আজিজ আহমদ সেলিম- কত কথা কত স্মৃতি

,
প্রকাশিত : ১৯ অক্টোবর, ২০২০     আপডেট : ১ মাস আগে
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

মিলু কাশেম:
আমার অগ্রজ প্রতিম বন্ধু সাংবাদিক ছড়াকার আজিজ আহমদ সেলিম আমাদের প্রিয় সেলিম ভাই আর আমাদের মধ্যে নেই। গতকাল তিনি চিকিৎসাধিন
অবস্থায় ইন্তেকাল করেছেন।সেলিম ভাইয়ের সাথে আমার দীর্ঘদিনের জানাশোনা সম্পর্ক।তার স্মৃতির
প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে আমার এই সামান্য স্মৃতিচারন।
আজিজ আহমদ সেলিম বয়সে আমার অগ্রজ হলেও
সম্পর্ক ছিলো বন্ধুর মত।আমার কিছু অগ্রজ বন্ধু আছেন যাদের প্রতি আমার রয়েছে প্রগাঢ় শ্রদ্ধাবোধ
ভালোবাসা কিন্তু আমাদের সম্পর্ক বন্ধুত্বের বন্ধনে
বাঁধা।তাদের অন্যতম আজিজ আহমদ সেলিম।আমি
তাকে সেলিম ভাই ডাকতাম।তার সাথে পরিচয় আমার
অর্ধ শতাব্দির।আমরা একই এলাকার বাসিন্দা।তাই
সেই কিশোর বয়স থেকেই জানাশোনা। তার দাদা বাবা চাচাদের সাথে আমার বাবার ছিল ঘনিষ্ঠতা। সেই সুবাদে একটা পারিবারিক সম্পর্ক ছিল আমাদের।
কিশোর বয়সে তাদের পৈতৃক বাড়ীর মাঠে আমরা এক
সাথে খেলাধুলা বিভিন্ন অনুষ্ঠান করেছি।
আজিজ আহমদ সেলিম বয়সে আমার বড় হলেও লেখালেখিতে আমরা সমসাময়িক।১৯৭৩ সালে সিলেটের সাপ্তাহিক যুগভেরী তে চালু হয় ছোটদের পাতা শাপলার মেলা।শাপলার মেলার পরিচালক ছিলেন সাংবাদিক অজয় পাল।যুগভেরী অফিস ছিল
আমাদের বড় বাজার এলাকার প্রবেশ মুখে আম্বরখানা
ইলেক্টিক সাপ্লাই রোডে।আমি মাঝে মাঝে লেখা নিয়ে
যুগভেরীতে যেতাম।এভাবেই আমার যুগভেরীর মাধ্যমে পরিচয় হয় সাংবাদিক অজয় পাল মাহবুবুর রহমান
কবি দিলওয়ার প্রমুখের সঙ্গে।এক সময় অজয় দা জাতীয় দৈনিক বাংলার বানীর দায়িত্ব নিয়ে যুগভেরী ছেড়ে দিলেন।যুগভেরীর দায়িত্ব পেলেন মাহবুবুর রহমান।তার সহকর্মী হিসাবে তখন ছিলেন বুদ্ধদেব
চৌধুরী, তুষার কর,বিদ্যুৎ কর, গিয়াস উদ্দিন আউয়াল প্রমুখ। লেখালেখির সুবাদে আমিও যাই। একদিন গিয়ে দেখি আজিজ আহমদ সেলিমও সেখানে বসা।মাহবুব ভাইয়ের কাছ থেকে জানলাম সেলিম ভাইও যুগভেরীতে যোগ দিয়েছেন।
তারপর একদিন মাহবুব ভাই বললেল শাপলার মেলাকে নিয়ে তার চিন্তাধারার কথা।সেলিম ভাই সহ আমরা সবাই তাকে সাপোর্ট দিলাম।শুরু হলো যুগভেরীর শাপলার মেলাকে ঘিরে শিশু কিশোরদের পথচলা।
আমাদের সাথে যুক্ত হলো আমাদের বড় বাজার এলাকার আরেকজন নুরুজ্জামান মনি আর চৌকিদেখি এলাকার আমার কাজিন সৈয়দ নাহাশ পাশা।সেলিম ভাইয়ের ডিউটি শেষে আমরা যুগভেরীতে
