আকাশ দেখা চোখ – সালমান হাবীব

প্রকাশিত : ১৫ জুলাই, ২০২০     আপডেট : ১ মাস আগে

জানালায় মাথা বের করে আমি প্রায় চেচিয়ে ওঠলাম; এই দেখুন, দেখুন! কী সুন্দর আকাশ! ওয়াও! নদীর জলে নীল পড়ে জলের ভেতর আস্ত একটা আকাশ সৃষ্টি হচ্ছে!

আকাশের এমন অপার মুগ্ধতা দেখে প্রায় ভুলেই গিয়েছিলাম যে, আমি কোথায় আছি। পাশে বসে থাকা মানুষটি আমার পরিচিত কেউ নন। আজকের পূর্বে দেখিওনি কোনদিন। এমন অপরিচিত একটা মানুষের কানের পাশে আকাশ আকাশ বলে চেচিয়ে ওঠলে বিরক্ত হওয়াটাই স্বাভাবিক। তিনিও বিরক্ত হলেন। তবে মুখে কিছুই বললেন না। আমি তার কপালের ভাজ আর চোখ দেখে সেটা বুঝেছি।

ঢাকা থেকে সিলেট যাচ্ছি। একা একা। ট্রেনে করে। একা জার্নিতে সবসময়ই ইচ্ছে থাকে পাশের সিটটা কোন সুন্দরী মেয়ের বুকিংয়ে থাকুক। কিন্তু এমনটা কোনদিনই হয়নি। এবার হয়েছে। সহযাত্রী হিসেবে যাকে পেয়েছি তিনি একজন সুন্দরী। উহু, এখনো সুন্দরী বলে দিতে পারছিনা। কারন আপাদমস্তক হিজাবে ঢাকা এই মেয়ের আমি কেবল চোখ দুটো দেখেছি। তবে সুন্দরী নির্ণয়ের জন্য এর থেকে বেশি কিছু দেখার প্রয়োজন আছে বলে আমার মনে হয়না।

অসম্ভব সুন্দর দুটি চোখ। যেন পৃথিবীর সব মায়া দুই চোখে ঢেলে দেওয়া হয়েছে। খুব বেশি সুন্দর মানুষ সহ্য করতে পারেনা। আগুনে ঝাপিয়ে পড়ে আত্মহুতি দেওয়া পোকার মত ঝাঁপ দিতে ইচ্ছে করে। আমি ঝাপ দিলাম না। তার চোখ থেকে দৃষ্টি সরিয়ে ট্রেনের জানালায় চোখ রাখলাম। দেখলাম; এখানে উঁকি দিলে দৃষ্টিতে আকাশ ছোঁয়া যায়।

আরো দু স্টেশন পর।
আমি বাইরে তাকিয়ে আছি। পাশ থেকে হঠাৎ মেয়েটা বললো; আপনার বুঝি আকাশ পছন্দ?
আমি এবারও আশপাশ ভুলে বলে ওঠলাম; খুউব! এবারের ‘খুউব’ বলা শুনে মেয়েটা কোন ক্ষোভ প্রকাশ করেনি। বরং খানিকটা মুচকি হাসলো। তারপর আকাশে দৃষ্টি ফেরাতে ফেরাতে বললো; আমারও। আমি শুধু দেখলাম;
মানুষ হাসলে কীভাবে হেসে ওঠে চোখ!

ততক্ষণে ভৈরব ছাড়িয়ে গেছি।
আমরাও পরস্পর হালকা হয়েছি অনেকটা। জড়তা কেটে গেছে কথাদের। পথে খাবার জন্যে পুচকি নুডুলস রেঁধে দিয়েছিল। আমি তাকে নুডুলস খেতে দিয়েছি। প্রথমে আমতা আমতা করলেও শেষ অব্দি খেয়েছে। খেতে খেতে অনেক গল্প হয়েছে। আমি তাকে আকাশ-গল্প শুনিয়েছি। গল্প শুনতে শুনতেই সে বললো; ‘যে মানুষ আকাশ পছন্দ আমার তাকে ভালো লাগে’।

