অঙ্গীকার রক্ষা করা ইমানের দাবি

প্রকাশিত : ২৪ জুলাই, ২০১৮     আপডেট : ২ বছর আগে  
  

বায়েজীদ মাহমুদ ফয়সল : একজন ইমানদার ব্যক্তির মৌলিক বৈশিষ্ট্যের অন্যতম হলো ওয়াদা বা প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা। এ বিষয়ে পবিত্র কোরআন ও হাদিসের বর্ণনাগুলো অধ্যয়ন করলে বোঝা যায়, অঙ্গীকার রক্ষা করা ইমানের দাবি। মুমিন ওয়াদা ভঙ্গ করতে পারে না। ‘মুমিন ব্যক্তি ওয়াদা করলে তা পূরণ করে।’ আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনের বেশ কয়েকটি আয়াতে ওয়াদা পূরণ করতে নির্দেশ দিয়েছেন। যেমন ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমরা ওয়াদা বা প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করো। নিশ্চয়ই প্রতিশ্রুতি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।’ (সুরা বনি ইসরাইল, আয়াত ৩৪)। তোমরা যখন পরস্পর আল্লাহর নামে কোনো ওয়াদা করো তা পূর্ণ করো। (সুরা নাহল, আয়াত ৯১)। ‘হে ইমানদাররা! তোমরা ওয়াদাগুলো পূরণ করো।’ (সুরা মাইদা, আয়াত ১)।
মানুষের পারস্পরিক ওয়াদা-অঙ্গীকার বা চুক্তি হতে পারে ব্যক্তির সঙ্গে ব্যক্তির, ব্যক্তির সঙ্গে সমষ্টির বা সমষ্টির সঙ্গে সমষ্টির। একাধিক ব্যক্তি সম্মিলিত হয়ে যদি কোনো অঙ্গীকার বা চুক্তি করে, তাহলে প্রত্যেকেই চুক্তি বাস্তবায়নে দায়বদ্ধ থাকবে। চুক্তির অপর পক্ষ তাদের যেকোনো ব্যক্তির কাছেই চুক্তিবদ্ধ অধিকার দাবি করতে পারবে এবং সে তা পূরণে বাধ্য থাকবে। কোম্পানি এবং সরকারি চুক্তিও আলোচ্য অঙ্গীকারের আওতাভুক্ত। চুক্তির ক্ষেত্রে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য দায়বদ্ধ থাকবেন। কোম্পানি বা সরকারি নীতিমালা অনুযায়ীই তাকে চুক্তি সম্পাদন ও বাস্তবায়ন করতে হবে। প্রতিষ্ঠানের নীতিমালা ভঙ্গ করে কোনো চুক্তি সম্পাদন করলে তার দায়-দায়িত্ব নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে বহন করতে হবে এবং সে জন্য প্রতিষ্ঠান কোনো ক্ষতির শিকার হলে সেটা ওই কর্মকর্তাকেই বহন করতে হবে। হজরত ইবনে উমর (রা.) বর্ণনা করেছেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘সাবধান! তোমরা সবাই দায়িত্বশীল, আর সবাইকেই তার দায়িত্ব সম্পর্কে কিয়ামতের দিন জিজ্ঞাসা করা হবে।’ (বুখারি ও মুসলিম)।
যেকোনো ধরনের ওয়াদা-অঙ্গীকার বা চুক্তি পূরণ করা ওয়াজিব এবং এটা ইমানের পরিপূর্ণতার জন্য একটি অপরিহার্য শর্ত। আর ওয়াদা ভঙ্গ করা বা চুক্তিবিরোধী কাজ করা ইমানের পরিপন্থী, যাকে রাসুলুল্লাহ (সা.) মুনাফেকির আলামত বলে আখ্যায়িত করেছেন। যেমন হজরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেছেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘যে ব্যক্তির মধ্যে চারটি গুণ একত্রে পাওয়া যাবে, সে খাঁটি মুনাফিক আর যার মধ্যে চারটির কোনো একটি পাওয়া যাবে, সেও মুনাফিক হিসেবে গণ্য হবে যতক্ষণ না সে তা পরিত্যাগ করে। গুণ চারটি হলো_(ক) তার কাছে কোনো আমানত রাখা হলে সে তার খিয়ানত করে। (খ) সে কথা বললে মিথ্যা কথা বলে। (গ) সে অঙ্গীকার করলে তা ভঙ্গ করে। (ঘ) সে কারো সঙ্গে বিরোধ হলে অশ্লীলতার আশ্রয় নেয়।’ (বুখারি ও মুসলিম)।

