অ্যা মেমোরেবল ইভনিং উইথ মাই তালই’

,
প্রকাশিত : ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২১     আপডেট : ৪ সপ্তাহ আগে
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

তাইসির মাহমুদ :
বিলেতে আমার একমাত্র তালই কাজী সাদ উদ্দিন আহমদ । বয়স প্রায় নব্বুই’র কাছাকাছি । বেঁচে থাকলে আর মাত্র এগারো বছর পর শতাব্দির সাক্ষি হয়ে যাবেন । দেশের বাড়ি সুনামগঞ্জে । বিলেতে স্থায়ী নিবাস বার্মিংহামের নিকটবর্তী উস্টার শহরে ।
বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতায় ভুগছেন তালই । তাই ঘর থেকে বেশি বের হওয়া হয়না । দীর্ঘদিন পর লন্ডনে এসেছেন তাঁর জামাতার (আমার ছোট ভাই মোহাম্মদ রহিম) ঘরে বেড়াতে। সন্ধ্যায় তালইকে দেখতে পপলারে ছোট ভাইয়ের ঘরে গেলাম । এই বৃদ্ধ বয়সেও তিনি দেশ-বিদেশের খবর রাখেন । পত্রিকার প্রতিটি পাতার সংবাদ খুটে খুটে পড়েন। টিভিতে টক শো দেখেন। আমাকে পেলেই দেশ-বিদেশ, কমিউনিটি আর জীবনের গল্প জুড়ে দেন। আমি তাঁর জীবনের গল্পগুলো শুনি আর তফাৎ খুঁজি, সেই সময় ও এই সময়ের বিলেতের।
তালই যুক্তরাজ্যে এসেছিলেন ১৯৬৩ সালে। বাংলাদেশ রাস্ট্রের জন্মেরও ৮ বছর আগে। সুনামগঞ্জে নিজ বাড়ি থেকে মাইল পাঁচেক দুরে একটি প্রাইমারি স্কুলে শিক্ষকতা করতেন। বাড়ি থেকে স্কুল অনেক দূরে হওয়ায় স্কুলের পাশেই একটি বাড়িতে লজিং থাকতেন । লজিং বাড়ির একটি ছোট্ট খুকি পড়াতেন । লজিং মাস্টার থাকতেন বিলেতে ।
একদিন হঠাৎ স্থানীয় পোস্ট অফিস থেকে খবর এলো বিদেশ থেকে তাঁর একটি চিঠি এসেছে। তিনি যেন গিয়ে চিঠিটি নিয়ে আসেন । তিনি বুঝতে পারছিলেন না চিঠিটি কে পাঠিয়েছে। পোস্ট অফিসে যাওয়ার পর তাঁর হাতে একটি চিঠি তুলে দিয়ে পোস্ট মাস্টার বললেন, এটি লন্ডন থেকে এসেছে। পরম কৌতুহল নিয়ে চিঠিটি খুলে দেখেন, ভেতরে লন্ডনের একটি ভাউচার (ওয়ার্ক পারমিট)।
কপাল খুলে গেলো তালইর । শিক্ষকতা পেশা ছেড়ে পাসপোর্ট-টিকিট করে পাড়ি জমালেন স্বপ্নের দেশ ব্রিটেনে । হিথ্রো এয়ারপোর্ট থেকে তাঁকে সিরিভ করলেন ভাউচার-দাতা সেই লজিং মাস্টার। নিয়ে গেলেন তাঁর বাসায় । সেখানে থাকলেন দিন-তিনেক । এরপর বেরুলেন কাজের সন্ধানে।
