অনুভবে অনুরাগে’র ভালোবাসার দ্যুতি ছড়িয়ে

প্রকাশিত : ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৮     আপডেট : ২ বছর আগে
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সাঈদ চৌধুরী: সিলেট প্রেসক্লাবের প্রয়াত সদস্যদের জীবন ও কর্ম নিয়ে প্রণীত গ্রন্থ অনুভবে অনুরাগে’র মোড়ক উন্মোচন হয়ে গেলো ভালোবাসার দ্যুতি ছড়িয়ে।

২৬ সেপ্টেম্বর দুপুরে প্রয়াতদের সন্তানেরা সিলেট প্রেসক্লাব মিলনায়তনে নিজেদের গর্বিত পিতার স্মরণ সভায় অভিভূত হয়েছেন দেখে বিমুগ্ধ হয়েছি। এ যেন তাদের কাছে – ভোঁর বেলায় সূর্যের প্রথম রশ্মি হয়ে বলে যাওয়া শুভ সকাল, দুপুরের কড়া রোদের মাঝে এক টুকরো মেঘ হয়ে ছায়া দিয়ে যাওয়া, ক্লান্ত বিকেলে এক দমকা হাওয়া হয়ে মন দুলিয়ে যাওয়া।

নতুন প্রজন্মের এই তারকাগুলো তাদের পিতার সতীর্থদের ভালোবাসায় সিক্ত, গভীর স্নেহের ছোঁয়ায় ধন্য হয়েছে। এ সময় তাদের চাহনি উপস্থিত অনেকের হৃদয় ছুঁয়েছে। এমন মহতি কাজের জন্য উদ্যোক্তাদের জানাই হৃদয় নিংড়ানো অভিবাদন।

গত কয়েকদিন ধরে আমি আশ্চর্য হয়ে দেখছিলাম, কী উৎসাহ-উদ্দীপনা ও আন্তরিকতা নিয়ে প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ইকবাল মাহমুদ কাজটি করছেন এবং সভাপতি ইকরামুল কবির, সম্পাদনা পরিষদ সদস্য এনামুল হক জুবের, খালেদ আহমদ, মো: ফয়সল আলম, শুয়াইবুল ইসলাম, দিগেন সিংহ সহ নির্বাহী কমিটির সদস্যরা তাকে সহায়তা দিয়ে যাচ্ছেন। প্রকাশনা অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আজ তা পূর্ণতা পেয়েছে।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি কমনওয়েলথ জার্নালিস্ট এসোসিয়েশনের আন্তর্জাতিক সভাপতি প্রখ্যাত সাংবাদিক হাসান শাহরিয়ার বলেছেন, ‘সিলেট প্রেসক্লাবের প্রয়াত সাংবাদিকগণ স্মৃতিতে ভাস্বর; তাঁরা ছিলেন আলোকবর্তিকা। তাঁদের কীর্তি ছিল কর্মের চেয়েও মহান। তাঁদের চিন্তাচেতনা ও অনুসৃত পথই সিলেট প্রেসক্লাবের প্রেরণার উৎস। আজ তাঁদের কথা স্মরণ করে, তাঁদের অঙ্গীকার, পেশার মান উন্নয়নে আপোসহীন সংগ্রাম, নিরপেক্ষ সাংবাদিকতা, সহযোগিতা ও পৃষ্ঠপোষকতার স্বীকৃতি দিয়ে এবং তাঁদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে সিলেট প্রেসক্লাব ঋণের ভার কিছুটা হলেও লাঘব করেছে।’

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ক্লাব সভাপতি ইকরামুল কবির। স্বাগত বক্তব্য রাখেন সাধারণ সম্পাদক ইকবাল মাহমুদ। পাঠাগার ও প্রকাশনা সম্পাদক খালেদ আহমদের পরিচালনায় বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের বিশিষ্ট আইনজীবী সিলেট প্রেসক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক তবারক হোসাইন।

