আক্রান্ত সবাই ঢাকায় ভ্রমণ করেছেন ৫ দিনে ওসমানীতে ভর্তি ২০ ডেঙ্গু রোগী

প্রকাশিত : ৩০ জুলাই, ২০১৯     আপডেট : ১ বছর আগে
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়ো-টেকনোলজি বিভাগের মাস্টার্সে অধ্যয়নরত রুবেল রায়। গত ১২ জুলাই অডিটর পদে প্রিলিমিনারি পরীক্ষা দিতে ঢাকা গিয়েছিলেন। পরীক্ষা দিয়ে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে বন্ধুর রুমে চারদিন ছিলেন। এক সময় তার শরীরে জ¦র আসে। সিলেট বাসায় আসার পর পরীক্ষা করালে তার শরীরে ডেঙ্গু ধরা পড়ে। এরপর চিকিৎসকের পরামর্শে ২৭ জুলাই সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন।
সিলেটে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। গত ২৫ জুলাই থেকে গতকাল সোমবার পর্যন্ত এই পাঁচদিনে শুধু ওসমানী হাসপাতালে ২০জন রোগী ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে শুধু গতকাল সোমবার সন্ধ্যা পর্যন্ত একদিনে নতুন ৭জন রোগী ভর্তি হয়েছেন। সিলেটের মেডিসিন বিশেষজ্ঞ কয়েকজন চিকিৎসক জানান, ওসমানী হাসপাতাল ছাড়াও সিলেটের বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে আরো ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন। এছাড়া চিকিৎসকের চেম্বারে এসে অনেকে চিকিৎসা নিচ্ছেন। সবমিলিয়ে সিলেটের ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা অর্ধশতাধিক হতে পারে। ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্তের সংখ্যা দিনদিন বৃদ্ধি পাওয়ায় ডেঙ্গু জ্বর নিয়ে মানুষের মাঝে প্রবল উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
গতকাল সোমবার ওসমানী হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, নীচতলার ২৭ নম্বর ওয়ার্ডের একটি কর্নার ডেঙ্গু রোগীর জন্য করা হয়েছে। সেখানে মশারি টাঙ্গিয়ে বেডে রাখা হয়েছে রোগীদের। কর্তব্যরত সেবিকা শাহানারা খানম ও মুক্তি ভট্টাচার্য্য জানান, এ পর্যন্ত ২০জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে ৫জন গতকাল সোমবার সুস্থ হয়ে বাড়ি চলে গেছেন।
হাসপাতালে ভর্তির রেজিস্ট্রার থেকে জানা যায়, চিকিৎসারত এসব রোগীদের সবাই ঢাকায় ছিলেন। সেখানে থেকে তারা ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে এসেছেন। রোগ চিহ্নিত হওয়ার পর তাদেরকে ওসমনানী হাসপাতালে ভর্তি করে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক (মেডিসিন) ডা. মইনুদ্দিন বলেন, এ পর্যন্ত সিলেটে যেসব ডেঙ্গু রোগী চিহ্নিত হয়েছেন, তারা সকলেই ঢাকা ছিলেন। সেখান থেকে ডেঙ্গু ভাইরাস নিয়ে এসেছেন। তারা ছাত্র কর্মজীবী ও ব্যবসায়ী। তিনি বলেন, ডেঙ্গু জ্বরের উৎপত্তি ডেঙ্গু ভাইরাসের দ্বারা এবং এই ভাইরাসবাহিত এডিস ইজিপ্টাই নামক মশার কামড়ে। ডেঙ্গু জ্বরের জীবাণুবাহী মশা কাউকে কামড়ালে সেই ব্যক্তি চার থেকে ছয় দিনের মধ্যে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হতে পারে। এবার এই আক্রান্ত ব্যক্তিকে কোনো জীবাণুবিহীন এডিস মশা কামড়ালে সেই মশা ডেঙ্গু জ্বরের জীবাণুবাহী মশায় পরিণত হয়। এভাবে একজন থেকে অন্যজনে মশার মাধ্যমে ডেঙ্গু ছড়িয়ে থাকে। তিনি বলেন, ঢাকায় যেহেতু ডেঙ্গুর প্রকোপ বেশি। তাই জরুরি কাজ না থাকলে এই সময়ে ঢাকা না যাওয়াই ভালো। আর যারা ঢাকা যাচ্ছেন তারা যেন সতর্ক ও সচেতন থাকেন। তিনি বলেন, ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক ড. শিশির চক্রবর্তীকে প্রধান করে একটি টিম করা হয়েছে। তারা সার্বক্ষণিকভাবে চিকিৎসা কাজে নিয়োজিত আছেন। এছাড়া হাসপাতাল সম্পূর্ণ বিনামূল্যে চিকিৎসা প্রদান করছে।