রাসুলে করিম (সা.) অঙ্গীকার রক্ষা করার বিষয়ে অত্যন্ত যত্নবান ছিলেন। নবুয়তপ্রাপ্তির আগেও কোনো দিন তিনি কারো সঙ্গে ওয়াদা ভঙ্গ করেননি। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আবু হাসমা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেন, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সঙ্গে তাঁর নবুয়তপ্রাপ্তির আগে আমি কিছু কেনাবেচা করেছিলাম। তাতে ক্রয়কৃত বস্তুর মূল্যের কিছু অংশ বাকি রয়ে গেল। তখন আমি তাকে বললাম, আপনি এখানে অপেক্ষা করুন, আমি অবশিষ্ট মূল্য নিয়ে এখানে আসছি। কিন্তু আমি বাড়িতে যাওয়ার পর সে ওয়াদার কথা ভুলে গেলাম। তিন দিন পর বিষয়টি আমার স্মরণ হলো। অতঃপর আমি গিয়ে দেখি, তিনি সেখানেই আছেন। আমাকে দেখে তিনি বললেন, তুমি আমাকে কষ্ট দিলে, আমি তিন দিন ধরে এখানে তোমার জন্য অপেক্ষা করছি। (আবু দাউদ)।
ইসলামে ওয়াদা পূরণের বিষয়টিকে অত্যধিক গুরুত্ব প্রদান করা হয়েছে। সে কারণে কোনো ব্যক্তি যদি কারো সঙ্গে ওয়াদা করার পর সে ওয়াদা পূরণ করার আগেই মারা যায়, তাহলে তার ওয়ারিশ বা উত্তরাধিকারীদের ওপর সে ওয়াদা পূরণ করা ওয়াজিব। ফকিহরা এ বিষয়ে একমত যে যদি কেউ কোনো আর্থিক বিষয়ে কারো সঙ্গে কোনো ওয়াদা করে তা পূরণ না করে মারা যায়, তাহলে তার পরিত্যক্ত সম্পদের এক-তৃতীয়াংশ দিয়ে সেটা পূরণ করতে হবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) কিছু ওয়াদা করেছিলেন, যা পূরণ করার আগেই তাঁর ওফাত হয়ে যায়। অতঃপর হজরত আবু বকর (রা.) খলিফা নির্বাচিত হওয়ার পর রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সেসব ওয়াদা পূরণ করেন। বুখারি ও মুসলিম উভয় সহিহ গ্রন্থে সংকলিত একটি হাদিস হজরত জাবের (রা.) বর্ণনা করেছেন। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ওফাতের পর হজরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.) খলিফা নির্বাচিত হওয়ার পর যখন বাহরাইনের গভর্নর আলা ইবনে হাজরামির কাছ থেকে কিছু সম্পদ এলো, তখন আবু বকর (রা.) ঘোষণা করলেন, যার কাছে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কোনো ঋণ আছে অথবা রাসুল (সা.) কাউকে কোনো ওয়াদা করে থাকলে, সে যেন আমার কাছে আসে। তখন আমি বললাম, রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাকে এভাবে, এভাবে, এভাবে দেবেন বলে ওয়াদা করেছিলেন। তিনি (সা.) তিনবার তাঁর দুই হাত প্রসারিত করে এটা বলেছিলেন। অতঃপর আবু বকর (রা.) এ পুঁটলি ভরে আমাকে দিলেন আর আমি গুণে দেখলাম তাতে ৫০০ দিনার আছে। তারপর হজরত আবু বকর (রা.) বললেন, তুমি আরো দ্বিগুণ (এক হাজার দিনার) নিয়ে নাও।’ ইচ্ছাকৃতভাবে কাউকে মিথ্যা প্রলোভন দেওয়াও ওয়াদা ভঙ্গের শামিল। ইমাম বুখারি (রহ.)