বক্তব্য রাখেন প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি আব্দুল মালিক চৌধুরী ও ইকবাল সিদ্দিকী, প্রখ্যাত সাংবাদিক হোসেন তৌফিক চৌধুরী, সাংবাদিক ও প্রাবন্ধিক রফিকুর রহমান লজু, দৈনিক সিলেটের ডাকের নির্বাহী সম্পাদক আবদুল হামিদ মানিক, দৈনিক সিলেট সংলাপের সম্পাদক মুহাম্মদ ফয়জুর রহমান, কলামিস্ট আফতাব চৌধুরী, ক্লাবের সিনিয়র সহ-সভাপতি এনামুল হক জুবের, সহ-সভাপতি এম এ হান্নান, সিনিয়র সাংবাদিক আব্দুল মালিক জাকা, সাবেক সহ-সভাপতি মোহাম্মদ বদরুদ্দোজা বদর ও হুমায়ূন রশিদ চৌধুরী, সাবেক সাধারণ সম্পাদক সমরেন্দ্র বিশ্বাস সমর, মৌলভীবাজার প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি বকশি ইকবাল, প্রবাসী সাংবাদিক সাঈদ চৌধুরী, ক্লাবের ক্রীড়া ও সংস্কৃতি সম্পাদক নূর আহমদ, সাবেক পাঠাগার ও প্রকাশনা সম্পাদক মো. আব্দুল মুকিত অপি, সাবেক ক্রীড়া ও সংস্কৃতি সম্পাদক আহবাব মোস্তফা খান ও মো. আব্দুল আহাদ, প্রয়াত সাংবাদিক জিতেন সেনের মেয়ে ইন্দ্রানি সেন। অনুষ্ঠানের শুরুতে কোরআন তেলাওয়াত করেন সিনিয়র সাংবাদিক আব্দুর রাজ্জাক।

উপস্থিত ছিলেন, প্রেসক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রশিদ মো. রেনু ও মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম, দৈনিক সিলেট বাণীর সম্পাদক ওবায়দুল হক চৌধুরী, প্রেসক্লাবের কোষাধ্যক্ষ শাহাব উদ্দিন শিহাব, সাবেক কোষাধ্যক্ষ খালেদ আহমদ, কার্যনির্বাহী সদস্য মো. ফয়ছল আলম, শুয়াইবুল ইসলাম ও দিগেন সিংহ, গল্পকার সেলিম আউয়াল, আবু তালেব মুরাদ, আব্দুল বাতিন ফয়সল, চৌধুরী দেলোয়ার হোসেন সেলিম, শেখ নাসির প্রমুখ সহ ক্লাবের সদস্যবৃন্দ ও প্রয়াত সাংবাদিকদের পরিবারের সদস্য।

