অন্যপ্রজাতির ভিড়ে দরগায় জালালি কবুতর কমে যাচ্ছে

প্রকাশিত : ০৯ জানুয়ারি, ২০১৯     আপডেট : ১ বছর আগে  
  

আহমাদ সেলিম : সিলেটের অনিন্দ্য সুন্দর জালালি কবুতর। পর্যটকদের কাছে এই কবুতর পুণ্যভূমির প্রধান আকর্ষণ। হযরত শাহজালাল (রঃ) এর স্মৃতি বিজড়িত কবুতরগুলো দেখতে পর্যটকরা প্রতিদিন দরগায় আসেন। দলবদ্ধভাবে হঠাৎ করে তাদের ডানা ঝাপটে আকাশে উড়ে বেড়ানোর দৃশ্য সবাইকে আকৃষ্ট করে। কিন্তু ইদানীং জালালি কবুতরের ঝাঁক আগের মতো চোখে পড়ে না। জালালি কবুতরের সাথে পাল্লা দিয়ে দরগা’র ভেতর অন্যপ্রজাতির কবুতরের সংমিশ্রণও ঘটেছে। ঐতিহ্য রক্ষার্থে এগুলো সরিয়ে ফেলা উচিত বলে মনে করছেন বিশিষ্টজনেরা।
হযরত শাহজালালের জীবনী যারাই লিখেছেন তাদের প্রায় সবাই কবুতর সম্পর্কে একটি কাহিনী বর্ণনা করেছেন। সিলেটে আসার পথে হযরত শাহজালাল দিল্লীতে অবস্থান করেন। পথে সাক্ষাৎ হয় বিখ্যাত সাধক নিজামউদ্দিন-এর সাথে। তিনি একজোড়া কবুতর উপহার দেন হযরত শাহজালালকে, যা আজকের জালালি কবুতর বা ‘জালালি কইতর’ নামে পরিচিত। সেই কবুতর শত শত বছরের ঐতিহ্য নিয়ে টিকে আছে সিলেটের হযরত শাহজালাল (র.)-এর মাজারে। এ কাহিনীটি জনপ্রিয় এবং বহুশ্রুত। তাই, শুরু থেকে জালালি কবুতরের প্রতি সিলেটবাসীর দৃষ্টিভঙ্গি শ্রদ্ধাপূর্ণ। ধর্মপ্রাণ সিলেটের মানুষের বিশ্বাস- এই কবুতর হারিয়ে যেতে পারে না। এই কবুতর শিকার করা, ধরে বিক্রি করা বা খাওয়ার কথা কেউ ভাবতেও পারে না। তাই, প্রায় ৮০০ বছর ধরে কবুতরের এই বিশেষ প্রজাতির ওড়াউড়িতে মুখরিত শাহজালালের মাজার।
সারাদিন মাজার বা যেখানেই জালালি কবুতর ওড়াউড়ি করুক না কেন, সন্ধ্যায় ফিরে আসে মাজারে। এই কবুতর যেন আধ্যাত্মিক ও প্রকৃতির সঙ্গে মিলেমিশে একাকার। কবুতরগুলো যখন হঠাৎ করেই একসাথে ডানা ঝাপটে আকাশে উড়ে বেড়ানো শুরু করে, তখন মাজার এলাকায় অপরূপ দৃশ্যের অবতারণা করে। লোকবিশ্বাস, যে বাড়িতে জালালি কবুতর বাসা বাঁধে তার মঙ্গল হয়। সেই বিশ্বাস থেকে একসময় অনেকেই বাসাবাড়িতে, বাড়ির ছাদে, গাছের সাথে কলসি বেঁধে রাখতেন। শান্তির প্রতীক কবুতর আসার জন্য, বাসা বাঁধার জন্য অনেকে মাটির কলসির ভেতর রাখতেন ধান, চাল। কেউ কাঠের তৈরী কুঠুরিও বানিয়ে রাখতেন। মানুষের সেই ভালোবাসার আহবানে সাড়া দিতো জালালি কবুতরও। তারা বাসা বাঁধতো। কারণ কবুতর কখনো খড়কুটো দিয়ে বাসা বানায় না। বাসাবাড়ি ছাড়া একসময় জালালি কবুতরের ডানার ঝাপটানি শোনা যেতো সরকারি অফিস আদালতের ছাদের কার্ণিশে। সিলেটের ক্বিনব্রিজ এবং আলী আমজাদের ঘড়ি ঘরের আশপাশেও কবুতরের ভিড় ছিলো। বিশেষ করে ক্বিনব্রিজ ছিলো জালালি কবুতরের রাতের আশ্রয়। সন্ধ্যার আগ থেকেই তারা ক্বিনব্রিজে এসে জড়ো হতো। এই দৃশ্য এখন আর চোখে পড়ে না। তবে এখনো জালালি কবুতরের নিরাপদ এবং বড় আশ্রয়স্থল হযরত শাহজালালের মাজার। দরগা চত্বরে দেয়ালঘেরা পাকা একখন্ড মাঠের মতো স্থানে ভিড় করে কবুতর। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা ভক্ত আশেকান ও পর্যটকরা ধান ছড়িয়ে দেন সেখানে। এই স্থানেও আগের মতো জালালি কবুতরের ভিড় নেই। নিরাপদ আবাসস্থলের অভাবে হোক বা অন্য কোন কারণে হোক জালালি কইতর বিলুপ্ত হতে শুরু করেছে। যেগুলো টিকে রয়েছে সেগুলোর সাথে এখন যুক্ত হয়েছে অন্যপ্রজাতির কবুতর। সেই কবুতরগুলো এখন দরগা এলাকায় জালালি কবুতরের সাথে সখ্যতা গড়েছে। তারাও মিশে গেছে জালালির ভিড়ে। একদিন হয়তো এই ভিড় থেকে হারিয়ে যাবে প্রকৃত জালালি কবুতর।
