অবাধে চলছে গাছ কাটা মাছ ও পাখি শিকার

প্রকাশিত : ০১ মার্চ, ২০১৮     আপডেট : ৩ বছর আগে
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

হাকালুকি হাওর হচ্ছে এশিয়ার বৃহত্তম হাওর। দশের সর্ববৃহৎ মিঠা পানির মৎস্য প্রজনন কেন্দ্র। সর্ববৃহৎ অতিথি পাখির সমাগমস্থল ও বিচরণ কেন্দ্র। গত দেড় বছর থেকে অরক্ষিত অবস্থায় এই হাওরটি। ফলে দুর্বৃত্তরা অবাধে কাটছে হাওরের জলজ গাছ। সেই সঙ্গে বিষটোপে চলছে পাখি শিকার এবং অভয়াশ্রম থেকে চলছে মাছ লুটের ঘটনা।

এতে হুমকির মুখে পড়েছে হাওরের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য।
ছোট-বড় ২৩৮টি বিল নিয়ে গঠিত এই হাকালুকি হাওর। শুষ্ক মৌসুমে ১৮ হাজার হেক্টরের হাকালুকি হাওর বর্ষা মৌসুমে ৪৪ হাজার হেক্টর জলাভূমিতে পরিণত হয়। এই হাওরে ১০৭ প্রজাতির মিঠা পানির মাছ রয়েছে। ফলে এই হাওরকে দেশের অন্যতম ও সর্ববৃহৎ মিঠা পানির মৎস্য প্রজনন কেন্দ্র বলা হয়ে থাকে। তাছাড়া ৪১৭ প্রজাতির পাখির মধ্যে ১১২ প্রজাতির অতিথি পাখি ও ৩০৫ প্রজাতির দেশীয় পাখিসহ লাখ লাখ অতিথি পাখির সমাগমস্থল ও বিচরণ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত এটি। রয়েছে আড়াং, হিজল করচসহ ১২০ প্রজাতির জলজ উদ্ভিদ। প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে ওঠা বিশাল সোয়াম ফরেস্ট বা জলজ বনও রয়েছে এ হাওরে।
মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়া, জুড়ী, বড়লেখা এবং সিলেট জেলার ফেঞ্চুগঞ্জ ও গোলাপগঞ্জ এই ৫টি উপজেলা অবস্থিত হাওরের চার তীরে। হাকালুকি হাওরকে ১৯৯৯ সালে সরকার ইকোলজিক্যাল ক্রিটিক্যাল এরিয়া (ইসিএ) ঘোষণা করে। ২০০৪ সাল থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত হাওর উন্নয়নে পরিবেশ অধিদপ্তর হাওরে ব্যাপক উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালিত করলেও ধীরে ধীরে তাতে ভাটা নামে। সর্বশেষ পরিবেশ অধিদপ্তরের বাস্তবায়নে সিবিএ-ইসিএ নামক একটি প্রকল্পের কাজ ২০১৫ সালের জুন মাসে শেষ  হয়। সিবিএ-ইসিএ প্রকল্পের মাধ্যমে হাওরের ১২টি বিলকে মৎস্য অভয়াশ্রম হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ফলে হাওরে অতিথি পাখি ও মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি পেতে থাকে। সর্বশেষ ২০১৬ সালের ডিসেম্বর মাস থেকে ২০১৭ সালের ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত হাওর উন্নয়ন কাজে ইউএনডিপি দু‘জন কর্মকর্তাকে নিযুক্ত করে। কিন্তু সেই দু’জন কর্মকর্তা পুরো বছর কাজ না করে বেতন-ভাতা উত্তোলন করে খেয়ে বসে সময় কাটিয়েছেন। এরই মধ্যে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে তারাও চলে যান।
কিন্তু পরিবেশ অধিদপ্তরের প্রকল্প মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার পর হাকালুকি হাওরে যেন শুরু হয়েছে ধ্বংসযজ্ঞ। অভয়াশ্রমে পড়েছে হাওর খেকোদের লোলুপ দৃষ্টি। হাওরে জলজ বন ধ্বংস এবং পাখি ও মাছ শিকারি এমন কয়েক ব্যক্তির নাম উল্লেখ করে হাকালুকির বোরোদল ইসিএ ব্যবস্থাপনা বহুমুখী সমবায় সমিতির সভাপতি মখলিছ আলী গত ১২ই ফেব্রুয়ারি বড়লেখা থানায় একটি মামলা করেন। স্পষ্ট নাম উল্লেখ থাকলেও আসামিদের বিরুদ্ধে পুলিশ কোনো ব্যবস্থা নেয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি। ফলে মামলা করে উল্টো নিজের নিরাপত্তা নিয়ে উৎকণ্ঠায় রয়েছেন মখলিছ আলী। এছাড়া হাওরের গুটাউরা হাওর খালবদ্ধ জলমহাল থেকে প্রতি রাতে ৫-১০ লাখ টাকার মাছ লুটপাট হচ্ছে বলে বড়লেখা উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কাছে লিখিত অভিযোগ করা হলেও তাতে কোনো প্রতিকার হয়নি।