নিয়মিত আড্ডা দিতাম।আলাপ আলোচনা করতাম
শিল্প সাহিত্য নিয়ে।মাহবুব ভাইয়ের উৎসাহ উদ্দীপনায়
শাপলার মেলার নিয়মিত সাহিত্য আসর চালু হলো। যুগভেরী অফিসে এসব অনুষ্ঠানে বিভিন্ন স্থান থেকে লিখিয়ে বন্ধুরা অংশ নিতো। কবি দিলওয়ার সহ অনেক অতিথিদের অংশ গ্রহনে অনুষ্ঠানগুলো প্রাণবন্ত হয়ে উঠতো।সেলিম মনি নাহাস হানিফ সহ আমরা
নেপথ্যে কাজ করতাম।যুগভেরীর বিভিন্ন অনুষ্ঠানের
ব্যাপারে সম্পাদক আমীনুর রশিদ চৌধুরীর সাথে
আলাপ করতে মাহবুব ভাই আমাকে আর সেলিম ভাই কে পাঠাতেন।চৌধুরী সাহেব ফ্রি থাকলে আমাদের বসিয়ে তার জীবনের নানা গল্প জুড়ে দিতেন। আমরা খুব উপভোগ করতাম।
শাপলারমেলা কে ঘিরে আমরা সিলেটে শিল্প সাহিত্যি কেন্দ্রীক অনেক কাজ করেছি।সেলিম ভাই সব কিছুতে
ছিলেন অগ্রভাগে।শাপলা নামে একটা চমৎকার দেয়াল পত্রিকা বের করতাম আমরা যা সারা দেশে আলোচিত হয়েছিলো।পর্যায়ক্রমে শাপলা সেলিম ভাই সহ আমরা কয়েকজন সম্পাদনা করতাম।১৯৭৬ সালে আমিও ছড়াকার তুষার কর বের করেছিলাম ছড়া বিষয়ক প্রথম সংবাদপত্র ‘ছড়া সন্দেশ ‘যা উভয় বাংলায় ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছিল।পরিবর্তীতে ছড়া সন্দেশ প্রকাশনায় আমার সাথে আজিজ আহমদ সেলিম, নুরুজ্জামান মনি ও সৈয়দ বেলাল আহমদ সংযুক্ত হয়।সেলিম ভাই সহ আমরা এক সাথে সিলেট থেকে অনেক সংকলন ছড়াকার্ড সাহিত্য পত্রিকা প্রকাশ করেছি।রেডিও ক্লাব শাপলা শালুকের আসর
আম্বরখানা সাখার সেলিম ভাই ছিল অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সহকারী পরিচালক।লোকমান আহমদ ছিলেন পরিচালক আর আমি ছিলাম সাথী ভাই।
সিলেট থেকে আমরা যারা ঢাকার সংবাদপত্রে ছড়া কবিতা গল্প লিখতাম সেলিম ভাই ছিল তাদের অন্যতম।যুগভেরী অফিস ছাড়া সিলেটের বিভিন্ন
স্থানে শিল্পী সাহিত্য কর্মীদের বেশ জমজমাট আড্ডা
বসতো।আম্বরখানার ফাতেমা রেস্টুরেন্ট জিন্দাবাজার
এর ম্যাগাজিন সেন্টার বন্দর বাজারের নীরা রেস্টুরেন্টে আড্ডা লেগেই থাকতো। সেলিম ভাই মনি নাহাস হানিফ জিষ্ণু রায় চৌধুরী আমরা ছিলাম নিয়মিত আড্ডা বাজ।
আমাদের অগ্রজরাও থাকতেন। লেখালেখিই ছিল আমাদের আড্ডার বিষয়বস্তু। আমরা অনেকেই তর্ক বিতর্ক করতাম বিভিন্ন বিষয় নিয়ে। কিন্তু সেলিম ভাই
শান্তশিষ্ট ভদ্রলোক। তাকে কোনদিন কারো সাথে ঝগড়া বিবাদ বা তর্ক করতে দেখিনি।
কবি দিলওয়ার এর ভার্থখলার বাড়ীতে লোকমান ভাইয়ের নেতৃত্বে আমরা ক’জন নিয়মিত আন্তর্জাতিক
আসর বসাতাম সেলিম ভাই সেই আসরেও আমাদের
