব। আরবি শব্দ তা’ আল্লুক’ যার অর্থ ভূ-সম্পত্তি এবং এর সাথে ফারসি দার’ যুক্ত হয়ে (তা’আল্লুক+দার) তালুকদার’ শব্দের উৎপত্তি হয়েছে। প্রকৃত পক্ষে, যিনি তালুকদার, তিনি জমি ও ক্ষুদ্র ভূ-সম্পত্তি বন্দোবস্ত নিতেন সরকারের কাছ থেকেও যেমন, তেমনি জমিদারের কাছে থেকেও। ফলে তিনি হতেন উপজমিদার সেই অর্থেই এসেছে তালুকদার’।

সরকার : সরকার’ শব্দটি ফারসি থেকে আগত। এর অর্থ প্রভূ, মালিক, ভূস্বামী, শাসনকর্তা, রাজা। অর্থ আদায় ও ব্যয় সংক্রান্ত কর্মচারি ও সরকার। মোগল আমলে এদেশের স্থানীয় রাজকর্মচারিদের এ পদবী দেয়া হতো। মোট কথা প্রধান কর্মচারি এবং সম্পত্তি দেখাশুনার কাজে নিয়োজিত ব্যক্তিকে সরকার বলা হতো। বাঙালি হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যেই এ পদবীর ব্যবহার আছে।

মল্লিক : আরবি মালিক’ বা মলিক’ শব্দ থেকে এসেছে মল্লিক’ বংশ পদবী। ফারসি মালিক শব্দজাত মল্লিক ভূম্যাধিকারী বা জোতদারের উপাধি। গ্রাম প্রধান বা সমাজের প্রধান ব্যক্তি মালিক। আবার লিপিকুশল রাজকর্মচারিকে মোগল আমলে মল্লিক বা সুলেখক আখ্যা দেয়া হত বলেও আমরা জানতে পারি। হয়তোবা সেই থেকে মল্লিক বংশ পদবী এসেছে।

মন্ডল : বাঙালি হিন্দু-মুসলিম সমাজে সমান ভাবে ব্যবহৃত হয় মন্ডল পদবী। বাংলাদেশে অতীত কাল থেকে গ্রামের অনানুষ্ঠানিক এবং সাধারণ ভাবে গ্রাম- প্রধানকে বলা হয় মন্ডল। বাংলা মন্ডলরা আগে অত্যন্ত প্রভাবশালী ব্যক্তি ছিলেন। মন্ডলীয় কাজ করে তারা অনেক অধিকার ভোগ করতেন। খাজনা আদায়কারী ও রায়তদের মধ্যস্থতা করা কিংবা গ্রামীন বিবাদ আপোস মীমাংসা করতে মন্ডলরা কার্যকরী ভূমিকা পালন করতেন। কোন কোন সময় তাদের অধীনে পাটোয়ারি, তহসিলদার, চৌকিদার ইত্যাদি কর্মচারী কাজ করতেন। সরকার ও রায়তদের মধ্যবর্তী মানুষ হিসেবে মন্ডলরা অধিক পরিচিত ছিল।

ফকির : মুসলমানদের মধ্যে সন্ন্যাসবৃত্তি’ থেকেই এসেছে ফকির’ পদবী। মরমী সাধকরা গ্রহণ করতেন ফকির’ পদবী। এটি আরবি শব্দ, যার মূল অর্থ নি:স্ব। আবার আরবি ফকর শব্দের অর্থ দারিদ্র। এ থেকে ফকির শব্দের উৎপত্তি। ফকির এবং পার্শি দরবেশ ব্যক্তিগণ সাধারণত এদেশে ফকির নামে পরিচিত। বিশেষ কোন ধর্ম মতের একান্ত অনুসারী না হয়ে যারা সকল ধর্মের মূলনীতি নিয়ে আত্মতত্ত্বের সন্ধান করেন তাদেরকেও ফকির বলা হয়। আবার সুফি বা বাউল তত্বের ধারকরাও ফকির।