এদিকে কুলাউড়ার নওয়াগাঁও গ্রাম সংরক্ষণ দলের সাধারণ সম্পাদক মো. কবির আহমদ গত ১৩ই ফেব্রুয়ারি হাকালুকি হাওরের টোলার বিল অভয়াশ্রম এলাকায় রাতের আঁধারে বিষটোপে পাখি শিকার, গবাদি পশুর বাথান দিয়ে বনায়ন নিধন ও জলজ বনের গাছ কাটা বন্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বড়লেখা উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কাছে ১৭ জনের নাম উল্লেখ করে লিখিত অভিযোগ দেন। অভিযুক্তদের বেশির ভাগ মানুষের বাড়ি ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার ঘিলাছড়া ইউনিয়নে। রাতের আঁধারে এরা বিষটোপে পাখি শিকার করে এবং গবাদি পশুর বাথান পরিচালনার নামে জলজ বন ধ্বংস করছে। শুধু এরাই নয় বিল ইজারাদারদের পাহারাদারাও পাখি শিকার ও বিল সেচে মাছ শিকারের মতো ধ্বংসাত্মক কাজের সঙ্গে জড়িত।
এশিয়ার বৃহত্তম এই হাওরটি হাওর উন্নয়ন বোর্ডে অধীনে না থাকায় পরিবেশ অধিদপ্তর কিংবা সরকারি-বেসরকারি কোনো সংস্থার কোনো কার্যক্রম নেই হাওরে। আর স্থানীয় প্রশাসনের ভূমিকাও এ ব্যাপারে রহস্যময়। বরং, প্রশাসনের যোগসাজশে ক্ষমতাসীন দলের নেতারা অভয়াশ্রমকে ইজারার আওতায় আনার অপচেষ্টায় লিপ্ত বলে জানা গেছে।
এসব ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডের ফলে চলতি মৌসুমে হাকালুকি হাওরে অতীতের তুলনায় অতিথি পাখির সমাগম কমেছে বলে জানিয়েছেন দেশের খ্যাতিমান পাখি বিশেষজ্ঞ ইনাম আল হক।
কুলাউড়া উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা সুলতান মাহমুদ জানান, অতিথি পাখি কম আসা মানে মাছের উৎপাদন কমে যাওয়া। ফলে মাছ আর পাখির জন্য যত বেশি অভয়াশ্রম হবে তাতে পাখির সমাগম বৃদ্ধি পাবে। পাখির সমাগম বৃদ্ধি পেলে মাছের উৎপাদন বাড়বে। তাতে সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবে হাওরের উপর জীবিকা নির্বাহকারী মানুষ।
বন্যপ্রাণি ও জীববৈচিত্র্য বিভাগের বিভাগীয় কর্মকর্তা মিহির কুমার দো জানান, পাখি নিধন ও জলজ বন ধ্বংস রোধ করতে হলে স্থানীয় জনগণকেই এগিয়ে আসতে হবে। এমনিতে হাওর দুর্গম  ও বিশাল এলাকা। ২ জন প্রহরী কেন ১০-২০ জন দিয়েও এত বিশাল এলাকায় পাখির বিচরণ নিশ্চিত করা কঠিন।
এব্যাপারে মৌলভীবাজারের জেলা প্রশাসক মো. তোফায়েল ইসলাম সাংবাদিকদের জানান, পাখি শিকার বা জলজ বন ধ্বংসে প্রশাসনের নীরব থাকার কোনো সুযোগ নেই। প্রশাসনের পাশাপাশি বন্যপ্রাণি ও জীববৈচিত্র্য বিভাগের কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে বিষয়টি প্রতিকারের ব্যবস্থা নেয়া হবে। আলাউদ্দিন কবির, কুলাউড়া (মৌলভীবাজার) থেকে | ১ মার্চ ২০১৮, বৃহস্পতিবার সুত্র মানবজমনি


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আরও পড়ুন

ডা. মোহাম্মদ খালেদ মাহমুদ করোনা আক্রান্ত

         শুক্রবার সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল...

গোয়াইনঘাটে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি, জনজীবন বিপর্যস্ত

         মনজুর আহমদ, গোয়াইনঘাট (সিলেট) থেকেঃ...

সিলেটে স্বামীর পুরুষাঙ্গ কর্তনের ঘটনায় গেনী বেগম কারাগারে

         পরকীয়ার জেরে ঘুমন্ত অবস্থায় স্বামীর...

শাবির ভর্তি পরীক্ষায় ডিজিটাল ডিভাইসসহ আটক ৫

         শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের...