আগুন পানি বন্ধু যেথায়

,
প্রকাশিত : ১৯ মে, ২০১৮     আপডেট : ৩ বছর আগে
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আলমগীর হোসাইন: বন-পাহাড়ে ঘেরা জলের মঞ্চে আগুনের উৎসব । পোড়া পাহাড়ের বুকে অগনিত আগুনের চুল্লি থেকে শাপের মতো জিহ্বা নাড়ে আগুনের লেলিহান । সমস্থ প্রাকৃতিক নিয়মকে তুড়ি মেরে এখানে চলছে প্রকৃতির নিয়ম ভাঙ্গার খেলা । সিলেটের পথে পথে বিছানো চমকিত সৌন্দর্যের ভিড়ে নিজেকে আলাদা করে যেন রহস্যপুরী হয়ে উঠেছে উৎলার পাড় । তাইতো রহস্যপিপাসু পর্যটকদের পদধ্বনিতে মুখরিত উৎলার পাড়ের পোড়ামাটির পথ ।

দেয়াশলাইয়ের একটা কাটিতে পুড়িয়ে দেয়া যাবে সমস্থ শহর । কিন্তু নূন্যতম একফোঁটা পানি কিংবা একদলা মাটিতে, সারাজীবনের চেষ্টাতেও কেউ কিঞ্চিত পরিমান আগুন ধরাতে পারবেনা । মাটিকে পুড়ানো যায়, পানিকে উত্তপ্ত করা যায় এর বেশি কিছু নয় । আগুন-পানি চির শত্রু । দাউদাউ আগুনেও পানি ঢাললে নেতিয়ে যাবে তার সমস্থ ত্যাজ । অথচ ম্যাজিকের মতোই সমস্থ প্রাকৃতিক নিয়ম ভেঙ্গে উৎলার পাড়ের পানিতে, পাহাড়ে অবিরাম জ্বলছে আগুন । চারিদেকে যেন আগুনের সমারোহ ।

উৎলা মানে বুড়বুড়ি । ভাত রান্নার ফুটন্ত পানির বুড়বুড়ি থেকে সৃষ্ট ফেণার মতো এ জলাশয়ে বুড়বুড়ি আর ফেণার ছড়াছড়ি । পানির বুকে ভাসমান এ ফেণাতে দেয়াশলাইয়ে কাটি জ্বালিয়ে দিতেই ধপ করে করে জ্বলে ওঠে আগুন । পাহাড়েও জ্বলছে আগুন, ঠিক পাশে কোথাও দেখা গেলে মাটির পিনপিনে নিরবতা। সে মাটি পোড়ার জন্য ব্যাস্ত করে তুলতে প্রয়োজন একটি মাত্র জ্বলন্ত কাটি। ছুয়ে দিলেই জ্বলা শুরু ।

রহস্য কি! ইতিহাস আছে?

খালি চোখে উৎলারপাড় নিঃসন্দেহে রহস্যময়, কিন্তু বিজ্ঞানের চোখে মামুলি । কারন এখানকার মাটি গ্যাসে পূর্ন । হ্যা! এটাই হচ্ছে হরিপুরের সেই যায়গা যেখানে বাংলাদেশের প্রথম গ্যাসের সন্ধান মিলে । সিলেট গ্যাসফিল্ড লিমিটেড এর পূর্বসূরী পাকিস্তান পেট্রোলিয়াম লিমিটেড (পিপিএল) পরিচালিত গ্যস অনুসন্ধান কার্যক্রমের এক পর্যায় ১৯৫৫ সালে সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলার হরিপুরে ড্রিলিং কার্যক্রম শুরু করে । এখানে কূপ নং-১ খননের মাধ্যমে বাংলাদেশের সর্বপ্রথম গ্যস আবিষ্কৃত হয় । কিন্তু কূপটি ব্লো-আউট হয়ে গ্যস উত্তলনের সমস্থ উপকরন মাটিতে দেবে যায়। দেবে যাওয়া এ কূপে পরবর্তিতে জলাশয়ের সৃষ্টি হয় এবং গ্যাসের প্রচণ্ড চাপে বুড়বুড়ি উঠতে থাকে। অবিরাম এই বুড়বুড়ির ফলে আশপাশ এলাকার নাম হয়ে যায় উৎলারপাড় । ১৯৫৬ সালে পূনরায় কূপ নং-২ খনন করলে সেখানেও গ্যসের উচ্চ চাপের ফলে কূপটি সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি । খনন কাজে স্থাপিত উপকরনের এ ধ্বংসাবশেষে যেন ফিসফিস করে সে ইতিহাস । ২নং কূপের কাছেই পোড়া পাহাড় । যেখানে একসময় দাউদাউ করে সারা পাহাড়ে জ্বলতো আগুন, সে আগুন অনেক দূর থেকেও দেখা যেত অনায়াসে । এখন খুব কাছে না গেলে দেখা যায়না, ক্রমেই এটি সংকুচিত হয়ে আসছে ।