সভাপতির বক্তব্যে ইকরামুল কবির বললেন, ‘স্বপ্ন গড়া মানুষেরা হারিয়ে যায়। হারানো মানুষেরা রেখে যায় দৃঢ় স্তম্ভে গড়া স্মৃতি। স্মৃতিগুলো এগিয়ে যায় প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম। এমনই একেক জন মানুষ চলে যান মনের গহীনে দাঁগ কেটে। কীর্তিমান ব্যক্তিরা চলে যান, কিন্তু বেঁচে থাকেন মানুষের মাঝে। তাঁদের কর্মযজ্ঞ অমর করে রাখে অনন্তকাল। সিলেট প্রেসক্লাবের প্রয়াত সদস্যরা তাঁদের কীর্তি, মননশীলতা ও মেধার ছাপ রেখে গেছেন পেশাদারিত্বে। সিলেট প্রেসক্লাব প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা রাখার পাশাপাশি সিলেট অঞ্চলের গণমাধ্যমের প্রসারে তাঁদের ভূমিকা সর্বজন স্বীকৃত। বর্তমানের সমৃদ্ধ গণমাধ্যমের পেছনে এই সব কীর্তিমান পুরুষদের শ্রম- অবদানকে আমরা স্মরণ করছি। সাংবাদিকতার মাধ্যমে সমাজ সংষ্কার বা পরিবর্তনে জীবনকে নিবেদন করে গেছেন, এমন কীর্তি রেখে যাওয়া অগ্রজ ও অনুজ সহযোদ্ধাদের স্মরণ করতে পেরে নিজের দায়িত্ববোধকে আজ সফল মনে করছি। না ফেরার দেশের কীর্তিমান সাংবাদিকদের চলার পথের নানা স্মৃতি-বিস্মৃতি, কীর্তি তুলে ধরেছেন আমাদের সহকর্মীরা। আমরা চেষ্টা করেছি সর্বোচ্চ শ্রম দিয়ে স্মরণীয়-বরণীয় ব্যক্তিত্বদের উপস্থাপনের। আমার বিশ্বাস প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে যারা সুস্থধারার গণমাধ্যমকে সবসময় এগিয়ে নিয়ে যেতে সচেষ্ট, তাদের অনুপ্রাণিত করবে এই প্রকাশনা।‘

স্বাগত বক্তব্যে সাধারণ সম্পাদক ইকবাল মাহমুদ বলেন, ‘সিলেট প্রেসক্লাব প্রতিষ্ঠার পর থেকে যারা বিভিন্ন সময় নানা অবদান রেখে পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন তাঁদের স্মৃতি ও কর্মকে স্মরণীয় করে রাখতে কিছু করার চিন্তা আসে মাথায়। প্রাথমিক কাজ শুরু করে বুঝলাম কাজটা যত সহজ মনে করেছিলাম, ততটা সহজ নয়। সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়লাম তথ্য সংগ্রহ নিয়ে। সিনিয়র সহ সভাপতি জনাব এনামুল হক জুবের এর নেতৃত্বে একটি সম্পাদনা পরিষদ গঠন করা হলো। কাজ এগুতে থাকলো। লেখা সংগ্রহ করতে গিয়ে অনেক সম্মানিত জ্যেষ্ট সহকর্মীকে সময়ে অসময়ে জালাতন করেছি। কেউ কেউ বিরক্ত হয়েছেন, অনেকেই হাসিমুখে সাহায্য করেছেন। কিন্তু সবশেষ ‘অনুভবে-অনুরাগে’ স্মারক গ্রন্থটি হাতে পেয়ে সবাই খুশি হবেন, আশা করছি। কারণ, এক মলাটের ভেতরে এত জন কীর্তিমান মানুষের জীবন ও কর্ম লিপিবদ্ধ করা নিঃসন্দেহে একটি বড় কাজ হয়েছে। এর মাধ্যমে ইতিহাসের একটি বড় দায় শোধের পাশাপাশি পূর্বসূরীদের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা প্রদর্শনের একটি অনিবার্য কর্তব্য আমরা সম্পাদন করতে পেরেছি।’

সিলেট প্রেসক্লাব নেতৃবৃন্দ একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজের আন্জাম দিলেন, যা জাতীয় দায়িত্ব পালনের পর্যায়। এটি একটি বিশাল কাজ। একটি নতুন ইতিহাস রচনা করে নিজেরাও ইতিহাসের অংশ হয়ে গেছেন।

অনুভবে অনুরাগে- প্রেসক্লাবের প্রয়াত সদস্যদের স্মরণে একটি গ্রন্থমাত্র নয়, এটি আমাদের জন্য বহুমাত্রিক ঐতিহাসিক দলিল। আরও অনেক বছর পরে যখন আমরা কেউ থাকব না, তখন এই দলিলগুলো থাকবে।