ঢাকা থেকে ডেঙ্গু নিয়ে সিলেট আসলে এটা সিলেটের অবস্থানরত মানুষের কি ক্ষতি করতে পারে এ ব্যাপারে বিশেষজ্ঞরা জানান, রাজধানীতে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে কেউ যদি গ্রাামের বাড়িতে যায়, তাহলে তার মাধ্যমে এ রোগ দ্রুত ওই এলাকার অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে পারে। তখন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে না।
তারা বলেন, এডিস মশার দুটি জাত রয়েছে। একটি এডিস ইজিপ্টি। এটি শহুরে মশা। এর মাধ্যমেই ঢাকা শহরে ডেঙ্গু রোগ ছড়িয়েছে। আরেকটি এডিস এলবোপিকটাস। এটি মূলত গ্রাম এলাকার মশা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা পরীক্ষা করে দেখেছে, এই মশাও ধীরে ধীরে ডেঙ্গুর বাহকে পরিণত হয়েছে। তাই ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী গ্রামে গেলে এডিস এলবোপিকটাস মশার মাধ্যমে তা ছড়িয়ে পড়াই স্বাভাবিক।
সিলেটের গোয়ালাবাজরের কৃষক জয়নাল ডেঙ্গু ওয়ার্ডে চিকিৎসা নিচ্ছেন। তিনি জানান, গত ১০ বছরের মধ্যে ঢাকা যাননি। গত এক সপ্তাহ থেকে জ¦র। এখন পরীক্ষা করে বলা হচ্ছে তার ডেঙ্গু হয়েছে। ওসমানী হাসপাতালের ২৭ নম্বর ওয়ার্ডে দায়িত্বরত রেসিডেন্ট মেডিসিন ডা. আবু কামরান রাহুল জানান, জয়নাল নামে রোগীকে ডেঙ্গু আক্রান্ত ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়েছে প্রাথমিকভাবে পরীক্ষা করার পর। আরো কিছু পরীক্ষা করে যদি ডেঙ্গু না হয়, তাহলে তাকে ছেড়ে দেওয়া হবে। তিনি জানান, যারা ভর্তি হয়েছেন সবার অবস্থা স্থিতিশীল পর্যায়ে আছে। ৫জন সুস্থ হয়ে বাড়িতে গেছেন। আক্রান্তদের মধ্যে হবিগঞ্জ ও সুনামগঞ্জ এলাকার বেশি। তারা সবাই ঢাকায় ছিলেন। সোমবার সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ওসমানীতে নতুন আরো ৭ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন বলে তিনি জানান।
এবার এইচএসসি পাস করে ঢাকায় বিশ^বিদ্যালয়ের ভর্তি কোচিং করতে গিয়েছিলেন হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জের আবিদ হোসেন। থাকতেন ঢাকা শান্তিগঞ্জে। আর কোচিং করতেন ফার্মগেইটে। ২৫ তারিখ তার শরীরে জ¦র আসে। এরপর বাড়িতে চলে আসেন। পরীক্ষা করে তার ডেঙ্গু ধরা পড়েছে। গত ২৭ জুলাই থেকে তিনি ওসমানী হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। তিনি জানান, ওসমানী হাসপাতালে ডেঙ্গু পরীক্ষার ব্যবস্থা নেই । তাই বাইর থেকে তাদের পরীক্ষা করাতে হচ্ছে।