সংক্ষেপে গ্যাসফিল্ড সম্বন্ধেঃ

পূর্বের দুটি কূপের পর হরিপুর-চিকনাগুল ভূ-খন্ডে ১৯৫৭ সালে ৩নং কূপ সহ পরবর্তিতে আরো পাঁচটি কূপ খনন করা হয় । ১৯৬০ সাল থেকে সিলেট গ্যাসফিল্ড লিঃ নিরবচ্ছিন্ন গ্যস উৎপাদন করে আসছে । বর্তমানে উৎপাদনরত ২ টি কূপ থেকে দৈনিক ৬০ কনডেনসেট (ব্যারেল) ৮.৫ গ্যস (এমএমএসসিএফ) উৎপাদন হচ্ছে। স্বাধীনতা পূর্ব সময়ে (পিপিএল), স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে (বিপিএল) নামে পরিচালিত কোম্পানিটি ১৯৮২ সালের ৮ মে থেকে সিলেট গ্যাসফিল্ড লিমিটেড (এসজিএফএল) নাম ধারন করে ।

১৯৮৬ সালের ২৩ ডিসেম্বর এ ভূখণ্ডের ৭ নং কূপে দেশের সর্বপ্রথম খনিজ তেলের সন্ধান পাওয়া যায় । ১৯৯৪ সালের ১৪ জুলাই পর্যন্ত ৫.৬ লক্ষ ব্যারেল ক্রুড ওয়েল উৎপাদনের পর কূপের মুখে চাপ হ্রাস পাওয়ায় তেল উৎপাদন সম্পূর্ন বন্ধ হয়ে যায় ।

আছে আহমদ আলী শাহ’র মাজারঃ

উৎলারপাড় আর আহমদ আলী শাহ্’র ইতিহাসকে এক সূত্রে গাঁথেন স্থানীয়রা । এ নিয়ে স্থানীয়দের মুখে মুখে প্রচলিত রয়েছে নানান গল্প কথা । স্থানীয়দের ভাষ্যে (পিপিএল) এর নেতৃত্বে গ্যস অনুসন্ধান ও উত্তলনের জন্য বৃটেনের বার্মা ওয়েল কোম্পানি যখন এখানে তাদের কার্যক্রম চালায় , তখন কোম্পানির লোকেরা রাতের অবসরে উচ্চস্বরে গান বাজনা করতো । আর মাওলানা আহমদ আলী শাহ পাশেই এক পাহাড়ে (যেখানে এখন তাঁর মাজার রয়েছে) ইবাদত বন্দেগি করতেন । তাঁর ইবাদতে ব্যাঘাত ঘটলে তিনি কোম্পানির লোকদেরকে উচ্চস্বরে গানবাজনা করতে নিষেধ করেন । কিন্তু মাওলানাকে তারা পাগল বলে ঠ্রাট্রা বিদ্রুপ করা শুরু করলো । এতে ক্ষিপ্ত হয়ে পাশেই এক পাহাড়ে তিনি হারিকেন জ্বালিয়ে দিলেন । সে রাতেই হারিকেন থেকে আগুন সারা পাহাড়ে ছড়িয়ে অগ্নিগিরির সৃষ্টি হয় যা এখনো জ্বলছে এবং কূপ খননের সমস্থ উপকরন মাটির গহিনে দেবে গিয়ে জলাশয়ের সৃষ্টি হয় । পরবর্তিতে হেলিকপ্টার দিয়ে জলাশয়টির গভিরতা মাপলেও এর কোন কিনারা খুজে পাও যায়নি ,পাওয়া যায়নি ধ্বংস হওয়া যন্ত্রপাতির কোন অস্থিত্বও। ব্লুআউট হওয়া কূপ-১,অসম্পন্ন কূপ- ২ ও পোড়া পাহাড়কে আহমদ আলী শাহ্’র অভিশাপের ফল বলে মনে করা হয় । উৎলারপাড়ে চির শায়ীত আছেন মাওলানা আহমদ আলী শাহ্ । পর্যটকদের বাড়তি আকর্ষণ উঁচু পাহাড়ে আহমদ আলী শাহ্ মাজার।