সম্প্রতি ‘কালজয়ী কবিতার স্রষ্টা আল মাহমুদ’ শীরোনোমে আমার একটি বই প্রকাশিত হয়। এটি পেয়ে কিছু প্রিয়জন সিলেটের সাহিত্যিক ও গুণীজনদের নিয়ে লেখার পরামর্শ দেন।

তাদের অনুপ্রেরণায় আগস্ট মাসে আমার বেশ কটি লেখা দেশে ও প্রবাসে ছাপা হয়েছে। এরমধ্যে রয়েছে, জন্মশত বার্ষিকীতে বঙ্গবীর এমএজি ওসমানী’র প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি, চিরস্মরণীয় হুমায়ূন রশীদ চৌধুরী, মুক্তবুদ্ধির অনন্য মানুষ আমিনুর রশীদ চৌধুরী, অনন্য অভিযাত্রায় লে. কর্নেল (অব) এম আতাউর রহমান পীর, আলোকিত সমাজে মুকতাবিস-উন-নূর একজন আদর্শ ব্যক্তিত্ব, দৃষ্টিতে ও সৃষ্টিতে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের অধিকারী আবদুল হামিদ মানিক, প্রেরণার উৎস কবি রাগিব হোসেন চৌধুরী, মৃত্তিকার ছাইভস্ম ও কবি কালাম আজাদ, মুকুল চৌধুরী : জ্যোতির্ময় কবি, সিলেটের সাহিত্যাঙ্গনে সেলিম আউয়াল একজন আলোকিত মানুষ, সৈয়দ মোহাম্মদ আতহার অদম্য স্পৃহায় ছুটে গেছেন সম্মুখপানে, আহবাব চৌধুরী রচিত কালের ভাবনার গ্রন্থ পাঠ-অনুভুতি।

এই কাজটি করতে গিয়ে আমার হৃদয়ে একটা বেদনা জেগেছিল। শতবর্ষের সাংবাদিকতার ঐতিহ্য ধারণকারী এই সিলেটের অনেক বড় মাপের লেখকের সঠিক তথ্য ও ইতিহাস খুঁজে পাওয়া ভার! কী হবে তার?

আজ সিলেট প্রেসক্লাব এই অভাব পুরণে যে সাহসীকতা দেখিয়েছে, তা দুর্নিবার, অদমনীয় বলেই আমার কাছে প্রতিভাত হয়েছে।

অনুভবে অনুরাগে’র প্রায় সবকটি লেখায় চমৎকার শব্দের গাঁথুনি ও শব্দচয়ন। আমি অভিভূত হয়ে নতুন এক সিলেটকে জানছি। আমার জানা ও না জানার মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করছি।

যারা আজ আমাদের মাঝে নেই, তারা সততা ও বিশ্বাসে, মেধা ও শ্রমে, মানবিকতা ও বিবেচনাবোধের এক অনুপম সমন্বয় সাধন করে গেছেন। তারা বেঁচে থাকুন আমাদের অন্তরে। তাঁদের সৃষ্টিশীলতা বেঁচে থাকুক।শিরদাড়া হয়ে থাকুক তাঁদের কর্ম-আদর্শ।


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

পরবর্তী খবর পড়ুন : এবার মাছের পেটে ইয়াবা

আরও পড়ুন

থ্যালাসেমিয়া রোগীদের অনুদান প্রদান

         বিএমএ’র মহাসচিব ডা. ইহতেশামুল হক...

মেয়র প্রার্থী এডভোকেট জুবায়েরের সমর্থনে কর্মীসভা

         সিলেট মহানগরীর শহাপরান পশ্চিম থানার...

ভাবির চেহারার দিকে দৃষ্টি দেওয়ার বিধান

         ইসলাম ও জীবন ডেস্ক: ভাইয়ের বউ...

ডায়াবেটিস টাইপ-২ নিরাময়ের উপায় উদ্ভাবন করেছে গবেষকরা

4        4Sharesঅস্ট্রেলিয়ান গবেষকরা প্রথমবারের মতো ডায়াবেটিস...