উস্টারের একটি রুটির দোকানে গিয়ে কাজ চাইলেন। দোকানের কর্মচারিরা কাজ নেই- বলে তাকে ফিরিয়ে দিলো। তিনি যখন ফিরে আসছেন তখন দোকান থেকে বেরিয়ে এলেন ম্যানেজার। জানতে চাইলেন তিনি কী চান? বললেন, আমি বাংলাদেশ থেকে এসেছি। একটি কাজ চাই। শ্বেতাঙ্গ ম্যানেজার বললেন, তুমি কি রুটি তৈরির কাজ করতে পারবে। তালই বললেন, আমাকে দেখিয়ে দিলে অবশ্যই পারবো।
ব্যাস। এই তো কাজ হয়ে গেলো। ম্যানেজার তাঁর জন্য চাকরির চুক্তিপত্র তৈরি করলেন। সপ্তাহে ৪৪ ঘণ্টা কাজ । সোমবার থেকে শুক্রবার ৫দিন । সোমবার থেকেই তিনি কাজ শুরু করলেন। শুক্রবারে সপ্তাহ শেষ হওয়ার আগের দিন বৃহস্পতিবার তাঁর হাতে একটি অ্যানভেলাপ ধরিয়ে দিলেন ম্যানেজার । ঘরে ফিরে পরম কৌতুহল নিয়ে অ্যানভেলাপটি খুললেন । দেখলেন, তাতে ১৬ পাউণ্ড । এতো পয়সা দেখে তাঁর চোখ তো ছানাবড়া । রুমমেটদের মধ্যেও রীতিমতো শোরগোল পড়ে গেলো । এক সপ্তাহে এতো পয়সা! আশপাশ থেকে অনেক অভিবাসী বাংলাদেশী তাকে দেখতে এলেন । কারণ তিনি যখন সপ্তাহে ১৬ পাউন্ড বেতন পেয়েছেন, তখন তাঁর রুম ভাড়া ছিলো সপ্তাহে মাত্র ৫০ পেন্স । মাত্র ১৫দিন আগেও পুরো একমাস শিক্ষকতা করে তালই বেতন পেতেন মাত্র ৩০ টাকা (২০ পেন্স)। সেখানে মাত্র ৫দিন কাজ করে বেতন পেলেন ১৬ পাউন্ড। তালই তো আনন্দের আতিশয্যে আত্মহারা!
তালই গল্প বলেই যাচ্ছিলেন। বললেন, তখন ঘরের ভেতরে টয়লেট-বাথরুম কিছুই ছিলো না। ঘরের বাইরে বাংলাদেশের মতো টয়লেট থাকতো । সপ্তাহে একদিন বাইরে পাবলিক বাথরুমে গোসল করতে হতো। বাথটবে দুইবার পানি দেয়া হতো। প্রথমে একবার বাথটব ভরে দেয়া হতো। সেই পানি দিয়ে শরীর ঘষা-মাজা শেষ হলে আরো একবার পানি দিয়ে বাথটবটি ভরে দেয়া হতো। একবার গোসলের জন্য ১৫ পেন্স দিতে হতো।
তখন আজকের মতো গ্রোসারি শপে রেডিমেড হাঁস-মোরগ, মাছ কিংবা ভেড়ার মাংস বিক্রি হতোনা। বাংলাদেশের মতোই মাছ, মোরগ, ভেড়ার খোলা বাজার বসতো। তাঁরা মোরগ কিনে এনে নিজ হাতে জবাই করে খেতেন। সপ্তাহে বেতন পেতেন ১৬ পাউন্ড। খরচ হতো সর্বসাকুল্যে ৫ পাউন্ড। বাকি ১১ পাউন্ডই বাড়িতে পাঠাতেন।
হঠাৎ একদিন বাড়ি থেকে একটি টেলিগ্রাম পেলেন তালই । জানতে পারলেন তাঁর মমতাময়ী মা অসুস্থ। তিনি পালটা টেলিগ্রাম পাঠিয়ে মায়ের সর্বশেষ অবস্থা জানতে চাইলেন। বাংলাদেশে যাওয়ার জন্য তাঁর মন ব্যাকুল হয়ে ওঠলো । কিন্তু পাসপোর্ট খুলে দেখলেন মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়ে