জালালি কবুতর স্বতন্ত্র প্রজাতির না হলেও এর আলাদা বৈশিষ্ট্য আছে। অন্যান্য দেশে প্রায় একই রঙের যে কবুতর দেখা যায়, জালালি কবুতর আকারে তার চেয়ে সামান্য ছোট। রঙেও কিঞ্চিৎ তারতম্য আছে। জালালি কবুতরের মাথা-পিঠ-বুক ঘন-ধূসর, ঘাড়-গলা ধাতব সবুজ, তার ওপরে গোলাপি রঙের আভা। ডানার প্রান্তে যেমন দুটো চওড়া কালো ব্যান্ড আছে, তেমনি লেজের আগায় আছে কালচে একটি আড়াআড়ি ব্যান্ড। পা লালচে, ঠোঁট কালচে। ঠোঁটের গোড়ায় সাদা রং। যে কারণে অন্য প্রজাতির কবুতরগুলো জালালি কবুতরের সাথে মিশে গেলেও তা সহজে চেনা যায়। সিলেটের আধ্যাত্মিক নিদর্শন জালালি কবুতর ধরে রাখতে সচেতনতার পাশাপাশি নিরাপদ আবাসস্থল গড়ে তোলা খুব বেশি জরুরি বলে মনে করা হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে যোগাযোগ করা হলে সুজনের সভাপতি ফারুক মাহমুদ চৌধুরী বলেন, একসময় ক্বিন-ব্রিজ এলাকায় খুব বেশী জালালি কবুতরের বিচরণ ছিলো। ব্রীজ দিয়ে হেঁটে গেলে মাথায় কবুতরের বিষ্ঠা পড়ে যেতো। এখন দরগা এলাকায়ও আগের মতো জালালি কবুতর নেই। বাজারের সাধারণ কবুতরের সংখ্যা বেড়ে গেছে। একসময় হয়তো তাদের ভিড়ে জালালি কবুতর হারিয়ে যাবে। এজন্য প্রয়োজন অন্যগুলো সরিয়ে ফেলা। সেই সাথে জালালি কবুতরের নিরাপদ আবাসস্থল তৈরী করা এবং কিভাবে জালালি কবুতরের প্রজনন বৃদ্ধি পায় সে বিষয়ে চিন্তা করা। একইভাবে সিলেটের ঐতিহ্য জালালি কবুতর রক্ষার দাবী জানিয়েছেন বিশিষ্ট আইনজীবী, স্টেশন ক্লাবের সভাপতি ই ইউ শহীদুল ইসলাম শাহীন। তিনি অন্যপ্রজাতির কবুতর বৃদ্ধির জন্য দরগায় আসা অতিউৎসাহী ভক্তদের দায়ী করেছেন। তিনি বলেন, কিছু ভক্ত বাজার থেকে কবুতর কিনে এনে দরগায় ছেড়ে দেন। এজন্য কর্তৃপক্ষকে অবশ্যই কঠোর হবার পাশাপাশি অন্যপ্রজাতি কবুতর সরিয়ে ফেলার উদ্যোগ নিতে হবে। না হলে সিলেটের ঐতিহ্য হারিয়ে যাবে। দরগা মাজারের মোতওয়াল্লি ফতেহ উল্লা আল আমান এর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, ‘কিছু ভক্ত বাজার থেকে কবুতর এনে লুকিয়ে ছেড়ে দেয়, আবার কিছু অন্যপ্রজাতির কবুতর জালালি কবুতরের সাথে চলে আসে। আমরা অবশ্য মাঝে মাঝে অন্যপ্রজাতির কবুতর সরিয়ে ফেলি। একইসাথে জালালি কবুতরের প্রজনন বাড়ানোরও ব্যবস্থা করছি।’

আরও পড়ুন



ইসলামে নারী মর্যাদা

মো:শামসুল ইসলাম সাদিক ইসলাম আগমনের...

শেখ রাসেলের জন্মদিন আজ

শেখ রাসেল ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরি স্কুলের...

সিলেটের ৬৬ প্রার্থীর ভাগ্য নির্ধারণ আজ

সিলেট এক্সপ্রেস ডেস্ক: একাদশ জাতীয়...