সঙ্গি ছিল।যুগভেরীতে এক সময় কাজ করতেন প্রয়াত টিপু মজুমদার।টিপুদা’কে নিয়ে আমরা খুব মজা করতাম।সেলিম ভাই আমাকে বিভিন্ন বিষয় শিখিয়ে দিতেন টিপু দা’কে ক্ষেপানোর জন্য। এরকমের কত
স্মৃতি জড়িয়ে আছে। আশির দশকের শুরু পর্যন্ত
আমাদের প্রায় প্রতিদিন দেখা সাক্ষাত হতো।
আশির দশকের শুরুতে নাহাশ চলে গেলো লন্ডনে।
কিছুদিন পর আমিও পরবাসি হলাম।আমাদের মধ্যে
একটা গ্যাপ সৃষ্টি হয়ে গেল।নাহাশ ছাড়া সবার সাথে
যোগাযোগ কমে গেলো।
১৯৯২ সালে আমি দেশে আসলে সেলিম ভাইকে দেখতে যাই যুগভেরীতে। যুগভেরী তখন দৈনিক হয়ে
গেছে।সেলিম ভাই ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক। মাঝে মাঝে
তার অফিসে আড্ডায় পুরনো দিনের স্মৃতিচারন করে
কাটতো সময়।সেলিম ভাইয়ের উৎসাহে আমি যুগভেরীতে “রাইনের তীর থেকে” শিরোনামে আমার
ভ্রমন কাহিনী লেখা শুরু করি।একদিন সেলিম ভাই
বললো যুগভেরী’৭৫ বর্ষপূর্তি সংখ্যা বের হবে।
শাপলার মেলা কে ঘিরে আমাদের কর্মকান্ড নিয়ে একটা লেখা তোমাকে লিখতে হবে।আমি কয়েক দিনের মধ্যেই লেখাটা তৈরী করে সেলিম ভাইকে দিয়ে দিলাম।খুব খুশি হলো সেলিম ভাই।বললো এত নাম এত স্মৃতি কথা তোমার মনে আছে। পরে সেলিম ভাই
যুগভেরীর চাকুরী ছেড়ে দিলো।বিশেষ সংখাটাও বের হয়নি।লেখাটা পরে সাংবাদিক অপূর্ব শর্মা যুগভেরীর একটা ঈদ সংখ্যায় ছেপেছিলেন।
গত কয়েক বছর যাবত সেলিম ভাইয়ের সাথে নিয়মিত দেখা হতো রাস্তাঘাটে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে।আজিজ আহমদ সেলিম যে একজন ছড়াকার সেটা এই প্রজন্মের অনেকেই জানে না।আমি বিভিন্ন অনুষ্ঠানে
তার ছড়াকার পরিচয়টা দিতাম।আমার বই প্রকাশনা অনুষ্ঠানে সেলিম ভাই থাকতো।আমি থাকে সব সময় বলতাম একটা ছড়ার বই বের করতে।না হলে ছড়াকার পরিচয়টা হারিয়ে যাবে।সেলিম ভাই খ্যাতিমান সাংবাদিক, ছিলো প্রেসক্লাবের সাধারন সম্পাদক। এক
সময় প্রচুর ছড়া লিখেছে। সেটা আমাদের সমসাময়িক সবার জানা।অবশেষে গত বছর একটা ছড়ার বই
তার প্রকাশিত হয়।
গত ফেব্রুয়ারিতে সিলেট শহীদ মিনারে প্রথম আলো
বন্ধুসভা আয়োজিত বই মেলায় আমাদের প্রতিদিন দেখা হতো।দল বেঁধে আমরা ছবি তুলেছি।করোনা মহামারি সময়ে আর সরাসরি দেখা হয়নি।তবে ফেসবুকে আমার কিছু স্মৃতিচারন মুলক লেখা পাঠ করে এবং পুরনো দিনের ছবি দেখে কমেন্ট করেছে ফোন দিয়ে ধন্যবাদ দিয়েছে পুরনো স্মৃতিগুলো তুলে ধরার জন্য।পরামর্শ দিয়েছে এটা যেন বই আকারে বের করি।