নেমে পড়ার কিছুক্ষণ আগে।
আমি জানালার পাশের সিটটাতে বসে আছি।
সে আমাকে ডাকলো। আমি পাশ ফিরে তাকিয়ে বললাম; কিছু বলবেন? সে কিছুই বললো না। কিছু একটা বলতে গিয়েও দৃষ্টি আড়াল করলো। আমি জানালা গলে দূরের আকাশে তাকিয়ে রইলাম। স্টেশানে ট্রেন থামলো। অনেক যাত্রীদের সাথে সেও নেমে পড়লো। আমি তাকিয়ে রইলাম। দূরের আকাশে না, তার চলে যাওয়া পথের দিকে। তাকিয়ে থাকতে থাকতেই দেখলাম; প্লাটফর্মভর্তি মানুষের ভিড়ে সে হারিয়ে গেল।

ট্রেন চলছে।
পাশের ফাকা সিটটার দিকে তাকিয়ে আমার ভীষণ মন খারাপ হলো। আমি বুঝলাম, এই মনখারাপ সিটের শূন্যতার জন্য নয়। ছেড়ে যাওয়া মানুষটির জন্য। তার মায়াময় চোখ দুটির জন্য। এই মন খারাপ তার বলা কথাটির জন্য; ‘যে মানুষ আকাশ পছন্দ আমার তাকে ভালো লাগে’।

যাত্রীরা যে যার ব্যাগপত্র গুছিয়ে নিচ্ছে।
আর মাত্র মিনিট পাঁচেক। আমি গন্তব্যে পৌঁছে যাব। গরমের কারনে জুতা খুলে বসে ছিলাম। পায়ে দিতে গিয়ে দেখি একটা কাগজ পড়ে আছে। জুতার সাথে কিছু একটা দিয়ে লাগানো। আমি ফেলে দেব ভেবেও তুলে আনলাম। খুলে দেখি চিরকুটের মত কিছু একটা লেখা। আমি চার ভাজের সেই ছোট্ট চিরকুটটা মেলে পড়তে শুরু করলাম। শুরুতেই ভড়কে গেলাম সম্বোধন দেখে! এই মেয়ে আমার নাম জানলো কী করে!

“আকাশনীল,
আপনার নীল আকাশ পছন্দ তাই আকাশনীল বলেই ডাকলাম। আমি যে কথাটি বলব বলে আপনাকে ডেকেছিলাম, কিন্তু লজ্জায় বলতে পারিনি। আমার ভীষণ ইচ্ছে করছিল ওঠে গিয়ে জানালার পাশে আপনার সিটটাতে বসি। আপনার মত করে অমন অপার মুগ্ধতা নিয়ে আকাশ দেখি। আর আপনাকে বলি; আপনি বরং আমার চোখেই আকাশ দেখুন।”

শেষ স্টপে থেমে গেছে ট্রেন।
যাত্রীরা নেমে পড়েছে।
চারভাঁজের ছোট্ট চিরকুটটা দু’ভাঁজ করে পকেটে রেখে আমিও নেমে এলাম।

প্লাটফর্মভতি মানুষ।
আশপাশে তাকিয়ে দেখি অজস্র চোখ। কিন্তু আকাশ দেখা যায় এমন চোখ একটিও নেই।

গল্প- আকাশ দেখা চোখ
© সালমান হাবীব

আরও পড়ুন

রাজু হত্যা মামলার ৯ আসামী কারাগারে

সিলেটে ছাত্রদলের অভ্যন্তরীন কোন্দলে নিহত...

দক্ষিণ সুনামগঞ্জে আইনশৃঙ্খলা কমিটির মাসিক সভা 

সালেহ আহমদ হৃদয়, সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি...

লিডিং ইউনিভার্সিটির ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগের শিক্ষার্থীদের সাফল্য

সিলেটের প্রথম বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় লিডিং...