গেছে । দেরি না করে দ্রুত চলে গেলেন বার্মিংহ্যামে তৎকালিন পাকিস্তান হাইকমিশনে । পাসপোর্ট রিনিউ করতে দিয়ে এলেন । এক সপ্তাহ পর গিয়ে পাসপোর্ট নিয়ে এলেন । অপেক্ষা করতে থাকলেন টেলিগ্রামের জবাবের । কিন্তু জবাব আসতে আসতে কয়েক দিন লেগে গেলো। যখন জবাব এলো তখন জানতে পারলেন তাঁর মা আরে বেঁচে নেই।
তালই বলেন, ফিরতি টেলিগ্রামটি আসতে দেরি হওয়ার কারণ খুঁজতে গিয়ে জানলাম ডাক বিভাগের ভুলের কারণেই তা আমার কাছে পৌঁছতে বিলম্ব হয়েছে। আমি থাকতাম ৬২-মিডিল স্ট্রিট, উস্টারে। কিন্তু বাংলাদেশ থেকে টেলিগ্রামটি ভুল করে পাঠানো হয় ৬২-মিডিল স্ট্রিট, মানচেষ্টার। সেখানে আমাকে না পেয়ে টেলিগ্রামটি ঘুরে আসে উস্টারে। এই ঘোরাঘুরির কারণে রাস্তায় কয়েকদিন লেগে যায়। তাই মায়ের মৃত্যূর আগে আমার আর দেশে যাওয়া হয়নি।
তালই এভাবেই জীবনের গল্পগুলো বলে যাচ্ছিলেন । বয়স হওয়ার কারণে তাঁর অনেক কিছুই এখন আর মনে নেই। আমি নিবিষ্ট মনে তাঁর জীবনের গল্পগুলো শুনছিলাম আর বর্তমান বৃটেনের সাথে সেই ৫৮ বছর আগের বৃটেনকে মিলিয়ে দেখছিলাম। যেন দিন-রাত পার্থক্য।
বৃটেনের প্রতিটি অভিবাসী মানুষের জীবনে এ ধরনের হাজারো গল্প রয়েছে । বিলেতে পাড়ি দেয়া ও এখানকার জীবনযুদ্ধের দুঃসাহসী গল্পগুলো আমাদের হূদয় ছুঁয়ে যায়।
আজ থেকে আরো ৫৮ বছর পরে আমাদের পরবর্তী জেনারেশনও হয়তো আমাদের কাছ থেকে এখনকার বিলেতের এমন গল্প শুনতে চাইবে । তখনকার ব্রিটেনের সাথে আজকের ব্রিটেনের মিল-অমিল খুঁজে দেখবে। এভাবেই প্রজন্মের পর প্রজন্ম অভিবাসী মানুষের গল্প চলতেই থাকবে।
তালইর জন্য অনেক শুভকামনা। তিনি যেন শতায়ু হয়ে শতাব্দির সাক্ষি হয়ে থাকেন।
তাইসির মাহমুদ
লন্ডন, যুক্তরাজ্য
রোববার,২৬ সেপ্টেম্বর ২০২১


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আরও পড়ুন

জগন্নাথপুরের আহবাব হোসেইন সর্বাধিক ভোট পেয়ে বৃটেনে কাউন্সিলর নির্বাচিত

        যুক্তরাজ্যের টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলের নির্বাচনে...

সিলেটে কেক কেটে রাধাষ্টমী পালন

        সিলেট এক্সপ্রেস ডেস্ক: ইসকন সিলেটে...

যুক্তরাস্ট্রে নিয়ন্ত্রনহীন করোনা পরিস্থিতি দেউলিয়া হয়ে যেতে পারে নিউইয়র্ক

92       এমদাদ চৌধুরী দীপু,১৮এপ্রিল,নিউইয়র্ক,২০২০ইং) ক্রমেই বাড়ছে...