বঙ্গবন্ধু’র জন্ম শতবার্ষিকীতে বঙ্গবন্ধু কে নিয়ে একটা ছড়ার বই করার পরামর্শ সেলিম ভাই আমাকে দিয়েছিলো।সেই বই আমার প্রকাশিত হয়েছে কিন্তু
তার হাতে বইটি তুলে দেবার সৌভাগ্য আমার আর হলো না।
গত কিছুদিন যাবত সেলিম ভাইয়ের খবর জানি না।
দেখা সাক্ষাতও হয়নি। মাঝ খানে একবার সাংবাদিক বাবর হোসেনের কাছ থেকে তার অসুস্থতার সংবাদ
শুনেছিলাম।পরে জেনেছি সুস্থ হয়ে গেছে।কিছুদিন
আগে হঠাৎ ফেসবুকে দেখলাম সেলিম ভাই করোনা
আক্রান্ত হয়ে সিলেট সিএমএইচ এ চিকিৎসাধিন।
তার শারিরিক অবস্থা আশংকাজনক।খুব দুশ্চিন্তায় কাটলো সময় কখন কি হয়ে যায়। রাতে লোকমান ভাই ফোন দিলেন সেলিম ভাইকে নিয়ে কথা হলো দীর্ঘ সময়।পরদিন জানলাম তার অবস্থার কিছুটা উন্নতি হয়েছে।
সেদিন দেখা হলো তার ছোট ভাই জাবেরের সাথে
ফার্মেসীতে।তার কাছ থেকে জানলাম কিছুটা ভালো হলেও আশংকামুক্ত নয় সেলিম ভাই।দুই দিন আগে
আবার ফেসবুকের পোস্ট থেকে জানলাম সেলিম ভাই
ভালো নেই লাইফ সাপোর্ট আছেন তার হার্ট কোন কাজ করছে না।অজানা আশংকায় মনটা কেপে উঠলো।গভীর রাত পর্যন্ত ফেসবুক চেক করলাম সর্বশেষ সংবাদ জানতে।
গতকাল সারাদিন নতুন কোন সংবাদ পেলাম না।রাত সাড়ে ৮টার দিকে ভাবলাম ফেসবুকে একটা পোস্ট দেই সেলিম ভাই’র সর্বশেষ অবস্থা কারো জানা থাকলো জানাবার অনুরোধ জানিয়ে।ফেসবুকে খুলেই চোখে পড়লো সেই দুঃসংবাদ।বন্ধু মুকতাবিস উন নূরের স্ট্যাটাস থেকে জানলাম কিছু সময় আগেই আমাদের প্রিয় সেলিম
ভাই এই নশ্বর পৃথিবীর সকল মায়া ত্যাগ পাড়ি জমিয়েছেন পরপারে। যেখান থেকে কেউ আর কোনদিন ফিরে আসে না।
সংবাদটা জেনেই আমি নীরব নিঃস্তব্দ হয়ে গেলাম।
একটা কাজে বাহিরে যাবার কথা ছিল সেটা বাতিল করে আমার পরিবারের সদস্যদের দুঃসংবাদটা জানালাম।তারা আমাকে শান্তনা দিয়ে বিশ্রাম নিতে পরামর্শ দিলো।সারা রাত আর চোখে ঘুম আসলো না। কেবলই চোখে ভাসলো সেলিম ভাইয়ের সদা হাস্যময় মুখ আর মনে পড়লো কত কথা কত স্মৃতি।আর বার বার চোখটা ঝাঁপসা হয়ে এলো।পরপারে তুমি ভালো থেকো বন্ধু।আমরাও আসছি…


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আরও পড়ুন

আলিয়ার মাঠে খাদিমুল কোরআন পরিষদের ৩ দিনব্যাপী মাহফিল

         সিলেট এক্সপ্রেস ডেস্ক : খাদিমুল...

কম্পিউটার ব্যবসার আড়ালে মোবাইলে পর্ন ছবি আপলোড

         সুনামগঞ্জের তাহিরপুরে কম্পিউটার ব্যবসার আড়ালে...

স্বাধীনতা দিবসে কেমুসাসের বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ

         সিলেট এক্সপ্রেস ডেস্ক: আগামী ২৬...