-এর জীবনী থেকে জানা যায়, তিনি দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে কারো কাছে হাদিস সংগ্রহ করার জন্য গিয়ে দেখলেন, তিনি খাবার দেওয়ার মিথ্যা প্রলোভন দেখিয়ে ঘোড়াকে ডাকছেন। তিনি তার কাছ থেকে হাদিস গ্রহণ না করে ফিরে এসেছেন এ আশঙ্কায়, যে ব্যক্তি একটা প্রাণীকে মিথ্যা প্রলোভন দেখাতে পারে, তার দ্বারা রাসুলের হাদিস সম্পর্কে মিথ্যা বলা কোনো অসম্ভব বিষয় নয়। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আমের (রা.) একটি হাদিস বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, একদিন রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাদের ঘরে বসা ছিলেন, এমন সময় আমার মা আমাকে এ বলে ডাকলেন, এদিকে এসো, আমি তোমাকে কিছু দেব। তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি তাকে কী দিতে চেয়েছিলে? উত্তরে মা বললেন, খেজুর। অতঃপর রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, এ ধরনের প্রলোভন দেখানোর ব্যাপারে সাবধান। যদি তুমি তাকে কিছুই না দিতে, তাহলে তোমার আমলনামায় একটা মিথ্যা লেখা হতো।’ (আবু দাউদ)
আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘ওহে সব লোক যারা ইমান এনেছ! তোমরা একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস কর না। তবে পরস্পরের রাজি-খুশির মাধ্যমে ব্যবসা করাতে দোষ নেই।’ (সূরা নিসা : ২৯)।
ব্যবসা একটি মহান পেশা। রিজিকের খোঁজে ব্যবসা করা বড় ইবাদতও বটে। অনেক নবীই ব্যবসার মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করেছেন। ব্যবসার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে লেনদেনের বিষয়টি। লেনদেন ছাড়া ব্যবসা তো কল্পনাও করা যায় না। ব্যক্তিজীবনেও লেনদেনের জালে বন্দী অধিকাংশ মানুষ। লেনদেন ওয়াদামাফিক হলে কোনো সমস্যা নেই। বিপত্তি তখনই বাধে, যখন কথামতো লেনদেন হয় না। সম্পর্কের অবনতি থেকে শুরু করে খুন-রাহাজানিসহ বড় ধরনের অঘটনও ঘটে যায় ওয়াদা রক্ষা না করার কারণে। তাই ব্যবসা এবং ব্যক্তিগত লেনদেনের ক্ষেত্রে ওয়াদা রক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। মনে রাখতে হবে, সততা যেমন ব্যবসার মূলধন, তেমনি ওয়াদা রক্ষাও ইমানের মূলধন। মুমিন চরিত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো ওয়াদা রক্ষা করা। ওয়াদা রক্ষা করা পবিত্র কোরআনের নির্দেশ। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘আমার সঙ্গে করা ওয়াদা তোমরা পূর্ণ কর। আমিও তোমাদের সঙ্গে করা ওয়াদা পূর্ণ করব। আর আমাকেই ভয় কর।’ (সূরা বাকারা : ৪০)। নবী-রসুলরা ছিলেন ওয়াদা রক্ষাকারী সত্যনিষ্ঠ মহামানব। হজরত ইসমাইল (আ.) সম্পর্কে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘এ কিতাবে স্মরণ কর ইসমাইলের কথা। সে ছিল ওয়াদা রক্ষাকারী সত্যনিষ্ঠ নবী এবং রসুল।’ (সূরা মারয়াম : ৫৪)। আবদুল্লাহ ইবনে হাসমা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবুওয়তের আগে আমি রসুল (সা.) থেকে কিছু দ্রব্য ক্রয় করি এবং বলি আপনি এখানে দাঁড়ান আমি টাকা নিয়ে আসছি। বাড়িতে গিয়ে আমি রসুল (সা.)-এর কথা ভুলে গেলাম। তিন দিন পর মনে হওয়া মাত্রই ওই স্থানে গিয়ে দেখি হুজুর (সা.) দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি আমাকে দেখে শুধু বললেন, তুমি আমাকে খুব কষ্ট দিয়ে ফেললে। আমি তিন দিন পর্যন্ত তোমার জন্য এখানে অপেক্ষা করছি।’ (সুনানে আবু দাউদ : ৪৯৯৬)।