ডেঙ্গু পরীক্ষা সম্পর্কে ডা. মইনুদ্দিন বলেন, ডেঙ্গু জ্বর হলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করাতে হবে। জ্বরের ৪ থেকে ৫ দিন পর সিবিসি এবং প্লাটিলেট টেস্ট করতে হবে। এর আগে টেস্ট করলে রিপোর্টে ডেঙ্গু রোগের জীবাণু ধরা নাও পরতে পারে। সাধারণত প্লাটিলেট কাউন্ট এক লাখের কম ডেঙ্গু হলে ভাইরাসের কথা মাথায় রেখে পরবর্তী পদক্ষেপ নেয়া উচিত। ডেঙ্গু এ্যান্টিবডির পরীক্ষা ৫ থেকে ৬ দিন পর করা যেতে পারে। এটি রোগ শনাক্তকরণে সাহায্য করে। যেহেতু রোগের চিকিৎসায় এর কোনো ভূমিকা নেই। তাই এই পরীক্ষা না করলেও কোন সমস্যা নেই। প্রয়োজনে ব্লাড সুগার, লিভারের পরীক্ষা যেমন-এসজিওটি, এসজিপিটি, এলকালাইন ফসফাটেজ ইত্যাদি করাতে হতে পারে। আবার চিকিৎসক যদি মনে করেন রোগী ডিআইসি জাতীয় জটিল কোনো সমস্যায় আক্রান্ত সে ক্ষেত্রে প্রোথ্রোম্বিন টাইম, এপিটিটি, ডি-ডাইমার ইত্যাদি পরীক্ষা করাতে হতে পারে।
সিলেটের ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন ডা. নুরে আলম শামীম বলেন, ওসমানীতে ডেঙ্গু রোগী আসার পর থেকে হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগের পরীক্ষাযন্ত্র আনার উপর জোর দেওয়া হয়েছে। আশা করি দু-তিন দিনের মধ্যে হাসপাতালে পরীক্ষাযন্ত্র আসবে। এছাড়া সরকার পরীক্ষার জন্য যে ৫০০ টাকা নির্ধারণ করে দিয়েছে, সেই মূল্যে পরীক্ষা করার জন্য আমরা সকলকে নির্দেশ দিয়েছি। তিনি জানান, ডেঙ্গু সচেতনতায় গতকাল সোমবার সিলেট নগরীতে মাইকিং করা হয়েছে। নগরীর মোড়ে মোড়ে বিলবোর্ড দেওয়া হয়েছে।
ডেঙ্গ জ্বরে আক্রান্ত হলে প্যারাসিটামল ব্যতীত অন্য ব্যথানাশক ওষুধ খাওয়া থেকে বিরত থাকতে এবং রোগীকে বেশি বেশি তরল খাবার খাওয়ানোর পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, ডেঙ্গু জ্বরের বাহক এডিস মশা পরিষ্কার পানিতে বংশ বিস্তার করে। অফিস, ঘর ও আশপাশে পানি জমতে দেবেন না। যে কোনো পাত্রে জমিয়ে রাখা বা জমে থাকা পানি ৩ দিনের মধ্যে পরিবর্তন করুন। এডিস মশা সাধারণত দিনের বেলা কামড়ায়। যথাসম্ভব লম্বা পোশাক পরিধান করুন। দিনে ঘুমানোর ক্ষেত্রেও মশারি ব্যবহার করুন।
বর্তমানে ডেঙ্গুর উপসর্গ নিয়ে ডা. মইনুদ্দিন বলেন, ২০০০ সালে যখন প্রথম ডেঙ্গু শুরু হয়, তখন কেবল ছিল ডেঙ্গু ক্ল্যাসিক্যাল এবং ডেঙ্গু হেমোরেজিক। ক্ল্যাসিক্যাল ডেঙ্গুতে তীব্র জ্বর, তীব্র শরীর ব্যথা ছিল। তখন শরীরে র‌্যাশ উঠতো। এসব উপসর্গের সঙ্গে আরেকটি ছিল, প্লাটিলেট এবং পিসিভি দ্রুত কমে গিয়ে শরীরের বিভিন্ন স্থান থেকে রক্তক্ষরণ হতো। কিন্তু এবারে ডেঙ্গুতে লক্ষণ বদলে গেছে। আগে যেমন ১০৪ থেকে ১০৫ ফারেনহাইট তাপমাত্রা থাকতো, এবারে সে উচ্চমাত্রার তাপমাত্রা দেখা যাচ্ছে না। ১০১ থেকে ১০২-তেই থাকছে তাপমাত্রা, ব্যথাও থাকছে মধ্যম মানে। যে