যেভাবে যাবেনঃ

সিলেট শহর থেকে হরিপুর, জৈন্তা, জাফলং গামি লেগুনা বা বাসে চড়ে এখানে যেতে সময় লাগে ৩০ থেকে ৪০ মিনিট। জনপ্রতি ভাড়া ২০/২৫ টাকা, সিএনজি রিজার্ভ নিলে ভাড়া পড়বে ২৫০-৩০০ টাকা । সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলার চিকনাগুল এলাকায় অবস্থিত সিলেট গ্যাসফিল্ড লিমিটেডের প্রধান শাখা হয়ে গাড়ি করে মাত্র এক-দেড় মিনিট পথ সমানে এগুলেই হরিপুর ৭ নম্ভর এলাকা। এখানে নামলেই পর্যটকদের স্বাগত জানাবে আহমদ আলী শাহ’র মাজার গেইট । গেইট পেরিয়ে ৫ মিনিট সমানে হাটলেই চোখের সামনে পড়বে দিক নির্দেশনাকারি সাইনবোর্ড এর বাম দিকে গেলে প্রথমেই দেখে নিতে পারবেন সেই বুড়বুড়ি সমৃদ্ধ কূপ এবং ডান দিকে গেলে পোড়া পাহাড় ও আহমদ আলী শাহ’র মাজার। অবশ্য যে কোন এক পথ দিয়ে ঢুকলেই সম্পূর্ন দৃশ্য উপভোগ করে অন্য পথে বের হওয়া যাবে । হেটে বা গাড়ি করেও পুরো এলাকা ঘুরে দেখা যাবে । প্রায় প্রতিদিনই দূরদূরান্ত থেকে এসে এখানে ভিড় করে উৎসুক পর্যটক । প্রকৃতির দারুন রহস্য উপভোগ করতে যেতে পারেন আপনিও ।

শতর্কতাঃ

যেহেতু আশপাশের বায়ূমণ্ডলে দাহ্য গ্যসের উপস্থিতি রয়েছে সেহেতু আগুন থেকে হতে হবে সতর্ক । পানিতে বা মাটিতে আগুন জ্বালানো উপভোগ করতে হবে সাবধানে ।

লেখকঃ আলমগীর হোসাইন

চিকনাগুল, জৈন্তাপুর, সিলেট

শিক্ষার্থীঃ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আরও পড়ুন

সুনামগঞ্জ ঐক্য কল্যাণ পরিষদের সৌজন্য স্বাক্ষাত

         সিলেট এক্সপ্রেস ডেস্ক : সিলেট...

সাংবাদিক কবির আহমদ অসুস্থ

         দৈনিক সংগ্রামের সিলেট ব্যুরো প্রধান,...

সবার দৃষ্টি সুলতান মনসুরের আসনে

         প্রায় ১৭ বছর পর আবারও...