ঠাকুর : বাংলা শব্দের বিশেষজ্ঞ হরিচরণ বন্দ্যোপধ্যায়ের মতে- ঠাকুর শব্দের মূল হচ্ছে (সংস্কৃত) ঠাক্কুর’ তার থেকে > (প্রকৃত) ঠকুর > (বাংলা) ঠাকুর এসেছে। পদবীগত দিক থেকে তা ব্রাক্ষণের পদবী বিশেষ, এমনকি ক্ষত্রিয়েরও উপাধি এটি। মধ্য যুগের কাব্য চৈতন্য ভাগবত’ উদ্ধৃত করে লেখক বলেছেন, তা বৈঞ্চবেরও উপাধি। যেমন, হরিদাস ঠাকুর। পাচক ব্রাক্ষণও এক প্রকার ঠাকুর বলে পরিচিত। তবে আহমদ শরীফ সম্পাদিত সংক্ষিপ্ত বাংলা অভিধান’ বলছে, সংস্কৃত ঠক্কুর থেকে ঠাকুর আসলেও এর মূলে ছিল তুর্কী শব্দ। বাঙালি হিন্দু-মুসলমান উভয়েই এই পদবী ব্যবহার করে।এরকম শতাধিক বংশ পদবী রয়েছে আমাদের দেশে। বাঙালির পদবীর ইতিহাস বৈচিত্র পথ ও মতের এক অসাধারণ স্মারক হিসেবে চিহিৃত।

এছাড়াও মানুষ বহু বর্ণ গোত্র ও জাতিতে বিভক্ত। কিন্তু মানুষের মূল এক ও অভিন্ন। মানুষের মর্যাদা তার কাজ ও মানসিকতার ওপর নির্ভর করে। মানুষের বর্ণ ভাষা, স্বভাব, চরিত্র, প্রতিভা ও যোগ্যতা একটা সৃষ্টিগত বৈশিষ্ট্য। এগুলোর কোনো মূল্য আল্লাহ তাআলার কাছে নেই।আল্লাহ তাআলার কাছে মানুষের মর্যাদা ও উৎকৃষ্টতার মাপকাঠি বংশ, গোত্র ও আভিজাত্য নয় বরং মানুষের মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি হলো তাকওয়া বা পরহেজগারি। যে ব্যক্তি আল্লাহকে বেশি ভয় করে; আল্লাহর দরবারে মানুষের মর্যাদাও ততবেশি। আর আল্লাহর কাছে যার মর্যাদা বেশি, দুনিয়া ও পরকালেও তার মর্যাদা বেশি।আল্লাহ তাআলার দৃষ্টিতে একটি মাত্র উপাদান রয়েছে। যা দ্বারা মানুষের মানুষের মান-মর্যাদা পরিমাপ করা যায়; মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। যে মাপকাঠি আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ঘোষণা করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন-

‘তোমাদের মধ্যে সে ব্যক্তিই আল্লাহর কাছে অধিক মর্যাদাবান; যে অধিক মুত্তাকি বা আল্লাহ ভিরু।’ (সুরা হুজরাত : আয়াত ১৩)

‘পাথেয় সংগ্রহ কর। আত্মসংযম (তাকওয়া) শ্রেষ্ট পাথেয়। (সুরা বাকারা : আয়াত ১৯৭)

সুতরাং যে যাই বলুক না কেন, আল্লাহর কাছে যে ব্যক্তি সম্মানিত সেই ব্যক্তি মানুষের মাঝে সর্বাধিক সম্মানিত ও সৎ। কেননা আল্লাহ তাআলা মানুষকে জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার দ্বারা পরিমাপ করেন না। বরং তিনি মানুষের তাকওয়া বা তার ভয়ের দ্বারা মানুষের মর্যাদা নির্ণয় করেন।দুনিয়ার চাক-চিক্যময় জীবন-যাপন দেখে যারা আল্লাহর বিধান অমান্য করে। তাদের জন্য রয়েছে সীমাহীন দুঃখ-দুর্দশা। সফলতা রয়েছে তাদের জন্য যারা আল্লাহ তাআলাকে দুনিয়ার জীবনের প্রতিটি কথা, কাজ ও হুকুম-আহকাম পালনের ব্যাপারে ভয় করে।

লেখক : প্রবন্ধিক প্রকাশক ও সংগঠক।


  • 1
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    1
    Share

আরও পড়ুন

আরও ২ করোনা রোগী শনাক্ত

         দেশে নতুন করে আরও দুই...

পুলিশ এর উদ্যোগে ইফতার মাহফিল অনুষ্ঠিত

         জুড়ী এসোসিয়েশন সিলেট অব পুলিশ...