কারণে মানুষ তাকে নিয়ে ভাবছে না। আর এতেই রোগী ভুলটা করছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এবার র‌্যাশ পাওয়া যাচ্ছে না, জ্বরের তাপমাত্রা তেমন উঠছে না। কিন্তু তীব্র জ্বরে, তীব্র শরীর ব্যথা, গায়ে র‌্যাশ উঠলে মানুষ ডেঙ্গু নিয়ে সচেতন হয়ে উঠতো। কিন্তু এবারে সেসব উপসর্গ না থাকায় মানুষ সচেতন হচ্ছে না। এবারে তাই জ্বর ছেড়ে যাওয়ার এক থেকে দুই দিন পরই রোগী শকে চলে যাচ্ছে। সেজন্যই ডেঙ্গু শক সিন্ড্রোম বেশি ঝামেলাপূর্ণ।
আমাদের মৌলভীবাজার সংবাদদাতা জানান, গতকাল সোমবার বিকেল পর্যন্ত মৌলভীবাজারে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৬ জনে। ডেঙ্গু আক্রান্তরা ঢাকা থেকে এ রোগে আক্রান্ত হয়ে এখানে এসেছেন। মৌলভীবাজার সিভিল সার্জনের কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, জেলায় এখন পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন ১৬জন। এদের মধ্যে মৌলভীবাজার সদর হাসপাতালে ৬ জন চিকিৎসা নিচ্ছেন, ৩ জন প্রাইভেট ক্লিনিকে এবং বাকি ৭ জন চিকিৎসকের পরামর্শে নিজ বাড়িতে আছেন। তাদের অবস্থা গুরুতর নয়। তবে অবস্থা গুরুতর হলে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসকরা। ডেঙ্গু আক্রান্তদের চিকিৎসার জন্য সদর হাসপাতালের চতুর্থ তলায় ডেঙ্গু কর্ণার চালু করা হয়েছে। ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসায় একটি মেডিকেল বোর্ড গঠন করেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। কিছু ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত রোগী সুস্থ হয়েছেন বলে নিশ্চিত করেছে মৌলভীবাজার জেলা সিভিল সার্জনের কার্যালয়। মৌলভীবাজারের সিভিল সার্জন ডা. শাহজাহান কবির চৌধুরী বলেন, ডেঙ্গু মোকাবেলায় জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ সতর্ক রয়েছে। মৌলভীবাজার জেলায় ২৫০ শয্যা সদর হাসপাতালসহ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলো ডেঙ্গু চিকিৎসায় প্রস্তুত রয়েছে।


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আরও পড়ুন

অসুস্থ কামরানকে দেখতে ছড়ারপারের বাসায় মানুষের ঢল

         সিলেট এক্সপ্রেস ডেস্ক : হৃদরোগে...

হবিগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপারের সাথে নবীগঞ্জ অনলাইন প্রেসক্লাবের মতবিনিময়

         নবীগঞ্জ প্রতিনিধিঃ হবিগঞ্জ জেলা পুলিশ...

মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চ সিলেট মহানগর কমিটির অনুমোদন

         মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চ সিলেট মহানগর কমিটির...