পবিত্র কোরআনের অসংখ্য আয়াতে ওয়াদা রক্ষাকারীর প্রশংসা ও মর্যাদা বর্ণনা করা হয়েছে। আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেন, ‘প্রকৃত মোত্তাকীরা যখন ওয়াদা করে, তখন তা রক্ষা করে।’ (সূরা বাকারা : ১৭৭)। ‘হ্যাঁ! কেউ যদি ওয়াদা রক্ষা করে এবং আল্লাহকে ভয় করে, তবে সে জেনে রাখুক, আল্লাহ এমন খোদাভিরুদের ভালোবাসেন।’ (সূরা আলে ইমরান : ৭৬)।
ওয়াদা রক্ষা না করা কবিরা গুনাহ। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘ওয়াদা রক্ষা না করার অপরাধে আমি বনি ইসরাইল সম্প্রদায়কে অভিশপ্ত জাতিতে পরিণত করেছি। আর তাদের অন্তরগুলোকে করে দিয়েছি কঠিন।’ (সূরা মায়েদা : ১৩।) ‘তিনি তাদের অন্তরে মুনাফিকি স্থায়ী করে দিলেন তার সঙ্গে সাক্ষাৎ হওয়ার দিন পর্যন্ত। কারণ তারা আল্লাহর সঙ্গে কৃত ওয়াদা রক্ষা করেনি বরং মিথ্যাচার করেছে।’ (সূরা তাওবা : ৭৭)। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রসুল (সা.) বলেছেন, ‘মুনাফিকের চিহ্ন তিনটি। যখন কথা বলে মিথ্যা বলে, ওয়াদা করলে খেলাফ করে এবং আমানত রাখলে খেয়ানত করে।’ (বুখারি : ৩৩)। জীবন চলার পথে প্রতিনিয়ত আমরা একে অন্যকে যেসব প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি এসব প্রতিশ্রুতি এবং ওয়াদা রক্ষা করা একান্ত কর্তব্য। ব্যবসা-বাণিজ্য এবং ব্যক্তিগত লেনদেনের ক্ষেত্রেও ওয়াদা রক্ষা অপরিহার্য। এ ব্যাপারে সামন্যতম শৈথিল্য প্রদর্শনও দুনিয়া-আখিরাতে বিপদের কারণ হতে পারে। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তোমরা ওয়াদা রক্ষা কর। ওয়াদা রক্ষার ব্যাপারে তোমাদের প্রশ্ন করা হবে।’ (সূরা বনি ইসরাইল : ৩৩)।
হজরত আলী (রা.) থেকে বর্ণিত, রসুল (সা.) বলেছেন, ‘ধ্বংস তার জন্য! ধ্বংস তার জন্য! ধ্বংস তার জন্য! যে ওয়াদা করল অতঃপর তা রক্ষা করল না।’ (মু’জামুল আওসাত : ৩৬৪৮, তারিখে দিমাশক : ৫৬১১৯)। তাই আসুন! আমরা জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ওয়াদা রক্ষা করার চর্চা করি। কখনো যদি মনে হয়, এ কথাটি আমার রাখা সম্ভব হবে না তাহলে তার কাছ থেকে বিনয়ের সঙ্গে সময় নিয়ে বলবে, ভাই আমাকে আরও কিছু সময় দিন। ইনশাআল্লাহ আপনার পাওনা পরিশোধ করব বা কাজটি সম্পন্ন করব। এটি হলো মুসলমানের চরিত্র। আর মুনাফিকের চরিত্র হলো পালিয়ে বেড়ানো, মোবাইল বন্ধ রাখা, আরেকজনকে দিয়ে মোবাইল রিসিভ করানো। আফসোস মুসলমান সমাজে মুনাফেকি আচরণই বেশি হচ্ছে। হে আল্লাহ! আমাদের ক্ষমা করুন এবং ওয়াদা রক্ষাকারী হিসেবে কবুল করুন।
লেখক : প্রাবন্ধিক প্রকাশক ও সংগঠক।

আরও পড়ুন